somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

"শিমুল তুলা ভাসে"-নাগরিক জীবনের গল্প।

১৩ ই নভেম্বর, ২০১১ রাত ৮:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ফ্লোরে মেলামাইনের গামলার ভোতা ঠক ঠক শব্দে ঘুম ভেঙ্গেই উঠে বসে শিমুল। বারান্দার ওপাশে পেয়ারা গাছে হলুদ পাখিটা ঠিক ঠিক বসে আছে দেখে ভালো লাগা ছড়িয়ে যায় ৮ বছরের শিমুলের মনে। কারন প্রতি রাতেই ঘুমানোর আগে ও একবার ভাবে কালকে পাখিটা থাকবে নাকি?

আব্বু আর দাদু মুড়ি আর দই মাখানো গামলা নিয়ে ফ্লোরে বসে আছে, আম্মু আম হাতে করে তাদের পাশে বসলো। শিমুল উঠে ওর বাবার গলা জড়িয়ে কাঁধে মাথা রেখে বাঁকা হয়ে দাড়িয়ে রয়েছে দেখে মা বললো, তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে নাস্তা খেতে আসো।

বাথরুমটাতে সুন্দর হাইজিনিক গন্ধ, বাবা'র শেভিং ফোম আর ইতিমধ্যেই অন্তত ২ বার ব্যাবহার হওয়া ক্লোজ-আপ পেস্টের গন্ধ মেলানো গন্ধটা ভাল লাগে শিমুলের।

এত সকালে শিমুলের বড় ভাই-বোন ঘুম থেকে উঠে না। আব্বু-আম্মু আর দাদুই শুধু উঠে। শাহানা আপু আর শাহান ভাইয়া আর ১ ঘন্টার মধ্যে ঘুম থেকে উঠে, নাস্তা খেয়ে স্কুলে চলে যাবে তাড়াহুড়ো করে। ওরা কত বোকা! একটু আগেই ঘুম থেকে উঠলে কিন্তু হলুদ পাখি দেখে, আস্তে আস্তে মুখ ধুয়ে নাস্তা করে স্কুলে যেতে পারতো। সেটা না করে তাড়াহুড়ো করে শুধু!

মুখ ধুয়ে এসে এবার আসন পেতে বসা মা'র কোলে বসে পড়লো শিমুল।

বাবা গ্রামের গল্প করছে , গ্রামে শুক্কুরের ঝি নামে এক প্রচন্ড ঝগড়াটে মহিলা ছিল। সবাই তার ঝগড়ার ক্ষমতার কারনে ওকে সমীহ করে চলতো। পরে ওর মৃত্যুর সময় খুব কষ্ট হয়েছিল। শিমুল শুক্কুরের ঝি'র চেহারা কেমন ছিল সেটা কল্পনা করার চেষ্টা করে। কালো, বেটে, মোটাসোটা শরীর, পায়ের গোড়ালীর উপরে উঠিয়ে লাল শাড়ি পড়ে, হাতে থাকে ক্ষয় হয়ে কালো হয়ে যাওয়া শলার মোটা ঝাড়ু!

মা তখন শিমুলের মুখটা হা করিয়ে একটু মুড়ি ঢুকিয়ে দিলে, মিষ্টির স্বাদ পেয়ে শুক্কুরের ঝি'র ছবিটা হারিয়ে গেল। মায়ের শরীরে একটা গন্ধ আছে। এই গন্ধটা কেমন সেটা শিমুল বুঝে না, কারন শুধু মা'র শরীরে এবং শাড়িতেই এই গন্ধটা পায় সে। অন্য কোথায় নেই এই গন্ধ যে তুলনা করা যায়! এই গন্ধটাই মা গন্ধ।

বাবা'র গায়েও একটা গন্ধ আছে কিন্তু ওটা লন্ড্রি করার পর সদ্য ইস্ত্রী করা কাপড়ে পাওয়া গেলেও মায়ের গন্ধটা অন্য কোথাও নাই!

দাদু'র গায়ের গন্ধও আছে, কিন্তু একটু অষুধের মত লাগে সেটা। আচ্ছা, আমি যেই গন্ধটা মা'র গায়ে পাই, বাবা কি দাদু'র গায়ে একই গন্ধ পায়? প্রশ্নটা তড়াক করে প্রচন্ড শক্তি পেয়ে শিমুলের মুখের কাছে উঠে এলো।

কিন্তু তখনই শিউলী ঘরের দরজায় এসে দাড়ালো আর শিমুলের নজর ঘুরে গেল।

শিউলী হচ্ছে, শিউলীর মা'র মেয়ে। শিউলীর মা হচ্ছে শিমুলদের গ্রামের সম্পর্কে ফুপু। স্বামীর সাথে বনিবনা হয় না বলে শিমুলদের বাসায় এসে কাজ করে। রান্না-বান্নায় সাহায্য করে, কাপড়-চোপড় ধু'তে সাহায্য করে, ঘর পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। কিন্তু সব কাজ যেহেতু শিমুলের মা নিজেও করে তাই পুরোপুরী কাজের লোক বলা যায় না।

