বর্তমানে আমাদের দেশে চলমান রাজনীতিক সহিংসতা জাতীয় সংকটের রূপ নিয়েছে। এ সংকটটি নিরসনে কূটনীতিক তৎপরতাও জোরে সোরে শুরু হয়েছে। এ সংকটটি আমাদের দেশের সার্বভৌমত্বের উপরে কোনো ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে কি না, এ নিয়ে কথা বলার জন্য সম্পাদক সাহেব আমাকে ডেকেছিলেন। আমি আমার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলেছি যে, ‘এভাবেই শুরু হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধও এভাবেই শুরু হয়েছিল। ইরাক যুদ্ধও এভাবেই শুরু হয়েছিল।’ সম্পাদক সাহেব আমার পুরো কথা শুনে বিষয়টি পত্রিকায় দিতে বললে। আমি এ ছোট্ট লেখায় যা কিছু লিখেছি তা আমার ব্যক্তিগত মত, বিশেষজ্ঞদের পাঠযোগ্য কি না বলতে পারছি না।
অভিজিৎ হত্যার পর থেকেই আমার মনে কেবল কু ডাকছে। যারা এই কুকর্মটি করল তারা কি জানে যে তারা এই জাতির কতবড় সর্বনাশের পথ উন্মুক্ত দিয়েছে? শুধু মনে হয়েছে, এই ছিদ্র হলো, এটা দিয়েই সুঁইটা ঢুকে পড়বে, আর কয়েক মাস বা কয়েক বছর পরে ফাল হয়ে বেরোবে। সুঁইটা হলো পশ্চিমা পরাশক্তির হস্তক্ষেপ। পশ্চিমা, এশিয়া, পার্শ্ববর্তী পরাশক্তিগুলো তাদের রাষ্ট্রদূতবর্গের মাধ্যমে গত দু মাসে অনেকবার বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকারকে সহযোগিতা করার প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু সরকার সে প্রস্তাব গ্রহণ করেন নি। কখনো সবিনয়ে, কখনো বা রূঢ়ভাবে তাদেরকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। তারা গম্ভীর মুখে ফিরে গেছেন। সরকারের আন্তরিক চাওয়া পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর সহায়তা ছাড়া নিজেরাই চলমান সমস্যার সমাধান করতে। তবে ভারত (তথা রাশিয়া) সম্পর্কে সরকারের মনোভাব অতটা কঠোর নয়, মমতা ব্যানার্জির সফরে তা সুস্পষ্ট হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের অভিমত কি? বাংলাদেশের মানুষের তো কথা বলার অধিকার আছে কিন্তু তাদের কথা শোনার কেউ নেই, শুনলেও সেটা মানতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। একে নাকি বাকস্বাধীনতা বলে। মানুষ ভোট দিয়েছে অথবা দেয় নি, কিন্তু তাদের গলায় বাঁধা রশি ঐ ভোট বাক্স পর্যন্তই যায়, এর বেশি যায় না। তথাপি বাংলাদেশের মানুষ বহুভাবে জানিয়েছে যে, তারা বিদেশি হস্তক্ষেপ চায় না। চ্যানেল-৭১ এ প্রচারিত এ বিষয়ের উপর একটি গোলটেবিল বৈঠকে সাধারণ মানুষ ফোন করে এই অভিমতই ব্যক্ত করেছেন। কারণ বিদেশি হস্তক্ষেপের বিষয়ে তাদের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা অতিশয় মন্দ। তবে তারা বাঁচতে চায়, কিন্তু কীভাবে তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব সরকারের উপরই ন্যস্ত করে সজল চক্ষে সরকার বাহাদুরের দিকেই তাকিয়ে আছে।
কিন্তু বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট গোড়া থেকেই বিদেশিদের ডাকছে মধ্যস্থতা করে সরকারের কাছ থেকে তাদের হিস্যাটা আদায় করে দেওয়ার জন্য। (দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন ৯ মার্চ ’১৫ এর পত্রিকার শিরোনামই করেছে ‘বিএনপির ভরসা বিদেশিরা’)। সরকার থেকে বারংবার প্রত্যাখ্যাত হয়ে ক্ষুব্ধ কূটনীতিকরা খালেদা জিয়ার কাছে কদর পাচ্ছেন, তাই তারা বার বার তার সঙ্গে বসছেন, মতবিনিময় করছেন। এদিকে প্রধানমন্ত্রীও অবেশেষে কূটনীতিকদের ডেকে সন্ত্রাসী হামলার উপরে ডকুমেন্টারি দেখাচ্ছেন, খালেদা জিয়াও দেখাচ্ছেন। পদ্মা সেতু নিয়ে মনোমালিন্য হয়ে সরকারের কেবলা পরিবর্তিত হয়ে রাশিয়া ও ভারতের দিকে ঘুরে গেছে কয়েক বছর আগেই। তারপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী, পশ্চিমাবিরোধী অনেক টক-ঝাল কথা সরকারি দলের নেতাকর্মীরা প্রকাশে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন যে, “অনেকেই মনে করেন একটা দেশ পাশে না থাকলে আমরা শেষ হয়ে যাবো। এ চিন্তা পরিহার করতে হবে।” ড্যান মজিনা হচ্ছেন ঢাকায় একমাত্র মার্কিন রাষ্ট্রদূত যিনি এ দেশের সব ক’টি জেলা, এমনকি শতাধিক উপজেলা ঘুরে দেখেছেন, ভাব বিনিময় করেছেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে। পাবনায় গিয়ে কৃষকদেরকে তিনি বুকে জড়িয়ে ধরে বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু বিদায়বেলায় প্রধানমন্ত্রীর এক মুহূর্তের সাক্ষাৎ তিনি লাভ করেন নি।
