এন্টিবায়োটিক হচ্ছে মানব সম্প্রদায় কতৃক আবিস্কৃত যুগান্তকারী আবিষ্কার সমূহের মধ্যে একটি, যা যুগ যুগ ধরে মানব সম্প্রদায়ের জীবন রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন অবদান রেখে চলেছে । কিন্তু এর সঠিক ব্যবহার যেমন উপকারী তেমনি ভূল ব্যবহার হতে পারে স্বাস্থের জন্য মারাত্নক হুমকি । এক্ষেত্রে "ভূল ব্যাবহার" ব্যাপারটা একটু জটিল আর এটি ব্যখ্যা করতেই আমার আাজকের এই ব্লগ ।
সচরাচর ছোটখাট রোগ-শোকে আক্রান্ত হই না এরকম লোক আমাদের মাঝে কমই আছে । আর একবিংশ শতাব্দির এই সময়টাতে এসে আমরা সবাই মোটামুটি সাস্থ্য সচেতন । তাই যে কোন রোগে আক্রান্ত হলে আমাদের প্রথমেই চিন্তা থাকে যত দ্রুত সম্ভব সুস্থ হয়ে ওঠার । এই অতি সচেতনতাই অনেক সময় বিপত্তির কারন হয়ে দাড়ায় । এ ক্ষেত্রে ওষুধকেই আমরা একমাত্র অবলম্বন ভাবি। আর আমাদের এই ভাবনাটাকেই কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণীর মানুষ নিজেদের ফা্যদা লুটছে কিন্তু মঝখান থেকে মারাত্নকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সাধারন মানুষ । প্রতারণার মূল উৎসই হচ্ছে এন্টিবা্যোটিক ও বিভিন্ন ভিটামিন ড্রাগস । মুলত এই ব্যপারটি ব্যাখ্যা করতেই আমার এই "ভূল ব্যাবহার" কথাটির অবতারনা ।
"ভূল ব্যাবহার" ব্যাপারটি দুই রকম :
১। রোগ নির্দেশনায় সম্পূর্ণ ভূল ওষুধের প্রয়োগ (যেমন জ্বরের রোগীকে যক্ষার চিকিৎসা করা )
২। রোগ সাপেক্ষে সঠিক বিকল্পসমূহের মধ্য হতে সঠিক বিকল্পটি বেছে না নিতে পারা ।
এদের মধ্যে প্রথমটি ডাক্তারদের ক্ষেত্রে সাধারণত কমই হয় । কিন্তু হরহামেশাই মানুষজন ২য় টির শিকার হয়। অথচ তা জনসাধারনের দৃষ্টিগোচর হয় না যার প্রধান কারন সাধারন জনগনের ওষুধ সংক্রান্ত বিষয়াদি সম্পর্কে স্বল্প জ্ঞান । আর সবচেয়ে মারাত্নক ব্যাপার হলো কতিপয় ডাক্তাররা সচেতনভাবেই এই ভুল (?) করে থাকেন ।
একটি নির্দিষ্ট রোগের ক্ষেত্রে সঠিক এন্টিবায়োটিকের ব্যাবহার একটি জটিল বিষয়, কারন অনেকগুলো এন্টিবায়োটিক দিয়েই উক্ত রোগের নিরাময় সম্ভব । এদের মধ্যে কোনটি কাজ করে খুব দ্রুত আবার কোনটি অপেক্ষাকৃত ধীর গতিতে । স্বাভাবিকভাবেই রোগীদের প্রথম পছন্দ দ্বিতীয়টি আর একজন ডাক্তারের বানিজ্যিক সাফল্য নির্ভর করে কত দ্রুত সে রোগীকে সুস্থ করে দিতে পারছে তার উপর । এখানেই মূল সমস্যার অবতারণা । দ্রুত সুস্থ হওয়ার ব্যাপারটি তখনই গুরুত্বপূর্ণ যখন চিকিৎসাকালীন সময়ের উপর নির্ভর করে রোগীর জীবন কিংবা ক্ষতির পরিমান । কিন্তু ছোটখাট রোগের ক্ষেত্রে দ্রুত সুস্থ হতে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদী শারিরীক ক্ষতির বিষয়টি কখনই কাম্য নয় ।পুরো ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করার জন্য এন্টিবায়োটিক সম্পর্কে কতিপয় মৌলিক জ্ঞান থাকা দরকার । বাংলাদেশে প্রাপ্ত এন্টিবায়োটিক সমুহ চার প্রকার :
