ক্ষমতা মানুষকে বড় করে না বরং মানুষই ক্ষমতাকে বড় করে—এই সত্যটি কিছু মানুষের জীবনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শার্ল দ্য গল ছিলেন তেমনই এক মানুষ।
১৯৫৯ থেকে ১৯৬৯ দশটি দীর্ঘ বছর তিনি ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি ছিলেন। এলিসি প্রাসাদ ছিল তার কর্মস্থল, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসন। কিন্তু সেই আভিজাত্যের ভেতরেও তিনি ভুলে যাননি একটি মৌলিক সত্য। আর তা হলো- সরকারি সম্পদ মানে জনগণের সম্পদ। আর জনগণের সম্পদে ব্যক্তিগত অধিকার নেই।
এলিসি প্রাসাদে ব্যক্তিগত কোনো খরচে সরকারি অর্থ ব্যবহার করতে তিনি দিতেন না। তার স্ত্রী ইভোন দ্য গল সবসময় একটি ছোট নোটবই সঙ্গে রাখতেন। সেই নোটবইয়ে পরিবারের প্রতিটি খরচ—বিদ্যুৎ বিল, বাজার-সদাই, কাপড় ধোয়া, সাবান, এমনকি ক্ষুদ্রতম দৈনন্দিন জিনিসের ব্যয়ও সযত্নে লিখে রাখতেন। যেন প্রতিটি অর্থ শুধু টাকার হিসাব নয়, বিবেকেরও হিসাব।
প্রতি মাসে সেই হিসাব মিলিয়ে তিনি ফরাসি ট্রেজারিতে একটি চেক পাঠাতেন—ব্যক্তিগত খরচের সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করতে। একদিন এলিসির এক হিসাবরক্ষক বলেছিলেন- ম্যাডাম, এতটা করার প্রয়োজন নেই।
জবাবে তিনি শান্তভাবে বলেছিলেন, স্যার, যা কিছু সরকারি কাজ নয়, তার সবই আমাদের ব্যক্তিগত। আর ব্যক্তিগত খরচ আমাদেরই পরিশোধ করা উচিত। জনগণ কেন আমাদের ব্যক্তিগত খরচ পরিশোধ করবে।
কত সহজ কথা। অথচ কত গভীর।
ইতিহাসে এমন আরেকটি দৃশ্য আমরা পাই হযরত ওসমান (রাঃ)-এর জীবনীতে। একবার এক সাহাবি তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত বিষয়ে আলাপ করতে এলে তিনি বায়তুলমালের তেল দিয়ে জ্বালানো বাতি নিভিয়ে দেন এবং নিজের তেল দিয়ে অন্য বাতি জ্বালান। কারণ, রাষ্ট্রের সম্পদ ব্যক্তিগত আলাপে ব্যবহার করা তাঁর বিবেক মানতে পারেনি।
দুই ভিন্ন যুগ, ভিন্ন সংস্কৃতি। কিন্তু নৈতিকতার মানদণ্ড যেন এক।
শার্ল দ্য গলের সন্তান ও নাতি-নাতনিরাও ব্যক্তিগত কাজে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করতে পারতেন না। তিনি তার পদমর্যাদার সঙ্গে যুক্ত বহু সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। এলিসিতে থেকেও নিজের পারিবারিক বিল এমনকি সাবান ও খাবারের মতো সাধারণ খরচও নিজের পকেট থেকেই পরিশোধ করতেন।
অবাক করার মতো হলেও সত্য, তিনি রাষ্ট্রপতির বেতন গ্রহণ করতেও অস্বীকৃতি জানান। একজন সামরিক জেনারেল হিসেবে যে পেনশন পেতেন, সেটিতেই জীবনযাপন করতেন। যেন তিনি নিজেকে রাষ্ট্রের মালিক নয়, কেবল একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারী হিসেবেই দেখতেন।
মৃত্যুর সময় তিনি কোনো ব্যক্তিগত সম্পদ রেখে যাননি—শুধু এগ্লিজে অবস্থিত উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া পারিবারিক বাড়িটি ছাড়া। এমনও বলা হয়, যদি তিনি জানতে পারতেন যে ভুলবশত কোনো ব্যক্তিগত খরচ সরকারি তহবিল থেকে পরিশোধ হয়েছে, তবে তা ফেরত দেওয়ার জন্য সঙ্গে সঙ্গে সরকারের কাছে একটি চেক পাঠাতেন।
আজকের পৃথিবীতে যেখানে ক্ষমতা প্রায়শই ভোগের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে শার্ল দ্য গলের জীবন- হযরত ওসমান রাঃ এর জীবন এক নীরব প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—আমরা কি ক্ষমতাকে সেবা হিসেবে দেখি, নাকি সুবিধা হিসেবে?
রাষ্ট্রের সম্পদ মানে মানুষের রক্ত-ঘামে অর্জিত সম্পদ। যারা তা রক্ষা করে, তারাই প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্রনায়ক। দেশ সেবার অধিকার কেবল তাদেরই মানায়। আর যারা তা নিজের বলে ভোগ করে, তারা কেবল পদে আর ক্ষমতায় বড় হয়। কিন্তু চরিত্রে কিংবা বিবেকে নয়।
এই গল্প শুধু একজন রাষ্ট্রপতি কিংবা কোনো খলিফার নয়। বরং এটি জনতার প্রতি দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার এক বিবেক জাগানিয়া গল্প।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ২:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




