নিম পাতায় যমের বড় অরুচী। সে জন্যেই নাকি মহাপ্রভূর নাম নিমাই রাখা হয়েছিল। একই থিওরী থেকে আমার এক আত্মীয় ভদ্রলোকের নাম রাখা হয়েছিল “ঝাড়ু–”। তার অগ্রজ শিশু বয়সেই মারা যাওয়ায় যমের অরুচী ধরাতে এই নাম। তো.. আমার সেই আত্মীয়ের পরিবারে শুদ্ধ ভাষার ব্যবহার বড় মারাত্মক। তেঁনারা সিলেটের আঞ্চলিক ভাষা বলেনতো না-ই, বরং মুলাকে মুলো বলেন। ঢেঁডশ উচ্চারণ করতে গিয়ে বাঁশ ঝাড়ের পেত্মী ষ্টাইলে এমনভাবে চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার করেন, মনে হয় কড়া ধাতের সর্দি হয়েছে। “কলকাতা” না বলে “কোলকাতা” “সিলেট” না বলে “শ্রীহট্ট” আর পানির বদলে জল না বলে নীর অথবা অম্বুর ব্যবহার মাথা ধরানোর জন্য যথেষ্ট।
দমফাঁটা হাসি আসে যখন শুনি ভদ্রলোকের স্ত্রী তার মেয়েকে ডেকে বলেন, ”মামনি ফুরইনটা (ঝাড়ুকে সিলেটে ফুরইন বলে) নে তো।” ফুরইন না বলে ঝাড়ু– উচ্চারণ করলে গৃহ কর্তাকেও যে টেনে আনা হয়!
কে বলে নামে কিছু আসে যায় না? ভুল কথা। ক্রীড়া সাংবাদিক উৎপল শুভ্রর নাম রেখেছিলেন তাঁর মাসি। তাই আমাদের উৎপলদা’র বন্ধুরা ভেবেছিলেন মাসি সম্ভবত র্বণান্ধ। উৎপল শুভ্র যে শুভ্র নন, তিনি শ্যামলা (চুপি চুপি বললে কুচকুইছ্যা কালা)।
মাসিরা বরাবরই বোনপো’দের নাম রাখার মত গুরু-দ্বায়িত্ব পালন করতে ভালোবেসেন।আমার মাসিও আমার বড় রেয়ার নাম রেখেছিলেন, যা আজও বর্তমান। মনিটরে দেখুন কিভাবে জ্বলজ্বল করছে নামটা…বি-মা-ন ধ-র…!
লোকে ট্রেন ধরে। অফিসের বাস ধরে, ডেটিংয়ে যেতে ট্যাক্সি ধরে। আমার বেলায় এক্কেবারে “বিমান”!!
স্কুলে থাকতে বন্ধুরা খেপাতো “বেঈমান” বলে। আমিও ক্ষেপতাম। বাধ্য হয়ে নিজের নাম বেঈমান দৌড়াইয়া ধর বলা শুরু করলাম। বন্ধুরা আমার ডাউন দ্যা এ্যাটাকে চুপ। আমার ফাদারের নাম কালীকেশ ধর। সংক্ষেপে কে.কে ধর। অবশেষে বন্ধুরা বিমলানন্দে সেই নাম বেছে নিল। অন্ধকারে চোরের গন্ধ পেয়ে যেমন “কে? কে!” বলে চিৎকার করি, তেমন করেই “কে?কে? ধর! ধর! ধরধরধর….!!” বলে ইয়র্কার মারতে লাগলো। আমিও ফিফটিন্ডুলকার !(টেন্ডুলকারের প্রপিতামহ)। ফাদারের নাম “কে কে দৌড়াইয়া ধর” বানালাম। ছক্কা!
…শেষ নয়! শেষ নয়! ইত্যাদির একটা পর্বে লুলু নামে একজন পাগল নেতার সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছিল। সেই সাক্ষাৎকারে জনাব লুলু পাগলা বলেছিলেন চামেলী নামের এক মহিলার জন্যেই তার এই পাগল হওয়া। হায় গোবিন্দ! আমার মায়ের নাম যে চামেলী! বন্ধুরা কি আর ছাড়ে!লুলু সাহেবের সাথে নাকি আমার মা বিট্রে করেছেন! পারলে আমার মায়ের বিরুদ্ধে ওরাই প্রতারনার মামলা করে ফেলে আর কি !
বুঝেন অবস্থা।নিজের নামটার সাথে মা বাবার নাম নিয়েও ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। এই হতভাগার বড় কষ্ট। কাউকে নাম বললে বত্রিশবার বুঝাতে হয়। তবু বুঝে না।
“কি নাম? বিধান?”
“বিমল?”
