এক
In the deep sea you can set many targets but you can't reach any... dont panic.. someone will reach you.. রিফাতের এই কথাটা একটু পর পর কানে বাজছে সামির। প্রায় দু-ঘন্টা হতে চল্ল ভেসে আছে। প্রথমে মনে হচ্ছিল ঠিকই আছে, সবার সাথেই আছে। কিন্তু আস্তে আস্তে সবার কথা যেন হারিয়ে গেল, পাশের গাইড বোটগুলোও যেন হারিয়ে গেল। ধীরে ধীরে সামি বুঝতে পারল, সে আসলে ট্র্যাক থেকে সরে গেছে। ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই প্রচন্ড একটা ভয় হঠাত করেই ওকে গ্রাস করতে চাইছে। কোন রকমে নিজেকে সামলে নিল সামি। চিন্তা করছে না, ওর একার জন্য একটা গাইড বোট আছে। কিছুক্ষনের মধ্যেই ওকে খুজে নেবে।
দশ জনের একটা সাতারুদের দল বাংলা চ্যানেল পারি দেবে। বাংলা চ্যানেল হলো টেকনাফের শেষে শাহপুরি দীপ থেকে সেন্টমর্টিন পর্যন্ত সমুদ্্র। গত বছরও এই দলের 3 জন সাতরে এই চ্যানেল পার হয়েছে। এইবার সামি তাদের সাথে পারি দেবে। প্রায় 14 কিলোমিটার পথ। কিন্তু পারি দেয়া সম্ভব। গতবার তো ওরা দিয়ে দেখিয়েছে। প্রত্যেকের সাথে এইবার আলাদা সাপোর্ট বোট থাকবে। কাজেই সমস্যা হলে বোটে উঠে গেলেই হলো। সবাই ওকে বেশ সাহস দিয়েছে। প্রায় দুই ঘন্টা হতে চল্ল। এখনও কোন বোট আসছে না কেন। রফিককি ওকে দেখতে পাচ্ছে না। রফিক ওর বোটের চার্জে আছে। গতবার একা ও তিনজনকে গাইড করে নিয়ে গেছে। তাই প্রথম সুযোগেই সামি টীম লিডার হামিদ ভাইকে বলে রফিককে ওর জন্য নিয়েছে। কিন্তু রফিক কোথায়? দুই ঘন্টা হলো প্রায় সমুদ্্রে ভেসে আছে সামি। একটুএকটু করে শরীর ভেঙ্গে আসছে। 14 কিলোমিটার সাতরানোর সময় এনার্জি লাগবে, তাই ছেলে কাব্যর চকলেটের বাক্স থেকে চকলেট নিয়ে এসেছিল। কিন্তু সেটাওতো রফিকের কাছে রাখা ব্যাগে। ....ওরা কি ভুলে গেল সামির কথা। কিন্তু রফিক তো ভোলার কথা না। ও তো শুধু সামির গাইড।
দুই
রাতের বেলা থেকেই রফিকের মনটা খুত খুত করছে। গতবারও সে এই দলটা নিয়ে বাংলা চ্যানেল পারি দিয়েছে।সেবার সব মিলিয়ে ওরা ছিল মাত্র চারজন। ও নিজে ছিল একমাত্র গাইড। এবার সেই তুলনায় এলাহি ব্যাপার। দশজন সাতারু। সবার সাথে সাপোর্ট বোট। সবসময় চ্যানেল আই টিভি ক্যামেরা। বিরাট ব্যাপার। কিন্তু কেন যেন ভাল লাগছে না রফিকের। ও নিজে একটু সহজ সরল মানুষ। অনেক কিছুই বোঝে না। কিন্তু এই যে রাতের বেলা সাতারুরা না খেয়ে আছে এটা কি ঠিক হলো। বাবুর্চি ছিল শাহপুরি দীপে। কিন্তু হামিদ ভাই তাকে ডেকে নিয়ে গেলেন আগামীকালের বিরানি রান্না করার জন্য। কালকে নাকি চ্যানেলের লোক আসবে, তাদের ভাল খাওয়াতে হবে। কিন্তুযাদের নিয়ে কালকের আয়োজন তারাই তো রাতে না খেয়ে আছে। কি জানি, রফিক ভালো বুঝতে পারে না। একবার ভাবে হয়তো সকালে সাতারের আগে রাতে খাওয়া ঠিক হবে না দেখেই হামিদ ভাই বাবুর্চিকে নিয়ে গেছেন। আসলে এই সব ব্যাপারে হামিদ ভাই ওস্তাদ লোক। উনি ভুল করার কথা না।এইসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেছে রফিক রাতে।
