পূর্বের 1 ও 2 নং পোস্টের পর থেকে ...................
আমরা হাল ছেড়ে দেই না।
আমরা ততদিনে জেনে গেছি, পৃথিবীতে মাত্র দু'ধরণের মানুষ আছে- হ্যাভ নটস আর হ্যাভ গটস।
হ্যাভ গটসরা সব সুযোগ সুবিধা ভোগ করছে আর হ্যাভ নটসরা চিরবঞ্চিত। আজ যে পৃথিবীময় অনাচার, দুর্যোগ, দুর্ভোগ এর সবকিছুর মূলে এই শ্রেণী বিভাজন। তাই, হ্যাভনটসদের জাগিয়ে তুলতে হবে। তাদেরকে বলতে হবে, তোমরাও মানুষ। তারপর একদিন বিপ্ল্লবের মাধ্যমে এক শ্রেণীহীন আদর্শ সমাজ গড়ে তুলতে হবে- রাশেদ ভাই আমাদের জীবনে এমনই এক লক্ষ্য ঠিক করে দিলেন।
আমাদের বিষণ্ন দিনগুলো বদলে গেল। নদীর ধারে অলস সময় কাটাবার বদলে আমরা সব ধরণের মানুষের সাথে মিশতে শুরু করলাম। শীর্ষেন্দু পড়ে রইল বালিশের নীচে, হাতে উঠল কার্ল মার্কস। কলেজে গড়ে তুললাম স্টাডি সার্কেল। কাস ফাঁকি দিয়ে শুরু হলো মিটিং, মিছিল, শ্ল্লোগান - দুনিয়ার মজদুর এক হও, লড়াই করো।
আগে কখনোই ল্য করিনি এমন সব বিষয় আমাদের নজরে পড়ল। আমরা দেখলাম, প্রতিটি রিকশাওয়ালার কাঁধে একটি করে গামছা থাকে। এই গামছা দিয়ে তারা ঘাম মোছে। এই খেটে খাওয়া মানুষটিরও নিজস্ব একটি জীবন আছে, নিজের মত দুঃখ, কষ্ট, আনন্দ, বেদনা, ঊপেক্ষা আছে। অথচ এতদিন তা বুঝতে পারিনি!
কলেজে আমাদের পার্টির ছাত্র সংগঠন আগে থেকেই ছিল। আমরা যোগ দেয়ায় শক্তি কিছুটা বাড়লো। কারণ দেবু।
দেবু বিচিত্র গুণের অধিকারী। ও গান গাইতে জানে। ও ভূপেনবাবুর গান গায়, আবার চটুল গানও গায়।
দেবু কবি। ও মে দিবসের কবিতা লেখে, আবার ব্যালকনিতে দাঁড়ানো প্রেমিকার কাছে চুম্বন প্রার্থনারত প্রেমিকের কবিতাও লেখে। কলেজের কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ওকে ছাড়া হয় না।
ছাত্রসংসদ নির্বাচনে দেবুকে জি.এস পদে দাঁড় করানো হলো।
অবধারিতভাবে বাঁধা এলো পরিবার থেকে। কিন্তু, মা বাবার ভালবাসার কাছে বিপ্ল্লবীরা কখনো হেরে যায় না, তুচ্ছ কোনো সুখের কাছে নিজেকে বিক্রি করে না। অনেক টাকা করার আশায়, সরকারের বড় আমলা হবার আশায় -বেঁচে থাকার নিরন্তর যে চেষ্টা, সেই চেষ্টায় তারা অনভ্যস্ত। তাদের নির্দিষ্ট কোনো পরিবার নেই, মাটিবর্তী সকল মানুষকে নিয়েই তাদের পরিবার।
এর মধ্যে গার্মেন্টসে স্ট্রাইক করতে গিয়ে দেবু পুলিশের হাতে প্রচণ্ড মার খেল। এতে ওর জনপ্রিয়তা তো কমলই না, বরং তা যেন বহুগুণে বাড়ল। ওর প্রচণ্ড জনপ্রিয়তায় ভয় পেয়ে সরকারি দলের ক্যাডাররা নির্বাচনের আগে আগে আমাদের স্টাডি সার্কেল ভেঙে দিয়ে গেল।
এরপর এলো সেই বিশেষ রাত। নির্বাচনের তখন দু'দিন বাকি।
রাশেদ ভাইয়ের কাছ থেকে কিছু ডিকটেশন নিয়ে দেবু আর আমি বাড়ি ফিরছিলাম। তখন রাত নেমেছে। রাধাচঁূড়া গাছের মাথায় অন্ধকার ঘন হয়ে এসেছে। স্ট্রীট ল্যাম্পগুলো জ্বলে উঠছে একের পর এক। সদ্য জ্বালানো ল্যাম্পগুলোকে ঘিরে চক্কর খাচেছ রাত পোকা। একজন জীবন্ত মানুষ যতটা ঝুঁকে থাকতে পারে, রিকশাওয়ালা ততটা ঝুঁকে রিকশা চালাচ্ছিল। রাস্তাটা উঁচু-নীচু, কিছুক্ষণ পরপর ঝাঁকি খেতে হয়। একটা উদ্দাম বাতাসের ঝাঁপটা আমাদের নাকেমুখে এসে লাগলো।
ঠিক তখন ওরা এলো।
ওরা এলো অতর্কিত, নিঃশব্দে, মুখে কালো কাপড় বেঁধে।
প্রথম আঘাতটা ফসকে গেল।
দ্বিতীয় আঘাত আসার আগেই আমি রিকশা থেকে লাফ দিলাম। এরপর কতক্ষণ দৌড়েছি ঠিক মনে নেই।
হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, দেবু আমার সাথে নেই।
সেবার দেবুর ডান হাত ভেঙে গিয়েছিল। আমার মনে আছে, হাসপাতালে প্রচণ্ড ব্যথায় ও নীল হয়ে গিয়েছিল। তবু কাঁদেনি।
দেবু কাঁদলো আজ। ঠিক দু'বছর পর।
আমাদের প্রিয় রাশেদভাই, যাকে ঘিরে আমরা বিপ্লবের স্বপ্ন দেখতাম, তিনি আজ সকালে সরকারি দলে যোগ দিয়েছেন। পালর্ামেন্টারী ইলেকশন করবেন।
হৃদয় আজ আর দেবুর শক্তি নয়, হৃদয় হলো দুর্বলতা--------------।
সমাপ্ত
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।






