somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নি-ক্যাপিং: আওয়ামী নৃশংস নির্যাতনের উপাখ্যান

১৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে সত্তরের দশকে আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি (আইআরএ) তাদের প্রতিপক্ষকে দমনে এক নির্মম কৌশল বেছে নিয়েছিল, যার নাম ‘নি-ক্যাপিং’। এই পদ্ধতিতে শটগান দিয়ে ভুক্তভোগীদের হাঁটুর নিচে এমনভাবে গুলি করা হতো, যাতে পা কেটে ফেলা ছাড়া আর কোনো পথ না থাকে। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি চিরদিনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করতে বাধ্য হতেন।
২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী সময়ে আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশও ভিন্নমত দমনে এই একই কৌশল রপ্ত করে। আসলে গুম বা ক্রসফায়ারের মতো ঘটনায় চারদিকে শোরগোল বেশি হয় এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো সোচ্চার হওয়ার সুযোগ পায়। তাই এমন এক পদ্ধতির খোঁজ করা হচ্ছিল, যা সমাজে ‘দৃষ্টান্তমূলক’ ভয় তৈরি করবে কিন্তু আওয়াজ হবে তুলনামূলকভাবে কম।
পদ্ধতিটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। প্রথমে ভিকটিমকে আটকে রেখে ব্যাপক নির্যাতন করা হতো। এরপর গভীর রাতে চোখ ও হাত বেঁধে কোনো নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে, একদম কাছ থেকে শটগান ঠেকিয়ে হাঁটু বা পায়ে গুলি করা হতো। গুলির পর রক্তপাত বন্ধ করার জন্য ক্ষতস্থানে কিছুটা বালু দিয়ে, চোখ বাঁধার গামছাটি দিয়েই ব্যান্ডেজ করে দেওয়া হতো। এরপর কোনো চিকিৎসা না দিয়ে বা নামমাত্র ব্যবস্থা করে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেলে রাখা হতো।
শটগানের অসংখ্য ছোট ছোট পিলেটের (ছররা গুলি) আঘাতে যখন পায়ের রক্তনালী ও স্নায়ুতন্ত্র ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়—চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘ভাসক্যুলার ইনজুরি’ বলা হয়—তখন দ্রুততম সময়ে উন্নত চিকিৎসা না পেলে সেই পা আর বাঁচানো সম্ভব হয় না। এই নিষ্ঠুর প্রক্রিয়াটিই মূলত ‘নি-ক্যাপিং’ বা ‘মেইমিং’ (অঙ্গহানি) নামে পরিচিত।
দীর্ঘ সময় চিকিৎসাহীন অবস্থায় পড়ে থাকায় ক্ষতস্থানে ইনফেকশন বা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তো। এরপর যখন তাদের হাসপাতালে নেওয়া হতো, তখন চিকিৎসকদের সামনে পা কেটে ফেলা ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকতো না।
পা হারিয়েও কিন্তু ভুক্তভোগীদের রেহাই মিলতো না। যেহেতু তারা গ্রেফতার অবস্থায় থাকতেন, তাই হাসপাতাল থেকে সরাসরি তাদের জায়গা হতো কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। সেখানে তারা অত্যন্ত অমানবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতেন। চলাচলের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলায় তাদের অবহেলা করে ফেলে রাখা হতো বাথরুমের কাছাকাছি নোংরা জায়গায়। আজ এত বছর পরও অনেকে আর্থিক অনটনে ক্ষতস্থানের সঠিক চিকিৎসাটুকু করাতে পারেননি। কেউ কেউ সামর্থ্য অনুযায়ী কৃত্রিম পা (প্রসথেটিক লিম্ব) লাগিয়েছেন, আবার কেউ সারাজীবনের সঙ্গী করেছেন ক্র্যাচকে।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে সাতক্ষীরা (যেখানে অন্তত একশত ভুক্তভোগী রয়েছেন), যশোর, ঝিনাইদহ এবং চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় এই ভয়াবহ ঘটনাগুলো ঘটেছে। এই নিষ্ঠুরতার শিকার শত শত মানুষের মধ্যে বিএনপি, ছাত্রদল, জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মীদের সংখ্যা বেশি থাকলেও, গ্রামীণ হাটের চৌকিদারের মতো নিতান্ত সাধারণ মানুষও এই তালিকায় বাদ পড়েননি। প্রত্যেকের পেছনের গল্পটা প্রায় একই রকম। মূলত প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দু-চারজনকে এভাবে পঙ্গু করে পুরো সমাজের মনে এক তীব্র ভীতি ও সতর্কতা ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল এর মূল লক্ষ্য। আইনি ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলা এবং সামাজিক ও আর্থিক দৈন্যতার কারণে বহু ভুক্তভোগী আজও আড়ালেই রয়ে গেছেন, তাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

