somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দূর সমূদ্্র.......

০১ লা এপ্রিল, ২০০৭ রাত ৩:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এক

In the deep sea you can set many targets but you can't reach any... dont panic.. someone will reach you.. রিফাতের এই কথাটা একটু পর পর কানে বাজছে সামির। প্রায় দু-ঘন্টা হতে চল্ল ভেসে আছে। প্রথমে মনে হচ্ছিল ঠিকই আছে, সবার সাথেই আছে। কিন্তু আস্তে আস্তে সবার কথা যেন হারিয়ে গেল, পাশের গাইড বোটগুলোও যেন হারিয়ে গেল। ধীরে ধীরে সামি বুঝতে পারল, সে আসলে ট্র্যাক থেকে সরে গেছে। ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই প্রচন্ড একটা ভয় হঠাত করেই ওকে গ্রাস করতে চাইছে। কোন রকমে নিজেকে সামলে নিল সামি। চিন্তা করছে না, ওর একার জন্য একটা গাইড বোট আছে। কিছুক্ষনের মধ্যেই ওকে খুজে নেবে।

দশ জনের একটা সাতারুদের দল বাংলা চ্যানেল পারি দেবে। বাংলা চ্যানেল হলো টেকনাফের শেষে শাহপুরি দীপ থেকে সেন্টমর্টিন পর্যন্ত সমুদ্্র। গত বছরও এই দলের 3 জন সাতরে এই চ্যানেল পার হয়েছে। এইবার সামি তাদের সাথে পারি দেবে। প্রায় 14 কিলোমিটার পথ। কিন্তু পারি দেয়া সম্ভব। গতবার তো ওরা দিয়ে দেখিয়েছে। প্রত্যেকের সাথে এইবার আলাদা সাপোর্ট বোট থাকবে। কাজেই সমস্যা হলে বোটে উঠে গেলেই হলো। সবাই ওকে বেশ সাহস দিয়েছে। প্রায় দুই ঘন্টা হতে চল্ল। এখনও কোন বোট আসছে না কেন। রফিককি ওকে দেখতে পাচ্ছে না। রফিক ওর বোটের চার্জে আছে। গতবার একা ও তিনজনকে গাইড করে নিয়ে গেছে। তাই প্রথম সুযোগেই সামি টীম লিডার হামিদ ভাইকে বলে রফিককে ওর জন্য নিয়েছে। কিন্তু রফিক কোথায়? দুই ঘন্টা হলো প্রায় সমুদ্্রে ভেসে আছে সামি। একটুএকটু করে শরীর ভেঙ্গে আসছে। 14 কিলোমিটার সাতরানোর সময় এনার্জি লাগবে, তাই ছেলে কাব্যর চকলেটের বাক্স থেকে চকলেট নিয়ে এসেছিল। কিন্তু সেটাওতো রফিকের কাছে রাখা ব্যাগে। ....ওরা কি ভুলে গেল সামির কথা। কিন্তু রফিক তো ভোলার কথা না। ও তো শুধু সামির গাইড।

দুই

রাতের বেলা থেকেই রফিকের মনটা খুত খুত করছে। গতবারও সে এই দলটা নিয়ে বাংলা চ্যানেল পারি দিয়েছে।সেবার সব মিলিয়ে ওরা ছিল মাত্র চারজন। ও নিজে ছিল একমাত্র গাইড। এবার সেই তুলনায় এলাহি ব্যাপার। দশজন সাতারু। সবার সাথে সাপোর্ট বোট। সবসময় চ্যানেল আই টিভি ক্যামেরা। বিরাট ব্যাপার। কিন্তু কেন যেন ভাল লাগছে না রফিকের। ও নিজে একটু সহজ সরল মানুষ। অনেক কিছুই বোঝে না। কিন্তু এই যে রাতের বেলা সাতারুরা না খেয়ে আছে এটা কি ঠিক হলো। বাবুর্চি ছিল শাহপুরি দীপে। কিন্তু হামিদ ভাই তাকে ডেকে নিয়ে গেলেন আগামীকালের বিরানি রান্না করার জন্য। কালকে নাকি চ্যানেলের লোক আসবে, তাদের ভাল খাওয়াতে হবে। কিন্তুযাদের নিয়ে কালকের আয়োজন তারাই তো রাতে না খেয়ে আছে। কি জানি, রফিক ভালো বুঝতে পারে না। একবার ভাবে হয়তো সকালে সাতারের আগে রাতে খাওয়া ঠিক হবে না দেখেই হামিদ ভাই বাবুর্চিকে নিয়ে গেছেন। আসলে এই সব ব্যাপারে হামিদ ভাই ওস্তাদ লোক। উনি ভুল করার কথা না।এইসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেছে রফিক রাতে।

