somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঈশ্বর আজ ক্ষুৎ-পিপাসা নিয়ে ভাসছেন অথৈ সাগরে..

১৬ ই মে, ২০১৫ বিকাল ৫:০৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


খবরের কাগজ, অনলাইনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে শ্রম ও আশ্রয়ের খোঁজে সাগর পাড়ি দেওয়া মানুষ আর অবৈধ অভিবাসীদের খবর ভাসছে। হাড়-জিরজিরে কঙ্কালসার এসব নারী, শিশু ও পুরুষগুলোর হৃদয়বিদারক চিত্র অনেককে কাঁদিয়ে তুলছে। খবরে জানা যাচ্ছে, কোন দেশই এই মানুষগুলোকে আশ্রয় দিতে রাজী হচ্ছে না। কোন দেশের তীড়ে ভীড়তে গেলেই তাদেরকে তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, গুলি করা হচ্ছে। এমনকী তাদেরকে ধরে নিয়ে গভীর সমুদ্রেও ছেড়ে দিয়ে আসা হচ্ছে। ক্ষুৎ-পিপাসায় ক্লান্ত-বিধ্বস্ত এসব মানুষ দিনের পর দিন অথৈ সাগরে ভাসছে। বাধ্য হয়ে নিজেদের প্রশ্রাব পান করছে এসব মনুষ্য সন্তান। এই মানুষগুলোকে বাঁচাতে অনেকেই আকুল আবেদন জানাচ্ছেন রাষ্ট্রনায়কদের প্রতি। কিন্তু কেউই তাদেরকে গ্রহণ করতে রাজী হচ্ছে না। মানবতার সামান্যতম ছোঁয়াও তাদের জন্য বরাদ্দ হচ্ছে না। তবে কী মানবতা বিবেচিত হয় জাতীয়তার ভিত্তিতে? এ কেমন মানবতা যা নিজেদের মত অনুভূতিসম্পন্ন মানুষকে বাঁচাতে পারে না শুধু ভিন্ন জাতীয়তার কারণে? তুমি আমার দেশের মানুষ হলেই তোমাকে আমি তোমাকে বাঁচাব, আর আমার দেশের মানুষ না হলে তাতে আমার মানবতা ঘুমিয়ে থাককেব- এ কেমন মানবিকতা? যেসব ধর্মান্ধ নিজ ধর্মের মানুষ না হলে পীড়িত মানুষদের উদ্ধারে এগিয়ে আসে না আমরা তাদের ধার্মিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলি, ঠিক অনুরূপভাবে যারা স্বজাতী নয় বলে মানুষকে সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে মেরে ফেলে তবে তাদের পরিচয় কী হতে পারে? এই মানুষগুলোর অধীনস্ত সভ্যতাকে কী সভ্যতা বলা যায়, অথবা এই মানুষগুলো কি নিজেদেরকে আদৌ সভ্য বলে দাবী করতে পারে, আদৌ কি নিজেদেরকে ধার্মিক হিসেবে দাবী করতে পারে?

কিন্তু ডাঙ্গায় থাকা মানুষগুলো যেভাবে বিলাসী ভোজনে নিজেদের উদরপূর্তি করছে, যে ধরনের আয়েশী জীবন-যাপন করছে, তাদের নির্মিত বড় বড় অট্টালিকাগুলো যখন আকাশ ছোঁয়ার প্রতিযোগিতা করছে, শহর-নগরগুলোর বৈদ্যুতিক আলোর ঝলকানী যখন ছড়িয়ে পড়ছে দিগন্ত রেখা ছাড়িয়ে- সেসব দেখে আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে যায়, আমরা স্বীকার করে নিতে বাধ্য হই যে এই সভ্যতার প্রগতিকে। হ্যাঁ, এই যান্ত্রিক প্রগতি, মঙ্গল-মহাকাশ জয় করার জন্য কোটি কোটি ডলার ব্যয়, পারমাণবিক বোমার স্তুপ, জংগি বিমানের বহর, ক্ষেপনাস্ত্রের সম্ভার, বার্ষিক সামরিক বাজেট দেখে আমরা সত্যিই স্বীকার করতে বাধ্য হই যে এই সভ্যতা তার চরম উৎকর্ষতায় পৌঁছে গেছে। এই সভ্যতার নব নব আবিষ্কার, উষর মরুতে উদ্যান বানিয়ে, একই জমিতে দ্বিগুণ-তিনগুণ ফসল উৎপাদন করে কৃষিতে বিপ্লব, কল-কারখানার মাধ্যমে শিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন হওয়ার পরেও নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে সাগরে ভাসতে থাকা এই গুটি কয়েক মানুষকে ঠাঁই দেওয়ার যোগ্যতা যাদের হয় না, সেই প্রগতিকে আর উন্নতিকে আর যাই হোক মানবিক সভ্যতা বলে স্বীকার করা যায় না। বরং এটাকে একটা পাশবিক সভ্যতা বলাই শ্রেয়।

