কুকুরের প্রেমে পিকাসো
অ ব নি অ না র্য
কুকুরটির নাম ছিলো লুম্প। পিকাসোর বাড়িতে (এবং হৃদয়ে) আমন্ত্রণ ছাড়াই ঘুরে বেড়াতো যে আপন মনে। প্রখ্যাত সমর-আলোকচিত্রশিল্পী ডেভিড ডগলাস ডানকিন তাঁর সামপ্রতিক বই-এ প্রকাশ করেছেন পিকাসোর সঙ্গে লুম্প নামক সেই কুকুরের অন্তরঙ্গ বেশকিছু আলোকচিত্র। এই ডানকানই নিয়ে গিয়েছিলেন লুম্পকে পিকাসোর কাছে। জন লিচফিল্ডের কাছে মানুষের সঙ্গে পশুর মহত্তম সম্পর্কের কথা বলেছেন ডানকান।
পাবলো পিকাসোর নারীপ্রেম সর্বজনবিদিত। কিন্তু, তাঁর কুকুরপ্রীতির খবর ততোটাই অজানা। সে প্রীতি আবার একটা নির্দিষ্ট কুকুরের প্রতিই।
পঞ্চাশ-ষাটের দশকে লুম্প (লুম্পি বা লুম্পিটো) নামের ওই নির্দিষ্ট কুকুরের প্রতি পিকাসোর সঘণ-শৈল্পিক ভালোবাসার অজানা অধ্যায়ের আলোকচিত্র নিয়ে সমপ্রতি একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। লুম্প: যে কুকুর পিকাসোকে খেয়েছে নামের বইটির সংকলক ডেভিড ডগলাস ডানকান। আমেরিকার এই কিংবদন্তী আলোকচিত্রশিল্পী যুদ্ধ এবং পিকাসোর ছবি তুলে দারুণ প্রসংশিত হয়েছিলেন। 1956 সাল থেকে 1973 সালে পিকাসোর মৃতু্যর আগ পর্যন্ত নব্বই বছর বয়সী এই ডানকান পিকাসোর কাছের বন্ধু ছিলেন। ডানকানের ক্যামেরায় শিল্পীর চিত্রকলার ভূবন আর নাটকের অন্তরঙ্গ আলোকচিত্র সাতটি খণ্ডে ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। সর্বসমপ্রতি প্রকাশিত বইটি লুম্প (জার্মান উচ্চারণে, একটু টেনে, "লূম্প")-এর সঙ্গে পিকাসোর সম্পর্ক-নির্ভর আলোকচিত্র নিয়ে। লুম্প-এর প্রকৃত মনিব স্বয়ং ডানকান। 1957 সালে দণি ফ্রান্সে পিকাসোর বাড়িতে স্থায়ী বাসিন্দা হয় লুম্প।
তৎকালীন জীবন্ত কিংবদন্তী চিত্রশিল্পী পিকাসোর সঙ্গে লুম্পের অভাবিত বন্ধুত্বের ঘটনা থেকেই বইটির নামকরণ করা হয়েছে। লুম্পের বন্ধুত্ব পাবার জন্য পিকাসো একবার চিনি-মিশ্রিত পিঠার বাকশোর তলায় পিকাসোর ঢঙে খরগোশ-আকৃতির একটি প্রাণী এঁকে ওইটুকু অংশ কেটে নেন। লুম্প আর যায় কোথায়। চিনিমিশ্রিত বাঙ্্রের কাটা অংশটুকু চুরি করে খেয়ে ফেললো।
নব্বই বছর বয়সী ডানকানের মনে পড়ে, "চারপাশে অনেক প্রাণী পরিবেষ্টিত থাকতে পছন্দ করতেন পিকাসো। কিন্তু, লুম্পের মতো আর কারো সঙ্গে এতোটা ঘনিষ্ট কখনও হননি।" তিনি বলেন, "এটা বাস্তবিকই প্রেমের সম্পর্ক। পিকাসো ওকে বাহুডোরে নিয়ে ঘুরতে চাইতেন, নিজহাতে খাইয়ে দিতে চান। অথচ পাগল কুকুরটাই একলাফে পালিয়ে ঘরময় ঘুরে বেড়ায়।"
