যখন ঘুম ভাঙ্গলো, তখন আকাশে সুর্যের অবস্থান থেকে বুঝল বিকেল গড়িয়ে গেছে । ঘুম দিয়ে তরতাজা বোধ করছে সে, পেটের ভিতর চনমনে খিদে ঠোকরাচ্ছে ।
'যেখানেই পিস্তলের গুলি সেখানেই মানুষ; আর যেখানেই মানুষ, সেখানেই খাবার,' ভাবল রেইন্সফোর্ড । কিন্তু ঠিক কোন ধরনের মানুষ এই বিরান দ্বীপে বাস করে? একদম নিশি্ছদ্র জঙ্গলে ঢেকে আছে সমস্ত উপকুল । ঝোপঝাড়ের জটলার মধ্যে দিয়ে পথ চলার কোন রাস্তা খুঁজে পেল না ও । উপকুল ধরে পথ চলাই সবচেয়ে সুবিধাজনক । ও যেখানে প্রথম উঠছিল সেখানে গিয়ে থমকে গেল ।
কোন একট প্রাণী--আলামত দেখে বোঝা যায় বেশ বড় প্রাণী-- ঝোপের নীচে ধ্বস্তাধ্বস্তি করেছে । আগাছা, শ্যাওলা উঠে গেছে জায়গায় জায়গায়, খানিকটা জায়গা রক্তে লাল হয়ে গেছে । একটা ছোট্ট চকচকে জিনিস চোখে পড়াতে ও তুলের নিল ওটা । জিনিসটা একটা কার্তুজের খোসা ।
'পয়েন্ট টু টু, গুলি,' আপন মনে বলল রেইন্সফোর্ড । 'ব্যাপারটা অদ্ভুত, দেখে শুনে মনে হচ্ছে জানোয়ারটা বেশ বড়ই ছিল । এত ছোট বোরের অস্ত্র দিয়ে সে এটাকে মোকাবিলা করেছে, শিকারীর নার্ভ আছে বলতে হবে । জানোয়ারটা যে লড়াই করেছে সেটা বোঝাই যাচ্ছে, আমার মনে হব প্রথম যে তিনটা গুলির শব্দ শুনেছিলাম তা আসলে শিকারীর প্রথম গুলিবর্ষন, তারপরে সে জন্তুটাকে তাড়িয়ে এখানে এনে শেষ গুলিতে খতম করেছে ।'
ভাল করে মাটি পরীক্ষা করে যা খুঁজছিল পেয়ে গেল সে--একজোড়া হান্টিং বুটের ছাপ । শৈলশিরার প্রান্ত ধরে সে যেদিকে যাচ্ছে, বুটের ছাপও সেদিকে গেছে । আগ্রহের সাথে এগিয়ে চলল রেইন্সফোর্ড, মাঝে পচা গাছের গুঁড়িতে বা আলগা পাথরে হড়কে যাচ্ছে পা, কিন্তু চলার বিরাম নেই ।
সাগর আর অরন্যের উপর আঁধারের চাঁদোয়া যখন নেমে আসছে খন রেইন্সফোর্ড আলো দেখতে পেল । সৈকতের একটা বাঁক ঘুরতেই এতগুলো আলো চোখে পড়ল যে, তার মনে হল যেন একটা গ্রামে এসেছে । কিন্তু সামনে আগে বাড়তেই অবাক বিস্ময়ে সে দেখল সমস্ত আলোই একট প্রকান্ড দালান থেকে আসছে--একটা বিশাল প্রাসাদোপম বাড়ি, মাথায় বসানো টাওয়ারগুলো অন্ধকার আকাশ ছুঁতে চাইছে । অন্ধকারে চোখে পড়ল দালানটার আবছায়া রেখা, একটা শৈলশিরার মাথায় বসানো প্রাসাদটা, তিনদিক থেকে খাড়া পাহার নেমে গেছে সাগর পর্যন্ত যেখানে ক্ষুধার্ত ঢেউগুলো ক্লিফের গোড়া লেহন করছে ।
