somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

" লজ্জা " -ব্যক্তির ভূষণ , সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং মুসলিম চরিত্রের অন্যতম বিশেষ বৈশিষ্ট্য ।

১৮ ই নভেম্বর, ২০২০ দুপুর ২:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ছবি - গুগল

আমাদের সমাজে “লজ্জা নারীর ভূষণ” এ কথাটি অধিক প্রচলিত । ইসলাম নারীকে লজ্জা ও শালীনতার ব্যাপারে বিশেষ তাগিদ দিলেও তা নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই লজ্জা ভূষণ আখ্যা দেয়া হয়েছে । ইসলামী জীবন বিধানে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য শালীন ও লজ্জাশীল জীবন যাপন করা আবশ্যক। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, " লজ্জা ঈমানের অংশ" (আল জামিউ বাইনাস সাহিহাইন, হাদিস: ১২৭৩)।আর আর ঈমানের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো বলেন, "কোনো কিছুতে অশ্লীলতা তাকে শুধু কলুষিত করে আর কোনো কিছুতে লজ্জা তাকে শুধু সৌন্দর্যমণ্ডিত করে"। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১২৬৮৯)।এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) নারী ও পুরুষের ভেতর কোনো ধরনের পার্থক্য না করেই তা সাধারণভাবে মানুষের ভূষণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
লজ্জা প্রসংগে মহানবী (সা.) বলেন, "নিশ্চয়ই আল্লাহ অত্যন্ত লজ্জাশীল ও অন্তরালকারী। তিনি লজ্জা ও অন্তরালে থাকতে পছন্দ করেন" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪০১৪)।রাসুলে আকরাম (সা.) আরো বলেন, "প্রতিটি ধর্মের একটি বিশেষ স্বভাব আছে। আর ইসলাম ধর্মের বিশেষ স্বভাব হলো লজ্জা" (মুয়াত্তায়ে মালেক, হাদিস : ৩৩৫৯)।এই হাদিস দ্বারাও প্রমাণিত হয়, লজ্জা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য আবশ্যক।



ছবি - গুগল

লজ্জা একটি নেতিবাচক বা যন্ত্রণাদায়ক মানষিক অবস্থাকে বুঝায়। যা মানুষ তার কর্মের ফল হিসাবে এবং সমাজের প্রচলিত ভাল কাজের মানদণ্ডের সাথে তার নিজের কাজের তুলনা করে নেতিবাচক অবস্থা বা ফলাফল উপলব্ধি করে। মানুষের বিবেক তথা সহজাত আত্মউপলব্ধি থেকে লজ্জার উৎপত্তি ঘটে থাকে।যার আত্মউপলব্ধি যত বেশী তার লজ্জা তত বেশী ।আর যার আত্মউপলব্ধি তথা আত্মশ্রদ্ধা কম তার লজ্জাও কম ।আর লজ্জাহীন মানুষ পশুর সমান।

লজ্জা বা হায়া শব্দটি বেহায়াপনা ও অশ্লীলতার বিপরীত অর্থে ব্যবহৃত হয়। রাসূল সা: বলেছেন, - প্রত্যেক ধর্মেরই কিছু না কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে। লজ্জাশীলতা হলো ইসলামের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

লজ্জা ঈমানের অঙ্গ। লজ্জাশীলতার মাধ্যমে একজন মুসলমানের ঈমানের পরিমাপ করা যায়। যিনি অবলীলাক্রমে ও নির্দ্বিধায় লজ্জাকর কাজ করে যায় এবং নিজের বেহায়াপনা বা অশ্লীলতার জন্য এতটুকুন অনুতপ্ত হয় না, বুঝতে হবে তার ঈমানে বড় ধরনের কোনো ত্রুটি রয়েছে। অপর দিকে সামজে এমন অনেক ব্যক্তি রয়েছেন ,যার দ্বারা কোনো লজ্জাকর কাজ সংঘটিত হলে, সাথে সাথে ভুলের জন্য আড়ষ্ট হয়ে মুখ লুকায় এবং বিবেকের কষাঘাতে জর্জরিত হয়। তখন বুঝতে হবে তার ঈমান জীবিত আছে।

রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘লজ্জা ঈমানের অঙ্গ। আর ঈমানের স্থান বেহেশত। অপর দিকে অকথ্য গালিগালাজ জুলুমের অন্তর্ভুক্ত। আর জুলুমের স্থান দোজখ।’ (আহমাদ)

লজ্জা মুমিনের ভুষণ। এটি মুমিনের চারিত্রিক সৌন্দর্যকে সুশোভিত করে।

রাসূলুল্লাহ সা: লাজুক প্রকৃতির নম্র-ভদ্র, সহনশীল ও কর্তব্যপরায়ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন।রাসূল সা: বলেছেন, ‘লজ্জা ও ঈমান অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। যখন একটির অভাব ঘটে, তখন অন্যটিও বিলুপ্তির পথ ধরে।’

লজ্জাহীন ব্যক্তির চরিত্র হয় অশ্লীল। সে সমাজের এমন হীন কাজ নেই যা সে করতে পারে না। এ ধরনের ব্যক্তি সাধারণত ফাসেক, পাপিষ্ঠ, কদাচারী, দুর্বৃত্ত ও দুর্নীতিপরায়ণ হয়। লজ্জাহীনতা তার আচরণকে করে উদ্যত, স্বভাব হয়ে উঠে রুক্ষ, মেজাজের ভারসাম্য হারিয়ে সামাজিক জীবনযাপনে বেপরোয়া, উন্মাদ, পরশ্রীকাতর, পরধনে লোভী, টাউট-বাটপার ও দুর্নীতিবাজ এককথায় উন্মাদ ব্যক্তিতে পরিণত হয়। এদের আর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো যে, এরা সাধারণত মিথ্যাবাদী হয়ে থাকে। মিথ্যাই এদের প্রধান পুঁজি হিসেবে কাজ করে। এরকম একজনমাত্র ব্যক্তিই একটি সমাজ, একটি রাষ্ট্রের জন্য অশান্তি ও বিপর্যয়ের জন্য যথেষ্ট কারণ হতে পারে।

রাসূল সা: বলেছেন, "যখন কোনো মানুষের অধঃপতন ঘটে, প্রথমে তার হৃদয় থেকে লজ্জার বিচ্যুতি ঘটে। পরে সে নিকৃষ্ট কাজের অনুগামী হয়। যখন কোনো পাপিষ্ঠ আল্লাহর রোষানলে নিপতিত হয় তখন তার হৃদয় থেকে লজ্জা উঠিয়ে নেন। আর যখন লজ্জা বিচ্যুত হলো, তখন হিংসুক হয়ে উঠে এবং হিংসার আগুনে জ্বলতে থাকে। শত্রুতা করতে দেখবে অথবা শত্রু দ্ধারা আক্রান্ত দেখবে"।
যদি উল্লিখিত দুই অবস্থায় কাউকেও দেখা যায়, তখন বুঝতে হবে তার থেকে আমানত উঠিয়ে নেয়া হয়েছে এবং যখন সে আমানত বিচ্যুত হলো, তখন তাকে আমানত খেয়ানতকারী অথবা আমানত বঞ্চিত দেখতে পাবে। বস্তুত যখন তাকে এরূপ অবস্থায় দেখবে, মনে করবে তার থেকে স্নেহ-মমতা উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। আর যখন সে দয়া বিচ্যুত হলো, তোমরা তাকে বিতাড়িত, অভিশপ্তরূপে দেখতে পাবে। যখন তাকে এমতাবস্থায় দেখবে, মনে করো তার গলা থেকে ইসলামের রশি খুলে ফেলা হয়েছে। (অর্থাৎ ইসলাম বিচ্যুত হলো) (ইবনে মাজাহ)।

লজ্জাশীলতা কোনো দুর্বলতার নাম নয়, বরং লজ্জাশীল ব্যক্তি একজন দৃঢ় চরিত্রের অধিকারী। লজ্জা হলো তার চরিত্রের মার্জিত রুচিশীল পোশাকসদৃশ।


