আমাদের সমাজের প্রধান সমস্যা ধর্মনিরপেক্ষতা বা গণতন্ত্রে নয়। বস্তু কিংবা প্রাণ এমন কোনো জিনিস নেই যার ধর্ম নেই। বরং এই দুই ধারণাকে যেভাবে ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করা হয় সমস্যা সেখানেই । ধর্মনিরপেক্ষতাকে দেখানো হয়েছে যেন এটি ধর্মের শত্রু যা মানুষকে বিশ্বাসহীন, ঈশ্বরহীন বা খোদাহীন বানাতে চায়। আর গণতন্ত্রকে সাজানো হয়েছে সুন্দর মুখোশ হিসেবে। এভাবে বোঝাপড়ার পরিবর্তে ভয়, আর চিন্তার পরিবর্তে প্রাধান্য পেয়েছে রাজনৈতিক মুখরোচক শ্লোগান।
রাজনৈতিক অর্থে ধর্মনিরপেক্ষতা কোনো ধর্মবিরোধী যুদ্ধ নয়। এটি শুধু ক্ষমতার লড়াইয়ে ধর্মকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করার দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু আমাদের সমাজে এটি ভয়ঙ্কর কল্পনা হিসেবে ধরা হয়। কারণ ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক উভয়েই এই বিভ্রান্তি থেকে সুবিধা পায়। ধর্মীয়রা তাদের ক্ষমতা হারানোর ভয় পায় আর পেশীশক্তিরা আইনশাসিত রাষ্ট্রে একচেটিয়া ক্ষমতা চর্চার সুযোগ বণ্চিত হওয়া এবং জবাবদিহিতার ভয় পায়।
ধর্মনিরপেক্ষতা মানে এই নয় যে তা ধর্মহীনতা। আবার এটাও নয় যে আমি অন্যের ধর্ম পালন করবো কিংবা অন্যে আমার ধর্ম পালন করবে। ধর্মনিরপেক্ষতার আসল রুপ হলো- সবাই সবার ধর্ম যেন স্বাধীন এবং ভয়হীনভাবে পালন করতে পারে। কিন্তু আমাদের সমাজে ধর্মনিরপেক্ষতা শত্রুতাপূর্ণ বক্তব্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে অথচ এটি বহুমাত্রিক ও বিভক্ত সমাজের জন্য কার্যকর সমাধান হতে পারে।
বাস্তবতার দিক থেকে দেখলে অ-ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বেশি ধর্মপ্রাণ নয়, বরং বেশি ভণ্ড। আর ভণ্ড বলেই পবিত্র কাবা শরীফের গিলাফ চলে গেছে বিকৃত মস্তিষ্ক যৌন নিপীড়ক এপিস্টনের ড্রইংরুমে -যেটা ভাবলেই অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। তারা ধর্মকে রক্ষা করার দাবি জানায়, কিন্তু ধর্মের পবিত্রতাকে ফাঁকা করে অন্যায় ও বিলাসের হাতিয়ার বানায়।
গণতন্ত্রও কম বিকৃত নয়। নানা দেশে গণতন্ত্রের নামে যা আমরা দেখি তা প্রকৃত গণতন্ত্র নয় বরং বংশ পরাম্পরায় এবং সময়ের ধারাবাহিকতায় পুনরাবৃত্ত রাজনৈতিক নাটক। এই নাটকের মাঝে লুকিয়ে থাকে সচেতনতা ছাড়া ভোট, ক্ষমতা ছাড়া সংসদ, জবাবদিহি ছাড়া সরকার। গণতন্ত্রকে আহ্বান করা হয় ঠিক তখনই যখন বৈধতার প্রয়োজন হয়। আর মানুষের অধিকার চাওয়া শুরু হলে তা দ্রুত দাফন করা হয়। ফলাফল: মানুষ ভোট দেয়, কিন্তু শাসন করে না। অংশগ্রহণ করে, কিন্তু কার্যত তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।
অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র যা শাসনের ভিত্তি হওয়া উচিত তা প্রায়শই অনুপস্থিত। কারণ এখানে এলিটরাই শুধু নির্বাচিত প্রতিনিধি হয়। ফলে প্রান্তিকরা কোনো কণ্ঠস্বর পায় না, নাগরিক সমাজ সীমাবদ্ধ, সংবাদমাধ্যম এবং বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় সবসময় শাসকের পদলেহনে ব্যস্ত। এমন বাস্তবতায় গণতন্ত্র মুক্তির মাধ্যম না হয়ে- হয়ে যায় প্রতারণার হাতিয়ার।
যে কোনো মানুষকে ধর্মবিশ্বাসে মাপা হলে তা রাষ্ট্র বৈষম্যের দ্বার খুলে দেয়। আর গণতন্ত্রকে অগ্রাহ্য করা রাষ্ট্রের অবাধ্যতা তৈরি করে। যখন বৈষম্য আর অবাধ্যতা একত্রিত হয় তখন দেশ আর দেশ নয় বরং হিংসা ও ভয়ঙ্কর ক্ষমতার সংঘর্ষের এক মাঠে পরিণত হয়। আর সচেতনহীন সমাজে কোনো নির্বাচন আসলে সে মাঠ আরো বেশি উত্তপ্ত হয়। ভোটার নামক মানুষ পরিণত হয় বিক্রয়যোগ্য পণ্যে।
আমাদের প্রয়োজন মানুষের পণ্য হওয়া থেকে বের হয়ে আসা। চিন্তাকে পরিশুদ্ধ করা এবং শূন্য বিপ্লবী স্লোগান পরিহার করা। আমাদের প্রয়োজন আমাদের বাস্তবতার সঙ্গে সৎ ও নির্ভীক মোকাবেলা। বহুত্ব কোনো সমস্যা নয় বরং তার অস্বীকার করাই সমস্যার মূল। ধর্ম ও কোনো বিপদ নয়। বিপদ হলো রাজনৈতিক স্বার্থে তা ব্যবহার করা হয়। আর তার চেয়ে বড় বিপদ হলো- যোগ্য নেতৃত্ব বাছাই করার ব্যর্থতা।
যথাযথ নির্বাচনের মাধ্যমে সঠিক নেতা যদি আমরা চয়েজ করতে পারি এবং -ধর্ম ও গণতন্ত্রকে যদি আমরা ইচ্ছাকৃত বিকৃতির বাইরে বুঝতে পারি তবেই আমাদের মুক্তি সম্ভব এবং জাতিকে বিভাজন ও ধ্বংস থেকে রক্ষা করার শেষ সুযোগ।
পড়ার জন্য অশেষ ধন্যবাদ।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৪:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




