somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বোধনের ডায়েরী - জেগে থাকা কিংবা পাখির জন্য নিরবতা

২০ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ বিকাল ৩:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ক’মাস ধরেই দেখছি পেচ্ছাবের রং হলুদ! ব্যাপারটা ভাল বুঝতে পারছি এজন্য যে, আমার ঘরে প্লাস্টিকের একটা মগ আছে, যেটা সময় মতো দুই উরুর সামনে তুলে ধরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি এবং ঘরের মধ্যেই রেখে দিই। এই তুলে ধরার ঘটনাটা দিনে দুই থেকে তিনবার ঘটলেও, রেখে দেয়ার ব্যাপারটা চলে কয়েকদিন পর্যন্ত। বেশি পানি খাই, ফলে বারবার টয়লেট যাবার ঝামেলা পোহাতে পারি না। পারি না আরও অনেক কিছুই, কিন্তু ‘এই’ না পারাটার জন্য বিশ টাকা দামের একটা মগই যখন যথেষ্ট, তখন কেন আর মাথা ব্যথা। আমি ছাড়া কে আর এসে থাকছে এ ঘরে যে আমাকে অত ভাবতে হবে? ফলে নির্ঝঞ্ঝাটেই ঘটে মগের তুলে ধরা ও রেখে দেয়া, এবং এই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি ও ক্রমশঃ নির্বিকার হয়ে উঠার ফলেই বুঝতে পারি যে, আমার পেচ্ছাবের রং হলুদ, যা প্রথম দু’একদিন হালকা রঙের থাকলেও পরের দিকে গাঢ় হয়, যা কখনও কখনও বেশ ভালভাবেই আমার মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। প্রথম দিকে ভেবেছিলাম ডাক্তারকে দু’তিনশ’ দিয়ে জেনে নিই, কিন্তু পরে মগের ভেতরে স্থির হয়ে থাকা কয়েকদিনের গাঢ় হলুদ রঙের প্রতি তীব্র ভাললাগা ও মায়া জন্মাতেই মনে হল, ‘থাক না, নিজের শরীর থেকে বের হওয়া রঙ, কেন বদলাব’?

কিন্তু, আমি বদলাতে না চাইলেও শরীর নিজে নিজেই বদলে ফেলে, এবং যেদিন মগের ভেতর হলুদের পরিবর্তে দেখি সাদা রঙ, সেদিন হতাশ হই! আশংকা হয়, তবে কি কাল থেকে কেউ আর আমাকে ডাক্তারের কথা শোনাবে না? দিন বা রাতের কোন না কোন সময় মা হঠাৎ ডুকরে উঠে আর কাঁদবে না? কিংবা তানিয়া, মাঝে মধ্যে প্রচন্ড রাগে বেপরোয়া হয়ে মাথার চুল মুঠো করে ধরে আপ্রাণ ঝাকুনি দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে গেলে, মাথাটা বুকের মধ্যে চেপে ধরে কি একনাগাড়ে ফোঁপাবে না? সাদা তরল ভর্তি মগটা সামনে নিয়ে বসে এসব ভাবি, আর ভাবনার মধ্যেই নিজেকে প্রশ্ন করতে থাকি, একটানা।

