আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তৈরি করার অধিকার জনগণ দিয়েছে তাদেরই নিরাপত্তা বিধানের জন্য। এ জন্য জনগণই তাদেরকে বেতন-ভাতা মিটিয়ে থাকে। এক কথায় বলা যায় তারা হচ্ছে জনগণের কর্মচারী। তারা কাগজে কলমে সেটা স্বীকারও করে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তারা জনগণের অর্থে লালিত-পালিত হয়েও এক ফ্রান্কেনস্টাইনের দৈত্যে পরিণত হয়েছে। আইন-শৃংখলাবাহিনীর কাজ ছিল দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন। কিন্তু তারা ফ্রান্কেনস্টাইনে পরিণত হওয়ার পর দুষ্ট এবং শিষ্টকে তারা প্রায়ই একচোখে দেখে থাকে।
তাদের এই আচরণটা আমরা লক্ষ্য করি প্রায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। কে সুনাগরিক আর কে আসলেই দুষ্কৃতিকারী সেটা বিচার করার আগেই তারা আমাদেরকে সন্দেহ করে আমাদের প্রতি এমন আচরণ করে যা আমাদেরকে মর্যাদায় আঘাত করে। আমি দেশের একজন সুনাগরিক, দেশের আইন মান্য করে চলি। আমি আমার দেশকে ভালোবাসি। আমি চাই আমার দেশের উন্নতি ও কল্যাণ। কিন্তু আমাকেই যখন নিছক সন্দেহের বশে জিজ্ঞাসাবাদের শুরুতেই তুই-তুকারী করা হয়, চড়-থাপ্পড় দেওয়া হয়, ধমক দেওয়া হয়, অশ্রাব্য গালিগালাজ করা হয় তখন একটা চোরের সাথে একজন দেশদ্রোহীর সাথে আমার পার্থক্য কোথায়? আমার সুনাগরিকত্বের মূল্যায়নই বা কোথায়?
আমাকে গালাগালি, প্রকাশ্য স্থানে চড়-থাপ্পড় দিয়ে থানায় নিয়ে যাওয়া হলো। এরপর আমার বিরুদ্ধে তদন্ত করে জানা গেল যে আমি আসলে দুষ্কৃতিকারী নই। তখন আমাকে 'সরি' বলে ছেড়ে দেওয়া হল। কিন্তু আমাকে যে প্রকাশ্যে অপমানিত করা হলো, চড়-থাপ্পড় মারা হলো এটা কি একটা মাত্র 'সরি' বাক্যের মাধ্যমেই মিটে যাবে? আমি দায়িত্বশীল এবং সম্মানীত একজন নাগরিক। এটা আমার অহংকার, আমার প্রাইড। কিন্তু যখন এভাবে প্রকাশ্যে আমাকে হেনস্তা করা হলো তখন কি আমার এই অহংকারে আঘাত লাগে না? এটা কি আমার মর্যাদায় আঘাত করে না?
চোর আর সাধুর গায়ে আলাদা সাইনবোর্ড থাকে না। তাই কে চোর আর কে সাধু সেটা তাৎক্ষণিকভাবে বিচার করা যায় না- সেটা আমরা দায়িত্বশীল নাগরিকরা অবশ্যই বুঝি। কিন্তু নিশ্চিত হওয়ার আগে যাকে-তাকে একপাল্লায় তুলে, চোর-সাধুকে মিলিয়ে লাঞ্ছিত করা কি অন্যায় নয়? চোর আর সাধু নিশ্চিত হওয়ার আগে, শুধু সন্দেহের বশে কাউকে তুই তুকারী করা, চড়-থাপ্পড় দেওয়া কি খুব জরুরী নাকি এটা তাদের অনৈতিক বাহাদুরি, ফ্রান্কেনস্টাইনীয় আচরণ? পুলিশ বিধানে বা তাদেরকে যখন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় তখন তাদেরকে কি এ ব্যাপারে যথাযথ শিক্ষা দেওয়া হয় না? যদি তাই দেওয়া হয় তবে তারা ঐ শিক্ষার বিপরীত আচরণ করলে কেন যথাযথ শাস্তি প্রদান করা হয় না? নাকি যারা এই বিচার করবে তারাও একই দোষে দুষ্ট?
ঔপনিবেশিক আমলে পুলিশ বানানো হয়েছিল নিজেদের শাসন-কর্তৃত্ব অটুট রাখার জন্য। এ জন্য জনগণের উপর অত্যাচার চালানো হত। ভয় দেখানো হত যাতে তারা বিদ্রোহ না করে। কিন্তু আজকে আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। আমরা ভোট দেই আমাদের দেশের নেতাদেরকেই। বাইরে থেকে কেউ এসে আমাদেরকে শাসন-শোষণ করে না। সুতরাং আমাদের উপর আজও কেন ঔপনিবেশিক আমলের পুলিশী আচরণ করা হবে আর আমরাই কেন সেটা মেনে নেব? তাও আবার নিজেরা বেতন দিয়ে? আমাদের টাকায় ফ্রান্কেনস্টাইন পুষে এই ফ্রান্কেনস্টাইনদের হাতে আর কত লাঞ্ছিত হব- কে দেবে তার জবাব?
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জানুয়ারি, ২০১৬ বিকাল ৪:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





