আমি, আব্দুর রশিদ থানাদার, পিতা মরহুম আব্দুল গনী থানাদার, মা গুলেনুর থানাদার। জন্ম ১৯৩০ সালের ৩০ জুন; সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদারপাড়া গ্রামে আমার মাতুলালয়ে। জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে প্রবাসে। ফিরে যাবার আকাঙ্ক্ষা চিরকালই ছিল। তবে আজ জীবন সায়াহ্নে এসে অনেক কিছুই মনে পড়ে, অনেক কিছু করতে ইচ্ছে করে। যখন যা বলি , মনে করি; তা হারিয়ে যায়। তাই এই লেখার অবতারনা।
শৈশব খুব ভালো কেটেছে। খুবই ভালো কেটেছে। পিতামাতার দ্বিতীয় সন্তান এবং পুত্র সন্তান বলে সামাজিক বৈষয়িক সব দিক থেকেই মূল্যবান সন্তান হিসেবেই গণ্য করা হয়েছে।
আমার পিতা ১৯১৯ সনে অসহযোগ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়ে ইংরেজি পড়া বাদ দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেন মহাত্মা গান্ধীর ডাকে। ভুল ছিল, কি শুদ্ধ ছিল; বলতে পারব না, যা অবশ্য পরবর্তীতে ইতিহাস পূরণ করে দিয়েছে। আব্বা প্রথম জীবনে ইংরেজ সরকারের কোন কাজ করতে রাজি হন নাই। পরবর্তীতে ইংরেজি শেখার ব্যাপারে কোনোরকম আগ্রহও দেখান নাই। যা শেখা ছিল সেটাই পরিমার্জন করে কাজ চালিয়ে গেছেন বাকি জীবন। প্রথম জীবনে কাজ আরম্ভ করেন স্বদেশী লোকের প্রতিষ্ঠানে এবং সেটা ছিল নবাব মোশাররফ হোসেন সাহেবের চা-বাগানে। যেহেতু সেটা ইংরেজের চাকরি নয়। এগুলো আমার জন্মের অনেক আগের কথা।
আমার জন্মের অনেক পরের কথা; মনে পড়ে আমাদের গ্রামের বাড়ি দিঘিসরাতইল, বেলকুচি থানায়; তার কিছুটা স্মৃতি। আর তার চাইতে আরও একটু পরিষ্কার স্মৃতি হোল আব্বা আর মেঝ চাচা যখন গোয়ালপাড়া, আসামে থাকতেন। সেখানে নিজেদের ব্যাবসা আরম্ভ করেন। সে অনেক কাহিনী [কখনো সময় পেলে বলবো]। সেখানেই আমার প্রথম শিক্ষাজীবন আরম্ভ হয়। মনে পড়ে, খুবই ছোট ছিলাম, আমাকে মাদ্রাসায় পাঠানো হয়েছিল। একদিনের মাদ্রাসায় উপস্থিতি; যা ছিল আমার মাদ্রাসা শিক্ষা জীবনের প্রথম ও শেষ দিন। পাকা মাটিতে পাটি বিছিয়ে বসে, তার সামনে ছোট একটা টেবিল, সেটাই আছে আমার স্মৃতিতে ক্লাসরুমের বিবরণ। অন্যান্য ছাত্রদের লেখাপড়া না করার জন্য শারিরিক শাস্তির রূপটা দেখে আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার উপরে ভক্তিই চলে গেল। পরেরদিন আমি আর সে মাদ্রাসায় যাইনি। মা আমাকে জোর করেই পাঠাতে চেয়েছিলেন। আমি আমার মেঝ চাচীর কাছে তাঁর শাড়ির আঁচলে যেয়ে আশ্রয় নিলাম। এই ছিল আমার মাদ্রাসা জীবনের শেষ।
