অনেকদিন হয় তোমাকে লিখছিনা। কিভাবে লিখব বল? ইংরেজেিত তুমি দূর্বল সেটা আমি ভাল করেই জানি। আর বাংলায় যে আমি দূর্বল সেটাও তুমি ভাল করে জানো। রস্তায় বের হলেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পোস্টার, ব্যানার আর দেয়াল লিখন সব কিছুতেই ইংরেজীর ব্যবহার। ফলে এসব দেখে দেখে আমি হয়ে উঠেছি ইংরেজীর জাহাজ। ফলে ভাষাগত দূর্বলতার জন্য তোমাকে আর চিঠি লেখা হয়না। তবে প্রতিবছর ফেব্রুয়ারী এলেই আমরা বাংলা নিয়ে মাতামাতি করি, বাংলা একাডেমীতে বই মেলা বসাই এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আর সেখানে যাওয়া আসা করতে করতে বাংলার উপর কিছুটা দখল নিয়েছি। তাই আজ তোমাকে চিঠিটা লিখছি। কিন্তু তুমিতো জানই এ ভাষার জন্যই 52তে জীবন দিয়েছিলেন বেশ ক'জন মহৎ প্রাণের মানুষ। তাদের প্রাণের বিনিময়েই আজ আমরা বাংলায় কথা বলি, বাংলায় গান গাই, বাংলায় পড়ি, বাংলায় লিখি এবং বাংলায় শিখি এমনকি প্রেম কিংবা ভালবাসাটাও বাংলাতেই করি।
ভাষাবিদদের মতে-আদিকাল থেকে সারা বিশ্বে প্রায় 30 হাজার ভাষায় মানুষ কথা বলেছে যার মধ্যে ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে প্রায় 25 হাজার ভাষা। আর আগামী 100 বছরের ভিতর হারিয়ে যাবে আরো 3 হাজার ভাষা। তুমি কি জানো?
কষ্ট হয় যখন দেখি ছোট ছোট বাচ্চারা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে লেখাপড়া করে বাবাকে বাপি আর মাকে মাম বলে ডাকে। কথায় কথায় তথাকথিত ভদ্রলোকেরা ইংরেজীতে বুলি আওড়ান। দেশের মন্ত্রী -এমপিরা আওড়ান বাংলিশ( বাংলা + ইংলিশ) বুলি। বাংলাদেশী খেলোয়ারদেরকে খেলায় উৎসাহ দিতে গিয়ে এদেশের কেউ কেউ যারা আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল সেই পাকিস্থানীদের মাতৃভাষা উদর্ূতে ভাষণ দেন। তখন আমার খুব কষ্ট লাগে। যতটুকু কষ্ট তুমি আমাকে দিয়েছো খালি হাতে ফিরিয়ে তার চেয়েও বেশী কষ্ট! মনে মনে ভাবি তাহলে কি হারিয়ে যাওয়া সেই তিন হাজার ভাষার মধ্যে বাংলা ভাষার নামটাও থাকবে? আচ্ছা বলতো তুমি আর আমি কী করতে পারি সে পরিস্থিতিতে? হয়তো বাংলাকে খুব বেশী ভালবেসে সে ভাষায়ই কথা বলতে পারি। কিন্তু সেটা কি খুব বেশী সুখকর হবে? ক্যামেরুন এবং নাইজেরিয়ার সীমান্তবতর্ী অঞ্চলে বিকেয়া নামক একটি ভাষা আছে যে ভাষায় কেবল একজন মহিলাই কথা বলে থাকেন। তাছাড়া কেনিয়ার একটি গ্রামে বিশু ভাষা নামে একটি ভাষা চালু আছে যে ভাষায় কেবল পিতা আর পুত্রই কথা বলেন। আজ সে মহিলা, এবং পিতা-পুত্র কিন্তু ভাষা বিজ্ঞানীদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। তথ্য এবং তত্দ্ব উদ্ধারের স্বার্থেতাদেরকে নিয়ে ভাষা বিজ্ঞানীরা শুরু করেছেন বিস্তর গবেষণা। যেন গিনিপিগের মত তাদের জীবন যাদেরকে নিয়ে করা হয় বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্ট অথ্যর্াৎ যাদেরকে ব্যবহার করা হয় গবেষনায়! আমার কী মনে হয় জানো? ভাষা বিজ্ঞানীদের কাছে হয়তো 100 বছর পর তুমি আর আমি দু'জনই বাংলা ভাষাভাষী হিসেবে হয়ে উঠতে পারি জীবন্ত কিংবদন্তী! নাকি আমরাও হয়ে যাব গিনিপিগ শ্রেনীর কেউ?
