somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সবচেয়ে বিপজ্জনক শিকার (ধারাবাহিক রোমাঞ্চ গল্প, প্রথম পর্ব)

২৩ শে জানুয়ারি, ২০০৭ সকাল ১১:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মুল: রিচার্ড কনেল (1932)

[ইটালিক]রিচার্ড কনেলের 'দ্য মোস্ট ডেঞ্জারাস গেম' কে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ রোমাঞ্চ গল্পগুলোর একটা বলে ধরা হয় । সৈয়দ মুজতবা আলী থেকে কাজী আনোয়ার হোসেন অনেকই এর সুখপাঠ্য অণুবাদ করেছেন । নগন্য আমিও কেন এই মহাজনো পন্থায় গেলাম সে কৈফিয়ত না দিয়ে বলি গল্পটা আমার ভীষণ প্রিয় । গল্পটার ছায়া অবলম্বনে বিটিভিতেও একটা (অত্যন্ত অখাদ্য ) নাটক প্রচার হয়েছে একবার । আগেও একবার অনুবাদ করেছিলাম, কিন্তু ফাইল হারিয়ে গেছে ।

গল্পের শুরুতে দেখি হুইটনি আর রেইন্সফোর্ড দুই বন্ধু ইয়টে করে ক্যারিবিয়ান সাগর ধরে ব্রাজিলের আমাজন জঙ্গলে জাগুয়ার শিকার করতে যাচ্ছে । হুইটনির সাথে রেইন্সফোর্ডের প্রাথমিক কথোপকথনে আমরা দেখি শিকার-শিকারী কিঞ্চিত খুচরা আলাপ করছে, আমরা আরো শুনি এখানে একটা অভিশ্প্ত দ্বীপ আছে আশপাশেই । সেটা পার হয়ে গেলেই নাবিকরা খুশি...বাকিটা আশা করি পাঠকরা জানতে পারবেন । [/ইটালিক]


'সামনে ডানদিকে একটা বড়সড় দ্বীপ আছে,' বলল হুইটনি । 'দ্বীপটা বেশ রহস্যময় ।'

'কী নাম দ্বীপটার?' রেইন্সফোর্ডের প্রশ্ন ।

'পুরনো জাহাজী চার্টগুলতে একে 'শিপট্র্যাপ আইল্যান্ড' বলা হয়েছে,' হুইটনির উত্তর । 'বেশ লাগসই নাম তাই না ?'

'দেখতে পাচ্ছি না,' ইয়টটাকে চেপে বসা সামনের উষ্ণ, আদর্্র অন্ধকার ভেদ করে সামনে দেখার চেষ্টা করে বলল রেইন্সফোর্ড ।

'তোমার চোখ ভাল,' হাসল হুইটনি । 'আমি চারশো গজ দূরে শরতের বনে মুজ হরিণ ফেলে দিতে দেখেছি । কিন্তু তুমিও চাঁদহীণ ক্যারিবিয়ান সাগরের অন্ধকার ভেদ করে চার মাইলের মতন দূরে দেখতে পাও না ।'

'চার গজও না ,' স্বীকার করল রেইন্সফোর্ড । 'উফ, একেবারে ভেজা কালো মখমলের মতন অন্ধকার ।'

'রিওতে আলোর কোন অভাব হবে না,' আশ্বাস দিল হুইটনি । 'আমরা কয়েকদিনের মধ্যেই পৌঁছে যাবো । আশা করি পার্ডি কোম্পানি থেকে জাগুয়ার মারা বন্দুকগুলো পৌঁছে গেছে । আমাজন নদীর উজানে চমৎকার শিকার হবে আমাদের ।'

'পৃথিবীর সেরা বিনোদন,' একমত হল রেইন্সফোর্ড ।

'শিকারীর জন্য,' সংশোধন করল হুইটনি । 'শিকারের জন্য নয় ।'

'বাজে কথা বোলো না হুইটনি,' বলল রেইন্সফোর্ড । 'তুমি একজন বড় শিকারী । একটা জাগুয়ারের কী রকম লাগল করবে সেটা নিয়ে কে মাথা ঘামাবে ?'

'হয়তো জাগুয়ার বোধ করবে সেটা,' হুইটনির পর্যবেক্ষণ ।

'ফুহ! ওদের চিন্তাশক্তিই নেই !'

'তাহলেও আমার মনে হয় ওদের একটা বোধশক্তি আছে । মৃত্যু আর ব্যাথা সব প্রাণীই বোঝে ।'

'ননসেন্স,' হেসে উঠল রেইন্সফোর্ড । 'আসলে এই গরম আবহাওয়ায় মিইয়ে গেছ তুমি । বাস্তববাদী হও, দুনিয়াটা দুটো শ্রেণীতে বিভক্ত । শিকার আর শিকারী, ভাগ্যক্রমে তুমি আর আমি দ্বিতীয় দলের অন্তর্ভুক্ত । তোমার কী মনে হয় আমরা দ্বীপটা ছাড়িয়ে এসেছি ?'

