স্থায়ী শান্তির জন্য মোহামেডান ও হিন্দুদের প্রয়োজন
পরস্পরের ধর্মকে জানা (এক)
ভূমিকা ঃ
হিন্দু এবং মোহামেডান এই দুই ধর্মের মানুষ ভারত উপমহাদেশের দেশসমূহ, অর্থাৎ সাম্প্রতিককালের ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে দীর্ঘকাল পাশাপাশি বসবাস করেছে, এক রাজার অধীনে কাজ করেছে, এক শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, এক সাথে হেসেছে, খেলেছে, কেঁদেছে । একই নৃ-তাত্বিক বৈশিষ্টের অধিকারী এই মানুষেরা প্রায় বারো শ’ বতসর (অষ্টম শতাব্দী থেকে বর্তমান কাল) পাশাপাশি বসবাস করার পর আজও তাদের মধ্যে স্বাভাবিক সৌহার্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয় নি । এটাকে বিশ্বে এক আশ্চর্যের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এই সময়ের চেয়ে অনেক কম সময়ে পাশাপাশি বসবাস করে এক সময়ের চরম শত্রু এবং নৃ-তাত্বিক ভাবে ভিন্ন বৈশিষ্টের অধিকারী মানুষেরা পরম বন্ধু হয়ে শান্তিতে বসবাস করছে এমন উদাহরণ এই পৃথিবীতে ভুড়ি ভুড়ি পাওয়া যাবে । বাংলাদেশ বা ভারতের ক্ষেত্রে এটা যে হয় নি তার পেছনে অবশ্যই যৌক্তিক কারন আছে । শিরোনামে উল্লিখিত বিষয়টি অনুধাবনের জন্য আমাদেরকে এই কারনগুলি খুঁজে বের করতে হবে ।
প্রথমেই মুসলিমদের ধর্মকে মোহামেডান হিসেবে উল্লেখ করার কারণ বিশ্লেষন করা যাক । মুসলিমদের ধর্ম গ্রন্থে ধর্মে পরম মানুষের জন্য একাধিক ধর্ম গ্রন্থ বা বার্তা পাঠিয়েছেন বলে বলা হয়েছে । তার এই বার্তা গ্রহন করে যারা তার কাছে আত্মসমর্পন করেছে তাদেরকে আত্মসমর্পনকারী (আরবীতে 'ইসলাম'
হিন্দু এবং মোহামেডানদের মধ্যে সন্দেহ অবিশ্বাসের একটি প্রধান কারন- ধর্মান্তর । ভারতের এই ধর্মান্তর পৃথিবীর অন্য যে কোন দেশের চাইতে ভিন্ন রকম । ব্যাপারটি উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যাক । নাইজিরিয়ায় মোহামেডান এবং খৃষ্টান ধর্ম প্রচারকেরা স্থানীয় আদিবাসীদের ধর্মান্তরিত করেছে । আরব বনিকেরা সাহারা মরুভূমির বানিজ্যপথ ধরে নাইজিরিয়ায় যায় এবং মোহামেডান ধর্ম প্রচার করে । এর বাইরে তাদের কাজ ছিল ব্যবসা এবং ক্রীতদাস সংগ্রহ করা । আবার বৃটিশ ব্যবসায়ীরা জাহাজযোগে নাইজিরিয়ার দক্ষিনে অবতরন করে । ব্যবসা এবং ক্রীতদাস সংগ্রহের পাশাপাশি তারা খৃষ্টধর্মও প্রচার করে । এই ধর্ম প্রচারের আগে নাইজিরিয়ার আদিবাসী, যারা ছিল একক দলপতিভূক্ত গোষ্ঠী, তাদের মধ্যে মধ্যে হিংসা, কোন্দল ইত্যাদি ছিল তীব্র । এই দুই ধর্ম প্রচারের পরেও তা অব্যাহত থাকে । সাম্প্রতিক কালে সমগ্র বিশ্বে বিশেষ ধর্মমত প্রতিষ্ঠার জন্য যে সংগ্রাম চলছে তার রেশ নাইজিরিয়ায়ও লেগেছে । কিন্তু দুই দশক আগে সে দেশে নানা উপজাতীর মাঝে কোন্দল থাকলেও মোহামেডান এবং খ্রিষ্টান এই দুই ধর্মালম্বীদের মধ্যে মাঝে তেমন কোন কোন্দল ছিল না । ধর্মান্তর কালে অনেক ক্ষেত্রে সেখানে একই পরিবারের কিছু সদস্য হয়েছিল খ্রিষ্টান আর কিছু হয়েছিল মোহামেডান । অথচ তারা একই খাবার টেবিলে খাবার খেতো, নির্দিষ্ট দিনে বা সময়ে উপাসনার জন্য গির্জা বা মসজিদে যেতো । মাঝে মাঝে দেখা যেতো কোন পরিবারের এক মোহামেডান সদস্য হঠাত ঘোষনা করছে যে সে আগামী মাসে খৃষ্টান হচ্ছে, অথবা এর উল্টোটা । এর সব কিছুই তারা সহজ এবং স্বাভাবিক ভাবে গ্রহন করতো ।