পাশবিক সভ্যতা এই জন্য যে এই সভ্যতার সভ্য মানুষগুলো পৃথিবীর বুকে কল্পিত সীমানা এঁকে, কাটাতারের বেড়া দিয়ে মানুষগুলোকে বন্দী করে কোথাও আটকে দিচ্ছে আবার কোথাও মাইলের পর মাইল ভূ-খণ্ড জনমানবহীন করে রেখে সেখানকার উৎপাদিত শস্য ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ গুটিকয়েক মানুষ রাজার হালে ভোগ করছে। পাশবিক সভ্যতা এই জন্য যে এরা বছরে কোটি কোটি টন উদ্বৃত্ত খাদ্য সমুদ্রে ফেলে দিচ্ছে খেতে না পেরে, এরা টনকে টন টম্যাটো নষ্ট করে টম্যাটো উৎসব করে। এ ছাড়াও আরও কত কী উপায়ে খাদ্যের অপচয় করা হয় যার অনেক কিছু আমাদের মত এই ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলের মানুষ ধারণাও করতে পারে না। অথচ সেই একই আকাশের নিচে আমাদেরই মতই অনুভূতি সম্পন্ন কিছু মানুষ যখন সাগরে ভাসছে খাদ্য ও পানি ছাড়া, বাধ্য হয়ে নিজেদের প্রশ্রাব নিজেরা খাচ্ছে তখনও আমরা তাদেরকে জাতীয়তার দোহাই দিয়ে তীরে উঠতে না দিয়ে তাড়িয়ে দিচ্ছি নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে। এই প্রগতির ভাগীদারগণ ভাবছে তাদেরকে আশ্রয় দিলে নিজেদের ভোগ-বিলাসে ভাগ বসবে।

অথচ এ সংক্রান্ত খবরগুলো যখন নিউজফিড আর ওয়েব পোর্টালগুলোর অধিকাংশ স্থান দখল করেছিল, ঠিক তখনি আরো একটা খবর ভাসছিলো যে- ফিনল্যান্ডে কোন দম্পত্তি বাচ্চা গ্রহণ করলে মাত্র এক ইউরোর বিনিময়ে তাদেরকে একটি করে প্লট দেওয়া হবে। মানুষ বাড়ানোর জন্য কিছুদিন আগে অনুরূপভাবে রাশিয়া নববর্ষের রাতে যারা বাচ্চা ধারণ করবে তাদেরকে পুরষ্কৃত করার ঘোষণা দিয়েছিল।


