এই লেখাটা আমার এক অতিপ্রিয় ব্যক্তিকে নিয়ে | লেখাটা লেখার খুব প্রয়োজন মনে করলাম কারণ রজনিশের নামটা আজ এক কলঙ্কিত নাম | বহু লোক নানা স্বার্থে তার নাম কলঙ্কিত করেছিল | আমি তার ব্যাপারে কিছু জানি তাই সেটা শেয়ার করার চেষ্টা করছি | যেসব পাঠকেরা রজনিশের সেক্স গুরু চরিত্রের ব্যাপারে নিঃসন্দেহ তারা দয়া করে এই লেখা পড়বেন না | এটা শুধু সেইসব মুক্তমনা পাঠকদের জন্য যারা প্রকৃত সত্য জানতে চান |
রজনিশের জীবনের এইদিক সম্বন্ধে আমি দুটি বই থেকে জানতে পারি : মা প্রেম শুন্যর লেখা মাই ডায়মন্ড ডেস উইথ osho আর মা আনন্দ শীলা ( ওনার ব্যক্তিগত সচিব)র লেখা ডোন্ট জাস্ট কিল হিম | দুইজনেই ওনার শিষ্যা ছিলেন খুব ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ ছিল রজনিশের সঙ্গে |এই লেখায় ঐসব বইগুলি থেকে পাওয়া তথ্যই ব্যবহার করব |
সেক্স গুরু কলঙ্ক
এটাই রজনিশের বিশ্বব্যাপী পরিচয় আমেরিকার কল্যানে | রজনীশ আমেরিকার সমস্ত ঈশ্বরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেছিলেন | আমেরিকার এইসব ঈশ্বররা হলেন যথাক্রমে: অর্থ, খ্যাতি, নাম,যশ, বিলাস, বৈভব এবং যিশু খ্রিষ্ট | অদ্ভুত ব্যাপার যিশু এই সমস্ত ঈশ্বরদের সাথেই বাস করছেন যাদের তিনি নিজে ঘৃনা করেছেন | রজনীশই প্রথম আমেরিকাকে তথা বিশ্বকে ভাবতে শেখালেন যে সুখী হতে চাইলে এইসব বিলাসের কোনো প্রয়োজন নেই | এসব ছাড়াই সুখী হওয়া যায় |ওনার মতে সুখী হতে গেলে ধ্যানই প্রয়োজন আর কিছুই নয় | রজনিশের ৯৯ টা রোলস রয়েস গাড়ি তার শিষ্যদের সম্পত্তি ছিল যারা আসলে প্রভূত ধনী ছিল | রজনীশ নিজে কোনদিন এইসব বিলাসদ্রব্য নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবেননি | উনি এইসব বিলাসদ্রব্যকে খেলার সামগ্রী বলে মনে করতেন | এইখানেই আমেরিকার সাথে রজনিশের বিবাদ | এই বিবাদ পরে আরো গম্ভীর রূপ নেয় যখন তিনি খ্রিষ্টধর্মের ভন্ডামির স্বরূপ উন্মোচন করেন | এইসব কারণে আমেরিকা ভীষণ চটেছিল রজনিশের প্রতি | ওনাকে নিয়ে কুত্সা ও রটনা শুরু হতে থাকে, অনার একটা বই ছিল : সম্ভোগ থেকে সমাধি বলে যেখানে উনি সেক্স-এর সাথে ধ্যানের সাদৃশ্য নিয়ে আলোচনা করেছিলেন | ওই একটিমাত্র বইতে উনি সেক্স নিয়ে কথা বলেছিলেন | আর বাকি অজস্র বই ছিল তাতে উনি সেক্স নিয়ে কিছুই বলেননি | মার্কিন প্রচারমাধ্যম ওই একটি বইয়ের কদর্থ করে ওনার বিরুদ্ধে নিন্দা আর সমালোচনার ঝড় তোলে | ওনার সেক্স গুরু নামই হয়ে যায় | ইউরোপিয়ান প্রচারমাধ্যমও একই ধুয়ো তোলে |
আমি নিজে রজনিশের সবকটি বই দেখেছি | কিছু আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে | ওই একটিমাত্র বহু আলোচিত বই ছাড়া বাকিগুলির বিষয় হলো জেন্, বৌদ্ধ ধর্ম, তাও ধর্ম, সুফিবাদ, খ্রিস্ট ধর্ম, ইহুদি ধর্ম, ওনার মেডিটেশন ইত্যাদি | অর্থাৎ সেক্স ছাড়া সবকিছুই |
এইভাবে রজনিশের কুত্সা গাওয়ার পরে আমেরিকা রজনিশকে গ্রেপ্তার করে | যেসব ধারা তাঁর বিরুদ্ধে দেয়া হয় তার প্রায় সবকটাই ভুল প্রমাণিত হয় আদালতে | কিন্তু আমেরিকার মজা হলো রাষ্ট্র কখনো একটামাত্র লোকের কাছে পরাজিত হতে পারে না : এই ধারণা ওখানকার আইনব্যবস্থার মধ্যে আছে | এই ধারণার বলে ওনাকে আমেরিকা থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয় | মার্কিন দোসর ইউরোপ রজনিশকে প্রত্যাখ্যান করে | ইউরোপের প্রায় প্রতিটা দেশ রজনিশকে ঢুকতে দেয় নি | সব্বাই আমেরিকার পা চাটা কুত্তা | ভারতে রজনীশ আশ্রয় নেন | ভারতের টুকে পাস মিডিয়া রজনিশের বিরুদ্ধে আমেরিকার দাবিগুলির সত্যতা বিন্দুমাত্র যাচাই না করে, রজনিশের শিষ্যাদের ইন্টারভিউ না নিয়ে রজনিশের বিরুদ্ধে সেক্স গুরু কলঙ্ক চালু রাখে |