আমার কি উচিত বাইরে থেকে ঘুরে আসা? বেশি দূরে না হোক কাছে পিঠেই, এই যেমন পাবনা, রংপুর, কিংবা মহাস্থানগড়। নিদানপক্ষে, নাটোরের রাজবাড়ি অথবা রাজশাহীর জাদুঘর। তাও যদি না হয়, পদ্মার পাড়ও কি ঘুরে আসা যায় না কোনভাবে? যখন যে নাম মনে আসে তখন সেখানে যাবার জন্যই নিজেকে প্রশ্ন করি, আর মন সমস্ত অথর্বতা সমেত একভাবে মগের সাদা তরলে স্থির থাকতে থাকতে পৃথিবী ছেড়ে উঠে যায় মহাশূন্যে। চাঁদের মাটি কত করে বিঘে? মঙ্গলে পানির লিটার কত হতে পারে? বুধ থেকে প্লুটোতে যেতে ক’দিন লাগবে? শনির বলয়টা হটাৎ ভেঙে গেলে কিভাবে সেটা জোড়া লাগানো যাবে? ক’টা পারমাণবিক বোমা দিয়ে উড়িয়ে দেয়া যাবে এই মহাবিশ্ব? কিংবা একটা অত্যাধুনিক রকেটে চড়ে অজানা কোন গ্রহে পালালে আমাকে কি কেউ আর খুঁজে পাবে? এসব বহুবিধ প্রশ্ন থেকে কোন একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পেরে রাগ হয়, আর তখন সব প্রশ্ন ছেড়ে সামনে রাখা সাদা তরল হলুদ নয় কেন, এই প্রশ্নটা উত্তরহীন রেখে দেয়ার জন্য, মগটা মুখের কাছে তুলে ধরতে ইচ্ছে হয়, আর সেই ইচ্ছেটা ততক্ষণ পর্যন্ত ধুম মেরে বসে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না সাদা তরল হলুদ, গাঢ় হলুদে গিয়ে ঠেকে। না, পেচ্ছাব আমি পান করিনি, না নিজের না অন্যের। তবে অজান্তে ও উত্তেজনায় তানিয়া বা অন্যান্য কারও দু’একফোঁটা পেচ্ছাব পাকস্থলীতে গেলেও যেতে পারে, কারণ আমি দেখেছি, যৌনাঙ্গ ও জীভ কাছাকাছি হলে খুব কম মানুষই নির্ভুল ডায়েরী লিখতে পারে।

আমি জানি, আমি সুস্থ। তবুও আমাকে ওষুধ খেতে হয়। কী জন্য যে খেতে হয়, তা কেউ বলেনি, আর আমিও জানতে চাইনি, কারণ লক্ষ্য করেছি অন্তত ওষুধ খাবার সময় আমার চিন্তা-ভাবনা বদলে যায়, এবং আমি যে অসুস্থ -এমন ভাবনার মধ্যে কিছুক্ষণের জন্য হলেও ডুবে থাকা যায়। তখন, ওষুধ খেতেও ভাল লাগে, ফলে নিরাময় ব্যাপারটা শেষ অব্দি এড়িয়ে যেতে পারি না আর এবং এই না পারাটা আমাকে দীর্ঘকালীন অস্বস্তির দিকে ঠেলে দেয়। তখন আমার ঘুম আসে! স্বপ্ন দেখি, বেগুনী রঙের স্বপ্ন। বেগুনী রঙের সবকিছু। বেগুনী রঙের ছোট ছোট শিশু, বেগুনী রঙের আকাশে ঘুড়ি হয়ে উড়ছে আর তাদের বুকে বাঁধা বেগুনী রঙের সুতা, মাটির দিকে নেমে জড়িয়ে যাচ্ছে বেগুনী রঙের বাঁশঝাড়ে। হঠাৎ একটা কিছু একটা লাফ দিয়ে পড়ে সামনে!ঘুম ভেঙে যায়, বিছানায় উঠে বসি! অনেকক্ষণ চোখ খুলতে পারি না! খুললেও দেখতে পাই না কিছুই, কারণ চোখের ভেতরে তখনও পড়ে থাকে গাঢ় বেগুনী রঙ!

