আজকে প্রথম আলোয় এই মর্মে একটি সংবাদ বেরিয়েছে : শ্রীলঙ্কা সরকার সে দেশে নিযুক্ত একজন জার্মান রাষ্ট্রদূতকে ডেকে তীব্র ভাষায় র্ভৎসনা করেছে। লাসানথা বিক্রমাতুঙ্গা নামে আততায়ীর গুলিতে নিহত একজন পত্রিকা সম্পাদকের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে ওই রাষ্ট্রদূত সরকারের এলটিটিইবিরোধী নীতির সমালোচনা করেছিলেন। সরকারের এলটিটিইবিরোধী নীতির কট্টর সমালোচক ‘সানডে লিডার’ পত্রিকার সম্পাদক লাসানথা বিক্রমাতুঙ্গা গত বৃহস্পতিবার কলম্বোর কাছে দুর্বৃত্তদের গুলিতে খুন হন। তাঁর শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে জার্মান রাষ্ট্রদূত ইয়রগেন ভেরথ বলেন,‘আজ আমরা নির্বাক। সম্ভবত বহু আগেই আমাদের সোচ্চার হওয়া উচিত ছিল। আজ অনেক দেরি হয়ে গেছে।’কলম্বো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা গতকাল বুধবার জানান, ইয়রগেনকে মন্ত্রণালয়ে ডেকে সরকারের অসন্তষ্টির কথা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
(পৃষ্ঠা,৭)
২
কিছুদিন ধরে আমি গভীর উৎকন্ঠার সঙ্গে শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীন উদ্বেগজনক পরিস্থিতি লক্ষ করছি এবং তা নিয়ে যৎসামান্য লিখছি। আমার লেখার প্রতিক্রিয়াসরুপ দেখলাম বেশির ভাগই শ্রীলঙ্কা সরকারের পক্ষে এবং তামিল টাইগারকে তারা জঙ্গি সংগঠনই মনে করে। একজন তো রায় দিয়েই ফেলল: শ্রীলঙ্কায় গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র, কেননা, শ্রীলঙ্কার একজন ক্রিকেটার তামিল!
শ্রীলঙ্কা গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র ? আচ্ছা। গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র হওয়া কি অতই সোজা? কলম্বোর ‘সানডে লিডার’ পত্রিকার সম্পাদ লাসানথা বিক্রমাতুঙ্গার নির্মম হত্যাকান্ড কি প্রমাণ করে? কী ছিল লাসানথা বিক্রমাতুঙ্গার দোষ? না, লাসানথা বিক্রমাতুঙ্গা ছিলেন শ্রীলঙ্কা সরকারের এলটিটিইবিরোধী নীতির কট্টর সমালোচক। তা হলে বোঝা যাচ্ছে-সরকারের এলটিটিইবিরোধী নীতি একচোখা-যেহেতু খোদ সিংহলীরাও সে নীতির প্রতিবাদ করছে।
গাজায় ইসরাইলী অভিযানে সে দেশের সাধারণ মানুষের সমর্থন থাকলেও ইসরালী বামপন্থি-মানবতাবাদী দলগুলো ইসরাইলী আক্রমের শুরুতেই তেল আবিবে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছিল এবং একই ভাবে শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চলের তামিলঅধ্যুষিত এলাকায় সরকারি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞে সে দেশের আমজনতার সমর্থন থাকলেও সে দেশের সাংবাদিক বুদ্ধিজীবিরা সঙ্গতকারণেই সরকারের এলটিটিইবিরোধী নীতির তীব্র সমালোচনা করে আসছে।
রাষ্ট্রদূত ইয়রগেন ভেরথ-এর বক্তব্যে যেন আর্ন্তজাতিক মহলের মতামতই প্রতিফলিত হয়েছে। লাসানথা বিক্রমাতুঙ্গার শেষকৃত্যা অনুষ্ঠানে ভেরথ কী বলেছিলেন তা আরেকবার স্মরণ করি: ‘আজ আমরা নির্বাক। সম্ভবত বহু আগেই আমাদের সোচ্চার হওয়া উচিত ছিল। আজ অনেক দেরি হয়ে গেছে।’
৩
