ইন্টারনেটে একটা ফানি ওয়ালপেপার দেখেছিলাম।মেয়েটার টিশার্টে বুকের কাছটায় লিখা ছিলো “এখানে নয়,আমার মুখটা উপরে”! হয়ত চলতি ফ্যাশন।কিন্তু সমাজের প্রতি একটা বার্তা দিতে ভুল হয় নি।মেয়েদের আটোসাঁটো পোষাক দেখলে যাদের রক্তে নাচন ধরে তাদের কি এটা বোঝার জ্ঞান আছে?
আসলে ‘জাগো’ নিয়ে কিছু বলতে গিয়ে কথাগুলো চলে এলো।দু’দিন ধরেই তুমুল সমালোচনা চলছে সংগঠনটির ভলান্টিয়ারদের পোষাক নিয়ে!
“বুকে উড়না নাই।টাইট জিন্স, পাছার সাইজ পুরা বুঝা যায়।নিতম্ব আর বুকের ভাঁজ স্পষ্ট।দেখ দেখ, ভালো করে দেখ!
গেলো রে গেলো...বাঙালীর জাত গেলো।”
বাঙালীর জাত অবশ্য সহজে যাবার নয়।দেশের তেল-গ্যাস বিক্রি হয়ে গেলে যায় না।নারীর মুখে এসিড পড়লে যায় না।যায় শুধু ধর্ম আর মেয়েদের ওড়নার বেলায়!
আমি নিজে ‘জাগো’ সংস্লিষ্ট নই।তবু লিখলাম শুধু তাড়নায়।নিজে যা করি নি তা ওই ইংলিশ মিডিয়ামের ছেলেপেলেরা একদিনের জন্যে হলেও করে দেখিয়েছে।
‘জাগো’ প্রায় নবীন একটা সংগঠন।এর কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সমালোচনা হতে পারে। উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন আসতে পারে। কিন্তু অতি নোংরা মনের কিছু মানুষ তারচেয়ে জঘন্য ভাষায় যেভাবে কুৎসা ছড়াচ্ছেন, তাতে স্তব্ধ হতেও ভুলে গেছি।
প্রথমেই মেয়েদের পোষাক নিয়ে কথা উঠে।আমিও ছবিগুলো দেখেছি। অশালিন কিছু দেখিনি। এরা টিশার্ট পরেছে বলে যাদের জিহবায় চুলবুলি করে তারা কখনো এরকম রাস্তায় কাজ করার মত কোন ইভেন্টে অংশগ্রহন করেছেন বলে মনে হয় না।কারন সারাদিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে দৌড়ে কাজ করতে হলে টিশার্ট আর জিন্সটাই আদর্শ, নারী পুরুষ সবার জন্য।এরপরও কারো কাছে সেই মেয়ের পোষাক খারাপ লাগলে সেটা তার সমস্যা।
সেই মেয়ে তোমার কাছে ফুল বিক্রি করতে এলে তুমি ফুলের দিকে তাকাও, মেয়ের দিকে না।তুমি ফুল কিনবে, না মেয়েটাকে কিনবে?
সমস্যা এখানেই।কাম দমনে অক্ষমতা।কালে ভদ্রে একদিন নগ্ন নারী ভাস্কর্য দেখলেও এদের দাঁড়িয়ে যায়।বাথরুমে দৌড় দেয়।
আরেক দল এটাকে বড়লোকের ঘোড়া রোগ বলছেন।একদিনের জন্যে রাস্তায় নেমে পিকনিক করার মজা নেয়া কিংবা নতুন ফ্যাশন।এদের কি বলা যায়! ফ্যাশন করে কারো কাছে হাত পাতা সহজ কিছু না।রাস্তায় নামা বড় কঠিন।কয়েকঘন্টা রাস্তায় কাজ করলে সমাজ সংস্কারের ইচ্ছা পালানোর পথ পায় না।বিশ্বাস না হলে আজই অন্তত একটা ফুল মোড়ে দাঁড়িয়ে বিক্রি করুন তো দেখি! নিজে তো সবার ভুল ধরেন,দেখি আপনার থিওরী কেমন কাজের!