সকালে উঠে সবাই সাতারের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সামি ভাই এসে তার জিনিসপত্র দিয়ে গেল। সামি ভাই একটু নার্ভাস মনে হয়। যদিও প্রকাশ করছে না। 14 কিলো সমুদ্্র মুখের কথাতো না। বোটে করেই অনেকে ভয় পায় আর এ তো সাতার। যাই হোক, সামি ভাই নতুন সাতারু, দেখে রাখতে হবে। অবশ্য নতুন পুরান ব্যাপার না। বোট না থকলে কোন উপায়ই নাই। সাগরে নামলে আর কিছুই দেখা যায় না। খালি পানি আর পানি।

বেশ ঘটা করে সাতার শুরু হলো সকাল বেলা। ঠিক সময় মত। ভাটা মাত্র শুরু হয়েছে। ভাটা থাকতে থাকতে সাতার শেষ করতে হবে। আর না হলে সেন্টমার্টিন আর যাওয় যাবে না। সাগর আবার কক্সবাজার ফেরত দিয়ে যাবে।

মনের খুত খুত ভাবটা এখন যেন আর নেই। চারদিকে কেমন সাজ সাজ রব। সামি ভাই বেশ ভালো সাতার কাটছে। উনার পিছনে আরও কয়েকজন আছে। চ্যানেল আইর ক্যামেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। হামিদ ভাই সক্ষাতকার দিচ্ছেন। উনার জানার ব্যাপ্তি অনেক। নিজে অসাধারন ডাইভার। একটু পরে কে জানি বল্ল কয়েকজন সাতারু অনেক পেছনে হারিয়ে গেছে, রফিক যেন একটু দেখে। কিন্তু ও তো সামি ভাইকে দেখছে - ভাবে রফিক। আবার ভাবে সামি ভাই তো ভালই সাতার কাটছে, যাই বাকীদের একটু দেখি। এদিকে হামিদ ভাইও ডাকছেন। আর ওর সাথে স্পীড বোট। সামি ভাই হারিয়ে আর কই যাবে। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখে 3 সাতারু সমুদ্্রে কাহিল। যাই হোক, ওদেরকে লাইফ লাইন দিয়ে টেনে মুল দলের কাছে নিয়ে আসল রফিক।

আবার হামিদ ভাই ডাকছে। চ্যানেলের লোকদের সাথে একটু থাকতে বল্লেন। রফিকের আবার একটু অস্থির লাগছে। সামি ভাইকে দেখছে না অনেকক্ষন। কোনদিকে হারিয়ে গেল না তো। সমুদ্্রের এই জায়গাটাতে দইটা স্রোত। একটু ওলট পালট হলেই বা গাইড না থাকলেই হয় সোজা খোলা সাগরে নয়তো সোজা বার্মা। রফিক হামিদ ভাইকে ওর টেনশনের কথা জানাল। উনি বললেন আরে চিন্তা করো না। তাছাড়া সামি তো সাতার ছেড়ে বোটে উঠে গেছে বলে শুনেছি। ওর কাহিল লাগছে শুনলাম। রফিক ভাবল, সুযোগ পেলে একবার সামি ভাইকে দেখতে যাবে। লোকটা আবার অসুস্থ হয়ে গেল না তো।

তিন

অনেকক্ষন ধরে শুধু ছলাত ছলাত ঢেউয়ের শব্দ। মাঝে মাঝে দূরে বোটের আওয়াজ শুনতে পায় সামি। হাত উঠিয়ে ডাকার চেষ্টা করেছে কয়েকবার। লাভ হয়নি। বোট ওকে দেখেনি। বা দেখলেও এরকম ওয়েত স্যুট পরা মাথায় স্নরকেল লাগানো কাউকে ঠিক বন্ধুসুলভ মনে হয়নি। সামির মনে হচ্ছে অনন্তকাল ধরে ও ভেসে আছে। সবথেকে খারাপ চিন্তাগুলো মাথায় আসছে। ওরা কি ভুলে গেল...?

