ধর্ম কোনো পেশা নয় এবং এটি পেশা হওয়ার উপযুক্তও নয়। ইসলামে “ধর্মীয় ব্যক্তি” নামে আলাদা কোনো চাকরিও নেই। আর আমরা যে উপাসনা পালন করি - তা যদি নিছক যান্ত্রিক, পুনরাবৃত্ত ও অনুভূতিহীনভাবে সম্পন্ন হয় তখন তা প্রকৃত অর্থে ধর্মের অংশ না হয়ে , আচার-অনুষ্ঠান হয়ে যায়।
ইসলামী পোশাক নামে ও নির্দিষ্ট কোনো পোশাক নেই। পায়জামা, পাগড়ি কিংবা দাড়ি—এসবই সামাজিক রীতি ও প্রথা যা মুসলমান, বৌদ্ধ, ইহুদি সবার মধ্যেই দেখা যায়। এমনকি ডিস্কো গায়ক ও হিপিদের দাড়ি অনেক সময় আরও লম্বা হয়। আর কারো নাম যদি মুহাম্মদ, আলী বা উসমানও হয় তবু কেবল নামের কারণে সে মুসলমান হয়ে যায় না।
পরিচয়পত্রে লেখা ধর্মও কেবল একটি শব্দ মাত্র। তসবিহ, বিড়বিড় করে জপ, গম্ভীর ভাব, দরবেশদের বেশভূষা এসব কখনও কখনও অভিনেতারাই তাদের চেয়েও দক্ষতার সঙ্গে অনুকরণ করে। পতাকা, ব্যানার, জেয়ারত, জেয়াফত এসবের আড়ালেও কখনও রাজনৈতিক কৌশল থাকে যার সঙ্গে ধর্মের প্রকৃত অর্থে কোনো সম্পর্ক নেই।
তাহলে ধর্ম কী?
ধর্ম হলো এমন এক অন্তর্গত বোধ যা শুধুমাত্র অদৃশ্যের প্রতি গভীর উপলব্ধি তৈরি করে এবং একমাত্র তার সন্তুষ্টি অর্জন করাকেই হৃদয়ে ধারণ করে। এটি এমন এক উপলব্ধি হৃদয়ে লালন করা যে-এমন এক গোপন, প্রজ্ঞাময়, সর্বশক্তিমান সত্তা আছেন- যিনি সবকিছু পরিচালনা করেন। এমন এক গভীর ও প্রভাবশালী অনুভূতি হৃদয়ে তৈরি করা যে এ জন্ম অর্থহীন নয়, এ জীবন বৃথা নয়, এ মৃত্যু ও কোনো সমাপ্তি নয়। এটা এমন এক অনুভুতি যে জালেম পৃথিবী থেকে রেহাই পেলেও স্রষ্টার কাছ থেকে রেহাই পাবেনা। গুনাহ বা অপরাধ গোটা পৃথিবীবাসীর কাছ থেকে গোপন করলেও রবের কাছ থেকে করা যাবেনা।
এই অনুভূতি তাকওয়া ও সংযমের জন্ম দেয়, আত্মসমালোচনায় উদ্বুদ্ধ করে, জীবনকে অর্থবহ করে তুলতে প্রেরণা দেয় এবং সেই মহান রাজাধিরাজের সাক্ষাতের প্রস্তুতি হিসাবে প্রতিটি মুহূর্তে নিজেকে আরও উৎকৃষ্ট রূপে গড়ে তুলতে উৎসাহিত করে। যেমন দৃষ্টিশক্তি এমন এক ক্ষমতা—চারপাশে সবাই অন্ধ হলেও দৃষ্টিমান ব্যক্তি দেখতে পারে। তেমনি অদৃশ্যের প্রতি অনুভূতি অন্যদের গাফিলতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। বরং কেয়ামতের দিনে সেটাই তার জন্য বাড়তি মর্যাদা হয়ে ওঠে।
ধর্ম কোনো বিগ্গাপন বা প্রদর্শনীও নয়। ধর্ম ও ধার্মিকতার মূল ভিত্তি হলো হৃদয়। হৃদয় কী নিয়ে ব্যস্ত- সেটা অনুধাবন করতে পারা। শুধু বাহ্যিক অবয়বে নয় বরং হৃদয়ের ভেতরের জিনিসের কারণেই একজন মানুষ প্রকৃত ধার্মিক হয়ে ওঠে। তার অনুভূতিতে হৃদয় তখন প্রতিটি ঘটনায় আল্লাহর কর্ম প্রত্যক্ষ করে—বৃষ্টি ও খরা, পরাজয় ও বিজয়, সুস্থতা ও অসুস্থতা, দারিদ্র্য ও সমৃদ্ধি, স্বস্তি ও সংকট—সবকিছুতে। এই বিশ্বাস ঈমানকে মজবুত করে। দাড়ি, জোব্বা, তাসবিহ , পাগড়ি এসব কিছুই ভালো যদি ঈমান ও হৃদিক বিশুদ্ধতা তার সাথে থাকে। আর ধর্মের কাজ হলো এই ঈমানী ভিত মজবুত করে সৎ কর্মের মাধ্যমে( প্রতি সৎ কর্মই ইবাদত) আল্লাহর দিকে এক বিশুদ্ধ আত্মার অবিরাম যাত্রাকে প্রতিনিয়ত জিন্দা করে রাখা।
প্রতিবছর এক মাস সিয়াম সাধনা আল্লাহর দিকে এই অবিরাম যাত্রার সবচেয়ে শ্রেষ্ট ও মহৎ প্রশিক্ষণ। তাই আমাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা উচিত এ যাত্রা যেন শুধু উপোসে, খাবারের মহোৎসবে, ইফতার পার্টিতে, ভোগে আর উপভোগে বিলীন না হয়।
আর এই অনুভূতি বুকে ধারণ করে নিজের ভিতর এবং বাহির দুটোকে বিশুদ্ধ করাই হলো ধর্ম - যা যে কোনো পেশা, চাকরি, পরিচয়পত্র, প্রতিষ্ঠান বা আনুষ্ঠানিক পোশাকের চেয়ে অনেক, অনেক বড়।
মহান রাব্বুল আলামীন তার সাথে মিলনের পথে আমাদের এই যাত্রাপথকে সহজ করে দিন। আমিন!!!
সবাইকে পবিত্র মাহে রমজানের শুভেচ্ছা। রমজানুল মোবারক।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