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং কোরিয়ান যুদ্ধের ছবি তুলে ব্যাপক নন্দিত ডানকান 1956 সালে পিকাসোর সঙ্গে পরিচিত হন, সর্বকালের শ্রেষ্ঠতম সমর-আলোকচিত্রশিল্পীদের অন্যতম, রবার্ট কাপার মাধ্যমে। পরের বছর ডানকান তার আফগান শিকারী কুকুর কুবলার সঙ্গী হিসাবে তিন মাস বয়সী লুম্পকে (জার্মান অর্থ "পাজি/বদমাশ") সংগ্রহ করেন স্টুটগার্টের একটি পরিবারের কাছ থেকে।
ডানকান বলছেন, "আফগান কুকুরটি লুম্পকে সারা বাড়ি ঘোরাতো, টেনিস বল বা সকার বলের মতো।" তিনি যোগ করেন, "আফগান কুকুরটি ঠিক বিদ্বেষী স্বভাবের ছিলো না, তবে বাচ্চাকুকুরটিকে ঠিকই খেলনা হিসাবেই বিবেচনা করতো। সাতান্নর বসন্তে আমার তৎকালীন রোমের বাড়ি থেকে ক্যানিসের নিকটে লা ক্যালিফোর্নিতে পিকাসো এবং তাঁর সঙ্গী জ্যাকলিন রোকের বাড়িতে স্থানান্তরিত যাই। লুম্পকে সঙ্গে নিয়েই গিয়েছিলাম।"
লা ক্যালিফোর্নির বাসভবন সম্পর্কে ডানকান তার বইতে লিখেন, "তখনকার যাদুঘর তত্বাবধায়ক, বড়মাপের সংগ্রাহক, গ্যালারি-মালিক, কবি, প্রকাশক, রুশ পিয়ানোবাদক, জিপসি গিটারবাদক, ষাঁড়যোদ্ধা, পুরনো বন্ধু এবং সুযোগসন্ধানী পথিকদের কাছে বাড়িটির উন্মুক্ত দরজা ছিলো স্বপ্নের।"
আফগান শিকারী কুকুরবিহীন জীবনের দ্বার উন্মুক্ত হলো লুম্পের।
ডানকান বলছেন, "গাড়ি থেকে নেমেই বাচ্চাকুকুরটি বাগানটা খানিক শুঁকে নিলো, পুরো বাড়িটার আকর্ষণীয় অংশগুলোর দিকে একবার চোখ বুলিয়ে সোজা ভেতরে ঢুকে গেলো। পিকাসোর জন্যই বুঝি আমাকে ছেড়ে গেলো।"
পরের কয়েক বছর ধরে পিকাসোর বাড়ির আরো-আরো বাসিন্দার, যেমন জার্মান বুলডগ ইয়ান বা এসমারেল্ডা নাম্নী ছাগলটির মতোই পরিবারের একটা অংশ হয়ে গেলো। পিকাসো প্রাণীগুলোকে ভালোবাসতেন ঠিক, কিন্তু লুম্পের মতো এতোটা সংবেদনশীল আর কোনো প্রাণীর উপর ছিলেন না।
লুম্প পিকাসোর বিছানায় ঘুমাতো। পিকাসোর আত্মপ্রতিকৃতি-সজ্জিত থালা ছিলো তার ডিনারপ্লেট (অথচ, তখন পিকাসোর এক একটা স্কেচ ছিলো ভবিষ্যতের কিংবদন্তী)। বাগানের 7 ফুট উঁচু ব্রোঞ্জনির্মিত পিকাসোর মূর্তি ছিলো ওর প্রস্রাবখানা।
পিকাসোর বাড়ির ইনফরম্যাল ছবির সঙ্গে সঙ্গে শিল্পীর কুকুরপ্রীতির আনন্দঘন 89টি ছবি নিয়ে বইটি প্রকাশিত হয়েছে। ডানকান বলেন, "লুম্পের প্রতি পিকাসোর এই ভালোবাসার কারণ, বোধ করি, দুজনের ঋষিস্বভাব। উষ্ণ-সম্পর্ক তৈরির প্রভূত মতা নিয়েও দুজনে বাস করতেন নিজ নিজ অন্তর্জগতে। পিকাসো বলতেন, লুম্প না কুকুর, না মানব, এসবের উধের্্ব অন্যকিছু।"
ডানকান স্মরণ করিয়ে দেন, বিশশতকের শিল্পের ইতিহাসে লুম্প-এরও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে।
"পিকাসো আমাকে ইশমায়েল নামে ডাকতেন; কারণ কখনো জিজ্ঞেস করিনি। একবার বললেন, 'ইশমায়েল, তুমি এই যে এতো ছবি তুলছো, কখনো অবাক হওনি আমি কী নিয়ে কাজ করছি?'
