somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

অতনু কুমার সেন
ভালো মানুষ হিসাবে নিজেকে দাবি করি না কখনোই, চেষ্টা করছি ভালো মানুষ হতে। জানিনা কবে ভালো হতে পারব! আর আমি এমনিতে বেশ ঠাণ্ডা, কিন্তু রেগে গেলে ভয়াবহ! স্বপ্ন দেখতে ভালবাসি, তার যদিও অধিকাংশই ভেঙ্গে যায়! আশার পিঠে আশা বেঁধে তবুও নির্লজ্

শিশু শ্রমিক আরিফ এর আত্তকথা আজ ৭ বছর পর নিজেকে সার্থক ভেবে লিখলাম!

১৭ ই আগস্ট, ২০১৮ রাত ৩:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


২০০৮ এর কথা একটি কাজে মানিকগঞ্জ এ যাওয়া পুরুষ কন্ঠের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুনে ,অবাক হয়ে একটি দোকানের ভিতরে তাকিয়ে দেখি, ১২/১৪ বছরের একটি ছেলে চোখ মুছতে মুছতে বলছে, আর এমন ভুল জীবনেও হবে না চাচা আমাকে মাফ করে দিন,
কিন্তু লোকটার সে কথা সম্ভবত বিশ্বাস হয়নি, ঠাস করে আর একটা চড় বসিয়ে দিল ছেলেটির গালে, অসহায়ত্ব কাকে বলে ,নিজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট শিশুটির চেহারার দিকে তাকিয়ে ,সেটা যেন আমি পরিষ্কার দেখতে পেলাম , বিবেকের তাড়না আমাকে তড়িৎ গতিতে নিয়ে গেল, দু চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরা ছোট ছেলেটির পাশে, হঠাৎ করে আমাকে দোকানের ভিতরে দেখে ,লোকটা ভিষন বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করল কি চান আপনি ? আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম আপনি এ ছোট শিশুটির গায়ে হাত তুলেছেন কেন ? দেখুন ভাই অযথা ঝামেলা করবেন না, আপনি এখান থেকে চলে যান, আমি ছেলেটির হাত ধরে টেনে আমার কাছে এনে জানতে চাইলাম, লোকটা তোমাকে মারছে কেন? সে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে, অনবরত চোখের পানি পড়ছে, তোমার নাম কি? আমার কথা যেন তার কানে যায়নি, ভয়ার্ত চোখে লোকটির দিকে তাকিয়ে আছে, লোকটা এবার চেঁচিয়ে উঠলো, কেন খামাখা আমার সময় নষ্ট করছেন? আপনাকে তো যেতে বলেছি । ততক্ষণে বেশ কিছু মানুষ এসে জড়ো হয়েছে, সবার একই প্রশ্ন কি হয়েছে ? আমি মোবাইলে স্হানীয় থানায় কল দিচ্ছি, কিন্তু কল যাচ্ছে না ।

আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকটি জিজ্ঞেস করল , ঘটনা কি ভাইয়া? ইতিমধ্যে যা দেখেছি তাকে বলতেই এক পলকে লোকটার গলা চেপে ধরে এক ঘুষিতে নিচে ফেলে দিল। কোন রকমে তাকে থামিয়ে বললাম অন্যায়ের প্রতিবাদ অন্যায় দিয়ে হয়না, ঠিক তখনই চেনা কন্ঠে আওয়াজ এল , " আরে বাপ্পি আপনি এখানে? " । পিছনে তাকিয়ে দেখি এস আই সাইফুল ইসলাম নূর ভাই মাথার হেলমেট খোলতে খোলতে মোটরবাইক থেকে নামছে, গায়ে পুলিশের ইউনিফর্ম পরা নুর ভাই কে দেখে আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। এতক্ষণ উচু গলায় কথা বলা দোকানী , ফজলু মিয়ার চেহারায় স্পষ্ট ভয়ের ছাপ ফুটে উঠেছে । এবার নিজ থেকেই গড়গড় করে বলে যাচ্ছিল, তার কোন দোষ নাই, ছেলের মা বলেছে কথা না শুনলে শাসন করতে। ছেলেটির নাম আরিফ, আজ থেকে চার মাস আগে তার মা নিজে এসে, ছেলেকে কাজ শিখার জন্য এখানে দিয়ে গেছে, এখন পর্যন্ত দিনে দুবেলা খাবার ছাড়া কোন বেতন পায়না সে।