আজ থেকে দশ বছর আগে যশোরের দুই বাসিন্দা—ইসরাফিল এবং রুহুল আমিন—এই সুপরিকল্পিত নি-ক্যাপিংয়ের শিকার হয়ে নিজেদের পা হারিয়েছিলেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর, আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এই প্রাতিষ্ঠানিক নি-ক্যাপিং বা অঙ্গহানি মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

“No Right to Live” “Kneecapping” and Maiming of Detainees by Bangladesh Security Forces

সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:৫২
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অন্ধকারের রসায়নবিদ

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৮


লেখকের নোট:
এই গল্পের পটভূমি ১৯৭৭ সালের ঢাকায় সংঘটিত জাপান এয়ারলাইন্সের বিমান ছিনতাইয়ের ঐতিহাসিক ঘটনাকে অবলম্বন করে নির্মিত। ঐতিহাসিক ব্যক্তি, স্থান ও ঘটনার পাশাপাশি প্রফেসর রেহান আশরাফ, তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেউ জানেনা

লিখেছেন অপ্‌সরা, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৪২


কেউ জানেনা
আমার একটা জগৎ আছে,
খুব গহীনে, সংগোপনে,
বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা
একটা জগৎ....
নিজের জগৎ, নিজের মত
আমার একটা জগৎ লাগে।

রোজ বিকেলে কাজের পরে
একটু যখন অবসরে,
একটু সময় চায়ের কাপে
নিজের মত, নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সালমান মুক্তাদীরের জুলাই আন্দোলন: কারণটা কি একান্ত ব্যক্তিগত ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:০১


সালমান মুক্তাদীর বাংলাদেশের কনটেন্ট ক্রিয়েশন জগতের পথিকৃৎ। তার হাত ধরে এদেশে কনটেন্ট ক্রিয়েশনকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে কত তরুণ, তার কোনো হিসাব নেই। তার ভক্তের সংখ্যা অগণিত। তবে কাজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে পর্ণ এটাকের জনককে পাওয়া গিয়েছে?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:০৮



ব্লগার চারাগাছ সামুতে মডারেটর নেই বলে সন্দেহ করছেন। নিজের ধারণা পাকাপোক্ত করতে সামুতে পর্ণ এটাকের প্ল্যান করছেন। ইহা কি ব্লগার?

সামুতে পর্ণ এটাকের কারণে পর্ণ সাইটের ধুয়া তুলে বিগত সরকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেউ জানে না.....অপ্‌সরাপু মেইড মাই ডে!!!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১২

গানঃ কেউ জানে না
গানের লিংক - https://on.soundcloud.com/t6S1rpHbzq62HoSW98



হয়নি বলা হয়নি বলা...
সবচে' আপন যে জন ছিলো
সবচে' দূরের মানুষ সেও।
হঠাৎ কোথা হারিয়ে গেলো!
একটা অজান সূর।
কোন সুদূরে কোন অপারে
কোন সে অচিনপুর!


==========
কবিতার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×