আজকাল অনেকেই আশেপাশে ফিসফাস করে। ওদের সব কথা শুনতে না পেলেও, অভিব্যক্তি দেখে স্পষ্ট বুঝতে পারি, ওরা আমাকে ভয় পাচ্ছে। এই ব্যাপারটা বুঝতে পারার পর থেকেই আমি রোজ কয়েকবার আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। দাঁড়িয়েই থাকি, একভাবে। এক সময় আয়নার ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির মুখ ছুঁয়ে দেখার জন্য হাত বাড়াই। আমার হাত ডুবে যায় আয়নার কাচে আর হাতের সাথে লেপ্টে যায় বেগুনী রঙের কোনো শিশুর মুখ। আমি হাত সরাতে পারি না। দাঁড়িয়েই থাকি। আয়না ক্রমশঃ আমাকে ভেতরের দিকে টানে, টানতে টানতে এক সময় সম্পূর্ণরূপে ভেতরে টেনে নেয়, আর তখন দেখি, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই বেগুনী রঙের শিশুটি, যে তার কচি হাত আমার মুখের দিকে বাড়িয়ে ধরেছে, অথচ কিছুতেই ছুঁতে পারছে না আমাকে। আমার অস্বস্তি হয় এবং অপরিসীম মায়াসহ নিজের মুখটা ওর কচি হাতের দিকে এগিয়ে আনার চেষ্টা করি, কিন্তু ব্যর্থ হই, কেন না আয়না আমাকে এমনভাবে জাপটে ধরে রাখে যে, আমার বিন্দুমাত্র নড়া-চড়ার ক্ষমতা থাকে না। আমার অসহায়, স্থবির মুখের দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শিশুটি একসময় প্রচন্ড শব্দে হেসে ওঠে আর আয়নার কাচ টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যায়!

এক সকালে দেখি বাড়ির সবাই ব্যস্ত। আমাকে কেউ কিছু বলছে না, কিন্তু আমি বুঝতে পারছি ওরা আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে আজ। মনে মনে বললাম, যাক না নিয়ে, তাতে কি, আমি তো এখনও মনে করতে পারি কেটু সিগারেটের প্যাকেটের কথা। প্লাস্টিকের স্ট্রর ভেতরে ভরা চারআনা দামের বিলেতি দুধের কথা। কিংবা সেই কাঠের বন্দুক ও সারাদিন ধরে বাবুই, শালিক শিকারের কথা কিংবা মুখ দিয়ে লাগাতার বেরিয়া আসা ঢিস্যিইয়া, ঢিস্যিইয়া শব্দের কথা। এমন কী মনে করতে পারি এও, ছোট ভাইটির জলে ডুবে যাবার কথা, এক পেট জল নিয়ে মাথাটা পানির নিচে রেখে জলের উপরে ফুটবলের মত ভেসে থাকা। অথবা সুফিয়ার কথা, যার সাথে কোন এক দুপুরে খড়ের গাদায় বানানো ঘরে ঘন্টা খানেকের জন্য পাতা সংসারের কথা, কিংবা কোন কোন সকালে গেরস্থের মঙ্গলের জন্য লাল সিঁদুরে মাখানো ছোট্ট মূর্তি নিয়ে গোয়াল ঘরের সামনে বসে জুগির কীর্তনের কথা। জুগি চাপা স্বরে একটানা কীর্তন করে, তারপর মূর্তির শরীর থেকে সিঁদুর নিয়ে গোয়ালের চালে ফোঁটা এঁকে দেয়, বিনিময়ে ধামা ভর্তি চাল বা গম নিয়ে রাখে চটের বস্তায়, আর আমি অপলক তাকিয়ে থাকি লাল দগদগে ঘাঁ-এর মত সিঁদুরে ডোবানো মূর্তিটার দিকে। কিসের যে মূর্তি সেটা আর তাকে দিয়ে কীভাবে গেরস্থের মঙ্গল হয়-এই প্রশ্ন থেকে বেরুবার আগেই জুগি যেমন করে এসেছিল, ঠিক তেমন করেই ভার কাঁধে চলে যায়। আমি দাঁড়িয়ে থাকি, দাঁড়িয়েই থাকি। এক সময় গোয়ালের চালে সদ্য এঁকে দেওয়া ফোঁটাগুলোর দিকে চোখ যায়। আচমকা গা গুলিয়ে ওঠে এবং পেট চেপে বসে পড়ি বাড়ির পাশের পেয়ারা গাছ তলায়। কেউ দেখে না, কেউ লক্ষ্য করে না, আর ওভাবেই সারা সকাল খালি পেটে ঘুরতে ঘুরতে এক সময় টের পাই,রাগ বাড়ছে এবং সেটা ক্রমশঃ বাড়তে বাড়তে আমাকে জাপটে ধরে প্রবল। অসহায় আমি ছটফট করি, অস্থির হয়ে ছুটে বেড়াই বিলের মধ্যে, পুকুর ধারে, বাঁশের ঝাড়ে কিংবা আম বাগানে। আমার মনে হয়, শীঘ্রই কান ফোঁড়ানো দরকার। মায়েরও হয়ত মনে হয়, মনে হয় দাদীরও। একদিন আবারও জুগি আসে, কীর্তন করে, মঙ্গল তীলক এঁকে ধামা ভরে গম নিয়ে যায়, আর রেখে যায় তার সিঁদুরে ল্যাপটানো মূর্তির ঘরের একটুকরো তার, যা দিয়ে সত্যি সত্যিই ঘটা করে আমার কান ফোঁড়ানো হয়।

