somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আখিরাত ঠিক করার পাশাপাশি দুনিয়ার রাজনীতিতেও ঢুকে পড়লেন

২৪ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


জাতীয় নির্বাচন শেষ হওয়ার দুই মাস পার হয়েছে। দেশের মানুষ একটু দম ফেলছে , চায়ের আড্ডায় যখন ভোটের উত্তাপ ফিকে হয়ে আসছে, ঠিক তখনই খবর এলো সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের। বিএনপি, জামায়াত কিংবা এনসিপি-পরিচিত সব দলই তাদের প্রার্থী দিচ্ছে। তবে এই প্রার্থীর তালিকার ভিড়ে একটি নাম দেখে আমি থমকে গেলাম। ১১ দলীয় জোট থেকে প্রার্থী হয়েছেন খেলাফত মজলিসের একজন নারী প্রতিনিধি। খেলাফত মজলিস বলতেই চোখে ভেসে ওঠে তৌহিদী জনতার সেই পরিচিত মিছিল কিংবা শাহবাগ আর কুষ্টিয়ার সাম্প্রতিক সব বিতর্কিত ঘটনা। এমন একটি উগ্র ঘরানার দল যখন একজন নারীকে সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দেয়, তখন কৌতূহল হওয়াটা স্বাভাবিক।

কৌতুহল থেকেই প্রার্থীর প্রোফাইলটা একটু ঘেঁটে দেখলাম। প্রার্থীর নাম মাহবুবা হাকিম। শিক্ষাগত যোগ্যতা আর ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে যে কেউ মুগ্ধ হবেন। সাভার ক্যান্টনমেন্ট স্কুল থেকে স্টার মার্কস, বুটেক্স থেকে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ, আর স্বামী একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। এক কথায়, অসাধারণ এক গোছানো জীবন। কিন্তু খটকাটা লাগলো তখন, যখন পড়লাম তিনি বর্তমানে কী করছেন। উচ্চশিক্ষিত এই প্রকৌশলী এখন একটি হিফজখানা আর মক্তব পরিচালনা করছেন। মানুষটা নিজে পড়েছেন সরকারি স্কুলে, পেয়েছেন সরকারি বৃত্তি, পড়েছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে, কাজ করেছেন আধুনিক ইন্ডাস্ট্রিতে আর এখন অন্যদের জন্য রেখে গেছেন মক্তব আর হিফজখানা।

নিজে যে সিঁড়ি বেয়ে উঠেছেন সেই সিঁড়িটা সরিয়ে নিচে ভিন্ন একটা পথ দেখাচ্ছেন। তিনি যে পথে শিশুদের পরিচালিত করছেন, তার শেষ গন্তব্য কোথায় তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। মাত্র কয়দিন আগে সিলেটে একটা অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন বলেছেন, "মাদরাসা থেকে ছাত্ররা পাস করে বের হচ্ছেন, ভালোভাবে কোরআন শেখেনি বলেই আজকে আমরা ধর্মীয় শিক্ষক পদে নিয়োগ দিতে পারছি না। কওমি শিক্ষার্থীদের সেই ইকুইভ্যালেন্ট ডিগ্রি নেই। আমরা সেই জায়গায় নয় হাজার ধর্মীয় শিক্ষক পদ খালি থাকার পরেও নিয়োগ দিতে পারছি না"। জেনারেল শিক্ষাও নেই, কোরআনও ঠিকমতো হয়নি, চাকরিও নেই। একটা নিখুঁত বন্ধ গলি।

