প্রথম বই প্রথম ভালবাসা
ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ
টিন এজ এ প্রথম কোন মেয়েকে ভাল লাগলে যে দুরুভাব ও হৃদকম্পন অনুভুত হয়, প্রথম লেখা কিংবা বই প্রকাশে তার কোন ব্যতিক্রম ঘটেনা। আমার প্রথম লেখা ছাপার অনুভুতি দিয়েই শুরু করছি। তখন ১৯৮৬ সাল। অনেকগুলো কবিতা লিখে ফেলেছি। লজ্জায় বড় কাউকে দেখাই না। ছোটদের কাছে ভাব নিয়ে বলতাম ‘তোরা নাইন টেনে উঠতেই আমার কবিতা পাঠ্যবইয়ে দেখতে পাবি’। নতুন নতুন বিষয়ে কবিতা লিখতে চেষ্টা করতাম। রাতে ঘুমোতে গেলেও টেনশন কাজ করতো। কঠিন কঠিন শব্দ খুঁজে বের করতাম ডেকশনারী থেকে। সেটিকে শিরোনাম করে কবিতা লিখতাম। বগুড়ার সারিয়াকান্দীতে পড়তাম তখন। সারিয়াকান্দী বাঙালী নদীর ফেরি চালকের মেয়ে (নামটি স্মরণে নেই) দৈনিক করতোয়ায় লেখার জন্য আমাকে উদ্বুদ্ধ করে। আমি কয়েকেটি লেখা পাঠিয়ে দিলাম পত্রিকায়। পত্রিকায় লেখা পাঠানোর পর মনে হতো আগামীকালের সংখ্যায় আমার লেখা ছাপা হবে। সারা রাত টেনশন কাজ করে; আমার লেখা ছাপা হবে, নাম আসবে ছাপার অক্ষরে। সকালে উঠে পত্রিকার খোঁজ শুরু। বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে আবেগের সাথে পত্রিকা হাতে নেই কাঁপা কাঁপা হাতে। হাত পায়ের সাথে সাথে বুকও কাঁপছে একই তালে। কিন্তু হায় কপ্পাল! কোথাও আমার লেখা খঁুজে পেলাম না। খুব হতাশা নিয়ে ফিরে আসি লজিং বাড়িতে। কয়েকদিন খঁুজে লেখা না পাওয়ায় মনমরা হয়ে গেলাম। হঠাৎ চিন্তা এলো দেয়ালিকা প্রকাশের। যে কথা সেই কাজ। ২১ ফেব্রুয়ারি মহান ভাষা দিবস সংখ্যার দুটি কপি বের করে সারিয়াকান্দী স্ড়্গুল গেট এবং মাদরাসা মোড়ে ঝুলিয়ে দিলাম। তখন সেখানকার ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন বজলুর রহমান। খুব সাহিত্য প্রেমিক ছিলেন তিনি। আমাকে বাসায় ডেকে পরবর্তী মহান স্বাধীনতা দিবসের সংখ্যা করতে উদ্বুদ্ধ করলেন। ভাষা দিবস সংখ্যার খরচ বাবদ পঞ্চাশ টাকা হাতে গুজিয়ে দিলেন। শুরু হলো দেয়ালিকার পথচলা। প্রায়ই ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের বাসায় যেতাম এবং তাঁর দুই মেয়ে বাধন আর বিধিশাকে গল্প শুনাতাম। ওরা এখন অনেক বড়। বাধন তো অনেক বড়মাপের শিল্পীও। খুব মনে পড়ে ওদের।
উনিশ‘শ সাতাশি সাল। একটি ছড়া ছাপা হলো দৈনিক করতোয়ায়। দেখে কিযে আনন্দ, বুঝানোর ভাষা নেই। মনে মনে ভাবতাম আমি তো কবি হয়েই গেছি। সবাইকে দেখাতাম। এখন ওসব স্মৃতি মনে পড়লে খুব হাসি পায়। হায়রে কতটা আঁতেল ছিলাম। আসলে প্রথম লেখা ছাপলে মনে হয় সবাই এমনভাবে আবেগ তাড়িত হয়।
১৯৮৭ সালে বাঁধভাঙা বন্যায় ফসল খেয়ে গেল সবার। ঘরবাড়ি, গরু ছাগল ভেসে গেল। মারা গেল অনেক অসহায় মানুষ। এসব বিষয়কে নিয়ে গ্রামীণ ঐতিহ্যের সুরেলা কবিতা লিখলাম ‘বন্যার জ্বালায় বাংলার আর্তনাদের কবিতা’ আধুনিকতার নামে প্রচলিত অসামাজিক বিষয়াবলী নিয়ে আর একটি লিখলাম ‘আধুনিক যুগের কবিতা’। ছাপা হলো গাইবান্ধা হেলাল প্রেস থেকে। নিজের প্রথম ছাপানো পুস্তিকার ঘ্রাণই আলাদা। আবেগে নিজেই বাজারজাতকরণ করতে গিয়ে বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে । সে প্রসঙ্গ আজ নাইবা টানলাম।
