অধিকাংশ মানুষের নৈতিকতা আসলে নিছক ন্যায়–অন্যায়ের নিরপেক্ষ মানদণ্ডে গঠিত নয়। বরং তা প্রায়ই সৌন্দর্য, ক্ষমতা ও স্বার্থের সূক্ষ্ম সুতোয় বাঁধা থাকে। আমরা যা দেখি বা যাকে গুরুত্ব দিই, যার জন্য কাঁদি কিংবা নীরব থাকি—তার পেছনে অনেক সময় মানবিকতার চেয়ে স্বার্থের হিসাব-নিকাশই বড় হয়ে ওঠে।
কিছুদিন আগে টেকনাফের ছোট্ট মেয়ে আফনান আরাকান আর্মির গুলিতে আহত হয়ে বাইশ দিন জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে হার মানলো। একটি শিশুর এই করুণ প্রস্থান স্বাভাবিকভাবেই আমাদের বিবেককে কাঁপিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সংবাদটি তেমন ঢেউ তুুলে নি। কারণ ভুক্তভোগী কোনো এলিট পরিবারের সদস্য নয়। তার মৃত্যু রাজনৈতিক বিতর্কের উত্তাপ বাড়ায়নি, টেলিভিশনের টকশোকে উত্তেজিত করেনি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী ঝড় তোলেনি। শুধু একটি পরিবার শোকে ডুবে গেছে। আর আফনান নিঃশব্দেই মৃত্যুর এক পরিসংখ্যান হয়ে চির অন্ধকারে হারিয়ে গেছে। আমাদের সমষ্টিগত নীরবতা যেন বলে দেয়—সব মৃত্যু আসলে সমান নয়।
এদিকে বিজয়ী সাংসদদের সঙ্গে সেলফির প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। হাসিমুখে ক্যামেরাবন্দি হওয়ার এই আগ্রহের পেছনে থাকে অদৃশ্য কোনো প্রত্যাশা—ভবিষ্যতের সুবিধা, পরিচিতির জোর কিংবা ব্যক্তিগত লাভের সম্ভাবনা। যেখানে স্বার্থ আছে, সেখানে উপস্থিতি জোরালো। যেখানে নেই, সেখানেই নীরবতা।
আমাদের চরিত্রের দ্বৈততাও বিস্ময়কর। যে মানুষ তার বসের সামনে বিনয়ী ইঁদুরের মতো, সেই মানুষই হয়তো একজন রিকশাচালক বা গৃহকর্মীর সামনে সিংহের মতো গর্জে ওঠে। ক্ষমতার অবস্থান বদলালেই বদলে যায় আচরণের রঙ। মানবিকতা তখন আর অন্তরের গুণ থাকে না। হয়ে ওঠে পরিস্থিতিনির্ভর অভিনয়।
আবার অধিকাংশ মানুষ যখন দেখে একটি গাড়ি একটি তেলাপোকাকে পিষে দিয়েছে, তখন তারা প্রভাবিত হয় না। তারা তেলাপোকার প্রতি সহানুভূতিও অনুভব করে না। কিন্তু একটি রঙিন পাখি বা একটি বিড়াল গাড়ির নিচে চাপা পড়লে তারা অবশ্যই সহানুভূতি প্রকাশ করে।
এছাড়াও মানবমনের অদ্ভুত দিকগুলোর মধ্যে একটি হলো—আপনি হয়তো দেখবেন- কোমল হৃদয়ের এক নারী একটি ক্ষুধার্ত কুকুরের প্রতি দয়া দেখিয়ে তাকে এমন এক প্রাণীর মাংস খাওয়াচ্ছেন, যাকে হত্যা করা হয়েছে। সে কুকুরটির প্রতি সহানুভূতি দেখায়, কিন্তু নিহত প্রাণীটির প্রতি নয়।
আর এজন্যই হয়তো জার্মান দার্শনিক ফ্রিডরিখ নিটশে বলে গেছেন- শুধু নারী মন না বরং সমস্ত মানবমন অত্যন্ত জটিল এবং তাকে বোঝা হয়তো সমগ্র মহাবিশ্বকে বোঝার মতোই কঠিন।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৩:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




