[ইটালিক]রিচার্ড কনেলের 'দ্য মোস্ট ডেঞ্জারাস গেম' কে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ রোমাঞ্চ গল্পগুলোর একটা বলে ধরা হয় । সৈয়দ মুজতবা আলী থেকে কাজী আনোয়ার হোসেন অনেকই এর সুখপাঠ্য অণুবাদ করেছেন । নগন্য আমিও কেন এই মহাজনো পন্থায় গেলাম সে কৈফিয়ত না দিয়ে বলি গল্পটা আমার ভীষণ প্রিয় । গল্পটার ছায়া অবলম্বনে বিটিভিতেও একটা (অত্যন্ত অখাদ্য ) নাটক প্রচার হয়েছে একবার । আগেও একবার অনুবাদ করেছিলাম, কিন্তু ফাইল হারিয়ে গেছে ।
গল্পের শুরুতে দেখি হুইটনি আর রেইন্সফোর্ড দুই বন্ধু ইয়টে করে ক্যারিবিয়ান সাগর ধরে ব্রাজিলের আমাজন জঙ্গলে জাগুয়ার শিকার করতে যাচ্ছে । হুইটনির সাথে রেইন্সফোর্ডের প্রাথমিক কথোপকথনে আমরা দেখি শিকার-শিকারী কিঞ্চিত খুচরা আলাপ করছে, আমরা আরো শুনি এখানে একটা অভিশ্প্ত দ্বীপ আছে আশপাশেই । সেটা পার হয়ে গেলেই নাবিকরা খুশি...বাকিটা আশা করি পাঠকরা জানতে পারবেন । [/ইটালিক]
'সামনে ডানদিকে একটা বড়সড় দ্বীপ আছে,' বলল হুইটনি । 'দ্বীপটা বেশ রহস্যময় ।'
'কী নাম দ্বীপটার?' রেইন্সফোর্ডের প্রশ্ন ।
'পুরনো জাহাজী চার্টগুলতে একে 'শিপট্র্যাপ আইল্যান্ড' বলা হয়েছে,' হুইটনির উত্তর । 'বেশ লাগসই নাম তাই না ?'
'দেখতে পাচ্ছি না,' ইয়টটাকে চেপে বসা সামনের উষ্ণ, আদর্্র অন্ধকার ভেদ করে সামনে দেখার চেষ্টা করে বলল রেইন্সফোর্ড ।
'তোমার চোখ ভাল,' হাসল হুইটনি । 'আমি চারশো গজ দূরে শরতের বনে মুজ হরিণ ফেলে দিতে দেখেছি । কিন্তু তুমিও চাঁদহীণ ক্যারিবিয়ান সাগরের অন্ধকার ভেদ করে চার মাইলের মতন দূরে দেখতে পাও না ।'
'চার গজও না ,' স্বীকার করল রেইন্সফোর্ড । 'উফ, একেবারে ভেজা কালো মখমলের মতন অন্ধকার ।'
'রিওতে আলোর কোন অভাব হবে না,' আশ্বাস দিল হুইটনি । 'আমরা কয়েকদিনের মধ্যেই পৌঁছে যাবো । আশা করি পার্ডি কোম্পানি থেকে জাগুয়ার মারা বন্দুকগুলো পৌঁছে গেছে । আমাজন নদীর উজানে চমৎকার শিকার হবে আমাদের ।'
'পৃথিবীর সেরা বিনোদন,' একমত হল রেইন্সফোর্ড ।
'শিকারীর জন্য,' সংশোধন করল হুইটনি । 'শিকারের জন্য নয় ।'
'বাজে কথা বোলো না হুইটনি,' বলল রেইন্সফোর্ড । 'তুমি একজন বড় শিকারী । একটা জাগুয়ারের কী রকম লাগল করবে সেটা নিয়ে কে মাথা ঘামাবে ?'
'হয়তো জাগুয়ার বোধ করবে সেটা,' হুইটনির পর্যবেক্ষণ ।
'ফুহ! ওদের চিন্তাশক্তিই নেই !'
