চাচা,
খুব সকালে আমার অনাহার ক্লিষ্ট বাচ্চাটা কেঁদে উঠে...ওর মায়ের বুকে দুধ নাই। মা কি খাওয়াবে?তার পেটেও তো কিছুই নাই...আমি এক পলক দেখে নেই তাকে;কালো আর শীর্ণ আমার বউটাকে আর আগের মত লাগেনা।আমি দিন দিন দেখতে পাচ্ছি কিসের যেন একটা বিষের ছোবল ওকে আর আমার বাচ্চাকে মেরে ফেলছে ধীরে ধীরে। ঘরে খাবার নেই...পাশের বাসার আব্দুল্লাহ্ কি যেন একটা কাজে আমাকে ডেকেছিল তো আমি দ্রুত সেখানে চলে যাই। আব্দুল্লাহ্ আমার প্রিয় বন্ধু...ও আর আমি একসাথে খেলতে খেলতে মানুষ হয়েছি...অনাহারে থাকলেও আমি যাওবা টিকে আছি আব্দুল্লাহ্ দিন দিন কেমন যেন শুকনা লতার মত হয়ে যাচ্ছে। আব্দুল্লাহ্ পেশায় জেলে...আর এই জেলে হবার অন্যতম কারণ ওর অসীম সাহস।দিন দিন আব্দুল্লাহর জালে মাছের পরিমাণ কমতে থাকে...সাথে সাথে আর সবারো। আব্দুল্লাহ্ আমাকে জানায় আমেরিকান একটা জাহাজ সমুদ্র পাড়ে কি যেন সব ফেলছে বেশ কিছুদিন ধরে...পানির রং কেমন যেন ভয়াবহ হয়ে যাচ্ছে...আগে যেমন সমুদ্র উপকুল থেকে খুব বেশি দূর যেতে হত না মাছ পেতে এখন দিন দিন তা বাড়ছে। আব্দুল্লাহ্ র শরীরেও সেই বিষ একদিন ঢুকে যায়...চমৎকার বাঁশি বাজানোয় ওস্তাদ...প্রায় ছয় ফিটের কাছাকাছি লম্বা...আর সদা হাশি খুশি আব্দুল্লাহর শরীর ভেঙ্গে পরতে শুরু করে।আমাদের সবার প্রিয় আব্দুল্লাহ্ একদিন আমাদের অবাক করে দিয়ে বলে, ‘আমি কিই বা ক্ষতি করলাম আমেরিকার বা ফ্রান্সের যে আমাকে বিষ দিয়ে মারলি? না খেতে দিয়ে মারলি’...ও কেঁদে ওঠে চিৎকার করে...আর এক সময় ওর গলা থেকে থক থকে রক্ত সমেত কাশ বের হয়ে আসে। আমি ওকে বুকে জড়ায় ধরি...আমার কান্না দেখলে ওকে স্বান্তনা দেবে কে?