উপরে নাইজিরিয়ায় ধর্মান্তরের যে কাহিনী লেখা হয়েছে তা কি ভারত, পাকিস্তান বা বাংলাদেশে কল্পনা করা যায় ? উত্তর- না। এই 'না' হবার যৌক্তিক কারন আছে যা গভীর চিন্তার বিষয় । এই পার্থক্যের প্রধান প্রধান কারন হলো,
(০১) নাইজিরিয়ায় যে দুটি ধর্মে ধর্মান্তর হয়েছে, অর্থাৎ খৃষ্টান ও মোহামেডান, তার দুটিতেই ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী ধর্মান্তর করার কথা আছে । অন্য দিকে ভারতে যে দুটি ধর্মের বিষয়ে ধর্মান্তরের কথা বলা হচ্ছে, অরথাৎ হিন্দু এবং মোহামেডান, তার একটিতে একটিতে ধর্মান্তর আছে, অন্যটিতে নেই ।
(০২) নাইজিরিয়ার আদি অধিবাসীরা ছিল গোষ্ঠীবদ্ধ নানান উপজাতির মানুষ যাদের কোন একক বা সাধারণ ধর্ম ছিল না । মোহামেডান এবং খৃষ্টান ধর্ম প্রচারকেরা সেখানে ধর্ম প্রচার করতে গেলে সেই প্রাচীন বিশ্বাস থেকে কেউ হয়েছে মোহামেডান, আর কেউ খ্রিষ্টান। সাবেক ধর্মকে হেয় করা সারা বিশ্বে নতুন ধর্মান্তরীদের একটা সাধারন ব্যাপার । স্বাভাবিক কারনেই নাইজিরিয়ায় নতুন প্রবর্তিত ধর্ম দুটির একটি আরেকটিকে হেয় করার চেষ্টা করে নি । অপর পক্ষে ভারতে কিছু মানুষ হিন্দু থেকে মোহামেডান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে । এখানে সাবেক ধর্মকে হেয় করার ব্যাপারটি ভালোই ঘটেছে ।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ করা যায় যে পৃথিবীতে একেবারে প্রাচীন কালে যে সব ধর্ম এসেছিল স্বাভাবিক কারনেই তাদের মধ্যে "অন্য ধর্মের লোককে ধর্মান্তরিত করার বিধান, অন্য ধর্ম গুলি কেন খারাপ, নতুন ধর্মটি কেন ভালো” এসব বিষয় ছিল না । হিন্দু এবং ইহুদী ধর্মকে এই স্তরে ফেলা যায় । অপরদিকে পরবর্তী কালে প্রচলিত হওয়া ধর্মগুলিতে সাধারন ভাবে একগুলি সন্নিবেশিত হয় ।
মজার ব্যাপার এই যে, নাইজিরিয়ায় মোহামেডান এবং খৃষ্টান ধর্মপ্রচারকেরা একদিকে যেমন অন্যদেরকে এই ধর্ম গ্রহনের জন্য নানা প্রলোভন দেখিয়েছে, অন্য দিকে নিজ নিজ ধর্মকে অন্যের কাছে ভালো প্রমান করার জন্য নিজেরা ভালো ভাবে জীবন যাপন করেছে এবং তাদেরকে এই ধর্ম গ্রহনের অনুরোধ করেছে । এখন আমরা দেখবো, ভারতে এই ধর্ম প্রচারের জন্য কি পন্থা গ্রহন করা হয়েছিল। প্রচারকের বদলে ভারতে ধর্ম প্রচার অথবা সঠিক অর্থে ধর্মান্তরের কাজটি করা হয়েছে রাজাদের দ্বারা । আর অত্যাচারী রাজাদের দ্বারা এ কাজ করা হলে তা কেমন ভাবে হতে পারে তা সাধারন জ্ঞানেই বোঝা যায় । রাজারা যে পদ্ধতিতে এই কাজ করেছে তা ইতিহাসে লেখা রয়েছে। আবার রাজাদের চাপে যারা বাধ্য হয়ে মোহামেডান হয়েছে তারা তাদের সহায়তা করার মহাপরাক্রমশালী রাজাকেই নিজ দলে পেয়ে গেছে । কালক্রমে তারাই হয়ে উঠেছে রাজার সহযোগী শক্তি । এই সব কিছ্য তাদেরকে সাবেক সহধর্মীদের হেয় করার জন্য সহায়তা ও উৎসাহ যুগিয়েছে।
