(পূর্ব প্রকাশের পর)
আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনা ঘটে ইউরোপের অনুকরণে। আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় বলতে যা বোঝায় তার উদ্ভব ও বিকাশ একাদশ শতাব্দীতে ইতালীর সালোর্ণো ও বলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এর আগেও উচ্চ শিক্ষার কেন্দ্র ছিলো ইউরোপে কিন্তু আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ধারনা ও সম্ভাবনা তা সেখানে প্রতিফলিত ছিলোনা। শিশুদের শিক্ষাদানের প্রচলন আদিম সমাজেও দেখা গেছে, বড়দের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা তখনই ঘটেছে যখন অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা ও অবকাশ লাভের সুযোগ অর্জিত হয়েছে। বয়স্ক শিক্ষার প্রাচীনতম নিদর্শন অবশ্য খুজে পাওয়া যাবে খ্রীষ্টপূর্ব 1500 অব্দে আমাদের উপমহাদেশেই বর্ণাশ্রমে যখন আর্যদের বাসস্থান নির্মানের ইতিহাস লিখিত হয়েছিলো ঋগ্বেদ রচনার মধ্য দিয়ে। এই সময় গুরুরা নির্বাসন নিতেন তপোবনে-জনপদের সকল রকম ব্যস্ততা ও হট্টগোল থেকে দূরে। রবীন্দ্রনাথ সেই প্রাচীন তপোবনের অনুপ্রেরণা থেকেই শান্তি নিকেতন প্রতিষ্ঠা করেন।
আধুৃনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকটতম প্রতিষ্ঠান আমরা দেখতে পাই এথেন্সে, প্লেটোর প্রতিষ্ঠিত একাডেমিতে। এটা খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর কথা। প্লেটোর শিষ্য এরিস্টটল এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাহিত্যেও সঙ্গে বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষাকে সংযুক্ত করেন। এথেনীয় এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একটি সুদৃঢ় অতীতের ফসলরূপে আমরা দেখতে পাই আলেকজান্দ্রিয়ার মিউজিয়াম। এখানে খ্রীষ্টপূর্ব 323 অব্দ থেকে 30 অব্দে রোমানদেও উত্তর আফ্রিকা জয় করা পর্যন্ত সময়ে সাত লক্ষাধিক বই সংগৃহীত হয়েছিলো। এই মিউজিয়ামটি আসলে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় ধারণার অনেক বৈশিষ্ট্যই ধারণ করতো।বিশেষ করে জ্ঞান সংগ্রহ, সংরক্ষন ও গবেষনার কাজে অংশগ্রহণে।ইউক্লিড, আর্কিমিডিস, হেরো এরা সবাই এখানকার ফসল।ইউরোপে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবার আগে দীর্ঘ সময় ধরে প্রাচীন গ্রীক ও রোমানদের সঞ্চিত জ্ঞান আরব বিশ্বে লালিত ও সংরক্ষিত হয়েছে। এর ফলে বাগদাদ,দামাস্কুম, কায়রো এবং আলেকজান্দ্রিয়াতে উচ্চ শিক্ষা কেন্দ্র গড়ে উঠেছিলো। 1076 সালে খ্রিষ্টাব্দে যে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ঘটে তার হাত ধরেই উচ্চশিক্ষার এই উদ্ভাবন পৃথিবী জুড়ে বিস্তৃত হয়েছে।ষষ্ঠ থেকে নবম শতাব্দী পর্যন্ত কুমিল্লার শালবন বিহাওে দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা ও জ্যোতির্বিজ্ঞান শিক্ষা দেয়া হতো বলে আমরা জানতে পেরেছি। বাংলাদেশের মাটিতে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা সূচিত হয় 1921 সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হওয়ার মাধ্যমে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশের দীর্ঘ যে অনেকগুলি শতাব্দী আমরা পার হয়ে এসেছি সেখানে অনেক রূপান্তর ঘটেছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় অনেক বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে। প্রথমত: যে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় লালন করে আসছে শুরু সময় থেকে তা হলো জ্ঞানের সাধক এবং সত্যসন্ধানীর আশ্রম।একজন কর্মব্যস্ত ও নানা কাজে ব্যাপৃত আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বনে নির্বাসিত না হতে পারেন, কিন্তু স্বাধীনভাবে আপন সৃজনশীল ভাবনার জগতে অবশ্যই তাকে নির্বাসিত হতে হবে সত্যের সন্ধানে; প্রাচীন সন্যাসীর মতো। গড়ে তুলতে হবে উপযুক্ত শিষ্য। দ্বাদশ শতাব্দীতে যেখানে ইউরোপে চার্চের প্রত্যক্ষ শাসন থেকে কেউ মুক্ত ছিলোনা, এমনকি নৃপতিরাও তখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিজেদের অনেকখানি মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলোন এবং গড়ে তুলেছিলেন নিজেদের স্বাধীন সমাজ।
দক্ষিন ইউরোপে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা নিজেদের একটি সংস্থা গড়ে তুলেছিলেন যেখানে শিক্ষালাভের জন্য শিক্ষকদের তারা বেতনভোগী হিসেবে নিয়োগ করতো। এভাবে ছাত্রদের একটি আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর। ইউরোপে এবং ল্যাটিন আমেরিকার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের সংস্থা বা ইউনিয়নের যে প্রচন্ড ক্ষমতা তার সূত্র খুজে পাওয়া যাবে এখানে।
উনবিংশ শতাব্দীতে এসে আরো একটি ধারা সংযোজিত হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যে। তাহলো শিল্পায়ন ও প্রযুক্তির বিকাশে উদ্ভাবিত নতুন জ্ঞান ও আবিস্কৃত প্রকৃতির নিয়মকে ব্যবহার করা।শুধু বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে প্রয়োগ করা নয়; প্রয়োগের লক্ষ্য এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের বোধ থেকে নতুন জ্ঞানের সন্ধান এবং গবেষণার কাজে বিনিয়োগ শুরু হলো। (চলবে...)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