বাধ্য হয়ে বলি “বিমান বাংলাদেশ এয়ার লাইন্স।”
সে লোকদের প্রতিক্রিয়া কেমন হয় জানেন?
“ও বিমান….. হে হে হে!”
“বিমান….. হোঃ হোঃ হোঃ হিক! হিক!”
গা-জ্বালানো হাসির সামনে টেকা দায়। কিন্তু টিকে থাকতে হয়, টিকে থাকি। আর মনে মনে মাসির উপহারের জন্য ফুঁসতে থাকি। আরে বাবা এখন নাম কেন রাখো! আর রাখলাই যদি কনকর্ড রাখতে পারলা না? নিদেন পক্ষে জি.এম.জি? এক্কেবারে বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স! তাও লোকেশন সিলেট। আপনারাতো জানেন, সিলেটের বিমানগুলা রানওয়ে ছাড়ার আগে পাহাড়ে গুতা খায়। তারপর রিটায়ারমেন্টে গিয়ে র্ফাষ্টক্লাস রেষ্টুরেন্ট হয়। কেউ কেউ উড়তে গিয়ে হাওড়ে গিয়ে পড়ে, রেষ্ট নেয়, পানি খায়। যেন পানিতে শান্তির নীড়।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আর আমার নাম নিয়ে ঘটে যাওয়া ভুল বুঝা বুঝির একটা উদাহরণ দেই। একবার আমাদের সংগঠনের সভাপতি ফোন করেছেন আমার বাসার টেলিফোনে। কিন্তু একটা ডিজিট ভুল করায় সেটা এক্কেবারে বাংলাদেশ বিমানের সিলেট অফিসে গেল। তিনিতো বিমানকে চাচ্ছেন। আর যে ফোন রিসিড করলো, সে ভাবলো তিনি বিমানের টিকিট চাচ্ছেন। কয়েক মিনিট কথা বলার পর তিনি যখন বিমানের সাথে কথা বলতে চাইলেন, উভয় পক্ষের ভুল ভাঙলো।সভাপতি পরে পরামর্শ দিয়েছিলেন অন্য নাম ব্যবহার করার জন্য। এমন পিকিউলিয়ার নাম নাকি হয় না!তাদেরকে দেখানোর জন্য ক’দিন আগে ফেইসবুকে “বিমান” লিখে সার্চ দিয়েছিলাম। যাদেরকে পেয়েছি সবাইকে ফ্রেন্ডস রেকোয়েষ্ট পাঠিয়েছি। অনেকেরই প্রত্যুত্তর ছিল “সত্যিই আপনার নাম বিমান?” এই নাম যে অন্য কারো হতে পারে সেটা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায় তো। অবশ্য আজ আমার ফ্রেন্ডস লিষ্টে নয়জন বিমান নামের বন্ধু আছেন।
তবে একটা ব্যাপার বড় ভালো লাগে বিভিন্ন ই-মেইল এড্রেস, একাউন্ট খুলতে গেলে আমার নামটা সহজেই ইউজারনেম হিসেবে নিয়ে নেয়। বসাতে হয় না কোন অর্থহীন সংখ্যা বা শব্দ, ইন্টারনেটের ভূবনে অদ্ভূত নামের এইটুকু যা উপকারীতা।
তিন অক্ষরের শব্দটা নিয়ে বেশী প্যাঁচাল হয়ে যাচ্ছে? না, আর লম্বা করবো না, শুধু একটা ভাবনা- রাইফেল চালাতে ওস্তাদ সন্ত্রাসী জাহাঙ্গীরের নাম রাখা হয় “রাইফেল জাহাঙ্গীর”।আমার “বিমান ধর” নাম শুনে যদি কেউ ভেবে বসে প্লেন কিডন্যাপার? কি বিড়ম্বনা!
লেখা শেষ করতে চাই একটা তথ্য জানিয়ে। বিমান শব্দের অর্থ হলো “বলাকা”। খুব সুন্দর, না! ফাজিল বন্ধুদের এটা বুঝিয়ে বললে তারা বলে “তোর নাম বলাকা অথবা বগলা যাই রাখতো না কেন অন্তত বিমান নামের চেয়ে ভালো হতো।” উলুবলে….
পুনশ্চঃ আমাদের জমির বর্গা চাষি নাম “আলপথ”। তার জন্মের আগেই তিন সন্তান মারা যাওয়ায় যমের অরুচী ধরাতে এই নাম রাখে ওর আব্বা। “আলপথ” নামে যদি যমের অরুচী হয়, তাহলে হাইওয়ে রাখলে তো যমের জিভ টসটস্ করার কথা। সাবধান! পরিচিত করে নাম হাইওয়ে রাখবেন না!!!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




