somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

আমি : দ্বিতীয় পত্র
নিজের সম্পর্কে লেখা টা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ। লেখার সময় মনে হয় আসলেই আমি কে? একেক মানুষের কাছে তো আমি একেক রকম।

বৃষ্টিপত্র (ছোটগল্প)

২৮ শে মে, ২০১৭ দুপুর ১:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



১.

ধোঁয়া ওঠা কফির মগ হাতে শুভ্রা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। মানুষজন দোকানগুলোর নিচে একসারিতে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছে। কেউ কেউ গল্প জুড়ে দিয়েছে। হঠাৎ করে এভাবে গল্প করার সুযোগ সহজে আসে নাহ।

অন্যকোন সময় হলে শুভ্রা বৃষ্টিতে হাত বাড়িয়ে দিত। আজ কিছুই ইচ্ছা হচ্ছে নাহ। মোবাইলটা বের করে দেখল। কই ! একবার হলেও তো কল দিয়ে সরি বলতে পারতো অর্ণব !

- আফা ! এই কাগজগুলান ফেলে দিতাম?
চমকে উঠলো শুভ্রা !
- কই? কী কাগজ?
- আফনের আগে যে আফায় থাকতো হেতার মনে হইতাসে।
- দেখি তো।
এই গুলো তো চিঠি!

আচ্ছা, এক কাজ করো, চিঠিগুলো আমার কাছে থাকুক। তুমি বরং খাটের পেছন টাতে যাও, ধূলার পাহাড় জমে গেছে, ঝটপট ঝাঁট দিয়ে নাও। দুপুরের আগেই শেষ করতে হবে। অনেক কাজ বাকি।



২.

এই রুমটা শুভ্রার বেশ পছন্দ হয়েছে। দু’পাশে জানালা। আগের রুমটায় কেমন যেন একটা বদ্ধ বদ্ধ ভাব ছিলো। জানালা যাও একটা ছিলো, আলামারিতে ঢাকা পড়ে গিয়েছিলো। সেই তুলনায় এই রুমটা অনেক খোলামেলা। ভাগ্য ভালো যে ঠিক টাইমে বলেছিল, নাহলে রুমটাই পাওয়া হতো নাহ।

- আফা, গেট ভিড়ান দেন, আইতাসি আমি।
- গেট টা টেনে রেখে যাও, খালা। পরে আটকাচ্ছি।
মোবাইলটা আবার দেখলো শুভ্রা। আগের মতোই তো নিশ্চুপ।

বিরক্ত লাগছে শুভ্রার। চেয়ারে রাখা চিঠিগুলোই চোখ গেল তার। অধিকাংশই মানি লন্ডারিং-এর বোঝা যাচ্ছে। ঠিকানাও সবগুলো একই। একটাই শুধু ভিন্ন!

ছয় মিনিট ধরে চিঠিটা কোলের উপর নিয়ে বসে আছে শুভ্রা। অন্য সময় হলে নিজেকে সামলে নিতো সে, আজ যেন কি হয়েছে তার! চিঠিটা পড়তে খুব ইচ্ছা হচ্ছে। তাছাড়া যেহেতু আপু ফেলে গেছেন, তারমানে চিঠিগুলো তার দরকার নেই- সহজ হিসাব! সুতরাং পড়া যেতেই পারে।



৩.

চিঠির কিনারাগুলি জোড়া লেগে আছে, কতদিনের পুরানো কে জানে! একপাশ তো হলুদ-ই হয়ে গেছে, কিনারা থেকে লেখাগুলো হালকা হালকা। কষ্ট হলেও পড়া যাচ্ছে বেশ।



“”

অনিন্দিতা,

বলতে পারবে আজ মাসের কত তারিখ? জানি পারবে নাহ, তুমি কখনোই দিনকাল মনে রাখতে পারো নাহ। যেদিন আমাদের দেখা হয়েছিল, সেদিন কী বার ছিল মনে আছে? মনে আছে গ্রীষ্মের সেই দুপুরের কথা ! ক্লান্ত-ঘর্মাক্ত হয়ে আমি যখন তোমার সামনে এসে দাঁড়ালাম, তখন তুমি কী বলেছিলে মনে পড়ে- “ চলো, রিকশা নিই। ” হা হা হা, এই আমাদের প্রথম কথা, তুমি পারো ও!