ডাক্তার আমাকে দেখে, খুব ভাল করেই দেখে এবং প্রথম প্রশ্ন করে, বয়স কত? আমি চমকে উঠি, ডাক্তারের চোখের দিকে তাকাই, তানিয়া বা মা দু’জনকেই খুঁজি, অথচ ওরা আমাকে রেখে গেছে একা। যদিও কান ফোড়ানোর পর আমার রাগ সত্যি সত্যিই কমে গেছে, তবু যেটুকু রয়ে গেছে, তা দিয়েই ওদের দিকে ছুঁড়ে দিই ক্রোধ, কিন্তু আমার প্রকাশ ঠিকঠাক হয় না! ডাক্তার পুনরায় জিজ্ঞেস করে, বয়সের কথা। আমার মনে হল আমি জানি আমার বয়স কত, কিন্তু ত্রিশ বলতে যাবার আগেই মনে হল, সত্যিই কি আমার বয়স ত্রিশ? আমি কি সত্যিই জানি আমার বয়স কত? এই যে আমি মনে করছি আমার বয়স ত্রিশ, সেটা কি বাস্তবিক আমার বয়স, নাকি অন্য কারও বয়স এভাবে এতটা বছর নিজের বলে জেনে এসেছি। তাহলে আমার সত্যিকার বয়স কত? সাত কি, যখন ফুপু গলায় দড়ি দিল আর সকালে সবার আগে আমিই দেখলাম ল্যাংড়া আম গাছে ঝুলে থাকা জীবনের প্রথম মৃতদেহ, নগ্ন ও বিভৎস। কিংবা আট, শ্রীপুরের বিলে সাত সকালে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে আচমকা দাঁড়িয়ে পড়লাম শিলুর ক্ষত বিক্ষত কাদা-মাখা লাশের সামনে। দশও তো হতে পারে, জীবনে প্রথমবার যখন বিড়ির পরিবর্তে মিষ্টি কুমড়ার শুকনো ডালে আগুন ধরিয়ে জোরে টান দিয়ে খক খক কেশেছি। ছোট ভাইটা পানিতে ডুবেছিল যখন, তখন এগার, সুতরাং এগারোও হতে পারে। এভাবে বার,তের, চৌদ্দ, পনের - কোনটা বাদ দিই? আমার বয়স সত্যিই কত আমি বলতে পারি না দেখে ডাক্তার প্রসঙ্গ বদলায়।

