ছোটবেলায় যখনই কোন বিষয় নিয়ে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করতাম তখনই শুনতে হতো – ‘এইটা বড়দের বিষয়, এই ব্যপারে তুমি কথা বলতে পারোনা।’ হ্যালো, এইযে বড়রা, জি আপনাদেরই বলছি! আমি তো জানতাম যে বড়রা বুদ্ধিমান, জ্ঞ্যানী, বিজ্ঞ, তাঁরা অনুকরণীয়, বাস্তবিক অর্থে তারাই একদিন আমাদের আদর্শ হবে। কিন্তু, আপনারা আমাদের যে পথ দেখাচ্ছেন আর অন্য কেউ হলেও আমি অন্তত সে পথে হাটতে চাইনা। মাননীয় নেতারা আপনারা কিছু মনে করবেন না, আমার বাবা গ্রামের একজন সাধারন কৃষক। আমি কোনদিন ঢাকা শহর স্বচক্ষে দেখিনি কিন্তু, খুব ইচ্ছা ছিল উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার জন্য ঢাকা যাব। আমার হতদরিদ্র পিতা যথারীতি পরীক্ষা দেয়ার জন্য সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করলেন। অতি উৎসাহে তিনি প্রায়ই কেদে ফেলেন এই ভেবে যে অজ গ্রামের একজন দরিদ্র কৃষকের সন্তান হয়েও আমি জিপিএ ৫ পেয়েছি মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক দুই পরীক্ষাতেই। আমরা বাস এ চড়ে ঢাকা এসে দেখলাম অনাকাঙ্খিত রাজনৈতিক অস্থিরতার কারনে অনির্দিষ্টকালের জন্য ভর্তি পরীক্ষা পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। অস্রুসজল চোখে পিতা পুত্র দুইজনই গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়ার জন্য বাস কাউন্টার এ এসেছি ঠিক ঐ সময় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শুরু হলো প্রচন্ড গোলাগুলি। ছাত্র পুলিশ সম্মুখ যুদ্ধ। দৌড়িয়ে রাস্তা পার হবার সময় গুলিবিদ্ধ হলেন আমার বাবা।
অনেক কিছুই না বলা রয়ে গেল তাঁর। শুধু কথা বলল তাঁর অসম্ভব বিস্ময় ভরা চোখ। প্রচন্ড ক্লান্ত চোখগুলি যেন বলছিল- এই ছেলেপুলে গুলো যেই খাবার গুলো খেয়ে পিতার বুকে গুলি করার মত শক্তি যুগিয়েছে সেই খাবার গুলোর সত্যিকারের যোগান দেই আমি আর আমার মত লাখো কৃষক, কিন্তু এ কি সম্মান তাঁরা আমাকে দিল ?
পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে আমি কলমের বদলে হাতে নিলাম লাঙ্গল। নামকরা কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন স্বনামধন্য প্রফেসর নয় বরং আমার অভিভাবক হলেন স্বয়ং সৃষ্টীকর্তা। কোন মেধাবী ছাত্র নয় বরং আমার একমাত্র বন্ধু হলো আমার হালের বলদ গরুটি। আমার মা এবং একমাত্র বোন সংসার চালানোর তাগিদে বাড়িতে বাড়িতে ঝিয়ের কাজ নিলো। আর আমি প্রায়ই একা একাই স্বপ্ন দেখি কিন্তু, নিজেকে নিয়ে নয় আমার বয়সের সবাইকে নিয়ে। নিশ্চয় আমার বাবা কোনদিনই চাননি যে আমি এই অবস্থায় থাকি।
পাঠক, উপরের গল্পটি একান্তই আমার কল্পনা হলেও প্রেক্ষাপট কিন্তু বাস্তব।
এই যে নেতারা! আপনারা ক্ষমতায় যাবেন যান কিন্তু, আমাদের জীবন নিয়ে খেলা করছেন কেন? আপনাদের মধ্যে কি মনুষত্ব্যবোধ বলে কিছুই নেই? মানুষ পোড়ানো আপনাদের কাছে একটা অতি সাধারন ব্যপার হয়ে গেছে। খুব তো আপনারা অহিংশতাঁর নামে প্রতিনিয়ত বক্তৃতা কপচাচ্ছেন কিন্তু কোথায় সেই বোধ আপনাদের? আরে আপনারা যেই দেশ নিয়ে এত্তটা চিন্তিত সেই দেশকে যে আপনারাই রীতিমত রসাতলে নিচ্ছেন সে খেয়াল কি আপনাদের আছে?
আর যারা ছাত্র রাজনীতি করছেন তাদের বলতে চাই- শিক্ষাটা কি আপনারা উত্তরাধিকার সূত্রে নিয়ে এসেছেন যে যাকে ইচ্ছা যখন ইচ্ছা যতটুকু ইচ্ছা বিলি করবেন? আমরা আপনাদের মত মহান নেতা হতে চাইনা, নাম কা ওয়াস্তে তথাকথিত শহীদ হওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা আমাদের নেই। আর রাজনীতির নামে আপনারা যা করছেন তা নিয়ে কথা বলতেও আমরা ঘৃনাবোধ করি।
মনে রাখবেন আপনাদের বাবাও একজন কৃষক হতে পারে। কি আদর্শ রেখে যাচ্ছেন আপনারা আপনাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ? কিভাবে কলম ছেড়ে অস্ত্র ধরতে হবে নাকি কিভাবে নিজেকে ব্যক্তিত্যসম্পন্ন ভাবার জন্য মাদকের আশ্রয় নিতে হবে ? আর মেধা......হাহাহাহা! এই শব্দটির সাথে আপনারা পরিচিতই না কারন আপনাদের জন্য ভাইভা বোর্ডে অপেক্ষা করছে সমমনা এবং একই রাজনৈতিক আদর্শের কোন শিক্ষক। আপনারা বরুং এক কাজ করুন, দয়া করে নিজেদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে নিজেদের নাম সরিয়ে আমাদের একটু সূযোগ দিন। অর্থ, ক্ষমতা আর মাদকের জঘন্য দুনিয়া আপনাদের এতটাই আসক্ত করে রেখেছে যে আপনারা নিজেদের মত আমাদের সবাইকেই পশু মনে করেন। আর তাইতো, আপনারা প্রতিদিন লাশের মিছিলে সামিল হন।
লেখাটা অনেক বেশি বড় হয়ে যাচ্ছে হয়তো পাঠকেরা বিরক্ত হতে পারেন। আসলে, ছাত্র রাজনীতি নিয়ে আমার কোন ব্যক্তিগত আক্রোশ নেই। আমিও চাই ছাত্র রাজনীতি একটি চলমান প্রক্রিয়া হোক, কিন্তু তা শুধু রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকুক, স্বার্থনীতি না হোক।
এদেশের সকল রাজনৈতিক নেতা এবং ছাত্রদের জন্য একটি কথা বলতে চাই – আজ হয়তো আপনাদের হাতে অস্ত্র আছে, আপনারা লড়াই করছেন একটি বাংলাদেশে। কিন্তু, মনে রাখবেন আমরা অনেক সহ্য করেছি, সহ্যের বাধ ভাঙল বলে! একটি বাংলাদেশ আপনাদের মুখ বুজে সহ্য করছে কিন্তু এই দেশের ভেতর ১৬ কোটি বাংলাদেশ আপনাদের আর সহ্য করবেনা। রাজপথেই দেখা হবে আপনাদের সাথে। সেদিন দেখব আপনাদের অস্ত্রের জোর বেশি নাকি আমাদের সাহসের। আপনাদের জন্য অপেক্ষায় রইলাম।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