জানো সেদিনে সেই দুপুরটা নিঃসন্দেহে আমার জীবনের আশ্চর্য এক সুন্দর দুপুর। বৃষ্টিভেজা পিচঢালা রাস্তায় আমার লাজুক স্বভাবটা এক কাঠি যেন বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ! আমি কতবার আড়চোখে তোমাকে দেখছিলাম, খেয়াল করেছো? কতবার যে ইচ্ছা হচ্ছিলো হাত দিয়ে তোমার কানের উপর পড়ে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দেই। হাতটা ধরে তোমাকে বলতে ইচ্ছা করছিলো- এ আনন্দ ছেড়ে আজ আমি কোথাও যাবো নাহ! কী ক্ষতি হতো দুপুরটা আর একটু বড় হলে?

মনে আছে, অনিন্দিতা? সেদিনটার নাম দিয়েছিলে তুমি- ‘ফুচকা দুপুর’। আশেপাশের একটা চটপটি-ফুচকার দোকানও সেদিন বাদ যায় নি। ফুচকা মুখে দেয়ার পর মেয়েদের চোখে-মুখে যে সৌন্দর্য্য ফুটে উঠে তা হয়তো কেউ খেয়াল করে নি। করলে কন্যাপক্ষ ‘কনেদেখা’র বদলে ফুচকা-সন্ধ্যা দিয়ে বরপক্ষের চোখে ধূলা দিত। হা হা হা।

মজার কথা কি জানো? যতবার তুমি টকের বাটিতে ফুচকা ডুবিয়ে ডুবিয়ে খাচ্ছিলে, আমি ততোবার তোমার চোখে ডুবে যাচ্ছিলাম! আমিই মনে হয় সেই একমাত্র ডুবন্ত ব্যক্তি, যে কিনা সৃষ্টিকর্তার কাছে বাঁচার জন্য কোন আশ্রয় প্রার্থনা করি নি। হা হা হা ! সত্যি কথা কিন্তু ! মনে হচ্ছিলো- এ আনন্দ ছেড়ে আজ আমি কোথাও যাবো নাহ!

তোমার কি মনে আছে অনিন্দিতা, আমার জন্য নুডুলস বানিয়ে এনে কী টেনশনই নাহ তুমি করেছিলে! আজো তোমার সেইদিনের মুখটা চিন্তা করলে আমার হাসি আসে। তোমার কী চিন্তা- আলুগুলো সিদ্ধ হয়েছে কিনা। বিশ্বাস করো, সেদিনের সেই আধাসিদ্ধ নুডুলস আমার জীবনে খাওয়া সব থেকে মজার নুডুলস। যতবার খাচ্ছিলাম, ততবার মনে হচ্ছিল- এ আনন্দ ছেড়ে আজ আমি কোথাও যাবো নাহ!

তোমার সেদিনের হারিয়ে যাওয়া চুলের ক্লিপটা কিন্তু আমার কাছে আছে, অনিন্দিতা। চুলগুলো খুলে দেবার পর যতবার বাতাসে আমাকে স্পর্শ করছিলো, আমি যেন কোথায় হারিয়ে যাচ্ছিলাম। কী এক আড়ষ্টতা যেন পেয়ে বসেছিল আমাদের বলো তো ! বারবার তোমার চুল আর আমার আধা ইস্ত্রি শার্টের কুঁচ ঠিক করতে করতেই যেন দুপুরটা টুপ করে বিকাল হয়ে গেল।

জানো অনিন্দিতা, আজো আমি তোমাকে সেই বৃষ্টিভেজা পিচঢালা পথে মেঘফেনা রঙের জামাটা পড়ে হেঁটে আসতে দেখি। মনে মনে তখন নিজেকে বলি- কী ভয়ানক! কী ভয়ানক! এতো সুন্দর হয় কীভাবে?

