somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলার ঈশপ আকমল মাস্টার ও সুলাইমানলিপি

০২ রা এপ্রিল, ২০১৪ রাত ১১:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


রূপগঞ্জ স্টেশনে আমি বাসের অপেক্ষায়। সময় যাচ্ছে শ্লথে। এক পিচ্চি হাঁক দিয়ে দিয়ে চা বিক্রি করছে। পিচ্চির কাছে চা চাইলো-এক সুবেশী যুবক। পিচ্চি চা কাপে ঢালতে না ঢালতেই আরেক হকারের কুনুইয়ের ধাক্কা খেয়ে ছলাত করে যুবকের শার্টে পড়লো। যুবক পিচ্চিকে এমন জোরে চড় মারলো আমার পুরো অন্তরাত্মাই কেঁপে ওঠলো।

আমার পাশে বসা ভদ্রলোক,সব লক্ষ্য করে বললেন-আহারে যুবক-কেন যে মিছেমিছি চড় মারলে। যা হবার তা তো হয়েই গেছে। আসলে তোমার সুলাইমানের গল্পটা জানা দরকার ছিলো। বলেই আমার দিকে ফিরে থাকালেন। আমার ও সময় কাটেনা। আমি বলি সুলাইমানের গল্পটা কেমন?

ভদ্রলোক অতি আগ্রহে গল্প শুরু করলেন-

একজন নিরীহ প্রাইমারী ইস্কুলের শিক্ষকের ছেলে সুলাইমান এমন জালিম ছিলো-তারপর আবার সাধু হয়ে গেলো একবারে আজব ব্যাপার। সুলাইমান-রিকশা থেকে নেমেই ড্রাইভারকে চড়াতে শুরু করলো একটা টাকা বেশী চাইছিলো বলেই।

বাড়ী এসে দেখে উনুনে এখনো ভাত। সুলাইমানের মাথা গরম ভাতের মতো গরম হয় আর সিদ্ধ ভাতের ধোঁয়ার মতো মাথা থেকে ভাঁপ বের হতে থাকে। রাগের মাথায় মারলো কাজের মেয়ে জরিনারে এক চড়।

আকমল মাস্টার রাতে বাসায় এসে যথারীতি ছেলের একই কীর্তি শুনেন। ভোরে পূবাকাশে আলো ফুটছে। চারদিকে প্রশান্তির বাতাস বইছে,ফুরফুরে হিমেল হাওয়া। আকমল মাস্টার ছেলেকে ঘুম থেকে জাগান। হাত মুখ ধূয়ে বাপ আর ছেলে অল্প কিছু পেটে চালান দিয়ে গ্রামের আল ভরাভর হাঁটতে থাকে গন্জের দিকে। সুলাইমানের বায়ুচড়া মন বড় বেশি উচাটন। বাপ আজ সকাল বেলায় তারে নিয়ে কোথায় রওয়ানা দিলেন।

দুজনে রহমত ব্যাপারীর ভূষিমালের দোকানে আসে। নানারকম সওদা শেষ করে। তারপর,মাস্টার মশাই, সুলাইমানকে বলেন-ছটাক তিনেক পেরেক কিনে নিতে। পূবাকাশের আগুনের গোলা মাথার উপর ওঠতে না ওঠতেই দুজনে বাড়ি ফিরে আসে।

আকমল মাস্টার ছেলে সুলাইমাকে নিয়ে খেতে বসেন। খাওয়া দাওয়া শেষ করে ছাতিম গাছটার নীচে গিয়ে বসেন। তারপর তিন ছটাকের পেরেকের থলেটি ছেলের হাতে দেন। শান্ত-ধীরে ছেলের মাথায় হাত রেখে বলেন-যখনই তোমার মেজাজ চড়া হবে কারো সাথে অভদ্র ব্যবহার করবে তখনই একটি করে পেরেক এই ছাতিম গাছের বুকে বিধঁবে। তোমার জন্মদাতা বাপ হিসাবে এই অনুরোধটুকু কি বেশী হয়ে যাবে?