'মরিচিকা,' ভাবল রেইন্সফোর্ড । কিন্তু যখন লোহার তীক্ষ্ণ শলা বসানো গেটটা খুলল, দেখল ব্যাপারটা কোন দৃষ্টি বিভ্রম নয় । পাথরে বাঁধানো সিঁড়িটা আসলেই বাস্তব, প্রকান্ড সিংহ দরজায় বসানো একটা দাঁত বের করা ড্রাগনের মাথা আকৃতির নকারটা আসলেই আছে । কিন্তু গোটা জায়গাটার মধ্যেই একটা অলীক কুহকের ছায়া খেলা করছে ।
নকারটা তুলতেই কিঁচকিঁচ করে শব্দ হলো, যেন এটা কোনদিন ব্যাবহার করেনি কেউ । নকারটা ছেড়ে দিতেই এর বিকট শব্দে নিজেই চমকে উঠল রেইন্সফোর্ড । মনে হল ভিতরে পায়ের আওয়াজ শোনা গেল, কিন্তু দরজাটা বন্ধ রইল । আবার নকারটা তুলে আওয়াজ করল রেইন্সফোর্ড । দরজাটা এবার এত দ্রুত খুলে গেল যেন পাল্লাটা স্প্রিং লাগানো--ঘরের উজ্জল সোনালী আলোয়ে চোখ ধাঁধিয়ে গেল রেইন্সফোর্ডের । প্রথম রেইন্সফোর্ড জিনিসটা সে দেখল সেটা হচ্ছে তার দেখা সবচেয়ে বিশালদেহী মানুষ--দৈত্যের মতন লোকটার দাড়ি প্রায় কোমর পর্যন্ত নেমে এসেছে । ওর হাতে একটা লম্বা নলওয়ালা রিভলভার, সেটা সে সরাসরি রেইন্সফোর্ডের হৃৎপিন্ড বরাবর তাক করে রেখেছে ।
চুলদাড়ির জঙ্গল থেকে দুটো কুঁতকুঁতে ক্ষুদে চোখ রেইন্সফোর্ডকে দেখছে ।
'ঘাবড়ে যেও না,' মোলায়েম হাসি মুখে টেনে বলল রেইন্সফোর্ড । 'আমি কোন ডাকাত নই । আমি ইয়ট থেকে পানিতে পড়ে গেছি । আমি নিউ ইয়র্কের স্যাংগার রেইন্সফোর্ড ।'
লোকটার চোখের রক্ত পানি করা চাহনি বিন্দুমাত্র পাল্টাল না । রিভলভার ধরা হাতটা যেন পাথর কুঁদে বের করা মুর্তির হাত । রেইন্সফোর্ডের কথা যে বুঝেছে এমন কোন আলামতও পাওয়া গেল না । আস্ত্রাখান উলের বর্ডার দেয়া কালো রঙের ইউনিফর্ম পড়ে আছে দৈত্যটা ।
'আমি নিউ ইয়র্ক শহরের স্যাংগার রেইন্সফোর্ড, আমি ইয়ট থেকে পড়ে গেছি,' আবার শূরু করলো রেইন্সফোর্ড । 'আমি খুব ক্ষুধার্ত ।'
উত্তরে রিভালভারের হ্যামারটা তুলে দিল লোকটা । রেইন্সফোর্ড দেখল লোকটার অন্য হাতটা স্যালুটের ভঙ্গিতে কপালে উঠে গেল । তারপরের মেঝেতে বুট ঠুকে অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়ালো ও । চওড়া মার্বেলের সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছে সান্ধ্য পোশাক পরনে, ঋজু, মেদহীণ একজন মানুষ । রেইন্সফোর্ডের দিকে এগিয়ে হাত বাড়িয়ে ধরলেন তিনি ।
নিঁখুত, মার্জিত অ্যাক্সেন্টে ইংরেজিতে বললেন তিনি, 'বিখ্যাত শিকারী মি. স্যাংগার রেইন্সফোর্ডকে আমার বাড়িতে স্বাগত জানাতে সন্মানিত বোধ করছি আমি ।'
