
১।
মনে পড়ে যায় রুম নাম্বার ৩০৪।
কাঠফাটা চৈত্রের দুপূরে কোন খেয়ালে মন উদাস হতো !
জানিনা তোমার রান্না করা খিচুড়ির কারণেই;
নাকি বাগানবিলাসীর মোহে;
ছুটে যেতাম তোমার হোস্টেলে।
মনে পড়ে যায় পরমা গার্লস হোস্টেল-রুম নাম্বার ৩০৪;
কখনও চরিত্রহীন উপন্যাসের সাবিত্রীকে নিয়ে কথা হতো,
কিংবা কখনও বুদ্ধদেবের বাবলি অথবা ছুটি চরিত্রের মতো;
একটু উষ্ণতার জন্য তোমাকে দূরবীনের রেণু ভেবে,
মন উদাস হতো।
তোমার ভেজা চুলের শেষ সীমানায় কয়েক ফোঁটা জল কুড়িয়ে
নেবার ইচ্ছেটুকু পারিনি দমাতে।
এই ভোর, এই রাত্রি,
পদ্মপাতায় পাতা তোমার সংসার জল,
আর ভবঘুরে জীবন নিয়ে;
পথের ধূলোয় মিশে যাওয়া আমার পায়ের চিহ্ন,
ডুকরে উঠে আজও আমার মৌন দুপূরের অগোচরে।
তুমিও কি আমারই মতো করে;
ডায়েরীর পাতায় আজও সুখাদ্র রোদ স্নাত হও ?
২।
যদি কখনও স্বপ্নের অসুখে ভুগি;
ঘোর লাগা দুচোখে জোছনার মাদুলী বেঁধে তোমাকে চাইবো।
এসো তোমার আকাশে সূর্যরশ্মি দিয়ে করি আঁকাআঁকি,
মেলে ধরো পাপড়িগুলো,
শিশির সিক্ত মন নিয়ে তোমাতে স্বপ্ন কুঁড়াই;
ফিরে এসো সীমানার পাহারায় যুবকের বুকে দোআঁশ হয়ে,
সশস্ত্র সংগ্রামে; শূণ্যতায় উড়িয়ে দিয়ে রেশমী ওড়না।
বুড়ো মেহগনির বনে;
কত রাত লাশ হয়ে শুয়ে থেকেছি,
সঙ্গীহীন সমরে; এই বুঝি ভোর হয়ে এলো বলে !
৩।
একদিন আমিও অযত্নে অবহেলায় কালের সাক্ষী হয়ে রইবো;
অভিশপ্ত নগরীর ধ্বংসাবশেষ হয়ে,
হাজার বছর পরে ইতিহাসের পাতায় হয়ত আমাকে খুঁজে পাওয়া যাবে,
নতুবা এখানে কেউ কোনদিন আসবেনা,
ভবের হাটের এই রাসলীলা আর বসবেনা।
সময়ের সাথে সাথে সে আমিও অনেক আধুনিক হয়েছি,
অচল হয়ে পড়া কোন মুদ্রার মতো জীবন;
সেতো এখনমাত্র সময়ের দাবী,
শহরের এইসব উঁচু উঁচু দালানের কোলাহলে,
কখনওবা নাভিশ্বাস নিয়ে ছুটে চলা বাসের যাত্রী হয়ে;
আমিও আকাশ খুঁজে ফিরি,
মাঝে মাঝে রোদ এসে উঁকি দিয়ে যায়;
আমার শহরের এইসব কাঁচের দেয়ালে,
সূর্য আছে বলে কিছু একটা আকাশে;
আমি পাই টের,
এইত জীবন,
এইত সভ্যতা,
দাঁড়িয়ে থাকে পিরামিডের মতো করে,
আকাশের ওপারে আরও এক বিস্তৃত আকাশ আছে,
এভাবে বেঁচে থাকা হিমালয়ের শেষ হাসি নয়,
একদিন তাকেও অঝরে কাঁদতে হবে,
যাদুঘরে ঠাই পাবে,
আমার দেহের হাড়।
৪।
এখন আর আগের মতো কবিতা লিখে মন ভরে না,
টাকা থাকলেই সব হয়;
বাসের পেছনে, ফুটপাথের দেয়ালে, ল্যাম্পপোস্টে বাড়ে প্রচার প্রচারণা।
এখন আর আগের মতো কথা বলে মন ভরে না,
ইনবক্সের চ্যাটেই সব হয়;
সময়-অসময় সেলফি আপলোডেই নিউজ ফিডে বাড়ে লাইক বন্দনা।
কবিতা লিখে কি আর হবে বলো ?
তোমার পাশে দাঁড়িয়ে সেলফি তোলার মাঝেই এখন আনন্দ!