ইতিহাস গ্রন্থ যদি তুমি পড়তে তবে জানতে যে 1903 সালে জিপিনো নামে এক ভাষাবিজ্ঞানী 'ইন্টারলিঙ্গুয়া' নামক একটি বিশ্ব ভাষার উদ্ভাবন করেন। তার বড্ড ইচ্ছে ছিল এ ভাষাটাকে বিশ্ব ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার। কিন্তু তার ইচ্ছে পূরণ হয়নি। আমারও যেমন পূরণ হয়নি তোমাকে ভালবেসে একটা নতুন তাজমহল তৈরী করার ইচ্ছে।
প্রবাদে আছে-দাত থাকতে দাতের মযর্াদা বুঝেনা। আমরাও হয়তো এর ব্যতিক্রম নই। এ দেশে আছি বলেই হয়তো কিংবা বাংলায় কথাবাতর্া বলছি বলেই হয়তো বাংলার তেমন কদর করছিনা। যদি বিদেশ বিভুইয়ে কিংবা এমন কোথাও থাকতাম যেখানে সারাদিনেও হয়তো একটি বাংলা বাক্য শুনা যেতোনা করও মুখ থেকে। বাংলা শুনতে হলে নিজে বলে নিজেকেই শুনতে হতো!
ও! তোমাকেতো বলাই হয়নি যে বাংলা কিভাবে আন্তজর্াতিক ভাষার স্বীকৃতি পেল। আন্তজর্াতিকভাষার স্বীকৃতি ব্যপারটি কানাডা প্রবাসী রফিকুল ইসলাম নামে এক বাঙালী ভদ্রলোকের মাথায় প্রথম আসে। তারপর তিনি আরেক বাঙালী আব্দুস সালামকে সাথে নিয়ে 'মাদার ল্যাংগুয়েজ অব ওয়ার্ল্ড' নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেন। সেই সংগঠনটির পক্ষ থেকে তারা 1998 সালের 9জানুয়ারী তারিখে জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের কাছে 21ফেব্রুয়ারীকে আন্তজর্াতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষনার জন্য আবেদন পাঠান। কফি আনান তাদেরকে ইউনেস্কোর সাথে যোগাযোগ করতে বলে। তারা যোগাযোগ করলে ইউনেস্কো তাদেরকে জানায় কোনো বেসরকারী সংগঠনের প্রস্তাব ইউনেস্কো গ্রহন করতে পারেনা। তবে কোন দেশের সরকার এ ব্যপারে প্রস্তাব করলে সেটা বিবেচনা করা যেতে পারে। তারপর
রফিকুল ইসলাম বাংলাদেশ সরকারের সাথে এ বিষয়ে যোগাযোগ করেন। সরকার 1999 সালের 9 সেপ্টেম্বর এ ব্যপারে ইউনেস্কোর কাছে প্রস্তাব পেশ করে। পরবতর্ীতে ইউনেস্কো সর্বসম্মতিক্রমে 21 ফেব্রুয়ারীকে আন্তজর্াতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তোমাকে আমি যতটুকু ভালবাসি তার চেয়েও হয়তো বেশী বাংলাকে ভালবেসে জাতিসংঘ এটা করেছে।
আচ্ছা, তুমি কি বলতে পারো রক্তের বিনিময়ে অর্জিত একটি ভাষাকে নিয়ে কেন এত অবহেলা? কেন শুধু ফেব্রুয়ারী মাস এলেই পত্র-পত্রিকা, টিভি চ্যানেল আর দেশের বুদ্ধিজীবিরা ভাষা নিয়ে কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন। পারবেনা জানি! উত্তরটা আমিই বলে দিই। এদেশের মানুষ বড়ই স্বার্থপর! এদেশের মানুষ সুবিধা নিতে জানে। কিন্তু সে সুবিধাটি আদায়ে কে জীবন দিল সেটা খুজেনা। যা হোক সামনে স্বাধীনতার মাস আসছে। এসো খোদার দরবারে দুহাত তুলে দোয়া করি সে মাসটাতে যেন তারা মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ করতে আজকের মত কৃপণ না হয়!
ভালো থেকো
তোমারই বৈরাগী জাকির।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