তারপরে আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতিহাস নেই অনেকদিন। যতদূর মনে পড়ে ১৯৩৮ সালে তখন আব্বার চাকুরি জীবনে অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। চা-বাগানে ১০ বছরেরও বেশী সময় চাকরি করেছিলেন। তারপরে সম্ভবত ডানকান ব্রাদার্সে হবে, চা-বাগানে চাকরি নিয়ে গেলেন। গ্রামের বাড়ি থেকে আমার নানা এবং আমার বড় চাচা নিয়ে গেলেন জলপাইগুড়ির বীরপাড়া বাগানে। আবছা মনে পড়ে দারজিলিং মেইল থেকে নেমে, জলপাইগুড়ি ষ্টেশন, সেখান থেকে তিস্তা নদী পার হয়ে বালুচরের মাঝ দিয়ে অনেকটা পায়ে হাটা পথ । বাকিটা কেমন যেন ঝাপসা; পরিষ্কার মনে নেই। তারপরে, বাগানে যখন পৌঁছলাম, বিরাট বিরাট সারি দেয়া বাড়ি। একটা বিরাট চত্বরের সামনে সব বাবুদের বাড়ী, বাঙালি যারা কাজ করতো ওখানে তাদের ও আবাসস্থল ছিল সারিদেয়া অনেকটা পুলিশ ব্যারাকের মতো। আমাদের বাড়ীটা ছিল মাঠের শেষ দিকে, ফ্যাক্টরির কাছাকাছি। ফ্যাক্টরিতে যেতে হলে সিঁড়ি বেয়ে যেতে হতো। ফ্যাক্টরিগুলো উচু দেয়াল ঘেরা আর কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে আলাদা করা ছিল।
বীরপাড়ায় পৌঁছলাম আমরা তিন ভাইবোন। আমি বড়, তারপরে আমার এক বোন, তারপরে আরেক বোন। দ্বিতীয় বোন খুবই ছোট। দেড় বছর দুই বছর বয়স হবে হয়তো। সেসময় তাকে খুবই সুন্দর লাগত। নাম রাখা হয়েছিলো বুলবুলি। সে এখনোবেঁচে আছে। মাঝে মাঝে মনে হতো আব্বা বুঝি শুধু মেয়েদের দিকেই বেশী পক্ষপাতিত্ব করেন। ঐ বয়সে আমার উপর অনেক দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিলো আমার ছোট বোন দুটিকে দেখে রাখার।
এখানে একটি কাহিনী আছে। এটা বলা হয়তো সমীচীন হবে। ২২ জন বাবুর মাঝে দুইজন ছিল মুসলমান। আর বাকি সকলেই ছিলেন ধর্মের দিক দিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের। এই দুই শ্রেণীর লোকের জীবনযাত্রা ছিল সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন। ধর্মীয় আচার আচরণে হিন্দুদের সম্পৃক্ততা ছিল। মুসলমানদের মদ্ধ্যে মাত্র আমার আব্বা আর জনাব মেসকাতুল ইসলাম, তার বাড়ি কুষ্টিয়ায়। উনি ছিলেন হেড ফ্যাক্টরি অ্যাসিস্ট্যান্ট আর আব্বা ছিলেন অ্যাসিস্ট্যান্ট ফ্যাক্টরি অ্যাসিস্ট্যান্ট। চা-বাগানের উৎপাদিত ফসলের এই দুইজনই ছিলেন বিশেষজ্ঞ। আর যে সব কাজ ছিল সেগুলো সবই ছিল হিন্দুদের হাতে। হেড ক্লার্ক ছিলেন তখন সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষ। তিনজন সাহেব ম্যানেজার ছিল। বাগানের প্রধান একজন, “বড় সাহেব” । মেঝ সাহেব ছিলেন বাগানের ইন-চার্জ। আর ছোট সাহেব ছিলেন ফ্যাক্টরির ইঞ্জিনিয়ার। এরাই বাগানটা চালাত। সব কিছুই চলত মনে হয় যেন যান্ত্রিকভাবে, নিয়মতান্ত্রিকভাবে। কোথাও কোন ত্রুটি চোখে পড়তো না।