আগে হিন্দুরা দেখেছে সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য রাজাদের আগ্রাসী এবং নৃশংস কর্মকান্ড । দেখেছে কিভাবে নিজেদের আরাম বিলাসের জন্য তারা প্রজাদের শোষন করে, ধর্মান্তরের জন্য জোর জবরদস্তি করে, বা তাদের ধর্মের কারনে জিজিয়া কর আদায় করে । এই সময় এই নতুন প্রচারিত ধর্ম সম্বন্ধে তাদের জানার কোন সুযোগ ছিল না । রাজাদেরও নিজেদের ধর্মের উতকর্ষতা দেখানোর কোন গরজ ছিল না । হিন্দুরা দেখলো, তাদের যে সব সাবেক আত্মীয় এই নতুন ধর্ম গ্রহন করেছে কালে কালে তারাও ‘ছোট রাজা’য় পরিনত হয়েছে । এই অবস্থায় হিন্দুরা নতুন ধর্মকে বিচার করেছে এই ধর্ম পালনকারী মানুষের আচরন থেকে । এই প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিক ভাবেই তারা এই ধর্মকে ক্ষতিকর মনে করতে থাকে এবং এর বিরুদ্ধে প্রচারনা চালায় । এই সময় তাদের কেউ কেউ মোহামেডান ধর্মের বিরুদ্ধে অনেক কথা তৈরী করে এবং সেগুলি "হিন্দু ধর্মে আছে" বলে চালাতে চায় । কিন্তু হিন্দু ধর্মের মূল গ্রন্থে এগুলি না থাকায় তাদের এই প্রচেষ্টা সফল হয় নি । আমরা আগেই বলেছি, ভারতে নানা উপাদানের সমন্বয়ে যখন হিন্দু ধর্ম তৈরী হয় তখন এদেশে আর কোন ধর্মের অস্তিত্বই ছিল না । তাই অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে কোন উক্তি হিন্দু ধর্মে থাকার সুযোগ বা প্রয়োজন কিছুই ছিল না ।
কোন দেশে যখন কোন নতুন ধর্ম আসে তখন সাধারনতঃ ধর্ম প্রচারকেরা এই ধর্মের নানা কথা বলে মানুষকে এর দিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে থাকে । সাধারন মানুষও সাধারনতঃ নতুন ধর্ম সম্বন্ধে জানতে চায় । অদ্ভূত ব্যপার হলো, মোহামেডান ধর্ম যখন এদেশে আসে তখন রাজাদের ভূমিকা, ধর্মগ্রন্থের ভাষার দুর্বোধ্যতা ইত্যাদি কারনে এদেশের হিন্দুদের পক্ষে মোহামেডান ধর্ম সম্বন্ধে কিছু জানা সম্ভব হয় নি । বরং কোন কিছু জানার আগেই তাদের অনেককে ধর্মান্তরিত হতে হয়েছে । এই ধর্মের মূল ধর্মগ্রন্থ আরবী ভাষায় লেখা বলে আজও হিন্দুদের পক্ষে এই ধর্ম ভালো ভাবে জানার সুযোগ তৈরী হয় নি । অপর পক্ষে হিন্দুদের মূল গ্রন্থ সংস্কৃত ভাষায় লেখা হলেও অনেক আগে থেকেই এগুলি বাংলা, ইংরেজী এবং হিন্দীতেও লেখা হয়েছে । তাই এইসব ভাষা জানা মানুষের পক্ষে এই ধর্ম সম্বন্ধে জানতে কোন সমস্যা হয় না । আর হিন্দু ধর্ম সম্বন্ধে জানতে অন্য ধর্মের মানুষের কোন ভয়ও হবার কথা নয়। কারন এসব পড়ে কারো হিন্দু হবার ইচ্ছে হলেও তা কোনভাবেই সম্ভব নয় । ধর্মান্তরের বিধান না থাকায় কেবলমাত্র হিন্দু পরিবারে জন্ম ছাড়া কারও পক্ষে হিন্দু হওয়া সম্ভব নয় ।
-বিজন বিহারী শর্মা
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে আগস্ট, ২০১৫ ভোর ৬:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



