দোকানে লাল টুকটুকে বড়সড় আম দেখে লাফ দিয়ে উঠলাম। কত দিন আম খাই না!!! তাও শেষমেষ দেশে থাকতে যা খেয়েছি, বেশীর ভাগই তো ফরমালিন দেয়া ছিলো। ছোঃ...ওই সব মানুষ খায়!!! প্রায় ১০ গুন দাম ১ বাক্স আম কিনে ফেললাম। সুদূর পেরু থেকে আগত আম। বেশ আয়োজন করে কেটে খাওয়ার পর দেখি বাঙ্গীর মত লাগে। বিস্বাদ, গন্ধহীন, বর্ণহীন। ছোটবেলায় পড়া “ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে” ধরনের আম। চোখ বন্ধ করে খেতে দিলে নিশ্চিত বাঙ্গী মনে করে হালকা চিনি লাগিয়ে দু টুকরা খেতাম আর দু টুকরা বন্ধুকে দিয়ে বলতাম খেয়ে ফেল, পেটের জন্য বড় উপাদেয়।
চটপট বুদ্ধি চলে এলো। গুটিকতক আমেরিকান বন্ধু এবং আমার ইরানী রুমমেটকে দাওয়াত দিলাম। চলো আম খাই - ধরনের ট্যাগলাইন জুড়ে দিয়ে বেশ উৎসব উৎসব ভাব এনে ফেললাম। এই যুগটাই যে ট্যাগলাইনের যুগ। তো যাই হোক। মুখে দিয়ে এক আমেরিকান বন্ধু ঘোষণা করলো, তার বান্ধবী, বিয়ার এবং আম- এই তিন নিয়েই সে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে ইচ্ছুক। আমার ইরানী রুমমেট গম্ভীর মুখে আম খেয়ে অদ্ভূত উচ্চারনে বললো, ইহা হইলো “আমবে” । ইরানে যারা অত্যন্ত বড়লোক তারাই নাকি এটা খায়। অনেকটা বাংলাদেশের মানুষের স্ট্রবেরী খাওয়ার মতন। সে কোনদিন খায় নাই। কিন্তু আজকে বুঝলো কেন বড়লোকরা “আমবে” এতো পছন্দ করে। বাকীরাও মোটামুটি চিৎকার চেঁচামেচি করে জানালো আম বস্তুটা অতীব কুউউল। যদিও আমেরিকায় যে কোন মতামত চাইলে কুউউল বলেই টান দেয়ার নিয়ম। তারপরেও তাদের চেঁচামেচি শুনে বুঝলাম ব্যাপারটা তাদের মনে ধরেছে। এসব ক্ষেত্রে উদাস হয়ে যাওয়াটাই নিয়ম। আমিও তাই হলাম। এ আর এমন কি!! আসল আম তো খাওই নাই। খাইলে যে কি করতা!!! তারা তখন আমাকে ধরে বসলো। আসল আম কেমন? পড়লাম বিপদে।
অনুভূতি প্রকাশে আমি বরাবরই দূর্বল। শুধুমাত্র অনুভূতি প্রকাশে দূর্বলতার কারনে কত যে সম্ভাবনাময় প্রেমের মৃত্যু হলো, তা যদি গোণা যেত.. সেই মুহূর্তে সম্প্রতি এক বাঙ্গালী বড় ভাইয়ের কাছে শোনা মীরাক্কেলের জোকস মনে পড়ে গেলো। এক রাজা বহির্বিশ্ব থেকে এসে বাংলা দখল করলেন। দখল করে বললেন আম খাবো। তখন শীতকাল থাকায় আম কোথায় পাওয়া যাবে? তাই সকলে বললো মহারাজ অপেক্ষা করুন। গরমকাল এলেই রাজ্যের সেরা আম আপনাকে খাওয়ানো হবে। এত দোর্দন্ত প্রতাপশালী নব্য রাজা, আর সে কিনা সামান্য আম পাবে না!!!! উজিরকে তলব করা হল। রাজা বললেন কালকের মধ্যে আম চাই নইলে তোমার গর্দান যাবে। বেচারা উজির সারাদিন আম খুঁজলেন পুরা রাজ্য জুড়ে। কোথাও আম থাকলে তো!!! রাতে মন খারাপ করে উজির বসে আছেন। কালকেই হয়তো গর্দান যাবে। এমন সময় সাধারণত উজিরের মেয়ে বা বৌ বা গোপাল ভাঁড় বুদ্ধি নিয়ে চলে আসে। এখানেও তাই হলো। উজিরের মেয়ে একটা সমাধান দিলো। উজির সেই কথামত পরদিন রাজার সাথে দেখা করলেন। রাজা বললেন আম এনেছো? উজির বললো, “হুজুর, এনেছি। আমার দাঁড়ি টা চুষলেই আমের স্বাদ পাবেন।“ পুরো রাজ দরবার হতভম্ব। রাজা বললেন, ব্যাটা, এতো বড় স্পর্ধা!!! উজির বললো, হুজুর চুষেই দেখুন। যদি আমের স্বাদ না পান তবে আমার গর্দান রইলো। রাজা চুষলেন এবং অভিভূত হয়ে গেলে। আসলে উজিরের মেয়ের বুদ্ধিতে উজির তার দাঁড়িতে সামান্য গুড় আর তেতুল মেখে গিয়েছিলেন। রাজাকে সবাই জিজ্ঞেস করলো, খেতে কেমন? রাজা বললেন, আশযুক্ত, মিষ্টি এবং হালকা টকটক...দরবারের সবাই মাথা নেড়ে বললো, হুজুর এইটাই তো আমের স্বাদ। বলাবাহূল্য সে যাত্রায় উজির বেঁচে গিয়েছিলো।
ফিরে আসি বাস্তবতায়। দাঁড়ি রাখা শুরু করে দিয়েছি। বাসায় কিছু ইন্ডিয়ান তেঁতুলের আচার আছে। আর গুড়ের বদলে ম্যাপল সিরাপ বরাবরই চমৎকার কাজে দেয়। এখন শুধু আসল আমের স্বাদ চাখানোটাই বাকী......

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