কিন্তু শিমুল জানে যে তারা আসলে কাজের লোক কারন, মা শিউলী মুড়ি দেয়ার জন্য বললো, শিউলী যা তো একটা বাটি নিয়ে আয়। পরে শিউলী বাটি নিয়ে এসে মুড়ি নিল, কিন্তু শিউলীর জায়গায় শিমুল থাকলে শিমুল বাটি আনতে যেত না। শিউলীকেই বলতো বাটি নিয়ে আসতে। শিউলীকে আলাদা বাটিতে খেতে দেখে শিমুলেরও আলাদা বাটিতে খাবার শখ জাগলো। শিউলীকে বললো বাটি নিয়ে আসতে।

শিউলী বাটি নিয়ে এসে শিমুলের মায়ের পাশে বসে বললো, নাদিয়া'দের গাড়ি ধুচ্ছে নিচে। শিমুল সাথে সাথে বাটি হাতে সামনের বারান্দায় রওনা দিল। নাদিয়া'দের গাড়িটা খুব সুন্দর, টয়োটা ই ডি। উত্তরার একদম লেটেস্ট গাড়ি। ওদের ড্রাইভার রতন ভাই যখন সকালে ওটা ধোয়, তখন প্রায়ই শিমুল ভাল করে দেখে। শিউলী এটা জানে বলেই ইনফর্মেশনটা দিয়ে দিল।

প্যান্ট হাটু পর্যন্ত উঠিয়ে, স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে গ্যারেজের সামনে গাড়ির সামনের ওয়াইপার উঠিয়ে উইন্ডশিল্ড ধুচ্ছে রতন ভাই। কয়েকটা আলাদা আলাদা রেখায় স্রোতের মত পানি গড়িয়ে রাস্তার উল্টো পাড়ে হিমেলদের বাসার গ্যারেজের সামনের পর্যন্ত চলে যাচ্ছে। গ্যারেজের সামনের জায়গাটা উঁচু না হলে ওদের গ্যারেজেই পানি ঢুকতো। এমন পানি ঢুকতে ঢুকতে ওদের গ্যারেজ তলিয়ে যেত! তখন হয়তো হিমেলের মামা'টা এসে রতন ভাইকে মারধোর করতো। হুমায়ুন নামের কালো লোকটা কয়েকদিন আগে রতন ভাইকে কেন যেন সকাল বেলা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল। শিমুল বারান্দায় দাড়িয়ে দেখেছে। হিমেলের মামাটা মোটেও ভাল না!

শিমুলের মুড়ির বাটি খালি হয়ে যাবার পর শিউলীকে পাঠিয়ে আরো এক বাটি মুড়ি আনলো। বারান্দায় দাড়িয়ে দাড়িয়ে নাদিয়া'দের গাড়ি ধোয়া এবং চাকরীতে যাওয়া মানুষ দেখতে দেখতে সেই বাটিও শেষ করলো।

হঠাৎ করে মাথায় চাটি পড়তেই শিমুল বুঝলো, এখন বড় ভাই-বোনকে নিয়ে বাবা'র বের হবার সময় হয়েছে। শাহান ভাইয়ার শুধু শুধু ওর মাথায় চাটি মারাই তার সংকেত। বারান্দায় রাখা তোয়ালেতে ধোয়া মুখ মুছতে মুছতে শাহান ওর ছোট ভাইয়ের মাথায় একটা চাটি মেরে সুখ পায়।

শিমুলের মনে আতংক ঢুকে গেল! আজকে যদি ওকে স্কুলে যেতে বলে? শিমুল অবশ্য গত মাসে চুতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে এসেছে। কিন্তু এখনো ক্লাসে যায় নাই। ওর স্কুল একদম ভালো লাগে না। বুকে দুরু দুরু কাপন নিয়েই বারান্দায় দাড়িয়ে রইলো শিমুল। এখন ভেতরে গেলেই আব্বু বা শাহানা আপু হয়তো ওকে স্কুলে পাঠানোর কথা মনে করিয়ে দিবে, আর তখন শাহান ভাইয়া হৈ-চৈ করবে কেন ওকে স্কুলে পাঠানো হয় না! এসব ঝামেলায় আম্মুও হয়তো ওকে স্কুলে পাঠিয়ে দিবে!

স্কুলের বিষয়টা মাথায় ঢুকে যেতেই শিমুলের বুক থেকে একটা চিকন স্রোত পেটের দিকে নেমে গেল। শিমুলের ২ চোখ আশে পাশে তন্ন তন্ন করে ২ শালিক খুজা আরম্ভ করলো। আল্লাহ'র কাছে দোয়াও শুরু ততক্ষনে, আল্লাহ ২ শালিক দেখাও নইলে অন্তত ডান চোখ কাঁপাও। কারন ২ শালিক দেখা বা ডান চোখ কাঁপার মানে হলো ভাল কিছু একটা হবে। স্কুলে না যাবার চয়ে ভাল আর কি আছে?

তখনই ভেতর থেকে মায়ের গলা কানে আসলো, শিইইমুউল............।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×