১। ১ম জেনারেশন এন্টিবায়োটিক
২। ২য় জেনারেশন এন্টিবায়োটিক
৩। ৩য় জেনারেশন এন্টিবায়োটিক ও
৪। ৪র্থ জেনারেশন এন্টিবায়োটিক ।
এদের ব্যাবহার হয় পর্যায়ক্রমে, তথা একটি ব্যর্থ হলে আরেকটি । এন্টিবায়োটিকের একটি সীমাবদ্ধতা হলো "এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স" । অর্থাৎ অনুজীবসমূহের বিরুদ্ধে সক্রিয়তা হারানো। সাধারনত একটা অনুজীবের বিরুদ্ধে ১ম দিককার এন্টিবায়োটিকগুলো (১ম, ২য় জেনারেশন ) রেজিস্ট্যান্ট হয়ে গেলে তথা সক্রিয়তা হারালে পরের জেনারেশনগুলো (৩য়, ৪র্থ জেনারেশন ) ব্যবহার করা হয় এবং তারা অপেক্ষাকৃত অধিক শক্তিশালী হওয়া্য তখন সফলভাবে কাজ করে । কিন্তু সর্বোচ্চ জেনারেশন ব্যাবহার করার পর আর তাই হাতে কোনো অপশন থাকে না, ফলে ৪র্থ জেনারেশন এন্টিবায়োটিক ব্যাবহৃত হলে যদি কখনও এটি রেজিস্ট্যান্ট হয়ে যায় তখন সত্যিকার অর্থেই আর কোনো কার্যকর চিকিৎসা থাকে না । এভাবে রেজিস্ট্যান্ট হতে থাকলে একটা সময় এন্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা সম্পূর্ণরুপে অকার্যকর হয়ে পড়বে । উপরের জেনারেশন গুলো (৩য় ও ৪র্থ ) যত বোশি ব্যবহৃত হবে ততই এদের রেজিস্ট্যান্ট হওয়ার সম্ভাব্যতা বাড়তে থাকবে । তাই উপরের দিককার এন্টিবায়োটিক ব্যাবহারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। নিতান্তই আবশ্যক না হলে এগুলো ব্যাবহার করা উচিৎ নয়। তাই রোগের চিকিৎসায় আগে প্রাথমিক দিকের এন্টিবায়োটিকগুলো ব্যাবহার করা উচিৎ, পরবর্তিতে এগুলো কাজ না করলে পরে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন এন্টিবায়োটিক ব্যাবহার করতে হয় । অবশ্য পরিমিত কোর্স কমপ্লিট না করলেও একটি এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয়ে যেতে পারে, তাই এই বিষয়টিও সমান গুরুত্বপুর্ণ ।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের কথা হলো তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাবার লক্ষ্যে মানুষ সাধারন অসুখেই (সর্দি জ্বর ইত্যাদি ) এ্সব হাই প্রোফাইল এন্টিবায়োটিক ব্যাবহার করছে এবং ইতিমধ্যেই নিম্ন জেনারেশনের অনেক এন্টিবায়োটিক কা্র্যকারিতা হারিয়েছে (পেনিসিলিন) যেগুলো কিছুদিন আগেও বেশ ভালভাবেই কার্যকর ছিল । পূর্বেই বলেছি এজন্য মূলত কতিপয় ব্যাবসালোভী ডাক্তার সম্প্রদায় দায়ী । এতে করে সাময়িকভাবে রোগী উপকৃত হলেও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বৃহৎ পরিসরে । অথচ এ সকল সমস্যা সাধারন অসুধ দি্যেই সেরে যায়, হয়তবা সময় একটু বেশী লাগে কিংবা অনেক সময় একটু ধৈর্য ধরলে কোনো রকম ওষুধ ছাড়াই ভাল হয়ে যায়। যদিও মেডিসিন জীবন রক্ষাকারী উপাদান তারপরও সব অষুধেরই কমবেশী খারাপ দিক থাকে । বলা হয়ে থাকে যে,
All the Medicines are poisons, the benefits depend upon the proper use. .