সকালে উঠে সবাই সাতারের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সামি ভাই এসে তার জিনিসপত্র দিয়ে গেল। সামি ভাই একটু নার্ভাস মনে হয়। যদিও প্রকাশ করছে না। 14 কিলো সমুদ্্র মুখের কথাতো না। বোটে করেই অনেকে ভয় পায় আর এ তো সাতার। যাই হোক, সামি ভাই নতুন সাতারু, দেখে রাখতে হবে। অবশ্য নতুন পুরান ব্যাপার না। বোট না থকলে কোন উপায়ই নাই। সাগরে নামলে আর কিছুই দেখা যায় না। খালি পানি আর পানি।
বেশ ঘটা করে সাতার শুরু হলো সকাল বেলা। ঠিক সময় মত। ভাটা মাত্র শুরু হয়েছে। ভাটা থাকতে থাকতে সাতার শেষ করতে হবে। আর না হলে সেন্টমার্টিন আর যাওয় যাবে না। সাগর আবার কক্সবাজার ফেরত দিয়ে যাবে।
মনের খুত খুত ভাবটা এখন যেন আর নেই। চারদিকে কেমন সাজ সাজ রব। সামি ভাই বেশ ভালো সাতার কাটছে। উনার পিছনে আরও কয়েকজন আছে। চ্যানেল আইর ক্যামেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। হামিদ ভাই সক্ষাতকার দিচ্ছেন। উনার জানার ব্যাপ্তি অনেক। নিজে অসাধারন ডাইভার। একটু পরে কে জানি বল্ল কয়েকজন সাতারু অনেক পেছনে হারিয়ে গেছে, রফিক যেন একটু দেখে। কিন্তু ও তো সামি ভাইকে দেখছে - ভাবে রফিক। আবার ভাবে সামি ভাই তো ভালই সাতার কাটছে, যাই বাকীদের একটু দেখি। এদিকে হামিদ ভাইও ডাকছেন। আর ওর সাথে স্পীড বোট। সামি ভাই হারিয়ে আর কই যাবে। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখে 3 সাতারু সমুদ্্রে কাহিল। যাই হোক, ওদেরকে লাইফ লাইন দিয়ে টেনে মুল দলের কাছে নিয়ে আসল রফিক।
আবার হামিদ ভাই ডাকছে। চ্যানেলের লোকদের সাথে একটু থাকতে বল্লেন। রফিকের আবার একটু অস্থির লাগছে। সামি ভাইকে দেখছে না অনেকক্ষন। কোনদিকে হারিয়ে গেল না তো। সমুদ্্রের এই জায়গাটাতে দইটা স্রোত। একটু ওলট পালট হলেই বা গাইড না থাকলেই হয় সোজা খোলা সাগরে নয়তো সোজা বার্মা। রফিক হামিদ ভাইকে ওর টেনশনের কথা জানাল। উনি বললেন আরে চিন্তা করো না। তাছাড়া সামি তো সাতার ছেড়ে বোটে উঠে গেছে বলে শুনেছি। ওর কাহিল লাগছে শুনলাম। রফিক ভাবল, সুযোগ পেলে একবার সামি ভাইকে দেখতে যাবে। লোকটা আবার অসুস্থ হয়ে গেল না তো।
তিন
অনেকক্ষন ধরে শুধু ছলাত ছলাত ঢেউয়ের শব্দ। মাঝে মাঝে দূরে বোটের আওয়াজ শুনতে পায় সামি। হাত উঠিয়ে ডাকার চেষ্টা করেছে কয়েকবার। লাভ হয়নি। বোট ওকে দেখেনি। বা দেখলেও এরকম ওয়েত স্যুট পরা মাথায় স্নরকেল লাগানো কাউকে ঠিক বন্ধুসুলভ মনে হয়নি। সামির মনে হচ্ছে অনন্তকাল ধরে ও ভেসে আছে। সবথেকে খারাপ চিন্তাগুলো মাথায় আসছে। ওরা কি ভুলে গেল...?