'এই আঁধারে আমি সঠিক বলতে পারছি না । আশা করি তাই ।'

'কেন?' রেইন্সফোর্ডের জিজ্ঞাসা ।

'জায়গাটার একটা নাম আছে । বদনাম ।'

'নরখাদকদের আবাস আছে?' রেইন্সফোর্ডের প্রশ্ন ।

'মনে হয় না । এমন কী নরখাদকরাও এমন বাজপড়া জায়গায় থাকতে চাইবে না । কিন্তু যে করেই হোক এর নাম নাবিকদের গল্পকথায় ঢুকে গেছে । তুমি দেখো নি আজকে আমাদের ক্রুরা কেমন নার্ভাস আচরণ করছে ?'

'হু, ব্যাপারটা বেশ অবাক করেছে আমাকে । এমন কী ক্যাপ্টেন নিলসেনও--'

'হ্যাঁ, এমন কী সেই কাঠখোট্টা দুঃসাহসী সুইডিশ বুড়োটাও, যে কিনা খোদ শয়তানের কাছে গিয়ে পাইপ ধরানোর আগুন চাইতে পারে সেও ঘাবড়েছে খানিকটা । ওর মাছের মত ভাবলেশহীণ নীল চোখজোড়ায় এমন দৃষ্টি দেখিনি কখনো । জিগ্যেস করে যেটুকু জানতে পারলাম 'এ জায়গার খুব বদনাম আছে স্যার ।' বলে খুব গম্ভীরভাবে আমাকে জিগ্যেস করল, 'আপনি কিছু টের পাচ্ছেন না স্যার?' যেন বাতাসটাই বিষাক্ত হয়ে উঠেছে । আমার কথা শুনে হেসো না, আমার সত্যি একটা গা শিরশির করা অণুভুতি হয়েছিল । একফোঁটা বাতাস বইছিলো না কোনখানে, সাগর একেবারে আয়নার মত শান্ত, আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম দ্বীপটার দিকে । আমি হঠাৎ আতংকিত বোধ করলাম ।'

'স্রেফ কল্পনা,' রায় দিল রেইন্সফোর্ড । 'একজন কুসংস্কারগ্রস্ত নাবিক, পুরো জাহাজটাকে পচিয়ে দিতে পারে ।'

'হতে পারে । তাহলেও বলব, নাবিকদের সাধারনত বিপদে পড়ার আগেই টের পায় । আমার কখনো কখনো মনে হয় যে অশুভ একটা ধরাছোঁয়া যায় এমন জিনিস, মানে শব্দ বা আলোর মতই এর তরঙ্গ দৈর্ঘ আছে । একটা অশুভ জায়গা নিজের অস্তিত্বের কথা রীতিমত ব্রডকাস্ট করে যদি সেভাবে বলতে পারি । এ জায়গা থেকে বেরিয়ে আসছি বলে আমি খুশি ।'

'আমর ঘুম পায়নি,' বলল রেইন্সফোর্ড । 'আফটারডেকে বসে আরেকটা পাইপ টানব আমি ।'

'তাহলে গুডনাইট রেইন্সফোর্ড । ব্রেকফাস্টে দেখা হবে আবার ।'

'ঠিক, গুডনাইট হুইটনি ।'

ইয়টের এঞ্জিনের ভোঁতা শব্দ আর প্রপেলারের পানি কেটে এগোনোর শব্দ ছাড়া আর কোন আওয়াজ রেইন্সফোর্ডের কানে আসছে না । স্টিমার চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে মনের আনন্দে পাইপ ফুঁকছে রেইন্সফোর্ড । তন্দ্রায় বুঁজে আসছে তার চোখ । 'রাতটা এত অন্ধকার যে আমি চোখের পাতা খোলা রেখেই ঘুমাতে পারি,' আপন মনে বিড়বিড় করে বলল ও ।

হঠাৎ একটা শব্দে চমকে জেগে উঠল ও । ডানদিক থেকে এসেছে আওয়াজটা, ওর কান এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ, এসব ব্যাপারে ভুল হয় না আন্দাজে । আবার হল শব্দটা, অন্ধকারে কেউ পর পর তিনবার গুলি করেছে ।

এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে রেলিংএর কাছে গিয়ে দাঁড়াল তাজ্জব রেইন্সফোর্ড । অন্ধকার ভেদ করে কিছু দেখার চেষ্টা করছে ও, কিন্তু সেটা কম্বলের মধ্যে দিয়ে দেখার মতই অসম্ভব কাজ । রেলিংএর উপর উঠে গেল ও আরো ভাল করে দেখার জন্য । ওর মুখের পাইপটা জাহাজের একটা দড়িতে বাড়ি খেয়ে ছিটকে পড়ল মুখ থেকে । ওটাকে ধরার জন্য হাত বাড়াল, যখন ও বুঝল ভারসাম্য হারিয়েছে ও অস্ফুট একট আর্তচিৎকার বেরোল ওর মুখ থেকে । ক্যারিবিয়ান সাগরের তপ্ত পানিতে ওর মাথাটা ডুবে যেতেই চিৎকারটা থেমে গেল ।

