somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প : মাটিবর্তী (শেষ পর্ব)

২২ শে জানুয়ারি, ২০০৭ রাত ৩:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

(পূর্বপ্রকাশের পর থেকে - আগের দুটো পোস্ট)

ফজর আলি বাড়ি ফিরে আসে পরদিন দুপুরে।

কলসি কাঁখে কালো ছিপছিপে জয়তুন তখন সবেমাত্র পুকুর ঘাট থেকে ফিরেছে। ফজর আলিকে দেখে সে কলসিটা ঘরের দাওয়ায় নামিয়ে রাখে।

ফজর আলি নিজেকে শোনানোর জন্যই যেন বলে, রাইতে কাম পইড়া গেল।

জয়তুন কোনো উত্তর দেয় না। কিন্তু তার মুখ লম্বাটে হয়ে যায়।

ফজর আলি দাওয়ায় পাতা মাদুরে বসে। ফের স্বগতোক্তির মত করে বলে, আইতে পাইরলে কি আর আইতাম না ? এইবারের কামডায় অনেক গুলান পয়সা পাইছি। এইরকম কাম আর দুই তিনডা ধইরতে পাইরলে সামনের মাসে তোরে গয়না গড়ায়ে দিমু।

জয়তুন এবারও উত্তর দেয় না। তার উত্তর দেবার দরকারও নেই। সে জানে, ফজর আলি রাতে কি কাজ করে। শুধু সে কেন, গাঁয়ের প্রায় সবাই জানে। কিন্তু, কেউ কোনো প্রতিবাদ করে না। আগে এরকম কিছুর আভাস পেলে গাঁয়ের মানুষ মুখে মুখে নানান কেচ্ছা কাহিনী ছড়াত, সালিশ বসত, বিচার হত। কিন্তু, হুট করে সবার যেন কি হয়েছে! চেনা মানুষগুলো আমূল বদলে গেছে। কে কি করছে, তার দিকে এখন আর কেউ ফিরেও তাকায় না।

জয়তুন খানিকক্ষণ ফজর আলির অপরাধী মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর বলে, খাওয়া দাওয়া হইছে?
না।
তাইলে বস, আমি ভাত নিয়া আসি।
দুইডা কাঁচামরিচ আনিস।
ঘরের ভেতর থেকে জবাব আসে, কাঁচামরিচ নাই।

'কাঁচামরিচ নাই'- এমন দুঃসংবাদে ফজর আলির মাথা গরম হয়ে ওঠে। ইচ্ছে করে জয়তুনের চুলের মুঠি ধরে বলে, কাঁচামরিচ নাই, এইডা আগে খেয়াল ছিল না?

কিন্তু সে কিছু না বলে মনে মনে ফুসতে থাকে। চুপচাপ ভাত খায়। ভাত খেয়ে উঠে সে খাটে গিয়ে শোয়। চোখ দুটো বন্ধ করে ঝিমায়।

ফজর আলি ঝিমায়, কিন্তু ঘুমায় না। তার আধবোজা চোখ ফাঁক করে সে সব দেখে। শিকের উপর তুলে রাখা একবাঁটি দুধ, ঘরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে যাওয়া ধেঁড়ে ইঁদুর, জয়তুনের কালো চকচকে অভিমানমাখা মুখ - কিছুই তার নজর এড়ায় না। তার মনে হয়, সব কিছু তাকে ব্যঙ্গ করছে।

ফজর আলি বিছানায় উঠে বসে। জয়তুনের মুখে অাঁতিপাতি করে কি যেন খোঁজে। কিন্তু, এক নির্বাক ঔদাসীন্য ছাড়া কিছুই পায় না। তার মেজাজ খারাপ হতে শুরু করে।