জানি অনিন্দিতা, এসবের কিছুই আজ তোমার মনে নেই। কি! পারলে নাহ তো বলতে আজ কতো তারিখ? নাহ, আজ আমার জন্মদিনও নাহ, আজ আমাদের দেখাও হয় নি। আজ খুব সাধারণ একটা দিন। আজকের দিনের পর আর কখনো তুমি তারিখটা ভুলবে নাহ।

ঠিক ওইদিনের মতোই বর্ষাদুপুরে আবারও আমাদের দেখা হবে। তবে সেদিন কিন্তু আমি কিছুই বলব নাহ। শুধু হাতে থাকা কাগজে লেখা থাকবে-

“দুঃখিত ! এই মুহূর্তে আপনি যাকে দেখতে এসেছেন তার সাথে দেখা করা সম্ভব হচ্ছে নাহ, অনুগ্রহ করে পরকালের জন্য অপেক্ষা করুন।”

দূরে চলে যাচ্ছি অনিন্দিতা, নিষ্প্রাণ এই নগরীতে এরপর আবারও ঝুপ করে বৃষ্টি নামবে। শুধু পিচঢালা বৃষ্টিস্নাত পথটা চেয়ে থাকবে তোমার আর আমার অপেক্ষায়।




ইতি
“আমি ”




৪.

বাইরে বৃষ্টি থেমে এসেছে। গাল বেয়ে পানি চিঠিতে গড়িয়ে পড়ছে। এরকম কোনো একদিন একসাথে থাকার স্বপ্নটা দেখেছিলো তারা। হয়তো একজন আজ হারিয়ে গেছে সবার কৌতূহলের বাইরে।

অর্ণবের নাম্বারটা বের করে বসে আছে শুভ্রা। কল দিবে নাহ বলে ঠিক করেছিল। থাক ! সেই নাহয় সরি বলবে এবার। একজনকে তো সরি বলতেই হয়।



কল দিতেই কেঁপে উঠলো শুভ্রার মন -




“দুঃখিত ! এই মুহূর্তে আপনি যাকে কল করেছেন তার সাথে............................................... ”


.
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জুলাই, ২০১৭ রাত ৮:১৮
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নির্ভীক অভিযাত্রা

লিখেছেন আকিব হাসান জাভেদ, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৩

আমি চলি ঐ প্রান্তে,
যেখানে অসৎ থেকে মানুষ হয়েছে সৎ।
আমি চলি উড়ে উড়ে,
ডানাহীন পাখির মতো,
যেখানে দুর্বলতাকে জয় করে
হয়েছে দুঃসাহস।
আমি চলি শক্তির সাথে,
দেহ যায় না ঝুঁকে।
করি না প্রণাম,
করি না চাটুকারিতা আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

চুপ - একদম চুপ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭



আমরা শুধু চুপ থাকবো -
আমাদের কথা বলার মুখ নেই
আমাদের দেখার মতো চোখ নেই
আমাদের শোনার মতো কান নেই
মনে হয়, মনে হয় -
আমাদের হাত-পাও নেই।

আমাদের বিবেক নেই
আমাদের চিন্তা-চেতনাও নেই
আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

তবুও বেঁচে আছি

লিখেছেন সালমান মাহফুজ, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:১৫

এই নিথর নগ্ন শরীরের প্রতিটা পল্লবের করুণ আর্তচিৎকার
পৃথিবীর মাটি ভেদ করে কোনদিনও
ওই মৃত কানে পৌঁছাবে না
আমি জেনে গেছি ।

বিপন্ন আকাশের গায়ে লেপ্টে থাকা
দেবতাদের প্রতারণার ফাঁদ আর মিথ্যা প্রলোভনের গল্পগুলি
আমার শুনতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুলাই মিউজিয়ামঃ স্মৃতির বিরুদ্ধে বিস্মৃতির লড়াই....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫৩



জুলাই মিউজিয়ামঃ স্মৃতির বিরুদ্ধে বিস্মৃতির লড়াই....

১৫ আগস্ট আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে গিয়েছিলাম জুলাই মিউজিয়ামে। সেখানে গিয়ে মনে হলো- এটি শুধু একটি জাদুঘর নয়; এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক ভয়াবহ অধ্যায়ের বিরুদ্ধে... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিজিবিজি নদী চলে মন উদাসের দেশে !

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:০২





হিজিবিজি নদী চলে মন উদাসের দেশে !

...................................................................
মানচিত্রের আঁকাবাঁকা রেখায় তারে পাবেনা,
সে নদী তো চেনা কোনো ঠিকানায় যাবে না।
তার কোনো কূল নেই, নেই কোনো ঘাট,
সে বয়ে চলে একা, বুক জুড়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×