চা-বাগানের শ্রমিক যারা তাদের বলা হতো কুলি। আহা কুলি; আজকের প্রেক্ষাপটে আমি তাদের বিচার করতে চাইনা। সেটা হয়তো নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। সেদিন এটাই ছিল স্বাভাবিক। কুলিদের পোশাক-আশাক, জীবনযাত্রা অত্যন্ত দারিদ্রের মধ্যে ছিল। কিন্তু সেটাকে তখন দারিদ্রতা মনে করা হতোনা, মনে করা হতো এটাই তাদের স্বাভাবিক জীবন। মা-বাবা, শিশু, এক কথায় যারা কর্মক্ষম তারা সবাই কাজ করতো। কুলিদের শিক্ষার কোন বন্দোবস্ত ছিলোনা। তাদের থাকার ঘর ছিল সবই ছনের ঘর। অবশ্য তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল যা সেই যুগে পাওয়া অসম্ভব ছিল সেটা চাবাগানগুলোতে ছিল। ঐ বাগানে অনেক বিহারের লোক ছিল শ্রমিক হিসাবে। তারা ছিল মুসলমান এবং শিয়া। এটা আজকে আমি বিচার করছি। তখন ওরা বছরে একবার তাজিয়া করতো। সেখানে হায় হোসেন, হায় হোসেন, মাতম করতো, লাঠিখেলা যুদ্ধ করতো। বাবুদের কোয়ার্টারের সামনে বিরাট বড় মাঠ ছিল সেই মাঠে ওরা এই উৎসব করতো; করতো বছরে একবার। হিন্দু ভদ্রলোক বাবুরা, যারা ছিলেন তাদের সন্তান-সন্ততি থাকতো বাগানে। দুএকজন হয়তো দেশের বাড়িতে লেখাপড়া করতো, বাকিরা সব বাগানেই থাকতো। আমরা যখন বাগানে গেলাম তখন আমাদের প্রথম প্রতিবেশী হল বাগানের ডাক্তারের বাড়ি। ডাক্তার কাকার বিধবা মা তাঁর সাথে থাকতেন। ঠাকুমাকে খুবই ভক্তি করতাম। যাতায়াত আরম্ভ হলো। সে সময় আব্বার যুবক বয়স। স্মৃতিতে যা মনে পড়ে আববা দেখতে সুদর্শন ছিলেন। ফর্সা রং। গান গাইতেন, তাস খেলতেন, বাহারি বার্মার চুরুট পান করতেন এবং কলকাতা থেকে তাঁর জন্য সুবাসিত তামাকও আসতো। এগুলো ফুরসি হুক্কায় খেতেন। তাস খেলাটাকে মা পছন্দ করতেন না মোটেই। তথাপি আমাদের বাড়িতেও মাঝে সাঝে তাস খেলায় বসতেন। তামাক এবং চুরুট খেতেন সবাই। ঐ হিন্দু ভদ্রলোকদের অনেকেই আসতেন, যারা তাস খেলায় অভ্যস্ত। এই ছিল জীবনযাত্রার নিয়ম যা আজ আমার স্মরণে আছে। ডাক্তার কাকুর মা আব্বাকে ডাকতেন “ গনূ “ বলে। একসময় শুনেছি উনি বলছেন, বাবা তোকে দেখে তো মনে হয় ব্রাহ্মণের ছেলে, কিন্তু তুই মোচলমান হলি কেমন করে? তখন সেটা বুঝতাম না। কি ব্যাবধান মুসলমানের আর ব্রাহ্মণ এ ।
বয়স যখন বাড়ল তখন ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম। এর মধ্যে একটা ব্যবধান ছিল হিন্দু আর মুসলমান। আমার জীবনের এই পর্যায়ে এসেই হিন্দু আর মুসলমান বলে কিছু তফাৎ আছে বুঝতে পারলাম। পরবর্তীকালে দেশের বাড়ি যখন এসেছি তখন দেখেছি আমাদের গ্রামেরই এক অংশে জেলেরা থাকে। মাছ ধরাই ছিল তাদের পেশা। মাছ ধরতো “খরা “ পেতে দিয়ে। আশা করি খরার মানেটা বুঝবেন। আষাঢ় শ্রাবণ মাসে খরা পেতে বসে থাকতো। বড় চাচার