সমস্যা এই নয় যে আমরা ভোট দিই না—সমস্যা হলো, আমরা ভোট দিই একটি অদৃশ্য খাঁচার ভেতরে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করি, আঙুলে কালি মাখি, মনে করি—আজ আমরা সার্বভৌম। অথচ সেই সার্বভৌমত্ব কাগজে লেখা একটি দিনের উৎসব মাত্র, যদি না কেউ মুক্ত কণ্ঠে, নির্ভীকভাবে ক্ষমতার কাঠামোকে প্রশ্ন করতে পারে। আমরা ভোট দিই, তারপর ঘরে ফিরে যাই। আর ক্ষমতা ফিরে যায় তার নীরব, সুরক্ষিত কক্ষগুলোতে—যেখানে আভিজাত্যের ঝলক বেশি কিন্তু জবাবদিহিতা কম।
আমরা চাই নতুন সরকার যেন এই জবাবদিহিতা এবং সুশাসন কায়েম করে।
সরকারের জবাবদিহিতা না থাকলে এটি কেবল অসম্পূর্ণ গণতন্ত্র নয়। বরং হয়ে ওঠে এমন এটি পরিচালিত গণতন্ত্র—যেখানে পরিবর্তনের সাইনবোর্ড টাঙানো হয়, কিন্তু ভবনের নকশা অপরিবর্তিত থাকে। ব্যালট বাক্স যেন এমন এক সিন্দুক না হয়, যা পাঁচ বছর পরপর একদিনের জন্য খোলে, তারপর আবার দীর্ঘ নীরবতায় বন্ধ হয়ে যায়। প্রকৃত গণতান্ত্রিক সরকারের বিজয় কেবল ভোটের ব্যবধানে মাপা যায় না। তা মাপা যায় মানুষের ভাগ্য-রেখায় কতখানি আলোর রেখা আঁকা হলো তার ভিতর দিয়ে।
সরকার যেন তার দেয়া প্রতিশ্রতি বাস্তবায়ন করে।
প্রকৃত গণতন্ত্র সংসদের সিঁড়ি বেয়ে ওঠার আগেই শুরু হয়—পরিবারে, শিক্ষালয়ে, নিজ দলের ভিতরে এবং প্রতিদিনের কথোপকথনে। যে শিশুকে অন্ধ আনুগত্য শেখানো হয়, প্রশ্নকে দমন করতে বলা হয়, ঘরের ভেতর ক্ষমতার পূজা দেখতে দেখতে বড় হতে হয় —সে কি ভোটের বয়সে হঠাৎ করে সমালোচনামূলক নাগরিক হয়ে উঠতে পারে? যে বিদ্যালয়ে আলোচনা নয়, মুখস্থ বিদ্যা পুরস্কৃত হয়- যেখানে মুক্ত চিন্তা উৎসাহ নয়, শাস্তি পায়—সেখানে নাগরিক নয়, প্রজা তৈরি হয়। ফলে আমরা নাগরিকত্বের মুখোশের আড়ালে প্রজাকে দেখি। নির্বাচিত প্রতিনিধির আড়ালে শাসককে দেখি।
সরকার যেন দেশে সুশিক্ষার পরিবেশ তৈরি করে- সচেতন নাগরিক গড়ে ওঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
গণতান্ত্রিক সংকটের শিকড় রাজনীতির আগে সংস্কৃতিতে, সংবিধানের আগে শিক্ষায়। কিন্তু সামাজিক সচেতনতা দুর্বল হলে সেই শিক্ষা ভেঙে পড়ে। নির্বাচন হয়, ব্যানার বদলায়, স্লোগান পাল্টায়—কিন্তু খেলার নিয়ম একই থাকে। আমরা চাই এমন বিজয়, যা কেবল মুখ বদলাবে না। এমন সরকার হবে যারা প্রান্তিক মানুষের মুখে সাহস তুলে দেবে—যার কণ্ঠ এতদিন ক্ষীণ ছিল, সে-ও যেন নিজের অধিকার চাইতে পারে নির্ভয়ে।
সরকার যেন দেশে সাম্যের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে।
টংয়ের দোকানে চা-পানের ছবি, শ্রমজীবী মানুষকে আলিঙ্গনের দৃশ্য—এসব তখনই সত্য হবে, যখন চাঁদাবাজি ও দখলদারির ভয় ছাড়াই মানুষ নিঃশ্বাস নিতে পারবে। আর উন্নয়নও যেন আণ্চলিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। ব্যক্তিপূজা, আঞ্চলিক বিভাজন—ঢাকাইয়া, বরিশাইল্যা, সিলটি, চাঁটগাইয়্যা—এই সংকীর্ণ পরিচয়গুলো যখন জাতীয় পরিচয়কে গ্রাস করে, তখন নাগরিকত্ব ক্ষয়ে যায়।
সরকার যেন সমস্ত আন্চলিকতার উর্ধ্বে ওঠে সব জাতি, সব বর্ণ, সব ধর্মের মানুষের জন্য একিভাবে কাজ করে।
প্রকৃত গণতন্ত্র কোনো নির্বাচনী ঘটনা নয়। এটি এক দীর্ঘ অনুশীলন—যা জনসচেতনতার পুনর্গঠন ঘটায়। এটি ভয়ের সংস্কৃতিকে ধীরে ধীরে ভেঙে জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তোলে। সবচেয়ে সৎ প্রশ্নটি হয়তো এই নয় যে গণতন্ত্র কেন ব্যর্থ হয়। বরং প্রশ্নটি হলো—আমরা কি সত্যিই তাকে আমাদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা হিসেবে চাই, নাকি কেবল স্লোগানের শব্দ হিসেবে ধারণ করি?
সরকার যেন কেবল মুখরোচক উন্নয়নের সরকার হিসাবেই গড়ে না ওঠে।
আর যদি তাই হয়- তবে স্বৈরতন্ত্রের চেয়েও ভয়াবহ সেই ব্যবস্থা, যেখানে আইনের পোশাক পরে স্বৈরতন্ত্র বেড়ে ওঠে। এখানে গণতন্ত্রকে বাতিল করা হয় না। বরং তার ভেতরের অর্থটুকু শূন্য করে দেওয়া হয়। ফলে উন্নয়নের যাত্রা শুরু হওয়ার আগেই গণতন্ত্রের চাকা পাংচার হয়ে যায়। আর এই পাংচারের নীরব কারিগর হয় চাটুকার শ্রেণি—যারা সত্যকে আড়াল করে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতাকে দেবতার আসনে বসায়। অতীত আমাদের এই শিক্ষা দিয়েছে। ভবিষ্যৎ যেন তার পুনরাবৃত্তি না হয়।
সরকার যেন চাটুকার শ্রেণী তৈরি না করে।
নবনির্বাচিত সরকার এই আশাগুলো যেন ধীরে ধীরে পুর্ণ করে। তা না হলে আমাদের নির্বাচন হবে শুধুই ক্ষমতা বদলের নির্বাচন আর গরীব দেশের দুঃখী মানুষের ঘামের উপর দাঁড়িয়ে ২,৯৫৬ কোটি বা প্রায় ২৯.৫৬ বিলিয়ন টাকার এক ব্যর্থ আয়োজন।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ২:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