ডাক্তার প্রশ্ন করতে থাকে আর আমি চুপচাপ দেখতে থাকি উনার মুখ। খুব চকচকে মুখ, অনেকটা বদি দাদার মত। মোটা মানুষ ছিল, সারাক্ষণ খালি গায়ে থাকতেন আর মুখের মধ্যে দাঁতে চিবিয়ে ধরে রাখতেন গামছার কোণা। তোতলিয়ে কথা বলতেন আর গোসল করতে নামলে মোষের মত চুপচাপ সারা শরীর ডুবিয়ে শুধু মাথাটা বের কর রাখতেন পানির উপরে ঘন্টার পর ঘন্টা। আমার কেন জানি উনাকে ভাল লাগত। সেই উনিও তো মারা গেলেন পনেরতে। সবাই গেল উনার লাশ দেখতে, কেবল আমি গেলাম না। মাঝরাত পর্যন্ত নারী-পুরুষের কান্না আমাকে অতিষ্ট করে রাখল আর আমার নিজের ঘরের মধ্যে বসে বসে নিজের ক্রোধ সহ্য করতে না পেরে জুগির তার ছাড়াই লেপ সেলাইয়ের সুঁই দিয়ে ফুঁড়িয়ে দিলাম আরেক কান।

কতক্ষণ হয়ে গেছে জানি না। হঠাৎ খেয়াল হতে দেখি পাশে মা ও তানিয়া দু’পাশে দাঁড়িয়ে,আর ডাক্তার আমার কাঁধ ধরে ঝাঁকি দিয়ে চলেছেন। ওদের সবার মুখেই এক ধরনের আতংক। আমার হাসি পেল এবং হেসেও দিলাম। তারপর মাকে বললাম, ‘মা ডাক্তার আমাকে জিজ্ঞেস করল, আমার বয়স কত, তুমি কি জানো আমার বয়স কত’? মা এতক্ষণ দূরে ছিল। প্রথমে তানিয়া এগিয়ে আসে, তারপর মা। ওরা আমাকে ধরে, মা ডাক্তারের চেম্বারেই আচঁলে মুখ ঢেকে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে আর তানিয়া থমথমে মুখে আমার শরীর ঘেষে দাঁড়িয়ে হাত ধরে বলে, ‘চলো বাড়ি যাই’। ওর বলা শব্দ তিনটি আমাকে ভীষণ আরাম দেয়। খুব ঠান্ডা বাতাস ছুঁয়ে যায় শরীর। একটা অনাবিল সন্ধ্যা আচমকা ঢুকে পড়ে বয়সে, মনে পড়ে, তানিয়ার নিঃশ্বাসের ঘ্রাণ, ঠোঁটের উষ্ণতা, বাতাসে উড়তে থাকা চুল। তবে কি আমার বয়স পচিশ? এই প্রশ্নটা নতুন করে অস্থির করে। তানিয়া আমার পাশাপাশি চলতে থাকলেও, আমি ওর থেকে একটু একটু করে সরে যেতে যেতে একসময় গিয়ে দাঁড়াই সেই নদীটার ধারে, যেটা রোজ আমার সাথে সাথে স্কুল যেত, ক্লাস করত এবং আমার সাথেই ফিরে আসত বাড়িতে। আমি তাকে ভালবাসতাম, ওর সাথে আমার কথা হত আর মাঝে মধ্যেই সে আমাকে দেখিয়ে বলত, ‘ঐ যে দেখছো এতসব টাংনা, দেখো, মানুষ কীভাবে প্রলোভনের ফাঁদ পাতে’? আমি দেখতাম, বড়শি পিঠে টাংনায় ঝুলে থাকা সেই সব মাছের ছটফটানি। আমি খুব সহজেই প্রলোভনের টোপ হওয়া সেসব মাছের যন্ত্রণার সাথে একাত্ম হতে পারতাম, কেননা তাদের মতো আমিও অনুভব করতাম, দিন অথবা রাতের কোন না কোন মুহূর্তে কিছু একটা আচমকা গ্রাস করবে!