সাথে যখন বাজারে যেতাম, জেলেরা বলতো ও থানাদারের বেটা এই বড় মাছটা নিয়া যান। কোনদিন দেখিনি তারা কোন পয়সা চেয়েছে। এবং সেইভাবে দেখেছি গ্রামের বাড়িতে আষাঢ় শ্রাবণ মাসে, ভাদ্র মাসে যখন পাটের ফসল উঠত তখন জেলেপাড়া থেকে জেলেরা এসে শুকানো পাটের থেকে পাট নিয়ে যেত তাদের দড়ি, কাছি তৈরি করার জন্য। যার যেটা পছন্দ হতো নিয়ে যেত। কোনদিন আপত্তি করতে দেখিনি। আমার মনে হয়, গ্রামের যারা অবস্থাশালী লোক ছিলেন সবার বাড়ি থেকেই জেলে বাড়ির লোকেরা নিয়ে যেত। পাশের গ্রাম ছিল নামঃ “খামারউল্লা পাড়া” । সেটা ছিল ঘোষদের বসতি। দেখেছি ছোটবেলায় ঘোষরাও আসতো সকাল বেলা দই মাঠা বিক্রি করতে। সকালবেলা ওখানে একটা বাজার বসতো। সেখানেও গিয়েছি। বটগাছের নিচে বাজারের জায়গা ছিল। একটা কালিমন্দির ছিল সেখানে। বয়স যখন কম তখন দেখেছি কালি মন্দিরে কালি ঠাকরানের মূর্তিটা সম্পূর্ণই বস্ত্রহীন। ছিন্নমুণ্ডুর মালা গলায় পরানো। পরবর্তীকালে দেখলাম আবার যখন দেশে যাই, আগের মতো কিন্তু কালী কিন্তু সম্পূর্ণ উলঙ্গ নেই, কোমরে একটা সুতা দিয়ে কি যেন পাতা ঝুলিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে কালির নগ্ন যৌন অংগটা। এটাই আমার স্মৃতিতে মনে হতো বিবর্তন। কেন করা হোল? প্রশ্ন করিনি কোনদিন। দেখেছি যা তাই মনে আছে। খামারউল্লা পাড়া বাজারে এক শ্রেণীর লোক থাকতো তাদের বলতো পালকি বওয়া বেহারা। তারা ছিল শতভাগ বিহারের লোক ছিল। বিরাট বিরাট দেহের মানুষ। তারা পালকি এবং ডুলি বইত। একজনের যাত্রী, সেটা হল ডুলি, কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হতো। আর পালকিগুলো ছিল চার বেহারার, আঁট বেহারার। আগে থেকেই ঠিক করে রাখা হতো কোনদিন কোনটা লাগবে। বাড়ির মেয়েরা, মা, খালা, ফুপু এরা সব পালকি করে যাতায়াত করতেন। যখন একা আসতেন কখনো কখনো বা কেউ ডুলিতে করে আসতেন, । সবই আস্তে আস্তে এতো বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে।
আমার সত্যিকারের শিক্ষাজীবন আরম্ভ হোল আব্বা যখন বীরপাড়া চা-বাগান ছেড়ে অন্য এক কোম্পানির চাকরি করতে মুরতি টি এস্টেট এ গেলেন। সেটা ছিল জলপাইগুড়ি জেলায় মেটিলি থানার অধীনে। পরবর্তীকালে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালে বিরাট এক মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প হয় এখানে যার নাম হয় মুরতি ক্যাম্প। এখনো হয়তো অনেক মুক্তিযোদ্ধা বেঁচে আছেন যারা এই মুরতি ক্যাম্পে প্রশিক্ষন নিয়েছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে।
প্রথম পর্ব এ পর্যন্ত – চলবে –

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



