দেবু উদাস হয়ে বসেছিল। একদৃষ্টিতে দেখছিল দূরে নোঙর করা লঞ্চগুলো। এক সময় সে নিঃশব্দে কাঁদতে শুরু করল। চোখ থেকে জলের ধারা গড়িয়ে পড়ছিল অঝোর ধারায়।
আমি আস্তে আস্তে বললাম, কাঁদিসনে। কেঁদে কি হবে বল? ভুলটা তো আমাদেরই। এখন এগুলো ভুলে যাওয়াই ভাল।
শার্টের কোনা দিয়ে চোখের পানি মুছে দেবু সরাসরি আমার দিকে তাকাল, আমাদের ভুল?
আমি কিছু না বলে ওর চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিলাম।
দেবু কবি। হৃদয়ই ওর শক্তি, হৃদয়ই ওর দুর্বলতা। ওর হৃদয়ে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে আবার ভাঙনের সুরও বাজে। আমি ওর কাঁধে হাত রেখে একটু সান্ত্বনা দিতে চাইলাম।
হঠাৎ বুক থেকে অনেকখানি বাতাস বের করে দেবু বলল, তুই ভুলতে পারবি?
ওর এই হাহাকার শুনে আমার সব মনে পড়ে গেল।
সে বছর চারেক আগের কথা। মে মাসের এক সকাল।
দেবু আর আমি ঠিক আজকের মত পা দু'খানি জলে ডুবিয়ে নদীর ধারে বসেছিলাম। মৃদু বাতাস বইছিল। আগের রাতে খুব এক চোট ঝড় হয়ে গেছে। নদীর তীর ঘেঁষে পড়ে ছিল শিশু গাছের ভাঙা ডাল, কোথা থেকে যেন একটা টিনের চাল উড়ে এসে পড়েছে- তার অর্ধেক ডুবে ছিল পানিতে, অর্ধেক মাটির ওপরে। ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা ছেঁড়া মেঘের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়ছিল টিনের ওপর। শহরের এই দিকটায় একটু গ্রাম গ্রাম ভাব, সবকিছুতেই একটা শান্ত সমাহিত আমেজ। দূর থেকে মন উদাস করা সুরে শিস কাটছিল একটা দোয়েল। এমন নিস্তরঙ্গ একটি দিনেই রাশেদ ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের প্রথম আলাপ।
শহরের অন্তর ষাটভাগ লোক রাশেদ ভাইকে চেনে। যারা চেনে না, তারা অন্তত নামটা শুনেছে। সবল স্বাস্থ্যবান মানুষ। লম্বায় প্রায় ছ'ফিট। বয়স চলি্লশ ছুঁই ছুঁই করছে। মাথার চুলগুলো কোঁকড়া। সেই কোঁকড়া চুলই নেমে এসেছে ঘাড় পর্যন্ত। বিয়ে সাদি করেননি। পেশায় শিক্ষক। কিন্তু, গুরুগম্ভীর ভাব চেহারায় একেবারেই নেই। সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যেতে পারেন খুব সহজেই। দুপুর পর্যন্ত ছাত্র পড়িয়ে বিকালে আবার যান গার্মেন্টস কলোনিতে। গার্মেন্টস কর্মীদের জন্য মাঝে মাঝে ঢাকা থেকে লিফলেট নিয়ে আসেন। তাদের সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলেন। কোনোদিন আবার চলে যান গ্রামে। কৃষকদের সাথে চাষবাস নিয়ে আলোচনা করেন। রাশেদ ভাই ছিলেন সেই ধরনের লোক যারা জীবনবাদে বিশ্বাস করে এবং সেই বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠা করতে মৃতু্য পর্যন্ত তুচ্ছ করতে পারে।
সেই রাশেদভাই এসে দাঁড়ালেন খেয়াঘাটে। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলেন ঘাটে নৌকা বাঁধা আছে কি না। তারপর ফস করে একটা সিগারেট ধরিয়ে আমাদের দিকে তাকালেন। খানিকক্ষণ চুপ থেকে স্বগতোক্তির মত করে বললেন, কাল রাতে কি ঝড়টাই না হলো।
এরপর সহজেই আলাপ জমে উঠল। আমরা তার কাছ থেকে জানলাম গত রাতের ঝড়ে রঘুনাথপুর গ্রামের খুব ক্ষতি হয়েছে। তিনি সেখানেই যাচ্ছেন।
রাশেদভাই টাইপ লোক সম্বন্ধে এর আগে আমাদের মনে একপ্রকার ভীতি কাজ করত। সততার বাতিকগ্রস্ত মানুষগুলো কিছুটা বিরক্তিকর হয়। তাই, তার থেকে দূরে সরে থাকাকেই আমরা বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করতাম। কিন্তু মে মাসের সেই সকালে আমাদের ভুল ভাঙল।
গল্প করতে করতে কখন যে খেয়াঘাটে নৌকা এসে লেগেছে খেয়াল করিনি। রাশেদভাই উঠে প্যান্ট থেকে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন, চলো।
যেন আমরা তার সঙ্গে যাব কি, যাব না- এই প্রশ্নটা নিতান্তই অনাবশ্যক।
সেদিন না বলতে পারলে হয়তবা আমাদের জীবনটা অন্যরকম হত। আর দশটা শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মত বি.এ, এম.এ পাস করে চাকরি বাকরির চেষ্টা করতাম। কিন্তু, আমরা না করতে পারিনি। রাশেদভাইয়ের চেহারার মধ্যে এমন একটা কিছু ছিল যে তাকে না বলা যায় না।
সত্যি কথা বলতে কি, আমরা তখন একটা অস্থির সময় পার করছিলাম। সবাই বলে অস্থিরতার জন্ম হয় কষ্ট থেকে। আশ্চর্য বিষয়, আমাদের তেমন কোনো কষ্ট ছিল না। প্রিয়াকে হারাবার ভুতূড়ে কষ্ট, জীবনযুদ্ধে পুরোপুরি পরাস্ত হবার বেদনা, নিজের তৈরি করা একাকীত্বের মাঝে দুঃখ দুঃখ খেলা - কোনোটাই আমাদের বিশেষ স্পর্শ করত না।
আমার বাবা ছিলেন জেলা কৃষি অফিসার। সেই সূত্রে বাড়িতে চমৎকার বারান্দাওয়ালা নিজের একটি রূম, বালিশের নীচে রাখা শীর্ষেন্দু, বারান্দা ঘেঁষে দোতলায় উঠে আসা নারকেল গাছের সবুজ সতেজ পাতা - এই সবকিছুই ছিল আমার। সবকিছু অসাধারণ কাব্যময়। আমারও দুঃখ ছিল - কিন্তু অন্য সব মানুষের মত দুঃখের স্বরূপটা আমি সরাসরি চিনতে পারিনি, এ কি কম দুঃখের কথা? (চলবে........)
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।