মাস দুয়েক পর-

চৈত মাসের প্রচন্ড গরম পড়েছে। আকমল মাস্টার শীতল বাতাসের টানে ছাতিম গাছটার নীচে এসে বসেন। দেখেন অনেকগুলো পেরেক ছাতিম গাছটায় বিঁধে আছে। সুলায়মানকে ডাকেন। বলেন-ও আরেকটি কথা,যে পর্যন্ত তোমার মেজাজ নিয়ন্ত্রনে থাকবে কারো সাথে ভালো ব্যবহার করবে তখন একটি করে পেরেক এখান থেকে তুলে ফেলবে।

মাস দুয়েক পর আকমল মাস্টার দেখেন ছাতিমের গাছে আর কোনো পেরেক নেই। তিনি ছেলেকে নিয়ে ছাতিম গাছের পাশে যান। তারপর বলেন-আমি খুশী হয়েছি। তোমার মেজাজের পরিবর্তন হয়েছে দেখে। যাদের সাথে প্রতিনিয়ত খারাপ ব্যবহার করতে রিকসা ড্রাইভার,কাজের মেয়ে, স্বজন, বন্ধু, পরিজন সবার সাথে ভালো ব্যবহার করছো। কিন্তু গাছটার দিকে চেয়ে দেখো-সেই বিঁধে যাওয়া পেরেকগুলো আর নেই কিন্তু দাগগুলো ঠিকই রয়ে গেছে। এ দাগুগুলো কিন্তু কখনোই মুছে যাবেনা। কখনোই না।

শারীরিক আঘাতের চিহ্ন যেমন দাগ রেখে যায় মানসিক আঘাত, খারাপ ব্যবহার, কোনো তাচ্ছিল্য কোনো অবহেলা, অহমিকা, বড়ত্বের অহংকার, রাগের চোটে অসাবধানতাবশত কোনো অর্বাচীন বাক্যও মানুষের মনে চিরস্থায়ী দাগ রেখে যায়।

সেদিন যে ড্রাইভারকে চড় মেরেছিলে বাজারে, মনে আছে? শুনেছি সে আর নেই, ট্রাকের চাপায় পড়ে মারা গেছে। আমার বড় কষ্ট হচ্ছে তোমাকে ক্ষমা করার মতোও আর কেউ পৃথিবীতে রইলো না। তাই সবসময় ভুল করে যে আবার ক্ষমা চাইবে সে সুযোগ ও আর না আসতে পারে।

ইতোমধ্যে আমার বাস এসে দাঁড়িয়েছে। আমি বলি, হুম শুনলাম, আপনার গল্প। আমাকে এবার যেতে হবে।যদি আপনার নামটা বলেন – লোকটি বলেন আমার নাম হলো সুলাইমান। সেই আকমল মাস্টারের ছেলে। বাড়ী ফিরার পথে গাড়িতে বসে আমি চিন্তা করছি এই ছোট জীবনে কত জনের বুকে যে কত পেরেক বিঁধে রেখেছি মুছাতো যাবেনা কিন্তু সব তোলে ফেলার সময় পাবোতো?
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা এপ্রিল, ২০১৪ রাত ১১:৪৯
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে ভাল্লাগে- ২

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯


"যে-রাঁধুনী জানে তার তরকারিতে স্বাদ হয়নি, সে নিমেষে লঙ্কার কৌটো উপুড় করে দেবে। তারপর অতিথি যখন কান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে হাঁউমাউ করবে, রাঁধুনী তখন মিটিমিটি হেসে বলবে—‘একটু ঝাল বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চা এর আড্ডা।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১৬



শনিবার
৭ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৬ জমাদিউল আ. ১৪৪৮ হিজরি

কিছু মুহূর্ত কখনো হারিয়ে যায় না, সময়ের স্রোতে শুধু স্মৃতি হয়ে মনের গভীরে জমা থাকে।

২০১১ সাল। তখন আমি ইন্টারে পড়ি। নানীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৪'র ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশে ডানপন্থা ও মৌলবাদী চেতনা-রাজনীতির চরম উত্থান

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৩



২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশ দীর্ঘদিনের স্বৈ/রাচারী শাসন থেকে মুক্ত হয়েছিল ঠিকই; কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশ চলে গিয়েছিল বিপুল সংখ্যক ডা*নপন্থী বা মৌ*লবাদী চেতনা বা রাজনীতির ধারক-বাহক-সমর্থকদের কবলে।
হ্যাঁ, হাসিনার পতনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×