১৯৮৮ সাল। এবারের বন্যায় ভেসে গেল আমার অবশিষ্ট সে সব কবিতা। ইচ্ছে জাগলো সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনার। আবারো একই আবেগ, একই অনুভুতি। সারিয়াকান্দী মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা আবুল কাশেম হুজুরের সাথে পরামর্শ করতে গেলে তিনি নাম ঠিক করে দিলেন ‘আল ইশরাক’ (সুপ্রভাত)। সাহসের সহযাত্রী পেলাম মাদরাসার রাস্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আইযুব উদ্দীন স্যারকে। লেখা সংগ্রহ করে বগুড়ার ছাপতে এসে অর্জন করলাম নতুন নতুন অনেক অভিজ্ঞতা। লেটার প্রেসে ছাপা। চাররঙা প্রচ্ছদ এঁকে এনে বিপদে পড়লাম। খরচের হিসেব শুনে চোখ ছানাবড়া। অবশেষে সখের আঁকা প্রচ্ছদে পত্রিকা ছাপা হলো না। নতুন ডিজাইনে প্রচ্ছদ ছেপে পত্রিকার কাজ শেষ করা হলো। আইয়ূব স্যারের ফিফটি মোটর সাইকেলে চড়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দিয়েছি সে পত্রিকা। সে সব এখন শুধুই স্মৃতি। তখনকার অনেক স্ড়্গুল মাদরাসা এখন রাক্ষুসী যমুনার পেটে।
‘আল ইশরাকের’ দ্বিতীয় সংখ্যা আলোর মুখ দেখেনি। তবে বগুড়া শহরে এসে সমন্বয় সাহিত্য সাংস্ড়্গৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার সুবাদে সমন্বয় নামে একটি সাহিত্যের ছোট কাগজ সম্পাদনা করলাম। বেশ কয়েকটা সংখ্যা বেরিয়ে ছিলো। ‘বিজয়ের ছড়া’ নামে ছড়া ফোল্ডারও করেছিলাম কয়েকটি। ছাত্রজীবনের আবেগময় অধ্যায়ে এসব কাজে সত্যিই অন্যরকম অনুভূতি।
১৯৯৮ সাল থেকে একাডেমিক গবেষণায় মনোনিবেশ করায় সৃজনশীল লেখালেখিতে খানিকটা ভাটা পড়ে। অবশেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পর নতুনভাবে লেখালেখিতে জড়িয়ে ফেলি নিজেকে। কিন্তু বই প্রকাশের সাহস জোটেনা। মনে হতো আরো পক্কতা দরকার। ইতোমধ্যে ২০০৪ সালে যৌথ প্রয়াসে ছাপা হলো ‘পদ্মাপাড়ের ছড়া’ গ্রন্থটি। এ এক অন্যরকম অনুভূতি। অনেক লেখকের মাঝে আমার লেখাও থাকছে বলে খুব মজা পাচ্ছিলাম। ২০০৫ সালে ইসলামিক ফাউণ্ডশন বাংলাদেশ এর গবেষণা বিভাগ থেকে আমার গবেষণা গ্রন্থ ‘রোহিঙ্গা সমস্যাঃ বাংলাদেশের দৃষ্টিভংগী’ প্রকাশিত হলো। ২০০৭ সালে রাজশাহীর পরিলেখ প্রকাশনী থেকে বেশকিছু বই প্রকাশ হবে শুনে নিজেকে সাহসী করে তুললাম। পাণ্ডুলিপিও তৈরী হয়ে গেল। ছবি আঁকা নিয়ে টেনশন শুরু হলো। অবশ্য এ টেনশন খুব বেশিদূর না এগুতেই মনে হলো রানার কথা। রানা মানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষক আমিরুল ইসলাম রানা। আমার বন্ধু মানুষ। খুব ভালো আঁকিয়ে তিনি। তাঁকে ছবি আঁকার অনুরোধ করতেই রাজি হয়ে গেলেন। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই পেয়ে গেলাম ছবি। বইয়ের নামও ঠিক করলাম ‘ধনচে ফুলের নাও’। প্রচ্ছদের জন্য ঢাকার একজন খ্যাতিমান আঁকিয়েকে ঠিক করেছিলাম। তিনি সময় মতো প্রচ্ছদ তৈরি করেও পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সত্যি এক তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম। প্রচ্ছদটি কোন একটা শিশুতোষ পত্রিকার প্রচ্ছদের সাথে হুবহু মিলে গেল। মনটা ভীষণ খারাপ হলো।