সামির হাতে এখন অফুরন্ত সময়। কেউ ওকে খুজে না পাওয়া পর্যন্ত ভেসে থাকা। শুধুই ভেসে থাকা আর যতটুকু সম্ভব শক্তি বাচিয়ে রাখা। সামি জানে ও যত বেশীক্ষন ভেসে থাকতে পারবে ওর বাচার সম্ভাবনাও ততটাই বারবে। যদিও সামি জানে ও বেচে যাবে। অন্তত এবার এভাবে মরবে না। কেউ না কেউ ওকে ঠিকই খুজে বের করবে। ওর কাজ শুধু সে পর্যন্ত টিকে থাকা।

সামি ভাবে.... ভাবা ছাড়া আর কিই বা করার আছে। ভেসে থাকাটা অনেক সহজ হয়ে গেছে ওয়েট সু্যট আর স্নরকেলটার জন্য। মাথা না ভাসিয়েও শ্বাস নেয়া যায়। সামির চোখের সামনে ভাসে তার ছোটবেলা। বড় হয়ে ওঠা। রাজশাহী মেডিকেলে ভর্তি হওয়া। বাবু, ভন্ড ওদের সাথে বন্ধুত্ব, মনে হয় মুনিরের কথা। কলেজে প্রথম রলির সাথে পরিচয় হওয়া। পরিচয় থেকে প্রেম। তারপর বিয়ে। কত স্মৃতি। বিয়ের পর কাব্য - সামির একমাত্র ছেলে। কাব্যর কথা মনে হতেই সামির মনটা উতলা হয়ে ওঠে। মনে হয় সামি না থাকলে কাব্যর কি হবে। অর্থ কষ্টে ওর ছেলে পড়বে না এই বিশ্বাস আছে। কিন্ত ওর ছেলে আর কোনদিন বাবাকে পাবে না। ডাকতে পারবে না বাবা বলে। ভাবতে ভাবতে সামির বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। না.. এসব সামি কি ভাবছে?.. সামি তো মরছে না। ও অবশ্যই বেচে যাবে। ওর পুরো দলের একজনেরও কি ওর কথা মনে হবে না?! একটু দেরীতে হলেও ওরা নিশ্চই দেখবে সামি নেই। তখন নিশ্চই বোট পাঠাবে ওকে উদধার করতে।

সময় চলে যায়। সামি ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসছে। প্রায় 3 ঘন্টা হতে চল্ল। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। কিন্তু শরীর প্রায় পানি শুণ্য। লোনা পানি আর সূর্যের তাপ। অসহনীয় হয়ে যাচ্ছে সব। বুঝতে পারছে না সামি আর কতক্ষন টিকবে। শরীর চলছে না। ঝিমানি আসছে। মরার মত ভেসে আছে গভীর সমুদ্্রে। চারদিকে শুধু পানির আওয়াজ। এছাড়া একদম নিশ্চুপ।


চলবে.....
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা এপ্রিল, ২০০৭ রাত ৩:৫৫
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমন্ত্রন পত্র থাকলে ভিসার দরকার কী! আপনি জানেন আমি কে?

লিখেছেন মাথা পাগলা, ১৬ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০০



ভারত বাংলাদেশের কোনো একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানাতে চাইলে সেই আমন্ত্রণপত্র ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ হাইকমিশনে পাঠাবে। সেখান থেকে আমন্ত্রণপত্র যাবে সেই রাজনৈতিক ব্যক্তির ডিপার্টমেন্টে, তারপর তার কাছে। এরপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সাদিক হাসনাতের প্রোগামে রাজাকার মঈনুদ্দীন

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ১৬ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৫



এই ছবিটি লন্ডনে অনুষ্ঠিত হওয়া নিজেস্ব অর্থায়নে সাদিক হাসনাতের প্রোগামের। অসংখ্য আঙ্কেল আন্টিদের মাঝে একজন বিশেশ লোককে দেখা গেল সেখানে। লোকটাকে চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে ছবিতে। এই লোকটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চেয়ে চেয়ে দেখুন

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ১৬ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৩১


আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ; স্বাভাবিকভাবেই তারা অনলাইনে কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করছে। মাঝেমধ্যে ঝটিকা মিছিল করে তাদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।

রাজনীতিতে সক্রিয় বিএনপি ও জামায়াত-এনসিপি গং। বিএনপি ও জামায়াত আগে জোটবদ্ধ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৬ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:০৫



'এই জল ভালো লাগে; বৃষ্টির রূপালি জল কত দিন এসে
ধুয়েছে আমার দেহ- বুলায়ে দিয়েছে চুল-চোখের উপরে
তার শান-স্নিগ্ধ হাত রেখে কত খেলিয়াছে, আবেগের ভরে
ঠোঁটে এসে চুমো দিয়ে চলে গেছে কুমারীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

খাম্বা/খাল তারেক কে কিছু উপলব্ধি শেয়ার করছি

লিখেছেন অপলক , ১৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৪২

আজ আর মনের মাধুরী মিশিয়ে বকাঝকা করব না। আজ কিছু ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা শেয়ার করব।



খাল খনন বা ঢাকার বাসস্ট্যান্ড সরানোর চেয়ে কি কি গুরুত্বপূর্ন কাজ এই অর্থবছরে করা যেতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×