চাচা,
সোমালিয়া ছিল আফ্রিকার অন্যতম গুরুত্বপুর্ন দেশ। ভৌগলিক ভাবে এটি আফ্রিকার পুর্বের অধিকাংশ জুড়ে অবস্থিত যার উত্তর পশ্চিমাংশে জিবুতি, দক্ষিন পশ্চিমাংশে কেনিয়া,উত্তরে গালফ অফ এডেন এবং ইয়েমেন, পুর্বে ভারত মহাসাগর এবং পশ্চিমে ইথিওপিয়া। সুতরাং বুঝতেই পারছেন বিশ্বের পরাক্রমশালী দেশ গুলির কাছে এটি ব্যাবসায়িক ভাবে কতটা গুরুত্বপুর্ন ছিলাম আমরা। উনিশ শতকে বৃটিশ এবং ইতালিয়ানরা সমুদ্র তীরের কিছু অংশের কতৃত্ব হাতে পেতে সক্ষম হয় এবং বৃটিশ সোমালি ল্যান্ড এবং ইতালি সোমালিল্যান্ড।মুঃ আব্দুল্লাহ্ হাসানের ডারভিস প্রদেশ কৃতিত্বের সাথে বৃটিশ রাজতন্ত্রকে পরাজিত করতে সক্ষম হয় কিন্তু ১৯২০ সালে তারা চুড়ান্তভাবে বৃটিশ আকাশ শক্তির কাছে পরাজিত হয়।১৯২৭ সালে ইতালি তাদের পুর্ন কতৃত্ব পায়। মুলত এরপর থেকেই আমাদের দেশটা শাসন করবে কে এই সংঘাতের মাঝে আগাতে থাকে...কখনো শান্ত হয় আবার যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। এরই মাঝে সোমালিয়াতে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি গড়ে ওঠে যার ভিত্তি ছিল পশু পালন আর বৈদেশিক কোম্পনানিগুলার রেমিটেন্স।
চাচা,
অপার সম্ভবনাময় সোমালিয়াকে পরাক্রমশালী দেশ আমেরিকা,ইংল্যান্ড,কানাডা বা ইতালি কখনই শান্ত থাকতে দেয়নি।আমাদের দেশের সমুদ্রসীমা ওদের দরকার ছিল তাই ওরা নানা কৌশলে আমাদের পিছিয়ে রাখছে,আমাদের নানান খনিজ সম্পদ আমাদের দিয়েই উত্তলন করে ওরা নিয়ে গেছে...আর এই কাজটা ওরা সুচারু ভাবে করার জন্যে খুব কৌশলে কিছু মানুষের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছে যারা আমাদের দিনে দুপুরে পাখির মত গুলি করে হত্যা করেছে,আমাদের মা বোনকে ধর্ষণ করে হত্যা করেছে,বাচ্চাদের ধরে নিয়ে পাকা খুনির প্রশিক্ষন দিয়েছে...আবার তারাই বিশ্ববাসির কাছে জানায়ছে আমাদের দেশে গণতন্ত্র নেই তাই তাদের সেখানে যুদ্ধাভিযান চালাতে হবে। এরি সাথে শুরু হয়েছে মরাকে আরো মারার সুকৌশল।আমাদের না আছে সরকার, না আছে অর্থনীতি,না আছে কর্মসংস্থান আর না আছে বেঁচে থাকার জন্যে নিরাপদ আশ্রয়। আমাদের জন্ম হয় রোগা আর অপুষ্টিতে ভোগা মায়ের পেটে...আমরা বড় হই অস্ত্রের আওয়াজে...আর না খেতে পেয়ে একদিন ঐ গুলির আঘাতেই বা পরাক্রমশালী দেশের ছড়িয়ে দেওয়া মারাত্বক কোন ব্যাধির কাছেই মারা যাই। আমাদের দেশের হিরা আর দামি দামি খনিজ ওরা আমাদেরি কিছু লোকের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে আমাদের দিয়েই উত্তোলন করায়...আর সারা বিশ্বের মনোযোগ যেন অন্যদিকে থাকে তাই সারাক্ষন দেশে যুদ্ধ্য বাধায় রাখে এবং এই কৌশলেই তারা সেগুলা তাদের দেশে পাচার করে।এই মুল্যবান খনিজ গুলা তুলতে কত কালো মানুষের রক্ত ঝরে,কত মানুষ না খেয়ে দিনের পর দিন অত্যাচারের মুখে মারা যায় কেউ জানেনা...কারণ সেগুলা মিডিয়ার সামনে আসতে দেওয়া হয় না শুধু আসে আমাদের হাতে রকেট লাঞ্চার আর গ্রেনেড।