'তাহলেও আমার মনে হয় ওদের একটা বোধশক্তি আছে । মৃত্যু আর ব্যাথা সব প্রাণীই বোঝে ।'
'ননসেন্স,' হেসে উঠল রেইন্সফোর্ড । 'আসলে এই গরম আবহাওয়ায় মিইয়ে গেছ তুমি । বাস্তববাদী হও, দুনিয়াটা দুটো শ্রেণীতে বিভক্ত । শিকার আর শিকারী, ভাগ্যক্রমে তুমি আর আমি দ্বিতীয় দলের অন্তর্ভুক্ত । তোমার কী মনে হয় আমরা দ্বীপটা ছাড়িয়ে এসেছি ?'
'এই আঁধারে আমি সঠিক বলতে পারছি না । আশা করি তাই ।'
'কেন?' রেইন্সফোর্ডের জিজ্ঞাসা ।
'জায়গাটার একটা নাম আছে । বদনাম ।'
'নরখাদকদের আবাস আছে?' রেইন্সফোর্ডের প্রশ্ন ।
'মনে হয় না । এমন কী নরখাদকরাও এমন বাজপড়া জায়গায় থাকতে চাইবে না । কিন্তু যে করেই হোক এর নাম নাবিকদের গল্পকথায় ঢুকে গেছে । তুমি দেখো নি আজকে আমাদের ক্রুরা কেমন নার্ভাস আচরণ করছে ?'
'হু, ব্যাপারটা বেশ অবাক করেছে আমাকে । এমন কী ক্যাপ্টেন নিলসেনও--'
'হ্যাঁ, এমন কী সেই কাঠখোট্টা দুঃসাহসী সুইডিশ বুড়োটাও, যে কিনা খোদ শয়তানের কাছে গিয়ে পাইপ ধরানোর আগুন চাইতে পারে সেও ঘাবড়েছে খানিকটা । ওর মাছের মত ভাবলেশহীণ নীল চোখজোড়ায় এমন দৃষ্টি দেখিনি কখনো । জিগ্যেস করে যেটুকু জানতে পারলাম 'এ জায়গার খুব বদনাম আছে স্যার ।' বলে খুব গম্ভীরভাবে আমাকে জিগ্যেস করল, 'আপনি কিছু টের পাচ্ছেন না স্যার?' যেন বাতাসটাই বিষাক্ত হয়ে উঠেছে । আমার কথা শুনে হেসো না, আমার সত্যি একটা গা শিরশির করা অণুভুতি হয়েছিল । একফোঁটা বাতাস বইছিলো না কোনখানে, সাগর একেবারে আয়নার মত শান্ত, আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম দ্বীপটার দিকে । আমি হঠাৎ আতংকিত বোধ করলাম ।'
'স্রেফ কল্পনা,' রায় দিল রেইন্সফোর্ড । 'একজন কুসংস্কারগ্রস্ত নাবিক, পুরো জাহাজটাকে পচিয়ে দিতে পারে ।'
'হতে পারে । তাহলেও বলব, নাবিকদের সাধারনত বিপদে পড়ার আগেই টের পায় । আমার কখনো কখনো মনে হয় যে অশুভ একটা ধরাছোঁয়া যায় এমন জিনিস, মানে শব্দ বা আলোর মতই এর তরঙ্গ দৈর্ঘ আছে । একটা অশুভ জায়গা নিজের অস্তিত্বের কথা রীতিমত ব্রডকাস্ট করে যদি সেভাবে বলতে পারি । এ জায়গা থেকে বেরিয়ে আসছি বলে আমি খুশি ।'
'আমর ঘুম পায়নি,' বলল রেইন্সফোর্ড । 'আফটারডেকে বসে আরেকটা পাইপ টানব আমি ।'
'তাহলে গুডনাইট রেইন্সফোর্ড । ব্রেকফাস্টে দেখা হবে আবার ।'
'ঠিক, গুডনাইট হুইটনি ।'
ইয়টের এঞ্জিনের ভোঁতা শব্দ আর প্রপেলারের পানি কেটে এগোনোর শব্দ ছাড়া আর কোন আওয়াজ রেইন্সফোর্ডের কানে আসছে না । স্টিমার চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে মনের আনন্দে পাইপ ফুঁকছে রেইন্সফোর্ড । তন্দ্রায় বুঁজে আসছে তার চোখ । 'রাতটা এত অন্ধকার যে আমি চোখের পাতা খোলা রেখেই ঘুমাতে পারি,' আপন মনে বিড়বিড় করে বলল ও ।