আসলে নিজে কিছুই করব না। কিন্তু অন্যের ভালো কাজেরও অসংখ্য খুত বের করতে আমরা ওস্তাদ।প্রশংসা করতে না জানলে অন্তত চুপ করে থাকুন।দেশের নুপুংসক জনগোষ্ঠীর পাল্লা ভারী করবেন না।
আরেকদল বুদ্ধিজীবি টাইপ বন্ধুর বক্তব্য হচ্ছে একদিনের জন্যে রাস্তায় নেমে দেশের সব পথশিশুদের ভাগ্য বদলে দেয়া যায় না।এখানে আমি একমত।একদিনে বদলানো যাবে না। তবে ‘জাগো’ কিন্তু অনেক শিশুকে নিয়ে সারাবছর কাজ করছে।এদের জন্য সারাবছর বিনামুল্যে শিক্ষা, খাবার, পোষাক, চিকিৎসা, এমনকি এদের মা বাবারও কর্মসংস্থান করছে। ৭ জনের এই উদ্যোগে আজ ৭ হাজার ভলান্টিয়ার শামিল হয়েছে।মাত্র তিন বছরে।আর তিন হাজার শিশুর দ্বায়িত্ব নেয়াটা বিশাল কিছু নয় কি?ওরা এই তিন হাজার শিশুর জন্যে কাজ করছে।আপনি আমি কিন্তু একজনের জন্যেও করিনি।তাই উঠেপড়ে এদের বিরুদ্ধে কথা বলাটা আপনার আমার মুখে মানায় না।
আরেকটা হাস্যকর কথা আছে যে, এর ঠিক মত বাংলাই জানে না।এদের পক্ষে পথশিশুদের দুঃখ বুঝা সম্ভব?
এই প্রশ্নকর্তাকে দারুন একটা উত্তর দিয়েছিলেন তাওহীদ তুর্য।তুর্য বলেছিলেন “বাংলাদেশের কারো সাহায্য করতে হলে যদি বাংলা জানাটা এতই জরুরী হয় তাহলে আমাদের সরকার যখন সাহায্যের জন্য বিশ্বব্যাংকের দিকে তাকিয়ে থাকে, তখন বিশ্বব্যাংকের কর্তাব্যক্তিদের বাংলা শিখিয়ে আসেন না কেন?”
আরো এসেছে শ্রেনী বৈষম্য-শিক্ষাবৈষম্যের কথা...।
আরে ভাই পেরেছেন নিজের বাড়িতে শ্রেনী বৈষম্য ঘুচাতে? ঘরের বুয়ার সাথে কি আপনি বৈষম্য ঘুচাতে পেরেছেন? ‘জাগো’ কিন্তু উপরতলার মানুষদের আমাদের তলায় কিছুটা নিয়ে আসতে পেরেছে।
এই যে ভলান্টিয়াররা একদিনের জন্যে কিছুটা রোদে পুড়ে মাঝে মাঝে কোক পেপসি খেয়ে ফুল বিক্রি করল, এতে শ্রেনী বৈষম্য কি একটুও ঘুচল না?
এদেশের অতি বড়লোকদের সন্তানরা সাধারণত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে,এসি গাড়িতে চড়ে।সিঙ্গাপুরে ঈদের শপিং করতে যায়।আর বড় হয়ে সুইজারল্যান্ড গিয়ে থাকার স্বপ্ন দেখে।বাংলাদেশ তাদের কাছে কোন আবেদন রাখে না।কারন এরা সাধারন মানুষের কাছে আসার সুযোগ পায় না।বাংলাভাষা নিয়ে ভয়ের কারনে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে ভয় পায়।ভর্তি হয় বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালগুলোতে।গুচ্ছের টাকা উড়ায় আর বেঁচে থাকে।নিজের মাটির সাথে পরিচয় হয় না,নাড়ির টানও উপলব্ধি করতে পারে না।এখন এই ইভেন্টে যারা কাজ করল, তারা কিছুটা জানল বুঝল। ডাস্টবিনের পাশে কিভাবে লোকেরা শুয়ে থাকতে পারে সেই প্রশ্ন এদের মনে উঁকি দেবে না?এভাবেই ওরা ধীরে ধীরে আমাদের সাথে মিশতে শিখে যাবে।দুরত্ব বৈষম্য ঘুচে যাবে একদিন। লিখে রাখুন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




