সত্যিকারের সিনেমা অনেকটা দর্শনের মত।
'আমার কিছু কথা ছিল ' - পরিচালকের এই কথাগুলো বলতে চাওয়ার চিত্ররূপই সিনেমা।
ক্লোজ শট - কাউন্টার বাই এ্যানাদার কোজ শট, লংগ শট ফলোড বাই মিড লংগ শট - এগুলো হলো চিত্রভাষার গ্রামার।
সত্যিকারের দার্শনিক গ্রামার নিয়ে খুব একটা বিচলিত হন না। সিনেমায় বিভিন্ন ফরম থাকে। একজন মননশীল পরিচালক কখনও ফরম নিয়ে খুব একটা বেশী এঙ্পেরিমেন্ট করতে যান না - কারণ বিষয়বস্তুর প্রাধান্য তার কাছে আগে। বিষয়কে উপেক্ষা করে ফরম নিয়ে কসরত দেখানো মোটামুটিভাবে অন্ত:স্বারশূণ্যতার শামিল - একধরণের ইন্টেলেকচুয়াল মাস্টারব্রেশন।
যা বলছিলাম - সিনেমা যদি হয় দর্শন - তবে তারেক মাসুদ একজন উঁচু দরের দার্শনিক।
মাটির ময়না : এই ছবিটি আমার দেখা বাংলাভাষায় নির্মিত শ্রেষ্ঠ ছবিগুলোর মধ্যে একটি। এই মন্তব্য পড়ার সময় ভাববেন না - আমি সত্যজিত বা রিতিক ঘটকের (বানানটা লিখতে পারছি না)কথা ভুলে গেছি।
তারেক মাসুদ ছবিটিতে একটি সময়কে তুলে এনেছেন - মুক্তিযুদ্ধের সময়। না - তিনি যুদ্ধকে দেখাননি। যুদ্ধকে না দেখিয়ে যুদ্ধের নির্মমতা কত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা যায় - তা আমরা দেখেছি। একজন গোঁড়া পাকিস্তানবাদী মানুষ, মাদ্রাসার ছাত্র, বাড়ির বধু - সবার মনোজগতে যে অচিন্তিনীয় পরিবর্তন আনতে পারে একটি যুদ্ধ - তার প্রামাণ্য দলিল ছবিটি।
তারেক মাসুদ ঐ সময়, ঐ পরিবেশ, মাদ্রাসা, গ্রাম, ঐ জনপদকে দেখেছেন অনেক দূর থেকে - কাছ থেকে নয়। অনেকটা কাল্পনিক ঈশ্বর যেমন দেখেন আমাদের। তার দৃষ্টিভঙ্গি, ক্যামেরা আই, সংলাপ, গল্পের বুনন সবকিছুর মধ্যেই এই গড'স আই ভিউ। আবেগের কোনো বাড়াবাড়ি নেই। মনে হয় , অনেক দূরে বসে কেউ একজন আমাদের নিয়ে তামাশা করছে। আর সে কারণেই ছবিটা আমাদের হৃদয় ছুয়ে যায় - আমাদের ভাবতে শেখায়। এখানেই অন্যান্য ছবির সাথে তার পার্থক্য।
অনেক ছবি দেখেছি যেগুলো হৃদয় ছুয়ে যায় - এমনকি আমার চোখের পানিও নিয়ন্ত্রন মানে না। কিন্তু মাটির ময়না আমার চোখে পানি আনে না - আমাকে প্রশ্ন করে - নিতান্ত অগোচরে মনের মধ্যে জ্বলতে থাকা সলতের আগুন বাড়িয়ে দেয়।
কারিগরী দিক থেকেও ছবিটি একটি মাইলফলক।
ডিজিটাল অডিও অনেক ছবিতেই ব্যবহার হয় - কিন্তু গাছের পাতায় বাতাসের অমন শিরশির শব্দ আমি আর কোথাও শুনিনি।
দৃশ্যধারণের জন্য এখন অনেকেই ক্যামেরা আনান ভারত থেকে, সিনেমাস্কোপ করেন - কিন্তু অমন অপরূপ ল্যান্ডস্কেপ আমি কেবল মাটির ময়নাতেই দেখেছি।
অন্ত:র্যাত্রা: ছবিটি হলে গিয়ে দেখার বড় ইচ্ছা ছিল। কারণ অনেকগুলি।