ভুস করে পানির উপর ভেসে উঠে চিৎকার করতে চাইল রেইন্সফোর্ড । কিন্তু প্রোপেলার থেকে তোড়ে বেরিয়ে আসা পানি ওর মুখ বন্ধ করে দিল । নোনাপানিতে জ্বালা করছে গলা । দ্রুত ইয়টের অপসৃয়মান আলোর দিকে সাঁতরাতে শুরু করেছিল ও । কিন্তু পঞ্চাশ ফিট যাবার আগেই থেমে গেল ও । মাথা ঠান্ডা করে চিন্তা করছে, এমন নয় এই প্রথমবার একটা কঠিন, বিপদজ্জনক পরিস্থিতিতে পড়েছে ও । হতে পারে ওর চিৎকার ইয়টের কেউ শুনছে, কিন্তু সে সম্ভাবনা খুবই কম । জামাকাপড় ছেড়ে শরীরের সমস্ত শক্তি জড় করে চিৎকার করল ও । কিন্তু ইয়টের আলো জোনাকির মত টিমটিমে হয়ে রাতের অন্ধকারে পুরো মিলিয়ে গেল ।

গুলির শব্দের কথা মনে পড়ল রেইন্সফোর্ডের । শব্দটা ডানদিক থেকে এসেছিল, ঘুরে সেদিকে সাঁতরাতে শুরু করল ও । ধীরে ধীরে, শক্তি বাঁচিয়ে বাহু বিক্ষেপ করছে ও । মনে হল, অনন্তকালের জন্য সাগরের বিরুদ্ধে যুঝছে ও । স্ট্রোক গুনতে শুরু করল ও অবশেষে, খুব বেশী হলে আর শ'খানেক বারের মত হাত নাড়তে পারবে ও, তারপর--

শব্দটা শুনতে পেল রেইন্সফোর্ড । অন্ধকার থেকে আসছে কোন তীব্র যন্ত্রণাদীর্ণ আতংকিতপ্রাণীর তীক্ষ্ণ চিৎকার ।

জানোয়ার ঠিক কী রকম বুঝতে পারল না রেইন্সফোর্ড । সে চেষ্টাও করেনি ও অবশ্য, নতুন উদ্যমে সাঁতরাতে শুরু করেছ ও, তীর কাছেই আছে বোঝা যাচ্ছে । আবার শব্দটা হল, কিন্তু মাঝপথে কেটে গেল তা আরেকটা তীক্ষ্ণ, সংক্ষিপ্ত শব্দে ।

'পিস্তলের আওয়াজ,' সাঁতরাতে সাঁতরাতে বিড়বিড় করল রেইন্সফোর্ড ।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জানুয়ারি, ২০০৭ সকাল ৭:৫৩
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গুম আর গুপ্ত

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ২৫ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:১৫


খোঁজ করলে দেখাি যাবে, কুকুর-বিড়াল পালকদের অনেক কাছের আত্মীয়-পরিজন অনেক কষ্টে জীবন কাটাচ্ছে। তাদের প্রতি কোনও দয়া-মায়া নেই; অথচ পশুদের জন্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ১৮৯

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৫ শে এপ্রিল, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০৫



মসজিদে বসে মদ খেতে দাও, অথবা সেই জায়গাটা দেখাও যেখানে আল্লাহ নেই।

বহুদিন ধরে গল্প লেখা হয় না!
অথচ আমার গল্প লিখতে ভালো লাগে। সস্তা প্রেম ভালোবাসা বা আবেগের... ...বাকিটুকু পড়ুন

=পাতার ছাতা মাথায় দিয়ে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৫ শে এপ্রিল, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৯


মনে আছে ছেলেবেলায়
ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি এলে,
পাতার ছাতা মাথায় দিয়ে
হাঁটতাম পথে এলেবেলে।

অতীত দিনের বৃষ্টির কথা
কার কার দেখি আছে মনে?
শুকনো উঠোন ভিজতো যখন
খেলতে কে বলো - আনমনে?

ঝুপুর ঝাপুর ডুব দিতে কী
পুকুর জলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

তালেবান ঢাকায়, রাষ্ট্র ঘুমায়

লিখেছেন মেহেদি হাসান শান্ত, ২৫ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:৩২

জুলাই অভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশে অনেক কিছু নতুন হইছে। নতুন সরকার, নতুন মুখ, নতুন বুলি। কিন্তু একটা জিনিস খুব চুপচাপ, খুব সাবধানে নতুন হইতেছে, যেইটা নিয়া কেউ গলা ফাটাইতেছে না। তালেবানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুখোশ খুলে গেছে ও আয়না ভাঙ্গা শুরু হয়েছে!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৮:৫৬

মুখোশ খুলে গেছে ও আয়না ভাঙ্গা শুরু হয়েছে!

image upload problem

বাংলাদেশে একসময় খুব জনপ্রিয় একটা পরিচয়-“আমি সুশীল”, “আমি নিরপেক্ষ”, “আমি কোনো দলের না”। এই পরিচয় ছিল আরামদায়ক, নিরাপদ, সম্মানজনক। এর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×