একটা ওষুধ উপকারী হবে না ক্ষতিকর হবে তা নির্ভর করে তার সঠিক ব্যাবহারের উপর । তবে ছটোখাট সমস্যায় যতদূর সম্ভব অসুধের উপর নির্ভরশীলতা কমানোই বুদ্ধিমানের কাজ ।
ওষুধ শিল্পের আরেক কালো অধ্যায় বর্তমানে রচিত হচ্ছে ভিটামিন ও মালটিভিটামিন কে ঘিরে । আধিকাংশ ডাক্তারের প্রবণতা থাকে যে কোন রোগেই অন্যান্য ওষুধের সাথে একটা করে মালটিভিটামিন বা ভিটামিন এ (A) টু জেড (Z) প্রেসক্রাইব করা যার পেছনে ব্যাবসায়িক স্বার্থ প্রকট । ভিটামিন ব্যাবহারের বিষয়টি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট । একটা মানুষের প্রয়োজনের অধিকাংশ ভিটামিনই দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় বর্তমান থাকে, সেক্ষেত্রে কখনও একটা বা কয়েকটা নির্দিষ্ট ভিটামিন এর অভাব কারো হতে পারে । তাই বলে তাকে এ টু জেড সবগুলো ভিটামিন প্রেসক্রাইব করার কোনো মানে থাকেনা । এসব ভিটমিন এর উচ্চ দামের কারনে সাধারন গরীব মানুষেরা অনেকেই কঠিন পরিস্থিতির সম্মূখীন হন যদিও এ সকল অতিরিক্ত ভিটামিনের কোনটিই দরকার ছিলনা তার । রোগীর প্রয়োজনকে চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্ট ভিটামিনই প্রেসক্রাইব করা উচিৎ । ভিটামিন নামটার মধ্যে উপকারী-উপকারী একটা ভাব থাকলেও বাস্তবিক পক্ষে প্রয়োজনতিরিক্ত ভিটামিন অনেকসময় মারাত্নক ক্ষতির কারন হয়ে দাড়ায় । তাই ভিটামিন দেয়ার আগে নিশ্চিত হতে হবে রোগীর ঠিক কোন ভিটামিনটির ঘাটতি রয়েছে, কেবলমাত্র সেই ভিটামিন দিয়েই তার চিকিৎসা করতে হবে ।
অতএব ডাক্তারদের এতদ্বিষয়ক নীতিবোধই কেবলমাত্র সাধারন মানুষকে এ সকল সমূহ বিপদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে । জনসাধারনের সচেতনতাও এসব দুর্নীতি রোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । আর তাই ওষধ বিষয়ক মৌলিক জ্ঞানের কোনো বিকল্প নেই । কোন ডাক্তার কম দামের ওষুধ প্রেসক্রাইব করেছে মানেই ওই ডাক্তার ভাল নয় এই ধারনা তাই ভূল । বরন্ঞ কিছু কিছু শ্রদ্বাভাজন ডাক্তার যারা নিজেদের স্বার্থের বাইরে এসে কেবল মাত্র রোগীর উপকারের কথা মাথা্য রেখে এত প্রতিকূলতার মাঝেও মানবসেবা করে যাচ্ছেন তারাই প্রকৃত অর্থে মানবসেবক ।
বলা হয়ে থাকে একজন মানুষ রোগাক্রান্ত হলে তার সেকেন্ড গড হয়ে দাড়ায় একজন ডাক্তার । তখন ডাক্তার যাই বলুক না কেন তাই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ । আর এই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়েই চলছে ওষুধ বাণিজ্য ও প্রতারণা, যা জাতি কখনওই তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করে না।
তাই এখনই সময় সময় । সচেতন হউন । নিজে বাচুন, অন্যকে বাচান....।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১১ সকাল ১১:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


