তিথিকে যখন প্রথম দেখেছি তখন সে এইট-নাইনে পড়ে। আমার বন্ধু শিপলুর সাথে তাদের গাড়িতে করে কোথায় যেন যাচ্ছিলাম শিপলু সাদা আরেকটা গাড়ির সামনে গাড়ি থামিয়ে বলল- ‘এক মিনিট বোস।’ আমি তাকিয়ে দেখি পাশের গাড়িতে মর্গান স্কুলের ইউনিফর্ম পড়া একটা মেয়ে বসে আছে। মেয়েটির দেখতে খুব মিষ্টি। আমি অন্তুকে জিজ্ঞেস করলাম-‘কে এটা?’
ঃ আমার ছোট চাচার মেয়ে ,স্কুলে যাচ্ছে। ওদের গাড়িতে সিডি র্যাকটা ফেলে আসছিলাম তো নিয়ে নিলাম ।
ঃ ও।
তারপর তিথির সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ হয়েছিল শিপলুর বড় ভাইয়ের বিয়েতে। বিয়ে উপলক্ষ্যে চারদিকে মাগনা বিয়ার পেয়ে সবাই লুট লাগিয়ে ফেলেছিল। দেখাদেখি আমিও খেয়ে দেখি অবস্থা খারাপ। মাথা চক্কর দিচ্ছে। বারান্দার গ্রিল ধরে দাড়িয়ে ছিলাম। সে সময় কোত্থেকে যেন তিনচারজন মেয়ে এসে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। ওদের আত্মীয় হবে হয়ত। ঘোলা দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখি শিপলুর এক ফুপাত বোন আছে। সাথে তিথিকেও দেখা যাচ্ছে। তাদের কারও সাথেই আমার পরিচয় নেই কিন্তু শিপলুর বন্ধু হিসেবে সবাই আমাকে চেনে। হুট করে তিথি বলল- ‘ভাইয়ার বন্ধুদের মধ্যে আপনাকেই সবচেয়ে ভদ্র জানতাম। আপনারও শেষ পর্যন্ত এই অবস্থা ?
ঃ সরি।
ঃ ওমা আমাকে সরি বলছেন কেন? আপনি তো খুব অদ্ভুত আছেন। আচ্ছা আপনি শিপলু ভাইয়ার এত পুরনো বন্ধু কিন্তু কখনও একটু কথাও বলেন না, কেন জানতে পারি?
ঃ আসলে আমি কথা তেমন জানিনা। কারও সাথে কি যে বলব খুজেই পাইনা।
দিনে একবার শিপলুদের বাসায় যাওয়া আমার রুটিন হয়ে গিয়েছিল। ওদের বাসায় আমার আসা যাওয়াটা এতই নিয়মিত ছিল যে দু’একদিন না গেলেই সেটি যে কারও চোখে পড়ার কথা । আমার ইন্টার পরীক্ষার জন্য প্রায় একমাস ঘরে বন্দি ছিলাম। কোথাও বের হইনি। শিপলুদের বাসায়ও না । দীর্ঘদিন পর ওদের বাসায় যাওয়ার পর সবাই একটু খোজ নিতেই পারে । সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমার অনুপস্থিতির খোজ যে তিথি-ও নিতে পারে সেটি আমার ধারনার বাইরে ছিল। শিপলুদের বাসায় গিয়ে তার খোজ নিতে গিয়ে আকষ্মিক ভাবেই তিথি এসে বলল–- ‘ভাইয়া একটু বাইরে গেছে। আধ ঘন্টার মধ্যেই চলে আসবে। বসেন।’ আমি শিপলুর ঘরে গিয়েই বসলাম। সঙ্গে তিথি-ও আসল। আমাকে অবাক করে দিয়ে সে অভিমানের সুরে বলল- আপনি অনেকদিন পরে আসলেন। এতদিন আসেন নি কেন?
আমি ভিতর ভিতর কিছুটা অপ্র¯তুত হয়ে গিয়েই বললাম-‘ আমার পরীক্ষা ছিল তো , সেজন্য আসতে পারি নাই ।’
ঃ মাঝখানে দুই একদিন আসতে পারতেন তো। আমি সবার কাছে আপনার খোজ করছি। কেউ-ই কিছু বলতে পারেনা।
শিপলু তাদের ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় তার সাথে আর আগের মত দেখা হয়না। তাদের বাসায়ও যাওয়া হয়না। এর মধ্যে আমি এক জলজ্যান্ত হিমুর খোজ পেয়ে গেছি। সারাক্ষন তার সাথে ঘোরাঘুরি করি। মজার মজার সব কান্ড ঘটাই। বই থেকে উঠে আসা বাস্তব হিমুর খোজ পেয়ে পুরনো বন্ধুদের কথা ভুলেই গেছিলাম। সমবায় মার্কেটের সামনে হঠাৎ করেই একদিন শিপলুর সাথে দেখা হয়ে গেল। সে গাড়িতে উঠিয়ে বলল- চল তোরে বাসায় নামিয়ে দিয়ে যাই।
ঃ ঠিক আছে।
ঃ তোর সাথে তো এখন দেখাই হয়না।
ঃ তুই ব্যবসায় ঠুকে পড়েছিস। সে জন্য আর আসিনা।
ঃ তা-ও ঠিক। শোন , তোকে একটা কথা বলব। তুই আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেখেই খোলাখুলি বলছি।
ঃ কী কথা ?
ঃ তিথি তোকে খুব ভালবাসে।
আমি এর জবাবে শিপলুকে কিছুই বলতে পারলাম না। চুপচাপ বাসার সামনে নেমে গেলাম। তিথির সঙ্গে আমার মাত্র কয়েকদিন দেখা হয়েছে অথচ এই ক’দিনেই আমি তার জন্য কত বড় কষ্ট বয়ে চললাম।
আট বছর কেটে গেছে এর মধ্যে তিথির সাথে আর কখনও দেখা হয়নি বা দেখা করিনি। তিথি-রা এতই ধনী যে আমার ধরা ছোয়ার বাইরে ছিল। তখন আমি মাত্র কলেজ পার হচ্ছি। আমার কি-ইবা করার ছিল। আবেগ থেকে বাস্তবতাটাই আমি বেশী জানি। বয়স কম হলেও তখনই আমি জানি যে তিথিকে পাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। শুধু শুধু ঘটনা বাড়িয়ে লাভ কী ? তারপরেও মানুষের মন তো । তিথির কথা মনে পড়েই। কিছুদিন আগে রাস্তা দিয়ে যেতে গিয়ে দেখি তিথিদের বাড়িতে লাইটিং করা হয়েছে। রাস্তার মোড়ে বিশাল গেট। খবর নিয়ে জেনেছি তিথির বিয়ে হয়ে গিয়েছে। সেদিন যেখানে যাওয়ার কথা ছিল কেন জানি সেখানে আর যেতে ইচ্ছা করলনা। জানতে ইচ্ছা করছিল - তিথির কী আমার কথা মনে আছে এখনও? সেই কিশোরী বয়সে কাকে না কাকে তার ভাল লেগেছিল সেই কথা মনে না থাকারই কথা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


