somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সবুজের সাম্রাজ্যে দুই দিন (সিলেটের পথে পথে)

১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



প্রতিটি মানুষের ভেতরে একটা পথিক মন ঘুমিয়ে থাকে। কোনো এক ভোরে সে হঠাৎ জেগে ওঠে ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ার জন্য। আমার সেই পথিক মন জেগে উঠেছিল সিলেটের ডাকে। চা-বাগানের সবুজ,পাহাড়ি ঝর্ণার গান, আর পাহাড়ী নদী পিয়াইন ও ধলাই নদীর নীলাভ স্বচ্ছ জলের টানে রওনা দিলাম বৃহষ্পতিবার রাত এগারোটায়। শুক্রবার আর শনিবার দুই দিন, অনেকগুলো গন্তব্য ঘুরেছি আর ফিরে আসার পথে পথে মনের ভেতর জমিয়ে রাখলাম অনেক ভ্রমনের স্মৃতি।

প্রথম দিনের গন্তব্য ছিলো লালাখাল, শ্রীপুর চা বাগান ভিউ পয়েন্ট আর জাফলং।

লালাখালের নৌকায় উঠে যতই এগিয়ে গেলাম, মনে হলো কেউ যেন নদীর জলে নীল আর সবুজ রঙ গুলে দিয়েছে। ভারতের চেরাপুঞ্জি থেকে নেমে আসা পানি সারি নদীতে মিশে তৈরি করেছে এই অপার্থিব রঙ। দুই পাশে গাছের ছায়া, মাঝে নৌকা, আর সামনে অসীম সবুজ মনে হলো নগরের সমস্ত কোলাহল থেকে বহু দূরে এসে পড়েছি। লালাখালের বুকে ভাসতে ভাসতে উপলব্ধি হলো কিছু সৌন্দর্য চোখ দিয়ে নয়, হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হয়।



লালাখাল থেকে বেরিয়ে গাড়ি ছুটলো জাফলংয়ের দিকে। এই পথেই পড়বে শ্রীপুর চা-বাগান। পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে যাওয়া পথ, দুই পাশে সারি সারি চা গাছ। শ্রীপুরের চা-বাগানের ভিউ পয়েন্টে পৌঁছে যখন দাঁড়ালাম, মুখ দিয়ে কথা বেরোলো না। সত্যিই অনবদ্য। সামনে যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ। ঢেউ খেলানো পাহাড়ের গায়ে চা গাছের সবুজ গালিচা, দূরে মেঘের সাথে মিশে যাওয়া পাহাড়ের রেখা। শ্রীপুরের এই ভিউ পয়েন্ট যেন একটা প্রাকৃতিক ক্যানভাস যেখানে প্রকৃতি নিজেই তার সেরা চিত্রকর।



জাফলংয়ে এর আগে বহু বছর আগে একবার গেছি। পিয়াইন নদীর বুকে হাজারো পাথর, ওপারে ভারতের ডাউকি। পাহাড়ের গা থেকে নেমে আসা মেঘ মাঝে মাঝে ছুঁয়ে যাচ্ছে জলের বুক। জাফলংয়ের পাথরগুলো শুধু পাথর নয় এগুলো সুদূর পাহাড়ের গল্প বহন করে আনে নদীর স্রোতে। তবে এবার জাফলং গিয়ে দেখি প্রচুর দোকান পাট, খাবারের দোকান আর পর্যটকদের উপচে পড়া ভীড়। বাঙ্গালী নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্ত পরিবার গুলো যে এখন টুরে আসতেছে সেটা চোখে পড়ার মতো।



জাফলং জিরো পয়েন্ট থেকে কলের নৌকা ভাড়া করে পিয়াইন নদী পার হয়ে গেলাম মায়াবী ঝর্ণা দেখতে। গিয়ে দেখি ঝর্ণায় কোন পানি নাই । তবে ভরা বর্ষায় এই ঝর্না দেখে পর্যটকরা মুগ্ধ হবে তাতে কোন সন্দেহ নাই। আমার পরামর্শ থাকবে যারা এদিকে বেড়াতে যাবেন তারা অবশ্যই ভরা বর্ষায় আসবেন তা না হলে উপভোগ করতে পারবেন না এখানকার সৌন্দর্য।