"বললাম, আমি একজন ফোটোগ্রাফার মাত্র, শিল্পসমালোচক নই। আমি জিজ্ঞেস করতে পছন্দ করতাম না। তিনি নিজে আমাকে তার স্টুডিওতে নিয়ে ভেলাকোয়েজ পেইন্টিং-এর ভিন্ন-প্রকরণ_ লা(স) মেনিয়াস সিরিজের ছবি দেখান। মূল ভেলাকোয়েজ পেইন্টিং-এর অগ্রভাগে মাস্তিফ (ঝুলন্ত কান-ঠোঁটবিশিষ্ট বড়মাপের কুকুর) থাকতো; আর পিকাসো ভার্সনে এসে মাস্তিফের স্থান নিলো লুম্প।
"এই সিরিজের সবকয়টা (সর্বমোট 45) ছবিই বার্সিলোনার পিকাসো মিউজিয়ামে তিনি প্রদান করেন। ওগুলো আজও সেখানে আছে।
"আমার মনে হয়, এটাই পুরো গল্পের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক এবং জীবন্ত অংশ। আধুনিক শিল্পকলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পীর নিপুণ শিল্পনিদর্শনের অংশ হয়ে থাকলো স্টুটগার্টের সেই বাচ্চাকুকুরটি।"
বার্সিলোনা থেকে 15টি পেইন্টিং পুনর্মুদ্রণ করা হয়েছে বইটিতে। ক্যাপশনও আছে এরকম_ যেখানে কল্পনা করা হচ্ছে, লুম্প ভাবছে, "কীভাবে আমি এখানে এলাম?"
ডানকান বলছেন, ক্যাপশন বলছে জার্মান ছোট্ট কুকুরটির অভিজাত আইকন হবার অদ্ভুত ইতিহাসের কথা। এবং হয়তোবা তাঁর নিজেরও_ 1916 সালের জানুয়ারিতে আমেরিকার কানসাসে জন্ম নিয়ে কোরিয়া-ভিয়েতনামে লাইফ ম্যাগাজিনের জন্য আলোকচিত্রশিল্পী হিসাবে কাজ করতে করতে বিশ শতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীর বন্ধুত্ব অর্জনের কথা।
ডানকানের বইয়ের ভূমিকায় আছে: "গতকাল মনে হয়েছিলো অবাস্তব।" তিনি লেখেন: "দিনে-দিনে ঘটে যাওয়া কাহিনীর মধ্য দিয়ে সমৃদ্ধ হওয়া এই ভাগ্যবান আলোকচিত্রশিল্পীর জীবনের ঘটনাগুলো বলতে গেলে আজ মনে হতে পারে, সব উদ্ভট।"
তিনি যোগ করেন, "আমি বেশ ভালো ফটোগ্রাফার, কিন্তু আমার চাইতেও উৎকৃষ্ট ফটোগ্রাফার আছে। পার্থক্য কেবল এই, আমি ওখানে ছিলাম, সব দেখেছি। ওইসব ছবিগুলো ধারণ করবার সুযোগ পেয়েছি।"
আর লুম্পের কী পরিণতি হলো? গল্পের শেষটা অত কাব্যিক নয়। পিকাসোর বাড়িতে লুম্প স্থায়ী বাসিন্দা হবার ছ'-সাত বছর পর ডানকান আবার আসেন এ-বাড়িতে। কিন্তু লুম্পের কোনো আনাগোনা নেই।
"আমি জিজ্ঞেস করলে তারা অস্পষ্টস্বরে বললো যে, ও অসুস্থ। মনে রাখা প্রয়োজন, পিকাসো ছিলেন স্প্যানিশ। প্রাণীদের প্রতি আচরণ, এমনকি লুম্পের প্রতিও, আমার আপনার চাইতে বেশ আলাদা। যাহোক, জানা গেলো, লুম্পকে নেয়া হয়েছে ক্যানিসের একটা পশু-হাসপাতালে।
"মেরুদণ্ডের গুরুতর সমস্যার কারণে লুম্প তার পেছনের পায়ের কার্যমতা হারিয়েছে। পশু হাসপাতালে গেলে কুকুরটি আমার দিকে গড়িয়ে গড়িয়ে আসতে চাইলো। সে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। আর পঙ্গু বিবেচনা করে হাসপাতাল থেকেও তার আশা ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এমনকি ওর খাবারও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে...
"সারারাত লুম্পকে নিয়ে গাড়ি চালালাম স্টুটগার্টের উদ্দেশে। কাঁধের ওপর নিয়ে খাওয়ালাম। একটা খুব নামকরা পশু-হাসপাতালে নিয়ে গেলে ওরা লুম্পকে পরীা করে বললো, ও পঙ্গু হয়নি।
"কয়েকমাসের চিকিৎসায় ও সুস্থ হলো, আমাদের সঙ্গে রোমে ফিরে এলো। তারপর থেকে সে কিছুটা মদ্যপ নাবিকের মতো হাঁটতো, তবু পরের দশ বছর তার খুব ভালোই কেটেছে। আমাদের সাথেই প্যান-অ্যাম ব্যাগে করে ওকে নিয়ে যেতাম...
"আর জানেন কি? পিকাসো জন্মেছিলেন 1881-তে, লুম্প জন্মেছিলো 1956-তে। আর, দুজনেরই মৃতু্য হয়েছিলো 73 সালে, ফাঁরাক কেবল দশদিনের।"
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