এতক্ষণে দোকানের ভিতরে আমার চোখ বুলানো হয়ে গেছে, ফজলু মিয়া এখনও বলে যাচ্ছে, গত চার মাসে কোন কাজ শিখেনি, সে ভীষণ ফাঁকিবাজ । কোন কাজ ঠিক মতো করতে পারে না, আজ এটা ভাঙে তো কাল ওটা ,কিছু বললেই কাঁদে , এই দেখুন আমার এক বস্তা কাপর ওয়াশ করে নাই ।

আরিফ তখনও নিরবে কাঁদছে , সব শুনে ক্ষীণ গলায় বলল ডান হাত ব্যাথা কাজ করতে করতে তাই ধুতে পারেনি কাপর গুলো, সাথে সাথে মিথ্যুক কোথাকার বলে চেঁচিয়ে উঠলো ফজলু মিয়া । আমি আরিফ কে নিয়ে দোকানের বাইরে চলে এলাম, তার ছোট্ট মুখের দিকে তাকিয়ে খুব মায়া হচ্ছে, চড় খাওয়া গালটা বেশ ফুলে গেছে ।

ইতিমধ্যে জানতে পারলাম, আরিফ ক্লাস এইট তে পড়ত, সে এখনও লেখা পড়া করতে চায়, তার মা নাজমার ও একই ইচ্ছা ছিল, বেশ কয়েক মাস ধরে নাজমার শ্বাস কষ্টটা বেড়ে গেছে, ঠিক মতো কাজ করতে পারে না, মায়ের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে আরিফ সিদ্ধান্ত নেয় নিজে কাজ করবে । তোমার বাবা কই ? প্রশ্ন টা শুনে কষ্টের দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আমার বয়স যখন তিন বছর, তখন বাবা মারা গেছে , বাবার চেহারা টাও তার মনে নাই , একমাত্র মা ছাড়া এই দুনিয়াতে তার আর কেউ নাই । মা একটি হোটেলে থালা বাসন ধুয়া মুছার কাজ করে, রাতের খাবার টা সেখান থেকে আসে, লক্ষ করলাম ছেলে টা খুব রোগাটে, মাথার চুল গুলো অপুষ্টির জন্য হালকা লাল রংয়ের, গলার নিচের হাড় দুটি চামড়া ভেদ করে তাদের অবস্থান জানান দিচ্ছে । এস আই নূর ভাইয়ের এর ডাক শুনে তাকিয়ে দেখি তার হাতে কিছু টাকা, ফজলু মিয়ার কাছ থেকে আরিফের ক্ষতিপূরণ হিসেবে আদায় করেছে ।