দিনের শেষ গন্তব্য ছিল খাসিয়া জনগোষ্ঠীর পান পুঞ্জি। পাহাড়ের ঢালে সাজানো ছোট ছোট ঘর, পানের বরজ, আর মাতৃতান্ত্রিক এক সমাজের নিজস্ব জীবনধারা। খাসিয়া নারীরা এখানে মূল ভূমিকায়। সম্পদ, পরিচয়, উত্তরাধিকার সব মায়ের সূত্রে। বাংলাদেশের মূলধারার সংস্কৃতি থেকে একদম আলাদা এই জীবন দেখে মনে হলো একটি দেশের ভেতরেও কত বৈচিত্র্য লুকিয়ে থাকে।



সন্ধ্যার আগে ফেরার পথে পিয়াইন নদীতে প্রায় এক ঘন্টা গোসল করলাম। শরীরটা একদম শীতল হয়ে গিয়েছিলো । সে এক আলাদা প্রশান্তি। তবে বিশাল সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে আবারে পুরো শরীর ঘেমে নেয়ে একাকার। তারপর রাত আটটায় রওনা দিলাম সিলেট শহরের উদ্দেশ্যে।



দ্বিতীয় দিনের লিস্টে ছিলো চা বাগান, রাতারগুলের জলাবন আর সাদা পাথরের নদী এবং দরগাহ জিয়ারত

সকালের নাস্তা সেরে রওনা দিলাম আজকের স্পটগুলো ভিজিটের উদ্দেশ্যে। প্রথকেই পৌঁছে গেলাম মালিনীছড়ায়। বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো চা বাগানগুলোর একটি ১৮৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত। দেড়শো বছরেরও বেশি সময় ধরে এই বাগান চা উৎপাদন করে আসছে। সকালের নরম আলোয় চা পাতায় শিশির জ্বলছে হিরার মতো। দূরে চা শ্রমিকরা ঝুড়ি পিঠে পাতা তুলছেন এই দৃশ্য দেখলে বোঝা যায়, এক কাপ চায়ের পেছনে কত মানুষের পরিশ্রম আর জীবন জড়িয়ে আছে।



পরের গন্তব্য রাতারগুল যাকে বাংলাদেশের আমাজন বলা যেতে পারে। রাতারগুল সম্পর্কে আগে পড়েছিলাম বর্ষায় পানিতে ডুবে যাওয়া এই জলাবন নাকি অন্য এক পৃথিবী। নৌকায় চড়ে ভেতরে ঢুকতেই বুঝলাম, কথাটা অতিরঞ্জন নয়। গাছের শিকড় জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, ডালপালা ছায়া দিচ্ছে নৌকার উপর, পাখির ডাক ছাড়া চারপাশ প্রায় নিঃশব্দ। সূর্যের আলো পাতার ফাঁক দিয়ে সোনালি রেখায় নেমে আসছে জলে। রাতারগুল আপনাকে চুপ করিয়ে দেবে। ভেতরে ভেতরে একটা গভীর শান্তি নামিয়ে দেবে।



রাতারগুল থেকে রওনা হলাম ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর। পাথরের নদী আর আকাশের দর্পণ। ধলাই নদীর উৎস মুখে সাদা-কালো পাথরের বিস্তার যেন কেউ মেঘ থেকে পাথর বানিয়ে ছড়িয়ে দিয়েছে। তবে কয়েক মাস আগে সাদা পাথর চুরি হয়ে যাওয়ার পর তেমন আর সাধা পাথর নাই। তবে পানি এতটাই স্বচ্ছ যে নিচের পাথর স্পষ্ট দেখা যায়। ওপারে ভারতের পাহাড়, আকাশ তার ছায়া ফেলেছে জলে। এখানে দাঁড়িয়ে মনে হলো কিছু জায়গা আছে যেগুলো মানুষকে ছোট করে না, বরং মানুষের মনকে বড় করে দেয়। ভোলাগঞ্জ সেরকম একটা জায়গা।