মাহবুবা হাকিমের মতো মানুষেরা যখন উচ্চশিক্ষা নিয়ে এসে সেই একই ‘বন্ধ গলি’র কারিগর হন, তখন একে ট্র্যাজেডি ছাড়া আর কী-ই বা বলা যায়! তবে এই বন্ধ গলিটা কেবল মাহবুবা হাকিমের একার সৃষ্টি নয়; এটি যেন আমাদের জাতীয় এক শিল্প। দেশের অধিকাংশ এমপিরই এক বা একাধিক মাদরাসা আছে। অনেকে একে চরম ধার্মিকতা মনে করলেও এর পেছনে থাকে একাধিক হিসাব নিকাশ। প্রথমত এটা আখিরাতের বিনিয়োগ কারণ এতিম পালন করলে জান্নাতে নবীর সাথে থাকার হাদিস আছে, হাফেজ তৈরি করলে পরিবারের জন্য সুপারিশ আছে, মক্তব চালালে সদকায়ে জারিয়া হয়। দ্বিতীয়ত এটা সামাজিক মর্যাদার প্রকল্প কারণ এলাকায় দানশীল হিসেবে নাম ছড়ায়।

তৃতীয় একটা দিক আছে যেটা নিয়ে কেউ জোরে কথা বলে না কিন্তু সবাই বোঝে, হাজার কোটি টাকার মালিক এমপিরা বছরের পর বছর মাদ্রাসায় টাকা ঢালেন এবং কাকতালীয়ভাবে সেই টাকার কোনো হিসাব নেই, কোনো অডিট নেই, কোনো জবাবদিহি নেই। মানে টাকা শোধনের সবচেয়ে নিরাপদ ও পুণ্যময় উপায় হলো মাদ্রাসা। দুনিয়ায় সাদা হলো, আখিরাতেও নম্বর উঠল। এই পুরো ব্যবস্থার মধ্যে যারা আসলে থাকে তারা হলো সেই এতিম বাচ্চাগুলো। তারা হিফজ পড়ে, এমপির অনুদান পায়, আল্লাহর কাছে দোয়া করে আর বড় হয়ে আবিষ্কার করে যে তাদের জন্য কোনো রাস্তা তৈরি হয়নি। এমপিদের আখিরাত হয়তো ঠিক হয়ে গেছে কিন্তু ওই বাচ্চাগুলোর দুনিয়া ঠিক হয়নি।

এই প্রশ্নটা এমপিদের কাছে করার সাহস কারো নেই; কারণ প্রশ্ন করলেই বলবে দ্বীনের বিরুদ্ধে কথা বলছো। এই পুরো প্রেক্ষাপটে মাহবুবা হাকিমকে দেখলে তাকে নিয়ে বেশি কথা বলার আর থাকে না। জামায়াত জোটের হিসাব পরিষ্কার, খেলাফত মজলিস এক আসন পেয়েছে তাই সংরক্ষিত আসনে তাদের একটু ছাড় দেওয়া হয়েছে, আর প্রার্থী হিসেবে একজন বুটেক্স ইঞ্জিনিয়ার নারী পেলে বাইরে থেকে জোটটাকে একটু সভ্য দেখায়। মাহবুবা হাকিম এই জোটের জন্য একটা চমৎকার পিআর উপকরণ। কিনতু তার নিজের জন্য? সংসদ সদস্যের পদ পেলে আখিরাতের পাল্লায় আরেকটা বাড়তি ওজন পড়বে বলে হয়তো তিনি মনে করেন।

যদিও রাজনৈতিক ক্যারিয়ার বলতে কিছু নেই, কোনো নীতি কাজ নেই, মাঠ পর্যায়ে কোনো কাজ নেই, শুধু আছে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি, হিফজখানা আর একটি দলের সদস্যপদ যে দলের কাজকর্ম সংসদের চেয়ে রাস্তায় বেশি দেখা যায়। তবে মানুষটার কাছে সত্যিকারের একটা সুযোগ ছিল। বুটেক্সের ডিগ্রি, ইন্ডাস্ট্রির অভিজ্ঞতা, ধর্মীয় কমিউনিটির বিশ্বাস, সব মিলিয়ে একটা ভোকেশনাল সেন্টার বা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র করা যেত যেখানে কোরআন শেখার পাশাপাশি সেলাই, কম্পিউটার, টেক্সটাইল টেকনিশিয়ানের কাজ শেখানো হতো। ওই বাচ্চাগুলো তাহলে বড় হয়ে একটা রাস্তা পেত। আখিরাতও হতো, দুনিয়াটাও একটু বদলাত। কিন্তু সেটা হয়নি। হয়েছে হিফজখানা, পেয়েছেন মনোনয়ন, আর সামনে শুরু হবে সংসদের পথে যাত্রা।