চাচা,
আমরা জন্মের থেকেই অন্যায় ভাবে দারিদ্রের শিকার...আমাদের একটা শিশু জানেনা তার কি ভুল কিন্তু সে তার মায়ের বুকে দুধ খুঁজে পায় না...একটু পুষ্টিকর খাবার পায়না। কেমন করে পাবে? একজন সোমালি তরুণী যে বেড়েই উঠছে একটা ভীতিকর সামাজিক ব্যাবস্থার মাঝে...সেখানে তাকে দিনেরাতে সব সময় নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যে যুদ্ধ করতে হয়...সে নিজেই যেখানে দিনে কয়বার পেট ভরে খায় তার ঠিক নেই সেখানে সে তার বাচ্চাকে কি খাওয়াবে? তবুও বিয়ে করতে হয়...ঘর কান্না করতে হয় তাই আমরাও তাই করি...ভালবাসার ফসল হিসেবে আসে একটা কালো শিশু যে জন্মে থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তার বাবা মার মতই বঞ্চিত। চাচা, আমাদের গায়ের রং আপনাদের মত সাদা না,চুল সোজা আর সুন্দর না কিন্তু আমরাও মানুষ...আমাদেরও পেটে ক্ষুধা আর চোখে স্বপ্ন আছে তাই বলতে পারেন কেন আমাদের শেষ করে দিলেন তিল তিল করে? কেন বিশ্বের অন্যান্য দেশ চুপ করে থেকে আমাদের দেখে? একদিন আপনাদেরো এমন পরিণতি হবে...আফ্রিকার দেশ গুলাতে যত মুসলিম দেশ আছে তাদের ধ্বংস করার জন্যে সুকৌশলে আমাদের দুর্বল করে দেওয়া...যার বড় প্রমাণ মিশর আর লিবিয়া;আর তাদের মারতেই আমাদের দেশকে রুট হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা আমেরিকা আর পরাশক্তিরা করে রেখেছে আজ থেকে কয়েক শত বছর আগে।
চাচা,
আমাকে একটু বুঝায় বলেন তো সন্ত্রাসী কাদের বলে? আজকে যদি শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট মাহিন্দর রাজা পাকসে শুধু একটা জাতিকে ধ্বংস করে দেবে তাই তামিলদের পাখির মত গুলি করে আর বোমা মেরে হত্যা করে তবে সে বা তার বাহিনী সন্ত্রাসী না?তো এইটা যদি সন্ত্রাস হয় তাহলে আমেরিকা কেন ওখানে বোমা মারছে না?আচ্ছা ইসরাইল যদি ফিলিস্থিনের মুসলমানদের কাছ থেকে অন্যায় ভাবে তাদের জায়গা কেড়ে নেয়...বোমা হামলা করে বাড়ি ঘর গুড়িয়ে দেয়...মসজিদে ঢুকে মানুষকে গুলি করে হত্যা করে নামাজের সময় তাহলে তারা সন্ত্রাসী না?তখন তো ওবামা নামক মুসলমান আমেরিকান প্রেসিডেন্ট কিছু বলেন্না?আর আমরা সন্ত্রাসী? জন্মালাম অধিকার বঞ্চিত ভাবে,বাঁচলাম না খেয়ে খেয়ে আর ক্ষুধার জ্বালায় অস্ত্র হাতে তুলে নিতেই আমাদের বল্লেন সন্ত্রাসী।
চাচা,
আমাদের দেশের মাঠের এখন আর ফসল ফলে না...আমেরিকা আর তার মিত্ররা এমন ভাবে আমাদের শেষ করে দিয়েছে যে আমাদের মাটি ফসল ফলানোর অনুপযুক্ত হয়ে গেছে আর তার সাথে আছে দেশের অস্থির রাজনৈতিক অবস্থা।আমরা আমাদের দীর্ঘ সমুদ্র সীমায় মাছ ধরে খেতাম...এখন তাও পাইনা।আমেরিকা আমাদের দেশ কে বিষাক্ত ময়লা ফেলার স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছে...তারা আমাদের দেশের সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলে পারমাণবিক বর্জ্য ফেলে যার ফলে পরিবেশের মারাত্বক বিপর্যয় হচ্ছে।আমরা আর আগের মত সমুদ্রে মাছ পাইনা...পারমাণবিক বর্জ্যের তীব্র প্রভাবে ক্ষেতের ফসল থেকে শুরু করে সব কিছু বিষাক্ত। আমাদের মা দের পেটে শারীরিক ভাবে পঙ্গু বাচ্চা জন্মায়...আর তারা না খেতে পেয়ে একদিন এভাবেই মারা যায়।