ফজর আলির মনে হয়, সে জয়তুনকে বিয়ে করে ভুল করেছে। রহমত মিয়ার বাড়ি আর চায়ের দোকানের উপর লোভ করে মারাত্মক ঠকেছে। কালো কুচকুচে জয়তুনের জায়গায় সে মনে মনে আলতা বানুকে কল্পনা করে। একদিকে শুষ্ক, রুক্ষ্ম জমি আর একদিকে রসে ভরা মাটি। রুক্ষ্ম জমিতে লাঙল চালিয়ে সুখ কোথায়? দুই নারীর স্পষ্ট বৈপরীত্যে সে মনে মনে পুড়তে থাকে।
ঠিক তখনই তার চোখে পড়ে, বিছানার পাশে পড়ে থাকা আধ খাওয়া বিড়ির একটা টুকরো।

ফজর আলি এবার অস্ত্র পেয়ে যায়। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। সে জানে, বিড়ির টুকরোটা কোথা থেকে এসেছে। জয়তুনকে সে অনেকবার তার শার্টের পকেট থেকে চুপি চুপি বিড়ি বার করে ধরাতে দেখেছে।

আজ যেন তাকে সর্বনাশের নেশায় পেয়ে বসেছে। সে উঠে গিয়ে জয়তুনের চুলের মুঠি চেপে ধরে। বিড়ির টুকরোটা দেখিয়ে বলে, এইডা এইখানে ক্যামনে আইল?

জয়তুন প্রাণপণ চেষ্টা করে চুলের মুঠি ছাড়াতে। পারে না। ফজর আলির প্রকাণ্ড হাতের চড় খেয়ে সে বিছানার উপর উল্টে পড়ে।

ফজর আলি চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, এক রাইত বাড়িতে আসি নাই। মাগি আর একজনের লগে শুইছে। আইজ তোরে আমি খুন কইরা ফ্যালবো।

হঠাৎ যেন জয়তুন বুঝতে পারে, তার উপর কী অভিযোগ চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। সে প্রাণপণ চেষ্টা করে বলে, রাইতে তুমি বাড়িতে আস না। আমি তোমার জন্য জাইগ্যা বইসা থাকি। তাই, মাঝে মাঝে তোমার বিড়ি থ্যাইকা এক আধটা খাই। বিশ্বাস করো, আর কেউ এই বিড়ি খায় নাই।
কিন্তু, ফজর আলির মাথায় ততণে খুন চেপে গেছে। সে দরজার পাশে ঝুলিয়ে রাখা মোটা পাটের দড়িগাছা হাতে তুলে নেয়। তারপর জোরে চাবকাতে থাকে।

অনেকণ চাবকানোর পর তার মাথাটা একটু ঠাণ্ডা হয়। শার্ট গায়ে দিয়ে সে বেরিয়ে পড়ে। হাঁটতে হাঁটতে এক নিদারুণ মনোকষ্ট তাকে পেয়ে বসে। সব জেনেশুনে সে বৌকে মেরেছে। অবশ্য না মেরেও তার কোনো উপায় ছিল না। মাঝে মাঝে তার ওরকম রাগ ওঠে। তখন সে নিজেকে সামলাতে পারে না। কিছু একটা অঘটন ঘটিয়ে বসে।

ঘোর কাটতেই সে স্টেশনে যায়। ওষুধের দোকান থেকে মলম কেনে।


ফজর আলি যখন বাড়ি ফিরে আসে তখন প্রায় বিকাল।
জয়তুন উপুড় হয়ে শুয়ে ছিল বিছানায়। কিছুক্ষণ পরপর পিঠটা ফুলে ফুলে উঠছে। কোমরের কাছে শাড়ি সরে গেছে, সেখানে কালো রঙের গভীর দাগ পড়েছে। হাতার কাছে ব্লাউজটা ছেঁড়া। রক্তের একটা সরু ধারা গড়িয়ে পড়ছে সেখান থেকে।

ফজর আলির অনুশোচনায় মরে যেতে ইচ্ছে হয়। সে খাটের পাশে বসে পরম যত্নে জয়তুনের শরীরের কেটে যাওয়া জায়গাগুলোতে মলম লাগিয়ে দেয়। মৃদুস্বরে জিজ্ঞাসা করে, খুব লাগছে বউ?