শফিকুল সহ আরিফের বাসায় গিয়ে যা দেখলাম, তাতে আমার চোখের কোণে, কখন যে পানি জমে উঠেছে টেরই পাইনি, আরিফের মা নাজমা ছোট্ট একটা ভাঙা ঘরে জীর্ণ শরীরে শুয়ে আছে, গায়ে জ্বর, চার দিন হল কাজে যেতে পারেনি। প্রতিবেশীদের এক বেলা খাবারে কোন রকমে দিন যাচ্ছে, পুলিশ সহ আমাদের সবাইকে দেখে নাজমা প্রচন্ড ভয়ে কাঁপতে শুরু করল , তাকে আশ্বস্ত করে সমস্ত ঘটনা খুলে বলতেই, ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নাজমা হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল । আমি তাকে বুঝিয়ে বললাম আরিফের পড়াশোনা সহ তাদের দুজনের দ্বায়িত্ব আমি নিতে চাই, কথাটা শুনে নাজমা অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইল, পরের দিন সকালে তাদের দুজনকে ডাক্তার দেখানো হল, মা ছেলে দুজনই রক্ত শুন্যতায় ভুগছে, নাজমার শ্বাসকষ্ট ছাড়া আর কোন কঠিন রোগ না থাকায় নিশ্চিন্ত হলাম ।
শহর থেকে অদূরে মানিকগঞ্জ এ থাকা আমাদের সামান্য জমিতে ,তাদের থাকার জন্য ছোট একটা ঘর তুলে দিলাম,আরিফ কে হাজি বুরহান উদ্দিন স্কুলে ভর্তি করা হল, ঘটনাটি ৭ বছর আগের কথা, তখন আমিও খুব বেশি বড় না তাই খরচ সামলানোর মত সাবলম্বি ছিলাম না, তাই আরিফের পরাশুনার জন্য কিছু পরিচিত ভাই এবং আমার পরিচিত কিছু বিদেশি সাহায্য এর জন্য ব্যবস্থা করে দি!
আশ্চর্যের বিষয় কি জানেন?? সেই ছোট আরিফ আজ ডাক্তারী পরছে! ইন্ডিয়ায় গিয়েছে এম বি বি এস করতে!

নাজমা খুব কর্মঠ আর বুদ্ধিমতী, সে দিনের পর থেকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে, হাঁস, মুরগি, ছাগল লালন পালন করে, নাজমা নাকি বেশ কিছু টাকা জমিয়েছে, মুখ ভার হাসি নিয়ে বলছিল সেদিন, টাকা গুলো একমাত্র সন্তানের বিয়েতে খরচ করবে ।
দোয়া করবেন আরিফের জন্য যেন ডাক্তার এর মত ডাক্তার হতে পারে!

- সংগ্রহ
বর্ণ হাসান বাপি ভাই

সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই আগস্ট, ২০১৮ রাত ৩:১১
৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার একান্ত মুহূর্ত কি লুকানো ক্যামেরায় বন্দি হচ্ছে, জেনে নিন শনাক্তের উপায়

লিখেছেন নতুন নকিব, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:৩৬

আপনার একান্ত মুহূর্ত কি লুকানো ক্যামেরায় বন্দি হচ্ছে, জেনে নিন শনাক্তের উপায়

USB Charger এর ভেতরে লুকানো ক্যামেরার ছবিটি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

ভূমিকা

ভ্রমণ মানেই নতুন জায়গা দেখা, প্রিয়জনের সাথে সময় কাটানো... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের সেই মানুষগুলো কোথায় গেলো

লিখেছেন অর্ক, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:২৬



স্বাধীনতা পরবর্তী, পচাত্তর পরবর্তী সময়ের ঘটনা। পচাত্তরের পনেরোই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। ক্যু হয়েছে দেশে। সামরিক বাহিনীতে সংঘাত। বহু সদস্য হতাহত। জেনারেল জিয়া অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভুটান ও বাক স্বাধীনতা!

লিখেছেন সাহাদাত উদরাজী, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:৪৪

ভুটানের নাগরিকদের জন্য দেশটির সরকার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা নিশ্চিত করেছে, যা দেশটির "গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস" (GNH) দর্শনের মূল ভিত্তি। ভুটানের সাধারণ মানুষ মূলত যে সমস্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাঝা

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:০৬



বর্তমানে জনসংখ্যার বিচারে 'বিহার' ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম রাজ্য।
বিহারের রাজধানী পাটনা। বিহার মূলত দরিদ্র অঞ্চল বলা যেতে পারে। এখানে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় আছে। অনেক পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয়। নালন্দা ছিলো মূলত... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ কি ক্যাশলেস সোসাইটি এর জন্য কি পারফেক্ট?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০



এটা বাংলা কিউ আর কোড। বাংলাদেশ ব্যাংক সকল ব্যাবসায়ীদের বাংলা কিউ আর কোড বাধ্যতামূলক করেছেনভ এটার ভালো দিক ও খারাপ দিক দুইটাই আছে। বাংলাদেশের সিস্টেম, কারিগরি দক্ষতা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×