রাসূল সা: বলেছেন,‘নির্লজ্জতা যাকে আকৃষ্ট করে সে চিরকলুষ হয়। অপরপক্ষে লজ্জা যাকে পরশ লাগায় সে চিরসুন্দর হয়ে উঠে।

লজ্জাশীল ব্যক্তি মানসম্মানকে এতটাই অগ্রাধিকার দেয় যে, প্রয়োজনে নিজের প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দেবে কিন্তু আত্মমর্যাদার অবমাননা হতে দেবে না। লজ্জা ও ভয় পাশাপাশি অবস্থান করে।
প্রথমত, লজ্জাশীল ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে। সে এ বিশ্বাস পোষণ করে যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমার প্রতিটি কথা ও কাজ প্রত্যক্ষ করছেন। এ ধরনের ব্যক্তি সর্বদা আল্লাহকে হাজির-নাজির জানে বলেই কোনো লজ্জাকর কাজ তার দ্বারা সংঘটিত হয় না।

দ্বিতীয়ত, লজ্জাশীল ব্যক্তি নিজের ব্যক্তিত্ব, মর্যাদা ক্ষুণণ হওয়ার ভয় করে। মানুষের দৃষ্টিতে সে নিকৃষ্ট হেয় প্রতিপন্ন হবে এ ভয়ে যে কোনো অপকর্মে লিপ্ত হয় না। এটি কোন দুর্বল চিত্তের লক্ষণ নয়। বরং এ ধরনের ব্যক্তিরাই সমাজের দৃঢ়চিত্ত ও বীরোচিত ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়।


যার লজ্জা নেই তার মধ্যে আল্লাহর ভয় নেই। যার মধ্যে আল্লাহর ভয় নেই তার মধ্যে ঈমান ও থাকেনা। কারণ লজ্জাহীন ব্যক্তি আল্লাহর কোনো হুকুমের পরোয়া করে না। সমাজের সব কু-কাজের একচ্ছত্র নায়ক বনে যায়। এ ধরনের লোকেরা অশ্লীল ও নিন্দনীয় কাজ করে অনুতপ্ত হওয়ার পরিবর্তে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে। লাখো-কোটি মানুষের ধিক্কারকে সে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়।

সমাজ ও সভ্যতার সব নিয়মকানুনকে সে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে। সামাজিক বিপর্যয় ও অসংখ্য বনি আদমের দুর্ভোগে সে পশুত্বের অট্টহাসি ছড়ায়। দুনিয়ার সব কিছুই তার জন্য অতি সামান্যই মামুলি ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। পৃথিবী নামক এ গ্রহটি সব জীবের জন্য বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। তারা জলে-স্থলে সব জায়গায় ফ্যাসাদ ছড়িয়ে দেয়। আর এ সব পৃথিবীর নির্লজ্জ মানুষের কাজের ফলাফল হয়ে মানুষের দূর্ভোগ বাড়ায়।

নির্লজ্জরা সাধারণত হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়। সত্য থেকে অনেক দূরে অবস্থান করায় সত্যের চিন্তা ও উপলব্ধি করতে পারে না। অসত্য, অন্যায় ও অকৃতজ্ঞতার ওপর এদের জীবনের ভিত রচিত হয়। পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষী এ ধরনের ব্যক্তিরা ইতিহাসে কালো পাতায় শুধু স্থান পেয়েছে। কিন্তু জীবিত নির্লজ্জরা এসব ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না।

মহান আল্লাহপাক রাববুল আল আমিন আমাদের সবাইকে লজ্জাশীল তথা ঈমান ও আমলের বলে বলিয়ান হবার এবং সকল প্রকার অশ্লীলতা ও নিন্দনীয় কাজ পরিহার করার তওফিক দান করুন।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে অক্টোবর, ২০২১ দুপুর ১:৫২
১৫টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাখি মন

লিখেছেন সামিয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:১০



রাত গভীর হলে পাখিটা বারান্দায় এসে বসে। দূরের আকাশে তখনও কিছু আলো জ্বলজ্বল করে, কিন্তু পৃথিবীর কোলাহল ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে। সেই নীরবতার মধ্যে বসে পাখিটার মনে হয়, মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×