আমি মনে করি রজনীশ সেক্স গুরু ছিলেন না | ওনার সমস্ত বই পড়ে , মেডিটেশন করে আর বক্তৃতা শুনে আমার মনে হলো উনি সেক্স গুরু ছিলেন না | উনি ওনার এক শিষ্যা বিবেকের সাথে শুয়েছিলেন ও সেই শিষ্যা পরে আত্মহত্যা করে | তো সেটা ব্যক্তিগত ব্যাপার | অনেকে রজনিশের থেকে বহু উপকার পেয়েছিলেন | বহু ইউরোপিয়ান আর আমেরিকান শিষ্য ছিল ওনার যারা ওনার কাছ থেকে উপকৃত হয়েছিলেন | এই অধম লেখকও উপকৃত মানুষদের মধ্যে পড়ে | কি ধরনের উপকার জগত পেয়েছিল ওনার কাছ থেকে সেটা পরে বলছি |
রজনিশের দান :
রজনিশের মতে মন হচ্ছে মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু | মনই মানুষকে ভোগায় | মন কি ? রজনিশের মতে মন হচ্ছে বাসনা, কামনা, দুরূহ প্রহেলিকা, অতীত আর ভবিষ্যতের চিন্তা | আমি ছোট করে মন বলতে বাসনা কামনা বলছি | এই বাসনা আর কামনা হলো সর্বদা অন্যের মত হতে চেষ্টা করার ইচ্ছা | এর থেকে মুক্তির উপায় হচ্ছে নিজের মধ্যে ডুব দেয়া | নিজের মধ্যে যে মণিমুক্তা আছে তা খোঁজা | এই মন বা বাসনা কামনার কারণ হচ্ছে সামাজিক শিক্ষা | রজনীশ তাই তার ভক্তদেরকে সামাজিক শিক্ষার বাইরে নিজের বিচারবুদ্ধি দিয়ে চলতে বলেছেন | এই বাসনা আর কামনা মুক্ত অবস্থাই হলো নির্বাণ |
সমাজ সর্বদা মানুষকে এক ছাঁচে ঢালার চেষ্টা করছে | সে সর্বদা তার দৃষ্টিভঙ্গি , নিয়মনীতি জোর করে মানুষের উপর চাপিয়ে দিতে চায় | রজনীশ বলেন যে এই ধরনের জবরদস্তির ফল ভালো হয় না | এর থেকে মুক্তি পাওয়াই হলো নির্বাণ |
এই নির্বাণ পেতে হলে ধ্যান করতে হয় | রজনিশের মতে ধ্যান হলো কিছু সময় জগত আর সমাজ সংসারকে ভুলে থাকার কলা | যাতে করে আমরা জগত আর সমাজকে ভুলে নিজের মত থাকতে পারি তারই নাম হলো ধ্যান | তা যে কোনো কিছুই হতে পারে | যে কোনো সামান্য কাজই ধ্যান হতে পারে | রজনীশ পুঁথিগত শিক্ষার বিরোধিতা করেছিলেন | তিনি জীবনে কখনই কারো কাছ থেকে কিছু শেখেননি | তিনি যা কিছু নিজে অনুভব করেছেন তাই বলেছেন | তিনি যা কিছু করেছেন সবই নিজের ভেতর থেকে এসেছে | বাইরে থেকে নয় |
সংক্ষেপে এই হলো রজনিশের অবদান |
লেখকের মন্তব্য
রজনীশ ভুল না ঠিক এ বিচারের দায়িত্ব পাঠককেই দিলাম | আমি আমার মত ব্যক্ত করছি | আমার মতে রজনীশ ঠিক কারণ সমাজের সংস্কার বা শিক্ষা সবই পুরাতন | তা যুগের সাথে সবসময় পরিবর্তিত হয় না | এই জন্যই নতুনকে গ্রহণ করতে সমাজের এত অসুবিধা হয় | পৃথিবীজুড়ে বহু সামাজিক বৈষম্য আর বঞ্চনার এটাই কারণ | সমকামীদের সমাজ থেকে বিতাড়ন এবং নারী অধিকার হরণ ইত্যাদি যুগের সঙ্গে সমাজের তাল মিলাতে না পারারই উদাহরণ | রজনীশ আমাদের বর্তমানে বাঁচতে শিখিয়েছেন | অতীত আর ভবিষ্যতকে ভুলতে শিখিয়েছেন | এটাই প্রয়োজন | অতীতকে আঁকড়ে ধরে থাকলে মানুষ হয় মনোরোগী হয় নয়তবা সামাজিক অশান্তির শিকার হয় | ভবিষ্যতের চিন্তায় মানুষ দীর্ণ হয় কারণ ভবিষ্যত কেউ দেখেনি | এতে মানুষের জীবন নরক সমান হয়ে যায় | সুতরাং অতীত আর ভবিষ্যত ভুলে কেবল বর্তমানে বাঁচাটাই বুদ্ধিমানের কাজ |
রজনিশের মেডিটেশন গুলি মানুষের স্ট্রেস হরণ করার এক আশ্চর্য উপায় | ডায়নামিক, কুন্দলিনি, নটরাজ ইত্যাদি হলো রজনিশের মেডিটেশন | এইগুলি ব্যবহার করলে টেনসন দূর হয় | মানুষ ভালো থাকে |
পুনায় এই মহামানবের জীবনাবসান হয় |
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে ডিসেম্বর, ২০১৫ দুপুর ১:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