বাংলাদেশ ইস্যুতে কূটনীতিকদের মধ্যেও দুটি ভাগ সুস্পষ্ট হয়ে গেছে। খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট, বাংলাদেশ নিযুক্ত ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদাল্যান্ড, সুইডেন, স্পেন ও ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত। পক্ষান্তরে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইস্যুতে রাশিয়া, চীন ও ভারত একই অবস্থানে। তারা ইউরোপ আমেরিকার মতো নির্বাচনী মডেল চাপিয়ে দেন না।
এমন একটি অবস্থায় অভিজিতের হত্যার ঘটনাটি কি নিছক একটি ঘটনার মধ্যেই সীমিত থাকবে, নাকি তা নালা থেকে খালে, খাল থেকে নদীতে, নদী থেকে সাগরে গিয়ে পৌঁছবে? বাংলাদেশের শতাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে গত দু মাসে। এদের মধ্যে অর্ধেক নিহত হয়েছে আগুনে পুড়ে, অর্ধেকের মতো ‘ক্রসফায়ার’, ‘গণপিটুনি’ ইত্যাদি ভাবে। অবরোধের ৬২ তম দিনে এসে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১৯ জনে যাদের মধ্যে ৬৮ জন দগ্ধ হয়ে, ২১ জন সংঘর্ষ ও গণপিটুনিতে, ৩১ জন ক্রসফায়ারে। ৮৩৮ টি গাড়ি ভস্মীভূত এবং ১০৫৯ টি গাড়ি ভাঙচুর হয়েছে। ( দৈনিক আমাদের সময় ৯ মার্চ ২০১৫)। কেউই এসব হত্যা ও অপরাধের দায় নিচ্ছেন না, মনে হয় যেন ভুতে এসে এ ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে। এই নিহত মানুষগুলো কিন্তু অভিজিতের মতো ‘অসাধারণ’ নয়, তারা সাধারণ মানুষ। আমাদের সভ্য নাগরিকদের কাছে কতজন সাধারণ মানুষের জীবন একজন ‘বিজ্ঞানবাদী, মুক্তমনা’ ব্লগারের সমতুল্য আমরা জানি না। যেহেতু অভিজিৎ মার্কিন নাগরিকত্বের অধিকারী, তাই তার হত্যার ঘটনায় মার্কিন সরকার নাক গলানোর শক্ত একটি যুক্তি পেয়ে যায়। তারা ছিদ্রটি দিয়ে সুঁই হয়ে ইতোমধ্যেই ঢুকে পড়েছে, সরকারের পররাষ্ট্রনীতির জাল আর তাদেরকে আটকাতে পারলো না। অভিজিৎ বাংলাদেশের ছেলে কিন্তু তার মার্কিন পরিচয়ই এখানে বড় হয়ে দাঁড়ালো, ইউরোপ-আমেরিকার বড় বড় সংস্থাগুলো হৈ চৈ ফেলে জানিয়ে দিল, ‘মুক্তমনা মার্কিন নাগরিক’ হওয়া কত অসাধারণ ব্যাপার। অভিজিৎ পরিচালিত মুক্তমনা ব্লগের ইসলামবিদ্বেষীতার কথা প্রকাশ হয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষ এবার আর হুজুগে মাতলো না। কথায় বলে মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি।
অভিজিতের হত্যাকাণ্ডে সন্দেহের তীর ইসলামী চরমপন্থীদের দিকে, কারণ কেষ্টা বেটাই চোর। এ ঘটনার বেনিফিশিয়ারী আসলে কারা - জঙ্গিরা, ২০ দলীয় জোট, হাসিনা সরকার, মুক্তমনারা নাকি মার্কিন সরকার নিজেই তা নিয়ে চিন্তার সুযোগ রয়েছে। এরা প্রত্যেকে একে অপরের দিকে তর্জনি নির্দেশ করে আছেন। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় লাশ পড়েছে, তাই মাহমুদুর রহমান মান্না ও সাদেক হোসেন খোকার বেফাঁস ফোনালাম তাদের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে। শাহরিয়ার কবির গং আঙ্গুল দেখাচ্ছেন সরকারের দিকে- কারণ অভিজিৎ হত্যার দুই ঘণ্টা আগে থেকে মুক্তমনা ব্লগ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, যখন অভিজিৎ বই মেলায় অবস্থান করছিলেন। এজন্য মুক্তমনা ব্লগের সঙ্গে জড়িতদের প্রসঙ্গও এড়ানো যাচ্ছে না। এখানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটটা প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে, কারণ History repeats itself - এটি স্রষ্টা নির্ধারিত প্রাকৃতিক নিয়ম।