প্রচ্ছদ নিয়ে শুরু হলো নতুন ভাবনা। অবশেষে একজন ভালো গ্রাফিঙ্ম্যান পেলাম। নাম সৈয়দ শফিক। তাঁর কারুকাজ নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবেনা। রানার আঁকা ছবিগুলোকে চমৎকার ফ্রেমে নিয়ে এলেন। প্রচ্ছদের আইডিয়াটা তাঁর মাথায় দিতেই তিনি বলপেন দিয়ে বাঁশঝাড় এঁকে তাতে রঙ মাখিয়ে চমৎকার দৃশ্যের অবতারণা করলেন। এখন দরকার ধনচে ফুল। তিনি কম্পিউটারে রক্ষিত এ্যালবাম থেকে ধনচে ফুল কেটে এনে তাতে পিপীলিকা বসিয়ে দিলেন। অসাধারণ প্রচ্ছদ হলো। সত্যিই কাজটি খুব মজার। দীর্ঘ সময় ধরে কাজটি মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেলো। বইয়ের গ্রাফিঙ্রে কাজ শেষ হতেই ঐ ডিজিটাল ইমেজ নামক শফিক ভায়ের প্রতিষ্ঠানে এলেন রাজা ভাই। রাজা ভাই মানে ড· তসিকুল ইসলাম রাজা। তাঁকে আমি বগুড়ার তৌফিত হাসান ময়না ভাইয়ের সাথে তুলনা করি। দুজনই একই প্রকৃতির মানুষ। তবে ব্যবধান হলো ময়না ভাই বেশিরভাগ সময় নাটক নিয়ে থাকেন আর রাজা ভাই সব দিকই সামলান। তবে মৌলিক মিল হচ্ছে, যখন যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুন না কেন দুজনই প্রশাসনের আপন ব্যক্তি হিসেবে ভূমিকা সফল রাখেন। যাহোক, রাজা ভাই বইটা দেখে বললেন, চাররঙা হবে তো? আমি বললাম না ভাই চাররঙা অনেক খরচ। তিনি হেসে বললেন, এতো সুন্দর বই একরঙা? তা হবেনা। আপনি চার রঙা করেন। আরে টাকা লাগলে রাজা ভাই দিবেন, অসুবিধা কী? সাহস পেলেও চাররঙা করার সুযোগটা হয়ে ওঠেনি।
যা হোক, বই ছাপা হলো। এ এক অন্যরকম অনুভূতি। অনেক লেখকের মতো আমারও একটি বই হচ্ছে ভেবে খুব মজা পাচ্ছিলাম। আরো মজা যে প্রথম বইয়ের প্রকাশনা উৎসব হলো ঢাকায়। প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের প্রধান কবি আল মাহমুদ এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট নজরুল গবেষক শাহাবুদ্দীন আহমদ। অনুষ্ঠানে বই থেকে বেশ কয়েকটা ছড়া পড়েছিলাম, তাতে আল মাহমুদ ভাই খুব উচ্ছসিত হয়ে প্রশংসা করেছিলেন। আরো আনন্দের বিষয় যে, ইতোমধ্যে বইটির প্রথম সংস্ড়্গরণের ছয়শত কপি শেষ হয়ে আবার দ্বিতীয় সংস্ড়্গরণ ছাপা হয়েছে। এ বইয়ের সাহস আমাকে সামনে যেতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এখন প্রতি বছরই কোন না কোন বই বাজারে আসছে। এবারও এসেছে ‘স্বপ্নফুলে আগুন’ নামে একটি ছড়ার বই। সত্যিকার অর্থে প্রথম প্রকাশনার অনুভূতি সত্যিই অনেক আবেগের, অনেক মজার। এর প্রকাশ খুবই কঠিন। তবে টেনশনও কম থাকেনা। তাই সবমিলে এভাবেই বলা যায়-
পয়লা পিড়িত পয়লা শিশু পয়লা লেখা ছাপা
বুকের ভেতর কালবোশেখী যায় কখনো মাপা?
[সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্ড়্গৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ইমেইল, [email protected]]
Click This Link
আলোচিত ব্লগ
'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!
প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন
মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন
জীবন চালাতে শহরে থাকা কিন্তু বেঁচে থাকা যেন বাড়িতেই
ঈদের ছুটিটা কেমন যেন চোখের পলকে শেষ হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল, এই তো সেদিন বাড়ি গেলাম—মায়ের হাতের রান্না, বাবার গল্প, ছোট মেয়ের হাসি, আর স্ত্রীর সেই নীরব অভিমান… সবকিছু মিলিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন
ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!
ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!
সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।