চাচা,
মানুষের পেটে ভাত যদি না পরে তবে বেশির ভাগ মানুষই কিন্তু চেষ্টা করে কিছু করে খেতে...কিন্তু যদি সে দেখে তার থেকে শক্তিশালিরা তার সে অধিকারও রুখে দিছে তাহলে?আমাদের তো সবই শেষ তাই আমরা আর ভীত না...আমরা আমাদের অর্ধাহার আর অনাহারের শরীর নিয়ে আজকে সমুদ্রের রবিন হুড।চাচা, আপনাদের বাংলাদেশি জাহাজ়ে একজন সদ্য সন্তান হওয়া ছেলের পিতা ছিলেন...আপনারা হয়ত সে সময় আমাদের অনেক গালি দিয়েছেন...কিন্তু একবারও ভেবেছেন কি আমাদের দেশের কত সদ্যজাত শিশু সন্তান মারা যাচ্ছে মায়ের বুকের দুধ খেতে না পেয়ে?কত বাচ্চারা ক্ষুধার যন্ত্রনায় শুন্য থালা নিয়ে কান্নাকাটি করে? আমরা ক্ষুধার জালায় হালকা ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে বড় বড় জাহাজ দখল করি...তাদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করি বা কোন কোন সময় কাউকে হত্যাও করি কিন্তু কেন?কারণ আমাদের কে অন্যায় ভাবে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে...আমাদের বিষ প্রয়োগ করে দিন দিন দুর্বল করে দেয়া হচ্ছে...আমাদের পেটের অন্নকে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে...কিন্তু মজের ব্যাপার হচ্ছে যারা কল কাঠি নেড়ে এগুলা করছে তারাই আমাদের বিশ্ববাসির কাছে সন্ত্রাসী বা জলদস্যু সাজাচ্ছে। আমরা আজ তাই আর আমেরিকা, বৃটেন,রাশিয়া,কানাডা বা যেন কোন পরাশক্তির ভয়ে ভীত না...আমরা আমাদের ক্ষুধার্ত সন্তান,স্ত্রী বা পরিবারের সদস্যদের আর্তচিৎকার দেখে ঘর থেকে বের হই তারপর আমাদের যারা এমন ক্ষুধার্ত জাতিতে পরিণত করেছে তাদের জাহাজ কে আক্রমণ করি...যদি কিছু পাই তাহলে বেঁচে গেলাম কিছুদিনের জন্যে আর না পেলে আমাদের পরিবার আর আমাদের ফিরে পায় না। বব মার্লের গানের কথা খুব মনে পরে গেল...
‘বাফেলো সোলজার,ড্রেড লক রাস্তা,
ইট ওয়াজ এ বাফেলো সোলজার ইন দ্যা হার্ট অব আমেরিকা,
স্টোলেন ফ্রম আফ্রিকা, ব্রট টু আমেরিকা,
ফাইটিং অন এরাইভাল,ফাইটিং ফর সারভাইভাল,
আই মিন ইট ,হোয়েন আই এনালাইজ দ্যা স্ট্রেঞ্চ,
টু মি ইট মেক এ লট অব সেন্স,
হাউ ডিড ড্রেড লক রাস্তা ওয়াজ বাফেলো সোলজার।
আজকে আর না চাচা, সংবাদ আছে আমাদের জল সীমা দিয়ে আসছে কোন একটা জাহাজ...ওটাকে আটকাতে হবে...ঘরে খাবার নেই।আব্দুল্লাহ্ মনে হয় এজন্যেই ডাক দিছে।আর চাচা, এই গল্পের কোন শেষ নেই...আমাদের মাফ করে দিবেন।
এই লেখাটি ফেসবুক পেজ Gedu Cacar Khola Cithi (গেদু চাচার খোলা চিঠি) থেকে কপি করা View this link
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জুন, ২০১১ রাত ৮:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