জয়তুন ফুপিয়ে ওঠে।

মলম লাগানো শেষ করে ফজর আলি শুয়ে পড়ে জয়তুনের পাশে। জয়তুনের চুলে আস্তে আস্তে আঙ্গুল বুলিয়ে দেয়।

জয়তুন বলে, আর মারবা না তো আমারে?

ফজর আলি জয়তুনের বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে বলে, কখ্খনো না। আর যদি মারি তো আমি মাইনষের বাচ্চা না।
জয়তুন এবার নিজেই স্বামীকে কাছে টেনে নেয়। রুক্ষ্ম, অনুর্বর মাটি উর্বর হতে শুরু করে।
ফজর আলি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, সে এবার আলতা বানুকে ছেড়ে দেবে। আর আছিয়াকেও তার গ্রামে ফিরিয়ে দিয়ে আসবে।

বেলা গড়িয়ে যায়। সন্ধ্যা হয়ে আসে। ডানা ঝাঁপটে ঘরে ফেরে পাখির দল। বটগাছের ওপারে টুপ করে হারিয়ে যায় সূর্যের শেষ রশ্মি।
রতিকান্ত ফজর আলির কোনো প্রতিজ্ঞা মনে থাকে না। বেঁচে থাকার প্রয়োজনের কাছে সব প্রতিজ্ঞা হয়ে ওঠে অর্থহীন।

আবারও রাত নামে।
আঁধার ঘন হয়ে আসে মাটির পৃথিবীতে, আর মাটিবর্তী মানুষের মনে। (সমাপ্ত)
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
১৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গুম আর গুপ্ত

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ২৫ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:১৫


খোঁজ করলে দেখাি যাবে, কুকুর-বিড়াল পালকদের অনেক কাছের আত্মীয়-পরিজন অনেক কষ্টে জীবন কাটাচ্ছে। তাদের প্রতি কোনও দয়া-মায়া নেই; অথচ পশুদের জন্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ১৮৯

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৫ শে এপ্রিল, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০৫



মসজিদে বসে মদ খেতে দাও, অথবা সেই জায়গাটা দেখাও যেখানে আল্লাহ নেই।

বহুদিন ধরে গল্প লেখা হয় না!
অথচ আমার গল্প লিখতে ভালো লাগে। সস্তা প্রেম ভালোবাসা বা আবেগের... ...বাকিটুকু পড়ুন

=পাতার ছাতা মাথায় দিয়ে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৫ শে এপ্রিল, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৯


মনে আছে ছেলেবেলায়
ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি এলে,
পাতার ছাতা মাথায় দিয়ে
হাঁটতাম পথে এলেবেলে।

অতীত দিনের বৃষ্টির কথা
কার কার দেখি আছে মনে?
শুকনো উঠোন ভিজতো যখন
খেলতে কে বলো - আনমনে?

ঝুপুর ঝাপুর ডুব দিতে কী
পুকুর জলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

তালেবান ঢাকায়, রাষ্ট্র ঘুমায়

লিখেছেন মেহেদি হাসান শান্ত, ২৫ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:৩২

জুলাই অভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশে অনেক কিছু নতুন হইছে। নতুন সরকার, নতুন মুখ, নতুন বুলি। কিন্তু একটা জিনিস খুব চুপচাপ, খুব সাবধানে নতুন হইতেছে, যেইটা নিয়া কেউ গলা ফাটাইতেছে না। তালেবানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুখোশ খুলে গেছে ও আয়না ভাঙ্গা শুরু হয়েছে!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৮:৫৬

মুখোশ খুলে গেছে ও আয়না ভাঙ্গা শুরু হয়েছে!

image upload problem

বাংলাদেশে একসময় খুব জনপ্রিয় একটা পরিচয়-“আমি সুশীল”, “আমি নিরপেক্ষ”, “আমি কোনো দলের না”। এই পরিচয় ছিল আরামদায়ক, নিরাপদ, সম্মানজনক। এর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×