
১৯৮৬ সাল। পৃথিবীজুড়ে তখন বিশ্বকাপের উন্মাদনা। আমার বয়স সাত কি আট বছর হবে। কেওড়াতলা গ্রামের গোলপাতার ছাউনি আর মাটির মেঝের ছোট্ট এক ঘরেই আমাদের বেড়ে ওঠা। গ্রামে বিদ্যুতের খুঁটি সবে বসেছে কিন্তু সেই খুঁটিতে তখনও আলো জ্বলেনি। সন্ধ্যা নামলেই কুপি আর হেরিকেনের হলদে আলোয় ঘর ভরে উঠত আর সেই আলোতেই দিনশেষের গল্পগুলো বেঁচে থাকত। টেলিভিশন তখন আমাদের কাছে কল্পনার বস্তু কিন্তু ফুটবল ঠিকই পৌঁছে গিয়েছিলো গ্রামে। স্কুলে গেলেই সহপাঠীদের মুখে শুনতাম এক জাদুকরের গল্প। নাম তার ডিয়েগো ম্যারাডোনা। তবে তাকে সত্যিকার অর্থে আমার হৃদয়ে বসিয়ে দিয়েছিলেন আমাদের জগদীশ স্যার। কী আবেগ নিয়ে তিনি বলতেন 'ম্যারাডোনা বল নিয়ে দৌড়ায় না বলই যেন তার পায়ের সঙ্গে দৌড়ায়।' আমি তখনো ম্যারাডোনাকে দেখিনি। ছবিতে দেখেছি।
১৯৯০ সাল। এবার প্রথমবারের মতো ম্যারাডোনাকে টিভিতে নিজের চোখে দেখলাম। অবশ্য নিজের বাড়িতে নয় অন্যের বাড়িতে গিয়ে গাদাগাদি করে ঝাপসা ছবির টেলিভিশনের সামনে দাঁড়িয়ে। সেমিফাইনালে কানিজিয়ার উড়ে চলা আর ম্যারাডোনার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনার প্রতিটি ম্যাচ আমার কাছে যেন রূপকথা ছিল। মনে হতো এই মানুষটা হারতেই জানে না। কিন্তু ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে পরাজয়ের পর যখন ম্যারাডোনার চোখে জল দেখেছিলাম তখন নিজের চোখের জলও আর আটকে রাখতে পারিনি। দশ-বারো বছরের এক কিশোরের কাছে সেটাই ছিল জীবনের প্রথম বড় কষ্ট। মনে হয়েছিল পরিবারেরই কেউ হেরে গেছে।
১৯৯৪ সাল। পাশের দারোগা বাড়িতে বসে বিশ্বকাপ দেখতাম। সে বছর ডোপ টেস্টে পজিটিভ হওয়ায় ম্যারাডোনাকে বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিলো। খবরটা শুনে মনে হয়েছিল কেউ যেন আমার কৈশোরের আকাশ থেকে সবচেয়ে উজ্জ্বল তারাটাকে ছিঁড়ে ফেলেছে। মন এতটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে টানা এক সপ্তাহ স্কুলে যাইনি। কারণ ব্রাজিল সমর্থক বন্ধুদের ঠাট্টা সহ্য করার সাহস ছিল না। সেই বছর শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলের দুঙ্গার হাতে বিশ্বকাপ উঠল কিন্তু আমার কাছে সেই বিশ্বকাপের রঙ ছিল ধূসর। আজও মনে হয় সেই দিনটিই হয়তো শিখিয়েছিল যে জীবনের সবচেয়ে বড় নায়কেরও পতন হতে পারে।
১৯৯৮ সাল। ততদিনে বড় হয়ে উঠছি। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা সামনে। এরমধ্যে বিশ্বকাপ শুরু। সেবার ফ্রান্সের জার্সিতে জিনেদিন জিদানের দুই হেডে বিশ্বকাপ জয়ের দৃশ্য দেখে প্রথমবার উপলব্ধি করলাম, ফুটবল শুধু আবেগের নয় শিল্পেরও নাম। সেই রাতে মনে হয়েছিল কিছু মুহূর্ত সময়কে ছাড়িয়ে ইতিহাস হয়ে যায়। আর ইতিহাস কখনো শুধু বিজয়ীদের নয় দর্শকদের হৃদয়েও লেখা থাকে।
২০০২ সাল। এই বিশ্বকাপ আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। মায়ের জমানো টাকা আর আমার টিউশনির টাকা মিলিয়ে ৩৭০০ টাকায় কিনেছিলাম ১৭ ইঞ্চির একটি ন্যাশনাল সাদা-কালো টেলিভিশন। সেটি শুধু একটি যন্ত্র ছিল না আমাদের পরিবারের বহু বছরের স্বপ্ন ছিল। অ্যান্টেনা ঠিক করতে উঠোনে দৌড়াতে হতো। ঘরের ভেতর থেকে কেউ চিৎকার করে বলত, "এইবার পরিষ্কার!" আবার একটু পরই শোনা যেত: না না, ডানে ঘোরা! সেই ঝিরঝিরে সাদা-কালো ছবির আনন্দের সঙ্গে আজকের এইচডি প্রযুক্তির কোনো তুলনাই হয় না। সেই বিশ্বকাপে রোনালদোই ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জেতালেন। আমি আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়েও রেনালদোর খেলা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম।
