তখন রক্ষা পায়নি গ্রামের মানুষও । সময় ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত। আমি তখন ভবানীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ি। ২০০১ সালে সংসদ নির্বাচনের পর এক সপ্তাহ পর আমার আব্বু বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়। নির্বাচনের পর থেকেই প্রতিদিন আমাদের গ্রামে পুলিশ আসতো সাথে থাকতো আমাদের গ্রাম ও পাশের গ্রামের বিএনপির কয়েক জন নেতা। টার্গেট ছিল আমাদের বাড়ি, আমাদের পাশের জাফর মাষ্টারদের বাড়িসহ আশপাশের কয়েকটি বাড়ি।
শুনেছি আব্বু তখন ঢাকায় পালিয়ে ছিল। তখন আমাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনের ব্যক্তি ছিলেন আমার আব্বু। আমার দাদু তখন বেঁচে ছিল। প্রতি দিন আব্বুর জন্য কান্না করত। কারণ দাদা মরে যাওয়ার পর আমার অসুস্থ্য দাদুর ভরসা ছিল আমার আব্বু। শুধু তাই নয় আমার নানাকে মৃত্যুর পর বিএনপি ও পুলিশের ভয়ে আমার নানাকে মাটি দিতে পর্যন্ত আসতে পারে নাই আমার আব্বু।
আব্বু বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার সময় দাদুর হাতে কিছু টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন। আমার ছোট কাকা তখন ওই টাকা দিয়ে আমার পাশে কোরাইশমুন্সী বাজারে না গিয়ে অনেক দূর নোয়াখালীর সেনবাগ, সেবারহাট অথবা অন্য ইউনিয়নের মৌলভী বাজারে গিয়ে বাজার করতে হতো। তখন এমন অবস্থা ছিল যে আমাদের পাশের কোরাইশমুন্সী বাজারে যদি আমাদের বাড়ির কাউকে পায় তাহলে তাকেই হত্যা করবে অথবা নির্যাতন করবে।
আমাদের বাড়ির লোকজনের দোষ একটাই ছিল। উনারা সবাই আওয়ামীলীগ। বিএনপির লোকজন কোন আওয়ামীলীগকে কোরাইশমুন্সী বাজারে যেতে দিবে না। তখন আওয়ামীলীগের কোন নেতাকর্মী ভয়ে কোরাইশমুন্সী বাজারে যেত না। গেলেই তাকে নির্যাতনের শিকার হতে হতো।
প্রায় দুই বছর পর আমার আব্বু বাড়ি ফিরে আসে। আব্বু তখন বাড়ি না থেকে দাগনভূঞায় থাকত।
২০০৪ সালে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহতের জন্য আমাদের গ্রামে গায়েবানা জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। স্থান ছিল আমাদের গ্রামের প্রবেশ মুখে একটি চাউল কলের মাঠে। তখন আওয়ামীলীগের অনেক নেতাকর্মী ওই গায়েবানা জানাযায় জড়ো হয়। গায়েবানা নামাজ পড়ান আমার সকলের মুরুব্বি প্রয়াত হাফেজ মো: আজিজ। আমরা ওনাকে হুজুর দাদা ডাকতাম।
ওই দিন সন্ধ্যায়ই আমাদের গ্রামে পুলিশ আসে। আব্বু আবার পালিয়ে যায়। আব্বু পালিয়ে যাওয়ার এক দিন পরই আমি অসুস্থ্য হয়ে পড়ি। আমাকে দাগনভূঞা হাসপাতালে নেয়া হয়। আমার সঙ্গে ছিল আমার মা ও আমার ছোট কাকা । আমার দাদু তখন আমার বড় ফুফুদের বাড়িতে চলে যায়। ঘরে ছিল আমার ভাই আর আমার আব্বুর খালাতো বোন আমার শিউলি ফুফু। যেই দিন আমি হাসপাতালে ছিলাম ওই রাতেও আমাদের বাড়িতে পুলিশ আশে। পুলিশ আমাদের ঘর তল্লাশি করে। আমার আব্বু লুকিয়ে আছে এ কথা বলে তারা আমাদের ঘরে ব্যাপক ভাংচুর চালায়।
হাসপাতাল থেকে সুস্থ্য হয়ে বাড়ি এসে শুনেছি, আমার ছোট ভাই আর আমার ফুফুকে পুলিশ অনেক অকথ্য ভাষায় ব্যবহার করেছে। আমার ছোট ভাই ফুফুকে জড়িয়ে ধরে কান্না করেছে।
আমি ওইসব নোংরা দিন আর দেখতে চাই না। এখন দেখতে চাই শুরু সুন্দর একটি আগামী। যেখানে থাকবে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ। যেন আর কোন দিন কোন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসলে আর কোন পরিবার আমাদের মত কষ্ট করতে না হয়।

সর্বশেষ এডিট : ২১ শে আগস্ট, ২০১৬ সন্ধ্যা ৭:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


