এক গোধুলী বিকেলে পাশের ইকোপার্কে হাঁটছিলাম। সূর্য তখন প্রায় ডুবু ডুবু অবস্থা। সূর্যের নিভন্ত নিস্তেজ কিরণ আর লেকের উপর দিয়ে প্রবাহমান পবনের সুশীতল স্পর্শ আমার হৃদয়গহ্বরে তখন সাহিত্যিক চেতনার সঞ্চার করছিল। অন্যসব দিনের মত দিনটা অতটা কোলাহলময় ছিলো না। নিস্তব্দ-বিজন প্রকৃতি যেন বিমর্ষমূর্তিতে সামনের সেই অশ্বথ বৃক্ষটির দিকে কিছু একটা নির্দেশ করছিলো। খানিকটা উদ্দেশ্যহীন হয়েই হাঁটছিলাম সেদিকে!!
বৃক্ষটি যেন নিজের লতাকাকীর্ণ দেহের মোহে আমাকে আকড়ে ধরেছিলো; যেন ক্রমশ নিজের দিকে টেনে নিচ্ছিলো। আর আমিও অনিচ্ছাসত্ত্বেও বটবৃক্ষের পথ ধরে হাঁটছিলাম আনমনে। কিছুদুর হেঁটে যেতেই কারো মায়াবী কান্নার আওয়াজ আমার কর্ণগোচর হতে শুরু করলো। আরো কাছে গিয়ে মনোযোগ দিতেই বুঝতে পারলাম, বটগাছের ওপাশে কোনো নারী হৃদয়ের সমস্ত বেদনা তার অশ্রুজলের মাধ্যমে ভাসানোর চেষ্টা করছে। সেদিন প্রথমবারের মত কোনো নারীকে সেভাবে কান্না করতে দেখেছিলাম!!
অতঃপর অামার কৌতুহলী মন রমনীর রোদন রহস্য উন্মোচনের উদ্দেশ্যে ওপারে পা বাড়াতে শুরু করল। একটা অনন্য লাল পোশাক পরা বালিকাকে সেখানে বসে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে দেখে আমি জিজ্ঞেস করি, " এই যে, তুমি কাঁদছো কেন? কিসের দুঃখ তোমার? মনের কথা ভাগ করে নিলে হয়তো দুঃখ খানিকটা লাঘব হতো।"
বালিকা মুখ তুলে নিজের সবুজাভ নেত্র দুখানি আমার দিকে তাক করতেই___________
.
.
.
.
.
.
আমার হৃদয়ের অনু-পরমানু গুলো এলোমেলোভাবে ছোটাছুটি শুরু করে দিলো! আমার নেত্রপল্লব বিবর্ধিত হয়ে পড়ল! মাথার ভেতর হাজার হাজার পারমানবিক বোমা বিস্ফোরণ_______ হাজার হাজার ভোল্টেজ বিদ্যুৎ প্রবাহ_______!! এককথায়, সে তার মায়াবী দুচোখ দিয়ে আমাকে আপাদমস্তক ঘায়েল করে দিয়েছিলো।
সত্যিই সে ছিলো দিব্যাঙ্গনা; আমাকে কিছুক্ষণের জন্য বশ করে ফেলেছিল তার মায়াবী নেত্রের ইন্দ্রজালে। তারপর মায়া কাটিয়ে দুচোখ মুছে আবেগআপ্লুত স্বরে উচ্চারণ করলো,"মনের দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার মতো মানুষ খুজে পাওয়া হয় নি আমার। সবাইকেই আপন মনে হয়। আর আপনদের দুঃখ দেওয়ার ইচ্ছা_____।"
"আমার দুঃখ ভাগ করে নিতে কোনো অসুবিধা নেই।" আমার মুখনিঃসৃত এই শব্দগুলো শুনে কিছুক্ষণ আমার চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে রইল সে। এরপর অশ্বথ বৃক্ষের শীর্ষে খানিক চোখ বুলিয়ে বলে, "একটা অচিন পাখি আমার প্রিয় কন্ঠমালা ঝাপটি মেরে নিয়ে উড়ে যায় এই বটগাছেরই শীর্ষে। এতদিন আমার কাছেই আগলে রেখেছিলাম; এখন অনেক দুরে....। কখনো আশা করিনি।" খানিকটা বিশ্বাসের সুরেই আশাভরা বাক্যগুলো উচ্চারণ করে আবার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলো দিব্যাঙ্গনা।
আমার বুঝতে সময় লাগলো না। একটা উচু লাফ দিয়ে অশ্বথ বৃক্ষের একটি লতা ধরে গাছে উঠে পড়ি!! ভাবলাম যার কান্না এত মায়াবী তার হাসি....??
কয়েক মুহুর্ত পর........
হয়তো এইটা দেখার জন্যই আমার মন ব্যাকুল ছিলো এই অবধি!! বালিকার রহস্যভরা মুখের মায়াভরা হাসি আমার হৃদয়ে আশার সঞ্চার করলো। তার সবুজাভ দুচোখ দিয়ে যেন আমার জন্য এত্তগুলো ভালোবাসা আঁছড়ে পরছিলো। ইচ্ছে হচ্ছিলো জড়িয়ে ধরে স্প্যানিশ ভাষায় মনের ভেতর আটকে রাখা কথাটি বলে দিই - Te amo, baby!!
কিন্তু আমিই হয়তো একটু বেশিই আশা করে। ফেলেছিলাম________
-ধন্যবাদ, ধন্যবাদ আপনাকে। আপনার কারণেই আমি আমার জীবন ফিরে পেয়েছি। আপনার অশেষ কৃতজ্ঞতা।
-জীবন?? এই সামান্য সাতনরী......??
-হ্যাঁ। আসলে আমার ভালোবাসার মানুষটা আমার এই সামান্য কন্ঠমালার জন্যই নিজের জীবনাবসান ঘটিয়ে নিজের জীবনটুকু এই মালাতেই আমাকে উপহার দিয়েছিলো। খুব ভালোবাসতো আমাকে।
-আর আপনি??
-এই মালার প্রতি আমার আকুলতা দেখে এখনো বুঝেন নি??
.
.
.
.
.
.
.
রমণীর উচ্চারিত শব্দসমষ্টি যেন আমার হৃদয়ে লক্ষ কোটি ধারালো ভাঙা কাচের মতো বিঁধেছিল।একটু আগেই যে হৃদয়ে এত্তগুলো ভালোবাসা জমিয়ে রেখেছিলাম; মুহুর্তেই সেখানে উৎপন্ন হওয়া বেদনার সাথে বাসা বেধে নিতে শুরু করেছিলো।
বালিকা, তুমি আজ আমার পাশে নেই, তবু তোমাকে কল্পনায় একে আমি রোজ শুধুই একটি কথা বলি, "Te amo, baby. . . . . . . . .!!"

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