সামির হাতে এখন অফুরন্ত সময়। কেউ ওকে খুজে না পাওয়া পর্যন্ত ভেসে থাকা। শুধুই ভেসে থাকা আর যতটুকু সম্ভব শক্তি বাচিয়ে রাখা। সামি জানে ও যত বেশীক্ষন ভেসে থাকতে পারবে ওর বাচার সম্ভাবনাও ততটাই বারবে। যদিও সামি জানে ও বেচে যাবে। অন্তত এবার এভাবে মরবে না। কেউ না কেউ ওকে ঠিকই খুজে বের করবে। ওর কাজ শুধু সে পর্যন্ত টিকে থাকা।
সামি ভাবে.... ভাবা ছাড়া আর কিই বা করার আছে। ভেসে থাকাটা অনেক সহজ হয়ে গেছে ওয়েট সু্যট আর স্নরকেলটার জন্য। মাথা না ভাসিয়েও শ্বাস নেয়া যায়। সামির চোখের সামনে ভাসে তার ছোটবেলা। বড় হয়ে ওঠা। রাজশাহী মেডিকেলে ভর্তি হওয়া। বাবু, ভন্ড ওদের সাথে বন্ধুত্ব, মনে হয় মুনিরের কথা। কলেজে প্রথম রলির সাথে পরিচয় হওয়া। পরিচয় থেকে প্রেম। তারপর বিয়ে। কত স্মৃতি। বিয়ের পর কাব্য - সামির একমাত্র ছেলে। কাব্যর কথা মনে হতেই সামির মনটা উতলা হয়ে ওঠে। মনে হয় সামি না থাকলে কাব্যর কি হবে। অর্থ কষ্টে ওর ছেলে পড়বে না এই বিশ্বাস আছে। কিন্ত ওর ছেলে আর কোনদিন বাবাকে পাবে না। ডাকতে পারবে না বাবা বলে। ভাবতে ভাবতে সামির বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। না.. এসব সামি কি ভাবছে?.. সামি তো মরছে না। ও অবশ্যই বেচে যাবে। ওর পুরো দলের একজনেরও কি ওর কথা মনে হবে না?! একটু দেরীতে হলেও ওরা নিশ্চই দেখবে সামি নেই। তখন নিশ্চই বোট পাঠাবে ওকে উদধার করতে।
সময় চলে যায়। সামি ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসছে। প্রায় 3 ঘন্টা হতে চল্ল। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। কিন্তু শরীর প্রায় পানি শুণ্য। লোনা পানি আর সূর্যের তাপ। অসহনীয় হয়ে যাচ্ছে সব। বুঝতে পারছে না সামি আর কতক্ষন টিকবে। শরীর চলছে না। ঝিমানি আসছে। মরার মত ভেসে আছে গভীর সমুদ্্রে। চারদিকে শুধু পানির আওয়াজ। এছাড়া একদম নিশ্চুপ।
চলবে.....
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা এপ্রিল, ২০০৭ রাত ৩:৫৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