আজ থেকে ঠিক একশত বছর আগে। ১৯১৪ সালের ২৮ জুন। বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভো শহরে বেড়াতে গিয়ে আততায়ীর গুলিতে নিহত হলেন অস্ট্রিয়ার যুবরাজ আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ ও তার স্ত্রী সোফিয়া। হত্যাকারী ছিলেন অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় তরুণ, কিন্ত জাতিতে বসনীয় সার্ব, ধর্মে ইহুদি। তাকে ঘটনাস্থলেই গ্রেফতার করে বিচারের সম্মুখীন করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডটিই ছিল সে পর্যন্ত সংঘটিত বিশ্বের ভয়াবহতম গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের উৎস, যা চলে টানা চার বছর। অস্ট্রিয়া এ হত্যাকাণ্ডের জন্য তৎকালীন সার্বিয়াকে দায়ী করে এবং সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এ যুদ্ধে দুই দেশের বন্ধু রাষ্ট্রগুলো ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ে। তবে এ হত্যাকাণ্ডই বিশ্বযুদ্ধের একমাত্র কারণ ছিল না। উনিশ শতকে শিল্প বিপ্লবের কারণে সহজে কাঁচামাল সংগ্রহ এবং তৈরি পণ্য বিক্রির জন্য উপনিবেশ স্থাপনে প্রতিযোগিতা আর আগের দ্বন্দ্ব-সংঘাতও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণ ছিলো। সে যা-ই হোক, অস্ট্রিয়ার নাগরিকই তাদের যুবরাজকে হত্যা করেছিল, কিন্তু দায় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল সার্বিয়ার কাঁধে। অভিজিৎ একজন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক। তিনিও এসেছিলেন বেড়াতে। এক্ষেত্রেও তার স্ত্রী ও তিনি আক্রান্ত হলেন। দোষ চাপানোর চেষ্টা চলছে যুগপৎ বাংলাদেশ সরকারের উপর এবং ইসলামী চরমপন্থীদের উপর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ও আন্তর্জাতিক স¤পর্ক ছিলো গোপনীয়তায় ভরা ও জটিল, বর্তমানেও তাই।
তাই যাত্রাপালায় নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার মুখে যে উক্তিটি আমরা শুনে থাকি - ‘বাংলার আকাশে আজ দুর্যোগের ঘনঘটা’ এটি এখন অতিমাত্রায় প্রাসঙ্গিক বলে আমি মনে করি।
আসলে দেশ দখল করার জন্য প্রয়োজন একটি অজুহাত, সত্য মিথ্যা এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। ইরাকে কি গণবিধ্বংসী অস্ত্র পাওয়া গিয়েছিল? যায় নি। টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পেছনেও ছিল বহু ষড়যন্ত্র, কিন্তু একচেটিয়াভাবে আল কায়েদাকে দোষী সাব্যস্ত করে ধ্বংস করে দেওয়া হয় আফগানিস্তান। অর্থাৎ একটি অজুহাত লাগে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য। ইরাক যুদ্ধ একদিনে শুরু হয়ে যায় নি, এর আগে অনেক কূটনীতিক তৎপরতা, অনুসন্ধান, তদন্ত হয়েছে, অবরোধ হয়েছে। তারপরে একটি ঘোষণা দিয়ে শুরু হয়েছে বোমাবর্ষণ। আমাদের দেশেও ‘জঙ্গি ইস্যুতে’ এফবিআই তদন্ত করছে। তবে আমরাও কি তেমনই একটি মন্দ ভোরের অপেক্ষায় আছি? আমাদের আজকের সুখনিদ্রা পরবর্তী প্রহরে কালনিদ্রায় পরিণত হবে না তো?
আমার বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, আমাদের দেশের গোয়েন্দাবাহিনী যদি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করার সুযোগ পায় তাহলে কারা অভিজিৎকে হত্যা করেছে, কেন করেছে তা বের করতে পারবে। গত কয়েক দশকে বিশ্ব রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে যে সব নাটক আমরা প্রত্যক্ষ করেছি তাতে পনের কোটি মুসলিম জনসংখ্যা, তেলসহ প্রভূত প্রাকৃতিক সম্পদ ও গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানের অধিকারী আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমিকে নিয়ে আমি আশঙ্কামুক্ত নই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