কুষ্টিয়ায় পীর হত্যা: ‘জামায়াত-খেলাফতের নেতৃত্বে’ হামলা চালায় দুই শতাধিক লোক, অভিযোগ মামলায়-বিডিনিউজ২৪

সংরক্ষিত আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মনোনীত মাহবুবা হাকিম কে-সময় নিউজ অনলাইন

‘কওমি শিক্ষার্থীদের ইকুইভ্যালেন্ট ডিগ্রি নেই বলে শিক্ষক পদে নিয়োগ দিতে পারছিনা- Click This Link


সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:১৪
১৩টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হাতছানি

লিখেছেন আহমেদ রুহুল আমিন, ১৭ ই মে, ২০২৬ রাত ১০:২২

বাঁশবনের উপরে গোধূলীর আকাশে
কি'যে অপরুপ লাগে একফালি চাঁদ,
কাশবনের দুধারে মৃদুমন্দ বাতাসে
ঢেউ খেলে যায় সেথা জোৎস্নার ফাঁদ-
আহা..., কী অপরুপ সেই 'বাঁশফালি চাঁদ' ।

পাখিদের নীড়ে ফেরা কল-কাকলীতে
শিউলী-কামিনী যেথা ছড়ায় সুবাস,
আজানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মগজহীন গোল্ডফিশ মেমোরি

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৮ ই মে, ২০২৬ রাত ১:০১



বাংলা ব্যাকরণ ও বাংলা অভিধান যারা পড়েছেন তাদের জানার কথা “মগজহীন” শব্দ নতুন কোনো শব্দ না। “মগজহীন” শব্দটি বাংলা ব্যাকরণ ও বাংলা অভিধানে কখন কোন সালে নথিভুক্ত হয়েছে? -... ...বাকিটুকু পড়ুন

রুশদেশের চিরায়ত শিশুসাহিত্য

লিখেছেন জ্যোতির্ময় ধর, ১৮ ই মে, ২০২৬ রাত ৩:১৭


ঊনবিংশ শতাব্দীর মহান লেখক চেখভ , তুর্গেনেভ , দস্তয়েভ্‌স্কি , তলস্তয়ের নাম বিশ্ববাসীর কাছে সুপরিচিত। এই লেখকেরা - রাশিয়ার জাতীয় গৌরব । ঊনবিংশ শতাব্দীর রুশ লেখকদের মধ্যে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

রক্তের দাগে ধুয়ে যাওয়া আভিজাত্য: কারিনা কায়সারের বিদায় এবং আমাদের কিছু নির্মম শিক্ষা

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১৮ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৯



​বাঙালি সংস্কৃতির চিরায়ত নিয়মে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষ সব বৈরিতা ভুলে যায়। জানাজার খাটিয়া সামনে রেখে স্বজনরা কেবল ক্ষমা চান, চিরবিদায়ের প্রার্থনা করেন। কিন্তু গতকাল আমরা এক অভূতপূর্ব ও হাহাকারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ড. ইউনুস শুধুমাত্র বাই বর্ন বাংলাদেশী!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১০


আমেরিকার সাথে চুক্তির কথাটি আসলেই ইউনুসের উপদেষ্টাসহ তার লোকজন বলে বিএনপি ও জামাতের সাথে আলোচনা করেই চুক্তিটি হয়েছে!
বিএনপি ও জামায়েতের সাথে আলোচনা করলেই কি এই চুক্তি সঠিক হয়ে যায়?

আপনাদের বিএনপি-... ...বাকিটুকু পড়ুন

×