একেক সময় মা সামনে আসে না। তানিয়া আমার সাথে কথা বলে না। হয়ত ওদের ধারণা আমি ইচ্ছে করেই এসব করি। আমার হাসি পায় ওদের বোকামো দেখে, কারণ ওরা তো জানে না আমি কতবার ওদের খাবারে বিষ মিশিয়েছি। রোজ রাতে ওরা ঘুমিয়ে গেলে আমি ওদের খাবারে বিষ মিশিয়ে রেখে আসি আর সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করি কখন ওরা ঘুম থেকে উঠবে, বিষাক্ত খাবারগুলো খেয়ে মারা যাবে। অথচ কখনই ওরা মরে না দেখে আমার নিজের প্রতি বিরক্তি আসে আর তখন নিজের খাবারেই যথেচ্ছ পরিমাণে বিষ মিশিয়ে খাই এবং শেষ অব্দি নিজেও মরছি না দেখে হেসে উঠি, জোরে!ওরা এসব কিছুই জানে না, শুধু আমার হাসির শব্দ শোনো আর কখনও কখনও সহ্য করতে না পেরে তানিয়া ছুটে এসে আমার উপর তার সব ক্রোধ ঢেলে দেয়। মা হয়ত কাঁদে,এবং আশাহীনতা কিংবা আশার মাঝেই নিজেকে বোঝায়। এমন সময় আমার প্রবল ঘুম পায়, চোখ-মাথা-শরীর জুড়ে ঘুম আসে। সমগ্র পৃথিবীর ঘুম। আমি ঘুমিয়ে পড়ি আর ঘুমের মধ্যেই দেখি বেগুনী রঙের এক বালক সারা বিকেল ঘুড়ি উড়িয়ে সন্ধ্যার সময় মনের আনন্দে ঘরে ফিরছে। তার হাতে বেগুনী রঙের ঘুড়ি, ঘুড়ির বেগুনী লেজ তখনও ইতস্তত উড়ছে একটু আধটু হাওয়া পেয়ে। বালকটি আপমনেই ফিরছে ঘরে। সারা বিকেল ঘুড়ি উড়ানোর আনন্দে বিভোর ছিল বলেই সে হয়ত খেয়াল করেনি, যে এই ভর সন্ধ্যায় সে বাঁশঝাড়ের কাছে চলে এসেছে এবং কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই একটা রাক্ষস আমচকা বাঁশঝাড় থেকে বেরিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়ায় আর মুখ চেপে ধরে বাঁশঝাড়ের ভেতরে নিয়ে যায়।