স্বয়ংচালিতের মত লোকটার সাথে হ্যান্ডশেক করল রেইন্সফোর্ড ।
'তিব্বতে আপনার তুষার চিতা শিকারের বইটা পড়েছি আমি,' ব্যাখ্যা করলেন লোকটা । 'আমি জেনারেল জারফ ।'
রেইন্সফোর্ডের প্রথম চিন্তাটা হল লোকটা অত্যন্ত সুপুরুষ । দ্বিতীয় চিন্তাটা হল, কোথায় যেন একটা অস্বাভাবিকতা আছে লোকটার চেহারার মধ্যে । লোকটা মধ্যবয়স ছাড়িয়ে গেছে, ওঁর চুল রাতের ধবধবে শাদা, কিন্তু ভুঁরু আর চোখা মিলিটারি গোঁফ রাতের অন্ধকারের মতই মিশকালো । উঁচু গালের হাড়, ধারাল নাক আর কাটা কাটা মুখায়ব দেখে বোঝা যায় এ লোক হুকুম দিতে অভ্যস্ত, এ চেহারা কোন নীল রক্তের মানুষের । উর্দি পরা দৈত্যকে একটা ইঙ্গিত করতেই যে তার পিস্তলটা সরিয়ে, স্যালুট ঠুকে চলে গেল ।
'ইভান সাংঘাতিক শক্তিশালী মানুষ,' মন্তব্য করলেন জেনারেল । 'কিন্তু দুঃখের বিষয়ে ও কানেও শোনে না, কথাও বলতে পারে না । একজন সহজ সরল মানুষ, কিন্তু আমি দুঃখিত ওর জাতের বেশিরভাগের মতই একটু বুনো টাইপের ।'
'ও কী রাশিয়ান?' রেইন্সফোর্ডের প্রশ্ন ।
'তা বলা যায়, ও কসাক,' লাল ঠোঁট আর চোখা দাঁত বের করে হাসলেন জেনারেল । 'আমিও তাই ।'
'কিন্তু আমরা এখানে কথা বলে সময় নষ্ট করব না,' বললেন জারফ । 'আপনার খাবার, কাপড় আর বিশ্রাম প্রয়োজন । সে সব পাবেন আপনি এখানে । এটা খুব শান্তিপুর্ণ জায়গা ।'
ইভান আবার এল । জেনারেল কিছু বললেন তাকে, মুখ নড়ল কিন্তু শব্দ বের হল না ।
'ওর পিছু পিছু যান মি. রেইন্সফোর্ড । 'আমি ডিনার করতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু আপনার জন্য অপেক্ষা করব । আশা করি আমার কাপড় আপনার গায়ে ফিট হবে ।'
নিঃশব্দ দৈত্যটার পিছু পিছু রেইন্সফোর্ড একটা মস্ত, উঁচু ছাতওয়ালা, বেডরুমে পৌঁছালো । সেখানকার চাঁদোয়া লাগানো প্রকান্ড পালংকটাতে অনায়াসে ছয়জন লোক আরাম করে ঘুমাতে পারে । ইভান একটা ইভনিং স্যুট বিছিয়ে রাখল । রেইন্সফোর্ড খেয়াল করল কাপড়টা লন্ডনের যে দর্জি বানিয়েছে তারা সাধারনত ডিউক পদমর্যাদার নীচে কারো কাপড় কাটে না ।
যে ডাইনিং রুমটাতে ইভান ওকে নিয়ে এল সেটা অনেকভাবেই চমকপ্রদ । একধরনের মধ্যযুগীয় জৌলুস আছে তাতে; এর উঁচু ছাত, ওককাঠের প্যানেল, রিফেক্টরি টেবিল যাতে দু'কুড়ি মানুষ অনায়াসে খেতে পারে, সামন্ত যুগের অহমিকা প্রকাশ পাচ্ছে । দেয়ালে অসংখ্য শিকার করা প্রাণীর চামড়া আর মাথা ঝোলানো--সিংহ, বাঘ, হাতি, মুজ হরিণ, ভালুক । এতো বড় বড় বা এর থেকে এত চমৎকার সব ট্রফি রেইন্সফোর্ড আগে কখনো দেখেনি । প্রকান্ড টেবিলটার একপ্রান্তে জেনারেল একা বসে আছেন ।