নেপচুন থেকে প্লুটো অথবা দূরের কোন ছায়াপথে;
মুক্তির দ্রাঘীমা মেপে চলা আকাশটাকে বড় বেশি আপন লাগে।
বিধবা মেঘের সাথে সহমরণে আমিও রোদ্রস্নাত হবো;
বসন্তের এই ক্লান্ত দুপুরে।
কত রঙ বেরঙের রেশমি চুড়ির টুকরি নিয়ে জমেছে ফুটপাথ;
আর আমার মানিব্যাগ স্বপ্ন শূণ্যতায় খাঁ খাঁ করে,
রাতের অন্ধকারে যে নারীর দেহে নির্মোহ বেদনারা ক্ষুধার স্বর্গ গড়ে,
তাকে নিয়ে নতুন করে কি আর কবিতা লিখবো ?
গুলীবিদ্ধ যুবকের স্ত্রীর অশ্রু সিক্ত চোখে আমি এক নির্লজ্জ গণতন্ত্র।
মেমফিস থেকে উঠে আসা দেবীরা ধোঁয়ার কুন্ডলী পাকিয়ে নৃত্য করে;
আমার গরম ভাতের হাঁড়িতে,
কবিতারা শব্দ খুঁজে ফিরে নোনা স্বাদের আশায়,
শুঁকনো মরিচ আর দু'টুকরো পেঁয়াজের দ্বৈরথে;
পূর্ণতা খুঁজে পায় বিবর্ণ পান্ডুলিপি।
অতঃপর আবারও আশাহত হই,
স্বপ্ন ভেঙে জেগে উঠে নিজেকে খুঁজে পাই সোস্যাল মিডিয়ায়;
মানবতা যখন ক্রসফায়ারে ডুকরে ওঠে,
আমার কার্সর তখনও নিউজ ফিডে খুঁজে ফিরে কোন রূপসী নারীর সেলফি,
আর আমার বিপ্লবী চেতনা সেখানে মন্তব্য করে;
একশন, একশন, ডায়রেক্ট একশন !!
৫।
গতকাল সারা রাত জেগে ছিলাম;
আজও জাগবো,
ঘুমের কাছ থেকে ছুটি নিয়েছি;
এক পেয়ালা নিদ্রা নাশকের মাদকতায়।
অন্ধকার মরুর পথ ধরে হেটে চলেছি,
আমার চুলেতে চন্দ্রালোকের বাতাস বয়ে যায়,
গুনে দেখো তন্দ্রানীলা,
কয়টি তারা মিলে শোষণের সমর সাঁজে ?
কাজল মেঘের আড়ালে তোমারও কি বৃষ্টি লুকিয়ে থাকে ?
বেনারসি আকাশটাকে আপন ভেবে,
প্রথম ভোরের অপেক্ষায় তন্দ্রানীলা তোমার কপালে;
রক্তের আবীরে চাঁদ জাগে,
দিনের যত খিস্তি খেঁউড়ের ফাঁকে দুঠোঁটে ধূপকাঠি জ্বলে থাকে,
অনন্ত বিকেলের নেশায় ধোঁয়াস্নাত আমি তার;
পুরুষ বেশ্যা এক,
লজ্জা বিকিয়ে লজ্জারই বেশাতি জোগাই!
বুড়ো শহরের আবর্জনায় এক শালিক দম্পতি সাবলেট এসেছে;
কুকুর আর কাকের অপার্থিব সংসার তাদের আপন করে নিয়েছে।
জানালার ওপাশে আকাশটা ক্রমাগত ছোট হয়ে আসছে,
বারান্দার টবে কিছু মাটিয়ে জমিয়ে রেখেছি,
সাদা গোলাপের কলম করব বলে;
জীবন তবু চলছে অগাধ,
আমাদের বর্জ্য অফুরান।
৬।
এইতো যাচ্ছি চলে,
হাজার কথার আড়ালে,
নৈসর্গের গহীন আঁধারে,
তুমি ভাল থেকো প্রিয় বন্ধু আমার।
সব মেঘ বৃষ্টি ঝরায় না,
সব ফুল সুবাস ছড়ায় না,
কিছু স্বপ্ন হারায় অকুল পাথারে,
আজ কোন ভাটিয়ালী গান নয় দোহাই তোমার।
এই যে নদী বয়ে চলে যায়;
আকাশের সাথে তার হয় না মিলন।
শালিকের ডানায় চড়ে বেলা বয়ে যায়;
বসন্তের গানে তার হয় না সাধন।
বুকের ভেতর থেকে আমাকে সরিয়ে দেখো;
হলুদ ঘাসের বন জেগে আছে রক্ত শূণ্যতায়,
ভরা পূর্ণিমায় রেখোনা তার চোখের অধিকার;
পাহাড়ের নীরবতা নিয়ে সব কথা জমে থাক,
জ্যোতি হয়ে তোমাতে-আমাতে।
৭।
এখন আমি দারুণ নগ্ন হতে শিখেছি,
বিবস্ত্র মানুষের উল্লাসে এসো তোমাকেও নগ্ন করে তুলি।
বড় বেশি লাজুক তুমি,
লজ্জার বেশাতি খুলে এসো;
জলজ সাঁতারে মাছেদের মতো বিবস্ত্র হই,
পাঙাশের মতো পিচ্ছিল শরীরটাকে ভূণা করে খেয়ে দেখো;
কেমন একটা বীভৎস স্বাদ যেন তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে !
মিহি সুতার বুনন ধরে টান দিতেই কামিজ ছিঁড়ে বের হয়ে আসে;
আগলে রাখা তোমার মানচিত্র,
নখের আঁচড়ে ক্ষত-বিক্ষত;
বৈশাখী খরতায় দোআঁশের মতো ফেটে হয় চৌচির !
চেয়ে দেখো, গলার ওড়নাটা কেমন করে হাওয়ায় উড়ছে !
কেমন করে তোমার দুচোখের নীল,
ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আকাশে-আকাশে !
৮।
দীর্ঘ এক যুগ !
ভাবতে পারো কতদিন পর তোমার সাথে দেখা হলো ?
আমি অনেক বদলে গেছি;
ঠিক যেন এই শহরের মতোই জঞ্জালে পূর্ণ আজকের এই আমি।
অথচ, তুমি ঠিক সেই আগের মতোই আছো।
একটুও বদলায়নি তোমার বসন্তের প্রকৃতি।
বিশ্বাস কর যদি এক যুগ আগে আমি টক-শোর কোন সেলিব্রেটি হোতাম,
তুমিও আমাকে নিয়ে স্বপ্ন বিলাসী হতে।
তোমার এখন গাড়ি-বাড়ি সব হয়েছে;
অথচ আমি সেই পথহারা পথিক আজও;
হেটে চলেছি অজানা পথের খোঁজে।
যে পথিক আমি হেটে-হেটে বিরামহীন;
যুগের সব ক্লান্তি ভাসিয়ে দিয়েছি নোনা জলে,
তাকে আর তুমি কী এয়ারকন্ডিশন গাড়িতে করে লিফট দেবে ?
তোমার গাড়িতে চড়ে নতুন করে স্বপ্ন বিলাসী হতে আমি চাই না,
কিছু হাহাকার আমারই থাক;
বুকের ভেতর স্বযতনে !
৯।
এই রাত এক অ-মানুষের মত করে জেগে রয়;
আকাশের সমতলে খুঁজে ফেরে প্রিয় শৈশব,
দখিনা বাতাসে ছড়িয়ে দিয়ে দীর্ঘশ্বাস;
সময়ের তটে বিলাপ করে কাঁদে,
যদি আবারও ফিরে পেতাম;
আহ্লাদে বাবাকে জড়িয়ে ধরার সেই দিনগুলো,
যদি আবারও ফিরে পেতাম;
মায়ের বুক ঘেঁষে ঘুমানোর সেই রাতগুলো।
ঘুমের অন্বেষণে দেহে ক্লান্তি জমেছে অনেক,
শিমুল তুলার বালিশে মাথা গুঁজে দিয়ে ঘুমাই আমি,
কতরাত পেড়িয়ে ভোর হয়,
তবু ! ঘুমের মাঝে শান্তি খুঁজে ফিরি,
খুঁজে ফিরি মায়ের সেই উষ্ণ নিঃশ্বাস,
এ কেমন নিয়তি ?
জানি সেই ঘুমের মোহ তাঁদেরও আছে,
অথচ ! নিয়তির অমানিশায়;
আমরা ঘুমিয়ে থাকি,
আমাদের ঘুমাতে হয় বলে !
১০।
মেঘের কণ্ঠে প্রশব আর্তনাদ শুনি,
জন্ম নিয়েই কাঁদবে আষাঢ় জানি,
বল, কি দিয়ে আমি দুঃখ উড়াই ?
কুকুরের গোঙানিতে রাত কাটে নিদারুণ অনিদ্রায়,
আমার ঘরেতে অশুভ এক ছায়া উঁকি দেয়,
আমি মৃত্যুর বিন্দু দিয়ে জীবনের ব্যাসার্ধ এঁকে দেখি,
সবটাই বৃত্তে বন্দী যাতনা আমার।
ধবল ভোরের ফোঁকরে এইসব রাতের ক্লান্তি নিয়ে,
বাঁদুরেরা সব নিয়ম করে ঘুমাতে যায়।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই জুন, ২০১৫ বিকাল ৪:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