হাতের চামড়া উঠে যাচ্ছে। কতদিন ধরে উঠছে মনে নেই। উঠে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। হয়ত সপ্তাহ ধরে, কিংবা বছর ধরে, অথবা অনন্ত কাল ধরে। উঠছে তো উঠছেই, থামার আর নাম নেই। আমি হাতের দিকে মাঝে মাঝেই একভাবে তাকিয়ে থাকি। পরতের পর পরত চামড়ার উঠে যাওয়া নির্বিকার ভাবে দেখতে দেখতে ভাবি, ‘এই বুঝি, এই বেরিয়ে পড়বে হাড় আর টকটকে লাল তরলে ভেসে যাবে শরীর, ঘর-দোর। অথচ একেক পরত চামড়া উঠতে না উঠতেই নতুন আরেক পরত চামড়া সেখানে গজিয়ে যায়। কীভাবে গজায় বুঝতে পারি না, শুধু দেখি উঠে আসা চামড়ার নীচে আরেকটা চামড়া, তার নীচে আরও একটা, এভাবে একটার নীচে আরেকটা, তার নীচে আরেকটা, অজুত-লক্ষ চামড়ার স্তর আমাকে আমূল ঢেকে রাখে। ঢেকে রাখে আমার হাড়-মাংস, রক্ত-পূঁজ, এমন কী রোগ-শোক, দুঃখ-কষ্ট-জরা। অথচ আমি অপেক্ষা করি, চামড়ার পরত এভাবে উঠতে উঠতে একসময় বেরিয়ে পড়বে সব এবং সবকিছুই, আর আমি নেড়ে-চেড়ে দেখব তারা কীভাবে দিনের পর দিন, বছরের পর নিশ্চিন্তে বাস করছে আমার ভেতর, এভাবে। আমার অপেক্ষা ক্রমশঃ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে আর অস্থির হয়ে কখন কখনও নিজেই খুবলে খুবলে তুলতে থাকি চামড়া। এক ধরনের ভাললাগা কাজ করে যায় আর তোলার গতি বাড়তে থাকে। বাড়তে বাড়তে একসময় খেয়াল করি শুধু হাত নয়, কখন যেন সমস্ত শরীর থেকেই চামড়ার সাথে সাথে মাংসও তুলতে শুরু করেছি, আর চারপাশ, মেঝে, বিছানা, বালিশ, টেবিল-চেয়ার, জামা-কপড় সবখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে আমারই খুবলে তোলা বিভিন্ন আকারের টুকরো। খুব মনোযোগ সহকারে সেইসব টুকরোগুলো দেখতে দেখতে তাজ্জব হই, কোথাও এক ফোঁটা রক্ত নেই। হঠাৎ একটা কাঠঠোকরা ডানার শব্দসহ কোথা থেকে উড়ে এসে বসে মাথার উপরে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে কি যেন দেখে নেয়, তারপর ওর শক্ত ও লম্বা ঠোঁট দিয়ে মাথার মাঝখানে নিশ্চিন্ত মনে গর্ত করতে শুরু করে। এক সময় সে আমার করোটি ফুটো করে ফেলে, তখন কেন জানি আরাম বোধ হয় এবং এই ভাবনায় দু’চোখে ঘুম নামে, ‘এতদিনে তবে কোনো পাখি বাস করবে মাথার ভেতরে’!
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ বিকাল ৩:৩৭
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ডায়েরী- ১৯৭

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৪



শরতের সকাল! সকাল ৮ টা।
ভাদ্র মাস। ইংরেজি সেপ্টেম্বর মাস। ২০২৬ সাল। ঘটনাটা কি হয়েছে, আমি বলি। মোটামোটি ভয়াবহ ঘটনা বলা যেতে পারে! যে কোনো সময় রোদ উঠবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশে বর্তমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট: দায় কার?

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:০৭


সংক্ষিপ্ত রায় সবচেয়ে বড় দায় বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নীতির। এর মধ্যে ২০০৯–২০২৪ সময়কালের সরকারের সিদ্ধান্তগুলোর দায় তুলনামূলকভাবে বেশি, কারণ ওই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো হলেও... ...বাকিটুকু পড়ুন

যাপিত জীবন.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৭


১।মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশে জুম্মার নামাজ পড়ার সুযোগ হয়েছে। ১২.৫০ এ আজান তারপর ১.১৫ দিকে জুম্মার নামাজের সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ। আজানের কিছুক্ষণ পর খুতবা শুরু তারপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

মঞ্জুর চৌধুরর ছোট গল্প "একাউন্ট্যান্ট"

লিখেছেন মঞ্জুর চৌধুরী, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:৪০

একাউন্ট্যান্ট

মঞ্জুর চৌধুরী


রফিকুল ইসলামের জীবনে সবচেয়ে বিলাসী জিনিসটি ছিল একটি কাঠের আলমারি।

আলমারিটা নতুন নয়। মিরপুর এগারোর যে দুই কামরার বাসায় সে আর শায়লা থাকত, তাদের বিয়েরও আগে থেকে বাড়িওয়ালার স্টোররুমে... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫ই আগস্ট বিদ্যুৎও কি দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেল ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:১৪


শিরোনামটা একটু অদ্ভুত মনে হতে পারে। তবে কিছুদিন ধরে বিদ্যুতের দাম, ভর্তুকি আর লোডশেডিং নিয়ে যেভাবে আলোচনা হচ্ছে, তাতে প্রশ্নটা একেবারে অযৌক্তিক নয়। কারণ সরকার বদলেছে, কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×