কাল সন্ধ্যার পর ঘরে সোফায় হেলান দিয়ে পা তুলে বসেছিলাম। টিভির পর্দায় চোখ। শ্রীলঙ্কা সরকারের তামিলবিরোধী সাম্প্রতিক নৃশংসতার ওপর একটি সচিত্র প্রতিবেদন নির্মান করেছে আল জাজিরা । তামিল গ্রামগুলোর বিধস্ত ঘরবাড়ি, উপরানো গাছ, এখানে-সেখানে লাশ, একটা লাশ চেক-চেক লুঙ্গি পরা দেখে বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল; একজন কালো মিশমিশে যুবক আহত এক থুত্থুরে বৃদ্ধাকে কোলে করে বার করে আনল ঘর থেকে-সম্ভবত মা। একজন বৃদ্ধ আর্তনাদ করতে করতে বলল: আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে, জমিজমা সব গেছে; খাবার পর্যন্ত নাই।
তামিল ঐ বৃদ্ধটির মুখটি সহসাই ফিলিস্তিনি এক বৃদ্ধের মুখের মত হয়ে যায়।
আমি ইতিহাসের ছাত্র।
ক্যামেরা ঘুরে যায়। ছিমছাম একটি ঘর। কোথায়? কলম্বো? একজন মহিলা, টি-শার্ট পরা, কাঁধ পর্যন্ত ছাঁটা চুল-সম্ভবত সাংবাদিক- কম্পিউটারের সামনে বসে; আছেন। বললেন, ‘এখানে এত কিছু যে হয়ে যাচ্ছে, কেউই প্রতিবাদ করছে না, সবার চোখ এখন গাজার দিকে।’
আমি আমার লেখায় প্রায় এ রকম কথাই লিখেছিলাম।
আমি ইতিহাসের ছাত্র।
আমার চোখ টিভি পর্দায়। লাসানথা বিক্রমাতুঙ্গার খুনের কথা আগেই জেনেছি। দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আমার কেবলি মনে হয়েছে আমাদের পক্ষের একজন শক্তিমান প্রতিবাদী চলে গেলেন। কাঁধ পর্যন্ত ছাঁটা চুল মহিলাটি কে? লাসানথা বিক্রমাতুঙ্গার বন্ধু কি সহকর্মী নয় তো? হতে পারে। একেও কি হত্যা করা হবে? হয়তো। হয়তো-বা না।
আমার চোখ টিভি পর্দায়। বছর পাঁচেক হল সিগারেট ছেড়েছি। নইলে এক্ষুনি একটা ধরাতাম। ঘরে টিউবলাইট জ্বলেছিল। শিউলি এসে এককাপ চা দিয়ে গেল। 'র' । চায়ে আমি চিনি খাই না। লাসানথা? শ্যামলা সুদর্শন লাসানথা: নেট খুঁজে ছবি দেখলাম। আমাদের সময়ের এক সাহসী যোদ্ধা। আমার চোখ টিভি পর্দায়। হাসপাতালে আহতদের কাতরানি। নারীশিশুবৃদ্ধ। আল জাজিরার প্রতিবেদক বললেন, শ্রীলঙ্কার সেনারা হাসপাতালেও বোমা ফেলেছে ...লাসানথা এই জঘন্য কর্মের প্রতিবাদ করেছিলেন। আমি হাত বাড়াই। চায়ের কাপের উষ্ণতা স্পর্শ করি আঙুলের ডগায়। মৃত্যুর সময় কী রকম যন্ত্রনা হয়েছিল লাসানথার? তাঁর স্ত্রী আর সন্তানদের এখন কী রকম যন্ত্রণা হচ্ছে। লাসানথার মৃত্যু আমাদের কী শিখিয়ে যায়? ভেবে ভেবে দিশেহারা বোধ করি। চ্যানেল বদলাই। একটা ভালো খবর পাই-বাংলাদেশ সরকার সারের দাম অর্ধেক করেছে; তবু আমার উদ্বেগ কাটে না। তখন আমাদের আরেকজন বন্ধু- জার্মান রাষ্ট্রদূত ইয়রগেন ভেরথ- আমার খুব কাছে দাঁড়িয়ে যেন আমাকে শান্ত্বনা দেওয়ার জন্যই শান্তস্বরে বললেন: ‘আজ আমরা নির্বাক। সম্ভবত বহু আগেই আমাদের সোচ্চার হওয়া উচিত ছিল। আজ অনেক দেরি হয়ে গেছে।’
তবু আমি বলি-লাসানথার মৃত্যুর পরও সবকিছু বদলে যাবে না?
লাসানথার হত্যাকান্ড সংক্রান্ত মূল সংবাদটির লিঙ্ক-
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ সকাল ৮:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