২০০৬ সাল। তখন কর্মজীবনের ব্যস্ততা শুরু হয়েছে। জীবনের দায়িত্ব বেড়েছে কিন্তু বিশ্বকাপ এলেই সব ব্যস্ততা যেন থেমে যেত। জিনেদিন জিদানের শেষ ম্যাচে সেই অবিশ্বাস্য হেডবাট আর লাল কার্ড দেখে মনে হয়েছিল মানুষের জীবনে সব বিদায় সুন্দর হয় না। কিছু বিদায় অসমাপ্ত থেকেই কিংবদন্তি হয়ে যায়। ফুটবল আমাকে সেদিন শিখিয়েছিলো মহত্ত্ব মানেই নিখুঁত হওয়া নয়।
২০১০ সাল। চাকরি, সংসার, দায়িত্ব সব মিলিয়ে জীবন তখন অন্য এক ছন্দে। তবু বিশ্বকাপ এলেই মনে হতো ভেতরটা আবার জেগে উঠেছে। ইনিয়েস্তার একমাত্র গোলে সেবার স্পেনের প্রথম বিশ্বকাপ জয় দেখে বুঝেছিলাম কখনো কখনো একটি মুহূর্ত একটি জাতির শত বছরের অপেক্ষাকে শেষ করে দেয়।
২০১৪ সাল। এবার আমি পুরো দস্তুর সংসারী মানুষ। ঢাকার ভাড়া বাসায় নিজের ২৪ ইঞ্চির রঙিন টেলিভিশনে বিশ্বকাপ দেখছি। গোলপাতার ঘর থেকে এই পথচলা কম দীর্ঘ নয়। ব্রাজিলের মাটিতে জার্মানির ৭-১ গোলের জয় দেখে পৃথিবীর কোটি মানুষের মতো আমিও স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আর ফাইনালে মেসিকে দেখলাম স্বপ্নের এত কাছে গিয়েও বিশ্বকাপ ছুঁতে পারলো না। বুকের ভেতর কোথায় যেন আবার ১৯৯০ আর ১৯৯৪ সালের কষ্ট ফিরে এল। মনে হচ্ছিল ইতিহাস বুঝি আরেক ম্যারাডোনার গল্প লিখতে চাইছে না।
২০১৮ সাল। ততদিনে আমি ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দা। জীবন অনেকটাই গুছিয়ে নিয়েছি। কিন্তু বিশ্বকাপ এলেই মনে হয় বয়স বলে আসলে কিছু নেই। কিলিয়ান এমবাপ্পে নামে এক তরুণকে পৃথিবী চিনল। তার গতি দেখে মনে হচ্ছিলো ভবিষ্যৎ যেন বর্তমানকে ছাপিয়ে ছুটে যাচ্ছে। অন্যদিকে ছোট্ট দেশ ক্রোয়েশিয়ার অবিশ্বাস্য লড়াই আবার মনে করিয়ে দিল স্বপ্নের কোনো ভূগোল নেই। বড় হৃদয় থাকলে ছোট দেশও বিশ্বকে মুগ্ধ করতে পারে।
২০২২ সাল। ঢাকার মোটামুটি অভিজাত এলাকায় নিজের ঠিকানা জীবনের অনেক স্বপ্নই পূরণ হয়েছে। কিন্তু বিশ্বকাপের ফাইনালের রাতে আমি যেন আবার ফিরে গিয়েছিলাম কেওড়াতলা গ্রামের সেই কুপির আলোয়। প্রায় চার দশকের অপেক্ষা, অসংখ্য ব্যর্থতা, সমালোচনা আর অপূর্ণতার পর লিওনেল মেসি যখন বিশ্বকাপ হাতে তুললো মনে হলো শুধু মেসি না আমার নিজেরও বহু বছরের জমে থাকা কষ্ট ধুয়ে যাচ্ছে। ১৯৮৬ সালে জগদীশ স্যারের মুখে যে গল্প শুনে এক অদেখা মানুষকে ভালোবেসেছিলাম সেই ভালোবাসার পূর্ণতা পেল যেন ২০২২ সালের সেই রাতেই।
জীবনে কত মানুষ হারিয়ে গেছে কতো সম্পর্ক বদলে গেছে কত ঠিকানা পাল্টেছে। কিন্তু চার বছর পরপর বিশ্বকাপ এলেই মনে হয় সময় আসলে কোথাও থেমে আছে। কুপির আলো হারিয়ে গেছে এলইডির ঝলমলে আলোর ভিড়ে। গোলপাতার ঘরের জায়গায় উঠেছে পাকা দালান। ঝাপসা সাদা-কালো টেলিভিশনের জায়গা নিয়েছে হাতের মুঠোয় ধরা এইচডি স্ক্রিন।
বদলেছে সময় বদলেছে জীবন বদলেছি আমিও। কিন্তু বিশ্বকাপ এলেই আমি আবার ফিরে যাই কেওড়াতলা গ্রামের সেই ছোট্ট স্কুলে জগদীশ স্যারের ক্লাসে কিংবা কুপি জ্বালানো সেই সন্ধ্যাগুলোতে। আমার কাছে বিশ্বকাপ শুধু ফুটবল নয় আমার জীবনের সময়গণনার এক অনন্য ক্যালেন্ডার।
ঢাকা
১৪ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
ছবিঃ অন্তর্জাল
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