দুই দিনের ভ্রমণ শেষে ফেরার পথে থামলাম হযরত শাহজালাল (র.)-এর দরগাহয়। সিলেটের এই মহান আধ্যাত্মিক সাধকের স্মৃতি এখনও জীবন্ত এই শহরে। দরগাহর ভেতরে পা রাখতেই মনের মধ্যে একটা স্থিরতা এলো। শত শত বছর ধরে লক্ষ মানুষ এখানে এসেছেন শান্তির খোঁজে। জিয়ারত শেষে বেরিয়ে আসতে আসতে মনে হলো ভ্রমণ শুধু বাইরের জগৎকে দেখা নয়, ভেতরের জগৎকেও চেনার একটা পথ।



শেষ কথা
দুই দিনে সিলেট আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে নীল নদীর রঙ, সবুজ চা বাগানের গন্ধ, পাথরের শীতলতা, জলাবনের নিস্তব্ধতা, আর একটি পুরনো দরগাহর আধ্যাত্মিক স্পর্শ। সিলেট শুধু একটি জেলা নয় এটি একটি অনুভূতি। যারা এখনও যাননি, তাদের বলছি সময় করে একবার যেতে পারেন।

ভ্রমণ করুন, অনুভব করুন আর গল্প তৈরি করুন।

ভ্রমনকালঃ
১১ এবং ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ। শুক্রবার এবং শনিবার।
২৭ এবং ২৮ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।

ছবিঃ আমার নিজের মোবাইলে তোলা। (খাসিয়া পল্লী এবং শ্রীপুর চা বাগানের ছবিটা অন্তর্জাল থেকে নেয়া)
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:০৫
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এগারটি বছর পার হয়ে গেল…. কিছু পরিসংখ্যান নিয়ে একাদশতম বর্ষপূর্তি পোস্ট

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৪১



পূর্বের বর্ষপূর্তি পোস্টের লিঙ্কঃ দশম বর্ষপূর্তি পোস্ট

সামহোয়্যরইনব্লগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখ রাত ১১টা ২৬ মিনিটে প্রকাশিত হয় আমার প্রথম কবিতা, বক্ষমাঝে থাকবে তুমি। বলা যায় খুব দ্রুতই, মাত্র তৃতীয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুঃখ খচিত পতাকা আমার

লিখেছেন এম ডি মুসা, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:২৪


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র প্রাঙ্গণে
আজ হঠাৎ কার ছায়া নামে?
কার দুঃসাহসী কালো হাত
ইতিহাসের বুকের ওপর আঁকে পরাধীনতার নাম?

যে নাম একদিন ভাষার কণ্ঠ রুদ্ধ করতে চেয়েছিল,
যে শাসন একাত্তরে ছড়িয়েছিল মৃত্যুর অন্ধকার
আজ কেন তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ হতো হায়দ্রাবাদ

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৫

।।হায়দারাবাদের নিজাম।।


১৯৪৭ সাল ভারতবর্ষের মুসলমানরা যখন নির্যাতনের শিকার অনেকগুলো গণহত্যা হয়েছিল দাঙ্গা হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে বা তারও আগে এই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রাজনীতি শুরু করেছিল কংগ্রেসের রাজনীতি দিয়ে তিনি কংগ্রেসের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ: ইসলামপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষ, নাকি রাজনৈতিক বাস্তববাদী?

লিখেছেন Sujon Mahmud, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৮

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো—তিনি কি সত্যিই ইসলামপন্থী ছিলেন, নাকি ইসলামকে মূলত রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগীটি মারা গেলো

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৩৩



বাংলাদেশে ডাক্তারদের অবহেলায় কি পরিমাণ প্রাণ অকালে ঝরে গিয়েছে তা কল্পনাতীত। এবং আমাদের দেশের ডাক্তার এই অপরাধে নূন্যতম অনুশোচনা বোধ করে না।

ডাক্তারদের অবহেলার কারণে দেশের পাঠ্য বই ইংরেজি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×