'একটা ককটেল নিন আপনি,' বললেন জেনারেল । ককটেলটা ছিল চমৎকার, আর টেবিলের সাজসজ্জাও--লিনেন, ক্রিস্টাল, চিনামাটি আর রুপার বাসনকোসন; একেবারে নিঁখুত।
ওরা বর্শ নামের লাল, স্বাদু স্যুপ খাচ্ছে যা রুশদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় । কিছুটা ক্ষমাপ্রার্থনার সুরে জেনারেল বললেন, 'আমরা সভ্যতার সব সুযোগ সুবিধা রক্ষা করার চেষ্টা করি । যদি কোন ত্রুটি হয়ে থাকে তবে নিজগুনে ক্ষমা করবেন । আপনার কী মনে হয় শ্যাম্পেনটা তার দীর্ঘ সমু্দ্র যাত্রায় তার স্বাদ হারিয়েছে?'
'একেবারেই না,' জোরগলায় বলল রেইন্সফোর্ড । জেনারেলকে চমৎকার বিবেচনাশীল গৃহকর্তা হিসেবে দেখছে ও, জেনারেলের রুচিও আন্তর্জাতিক মানের । কিন্তু জেনারেলের একটা ছোট্ট ব্যাপারে খটকা লাগছে তার মনে । যতবারই সে প্লেট থেকে চোখ তুলে চাইছে ততবারই দেখছে, জেনারেল চোখ সরু করে রেইন্সফোর্ডকে মাপছেন ।
'আপনি বোধহয় আবাক হয়েছেন যে আমি আপনার নাম জানি,' মুখ খুললেন জেনারেল । 'আসলে আমি রাশিয়ান, ইংরেজি আর ফরাসীতে ছাপা সমস্ত শিকারের বই পড়ি । আমার জীবনে মাত্র একটাই শখ আছে মি. রেইন্সফোর্ড, আর সেটা হচ্ছে শিকার ।'
'দেয়ালে চমৎকার কিছু মাথা দেখতে পাচ্ছি আমি ,' একটা সুস্বাদু ফিলো মিনিও চাখতে চাখতে বলল রেইন্সফোর্ড । 'ওরকম বিশাল কেপ বাফেলো আমি কখনো দেখিনি ।'
'ওহ ওটা, একটা রীতিমত দৈত্য ।'
'মোষটা কী আপনার দিকে তেড়ে এসেছিল?'
'একটা গাছের উপর আছড়ে ফেলেছিল আমাকে,' বললেন জেনারেল । 'আমার খুলি ফেটে গেছিল ধাক্কায়, কিন্তু শেষমেষ জানোয়ারটাকে আমি ঘায়েল করতে পেরেছি ।
'আমি সবসময়েই ভেবেছি,' বলল রেইনস্ফোর্ড । 'শিকার করার জন্য কেপ বাফেলো হচ্ছে সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রাণী ।'
একমুহুর্ত কোন উত্তর দিলেন না জেনারেল । সেই লাল-ঠোঁট হাসিটা হাসছেন তিনি । তারপর ধীরে ধীরে বললেন তিনি, 'না স্যার । কেপ বাফেলো সবচেয়ে বিপজ্জনক শিকার নয় ।' ওয়াইনে চুমুক দিলেন তিনি, 'এখানে, মানে আমার এই দ্বীপে আমি আরো বিপজ্জনক প্রাণী শিকার করে থাকি ।'
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জানুয়ারি, ২০০৭ রাত ৯:৪৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।