হঠাৎ একটা শব্দে চমকে জেগে উঠল ও । ডানদিক থেকে এসেছে আওয়াজটা, ওর কান এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ, এসব ব্যাপারে ভুল হয় না আন্দাজে । আবার হল শব্দটা, অন্ধকারে কেউ পর পর তিনবার গুলি করেছে ।
এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে রেলিংএর কাছে গিয়ে দাঁড়াল তাজ্জব রেইন্সফোর্ড । অন্ধকার ভেদ করে কিছু দেখার চেষ্টা করছে ও, কিন্তু সেটা কম্বলের মধ্যে দিয়ে দেখার মতই অসম্ভব কাজ । রেলিংএর উপর উঠে গেল ও আরো ভাল করে দেখার জন্য । ওর মুখের পাইপটা জাহাজের একটা দড়িতে বাড়ি খেয়ে ছিটকে পড়ল মুখ থেকে । ওটাকে ধরার জন্য হাত বাড়াল, যখন ও বুঝল ভারসাম্য হারিয়েছে ও অস্ফুট একট আর্তচিৎকার বেরোল ওর মুখ থেকে । ক্যারিবিয়ান সাগরের তপ্ত পানিতে ওর মাথাটা ডুবে যেতেই চিৎকারটা থেমে গেল ।
ভুস করে পানির উপর ভেসে উঠে চিৎকার করতে চাইল রেইন্সফোর্ড । কিন্তু প্রোপেলার থেকে তোড়ে বেরিয়ে আসা পানি ওর মুখ বন্ধ করে দিল । নোনাপানিতে জ্বালা করছে গলা । দ্রুত ইয়টের অপসৃয়মান আলোর দিকে সাঁতরাতে শুরু করেছিল ও । কিন্তু পঞ্চাশ ফিট যাবার আগেই থেমে গেল ও । মাথা ঠান্ডা করে চিন্তা করছে, এমন নয় এই প্রথমবার একটা কঠিন, বিপদজ্জনক পরিস্থিতিতে পড়েছে ও । হতে পারে ওর চিৎকার ইয়টের কেউ শুনছে, কিন্তু সে সম্ভাবনা খুবই কম । জামাকাপড় ছেড়ে শরীরের সমস্ত শক্তি জড় করে চিৎকার করল ও । কিন্তু ইয়টের আলো জোনাকির মত টিমটিমে হয়ে রাতের অন্ধকারে পুরো মিলিয়ে গেল ।
গুলির শব্দের কথা মনে পড়ল রেইন্সফোর্ডের । শব্দটা ডানদিক থেকে এসেছিল, ঘুরে সেদিকে সাঁতরাতে শুরু করল ও । ধীরে ধীরে, শক্তি বাঁচিয়ে বাহু বিক্ষেপ করছে ও । মনে হল, অনন্তকালের জন্য সাগরের বিরুদ্ধে যুঝছে ও । স্ট্রোক গুনতে শুরু করল ও অবশেষে, খুব বেশী হলে আর শ'খানেক বারের মত হাত নাড়তে পারবে ও, তারপর--
শব্দটা শুনতে পেল রেইন্সফোর্ড । অন্ধকার থেকে আসছে কোন তীব্র যন্ত্রণাদীর্ণ আতংকিতপ্রাণীর তীক্ষ্ণ চিৎকার ।
জানোয়ার ঠিক কী রকম বুঝতে পারল না রেইন্সফোর্ড । সে চেষ্টাও করেনি ও অবশ্য, নতুন উদ্যমে সাঁতরাতে শুরু করেছ ও, তীর কাছেই আছে বোঝা যাচ্ছে । আবার শব্দটা হল, কিন্তু মাঝপথে কেটে গেল তা আরেকটা তীক্ষ্ণ, সংক্ষিপ্ত শব্দে ।
'পিস্তলের আওয়াজ,' সাঁতরাতে সাঁতরাতে বিড়বিড় করল রেইন্সফোর্ড ।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জানুয়ারি, ২০০৭ সকাল ৭:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।