এটি বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ডিভি ক্যামে শুট করা ছবি। ডিভি - 570 ক্যামেরায় আমি নিজে কাজ করেছি। কখনও মনে হয়নি যে, এই ক্যামেরা দিয়ে ছবি তৈরী হতে পারে। বড় পর্দায় চা বাগানের বিশাল ল্যান্ডস্কেপের ডেপথ ডিভি ক্যামেরায় আসবে কি না - সন্দিহান ছিলাম।
বাসায় ডিভিডিতে ছবিটা দেখে মনে হলো, শু্যট করার পর বিশাল অ্যামাউন্টের টাকা দিয়ে কালার কারেকশন করা হয়েছে। পরদিন মাছরাঙা প্রডাকশন হাউস নিশ্চিত করলো আমার ধারণার সত্যতা। তারেক মাসুদ আমেরিকায় গিয়েছলেন কালার কারেকশনের জন্য। কালার কারেকশনের পর বড় পর্দায় কি অবস্থা জানি না - তবে ডিভিডিতে পিকচার কোয়ালিটি খুব একটা খারাপ লাগেনি।
এই ছবিটি পুরোপুরি এক প্রকার অন্বেষণের গল্প নিয়ে - আমার ভেতরে যে আমি সেই আমিকে খুঁজে দেখার অন্বেষা। আমার শিকড় কোথায় তা খুঁজে পাবার চেষ্টা।
এই খুঁজে দেখতে গিয়ে তারেক মাসুদ আশ্রয় নিয়েছেন এমন কিছু টেকনিকের - যা অনেক পুরনো - কোনো কোনো ক্ষেত্রে দৃষ্টিকটু।
যেমন, লন্ডন ফেরত সারা যাকের ঢাকা শহরে দীর্ঘদিন পর এসে ঢাকার রাস্তায় রিকশায় করে ঘুরতে থাকে - চারপাশের বদলে যাওয়া দেখে অবাক হয়। তারেক মাসুদ এই বদলে যাওয়াটাকে দেখিয়েছেন মনোলগ আকারে। সারা যাকের নিজের মনে মনে বলছেন - 'সিনেমা হলটা আর নেই।'
অথবা আরো উদাহরণ যদি টানি তবে বলব, সারা যাকের ও তার ছেলে প্রায়শ:ই নিজের মনে মনে কথা বলেছেন পরস্পরের সাথে - অনেকটা মনোলগ আকারে।
ভিসুয়াল ল্যাংগুয়েজ বলে, একটা মানুষ একা একা কথা বলবে তখনই - যখন সে পাগল। আদারওয়াইজ, দিস ইজ নেভার পারফেক্ট।
মনোলগ পুরনো ফ্রেঞ্চ সিনেমায় আমরা প্রচুর দেখেছি - কিন্তু মাথায় রাখতে হবে যখন ঐ সিনেমাগুলো হয়েছে - তখন সিনেমা ব্যাপরটা খুব বেশীদিন আসেনি। মনোলগ গোল্ডেন ওল্ডের কোনো বিউটি নয় - এটা একটা বাগ।
তারেক মাসুদ মনোলগ ব্যাপরগুলোকে এড়িয়ে গেলেই মনে হয় আধুনিক নির্মাণ শৈলীর বহিঃপ্রকাশ হত। এবং খুব সহজেই মনোলগ এড়ানো যেত। রিকশাওয়ালাকে সারা যাকের সিনেমাহলটা উঠে গেছে কি না জিজ্ঞাসা করলেই হত - রিকশায় বসে নিজের মনে একা একা সংলাপ বলার ঝক্কি পোহাতে হত না।
সেক্ষেত্রে দর্শকের জন্যও বিষয়টা উপভোগ্য হত।
আর একটা কথা - উপন্যাস এবং সিনেমার মৌালিক পার্থক্য হচ্ছে - একটি লিখিত আরেকটি ভিসুয়াল। অন্তঃর্যাত্রা ইজ মোর অ্যা নভেল দ্যান সিনেমা। অন্তর অন্বেষণের ভিসুয়াল ল্যাংগুয়েজের সীমাবদ্ধতা মনোলগে কাটিয়ে ওঠা যায় না - বরং চিত্রনাট্যের ফাঁকিবাজি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
সবকিছুর পরেও অন্তঃর্যাত্রা একটি দর্শন - যা আমাদের মধ্যে নতুন একটা বোধের জন্ম দেয়।
তাই, তারেক মাসুদ একজন দার্শনিক - আমার প্রিয় দার্শনিক।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।