একদিকে মানুষের অভাবে বিরান ভূমি, ভবিষ্যৎ ধারাবাহিকতা রক্ষা নিয়ে শংকা আর অন্যদিকে ক্ষুদ্র ভূ-খণ্ডে ধারণ ক্ষমতার বাইরে গিজগিজ করা মানুষগুলোর একটি অংশ একটু ভালো খাবারের আশায় কিংবা একটু নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছোট ছোট ট্রলার ও নৌকায় করে পাড়ি দিচ্ছে অথৈ সাগর। এত বড় এই অবিচার, এই জুলুমের পরেও কীভাবে নিজেদেরকে সভ্য বলে দাবী করতে পারে মানুষ? আদৌ কি তারা মানুষ বলে বিবেচিত হতে পারে?
বিবেচিত না হলেই বা কী আসে যায়, এরা রীতিমত নিজেদেরকে ধার্মিক মনে করছে। ঠিকই স্বর্গপ্রাপ্তির আশায় নিয়মিত মসজিদ, মন্দির, চার্চ, প্যাগোডায় ঈশ্বরকে খুঁজতে যাচ্ছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আলীশান মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা আর গীর্জা বানিয়ে ঈশ্বরকে সেখানে ঢুকাতে চাচ্ছে। সত্যিই কী ঈশ্বর সেখানে থাকেন? না, ঈশ্বর থাকেন আর্ত-পীড়িতের মাঝে, ঈশ্বর থাকেন দু:খী মানুষের মাঝে। তাই ঈশ্বরকে আজ পাওয়া যাবে সাগরে ভেসে থাকা ঐ মানুষের মাঝে। অভুক্ত ও ক্ষুৎ-পিপাসা নিয়ে ঈশ্বর আজ ভাসছেন সাগরে। স্বর্গ ধান্ধাকারীরা যদি সেই মানুষগুলোকে বাঁচাতো তবে তারা খোদ ঈশ্বরকেই বাঁচাতো [হাদীসে কুদসী দ্রষ্টব্য]। সেই সাথে এরাও বাঁচাতে পারতো নিজেদেরকে। সাগরে ভেসে থাকা ঐ মানুষগুলোর প্রতি সদয় হলে ঈশ্বরও তাদের উপর সদয় হতেন। নতুবা অভুক্ত ঈশ্বরের ক্রোধ এই ‘সভ্য’ মানুষের উপর তাদের এই অমানবিকতার শোধ নেবেন। তাদের ভেবে দেখা উচিত ঈশ্বরের ক্রোধের কয় মুহূর্ত তাদের এই মেকী সভ্যতাকে তছনছ করে দিতে দরকার হতে পারে। এর নিকট নজীর (নেপাল) কি তাদের সামনে নেই?
৫টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মুহাম্মদ আলি জিন্না

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:৩৫



১৮৭৬ সালে করাচিতে এক দুষ্ট বালকের জন্ম হয়।
এবং ৭৬ বছর বয়সে দীর্ঘদিন যক্ষা রোগে ভূগে- দেশ ভাগের পরের বছর মারা যান। এই দুষ্ট বালক'ই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা। নাম তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

"রিকন্সিলিয়েশান"....ইহা কি খায় নাকি মাথায় দেয়?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:০০



সত্যি সত্যিই তাদের সুযোগ ছিলো ২৫ শে মার্চ এর পর যাবতীয় অপকর্ম জনগণের কাছে স্বীকার পূর্বক,
/মুক্তিযুদ্ধে তাদের দ্বারা নৃশংসতার শিকার জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা,
/তাদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে এবং,
/সব... ...বাকিটুকু পড়ুন

সেরা লেখক

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৭



বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভালো লেখক এক কথায় - হুমায়ূন আহমেদ। হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস মধ্যাহ্ন বা দেয়াল - এর পাশাপাশি রাখার মতো বাংলাদেশে আর কোনো উপন্যাস আছে কিনা আমার জানা... ...বাকিটুকু পড়ুন

=ডায়াটে একদিনের খাবার=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:৫১

ডায়াটের প্রথম দিকে-একদিনের খাবার। বর্তমানে আমাদের দেহে রোগসুগের অভাব নাই। ডায়াবেটিস, প্রেসার, ক্যান্সারসহ নানাবিধ রোগ বলা নাই কওয়া নাই শরীরে এসে বাসা বাঁধে।

আর এসব রোগের একমাত্র কারণ আনহেলদি... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিদায় নানা পাটেকার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৫৭



৯০ দশকের শুরুর দিকের কথা, সারা দিনের ক্লান্তি নিয়ে যখন বাসভবনে ফিরেছি, রুটিন মাফিক গোসল খাওয়া দাওয়া করে ঘুমোবো কিন্তু টিভি অন করে দেখি একটি সিনেমা শুরু হচ্ছে -... ...বাকিটুকু পড়ুন

×