somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রামকিঙ্কর

০৯ ই মে, ২০১১ সকাল ১১:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রবাসী পত্রিকার সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় তাঁকে চিঠিতে লিখেছিলেন শান্তিনিকেতনে যেতে। কিন্তু বাঁকুড়ার অজ গাঁয়ের উনিশ বছরের এই যুবক পথ ঘাট কিছুই চেনে না। পথ ভুল করে অনেক ঘুরতি পথ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত পৌঁছলেন তিনি শান্তিনিকেতনে। উনিশশো পঁচিশ সালের কথা সেটা। সেদিন তিনি সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন তাঁর আঁকা কয়েকটা ছবি আর হয়ত অনির্দিষ্ট কোন স্বপ্ন। ছবিগুলো দেখে নন্দলাল বলেছিলেন ‘তুমি কি করতে এখানে এলে, এতো সব করে ফেলেছো। আর কি শিখবে? যাহোক যখন এসেই গেছো এখানে থাক কিছুদিন। তারপর যাহোক করা যাবে’। সেই সময় তাঁর আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুর চেষ্টায় কিছু বই অলঙ্করণের কাজ পান তিনি। এতে করে তাঁর মোটামুটি চলে যায়। ওই সময় তাঁর কিছু ছবিও বিক্রি হয়েছিল প্রদর্শনীতে। শান্তিনিকেতনে প্রথম দু‘বছর কাজ করার পর তিনি ছাত্রদের শেখাতে শুরু করেন। এভাবেই রামকিঙ্করের শান্তিনিকেতনে আসা আর শান্তিনিকেতনের শিল্পী রামকিঙ্কর হয়ে যাওয়া। বাকী সারা জীবনে শান্তিনিকেতন ছেড়ে তেমন কোথাও যাননি। দিল্লি, বোম্বে এমনকি কলকাতায়ও গেছেন খুব কম। শুধুমাত্র একবার গেছেন নেপাল। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশের আমন্ত্রণ পেলেও আর কখনো বিদেশ যাননি তিনি।
রামকিঙ্করের শিল্পের চৌহদ্দি ছিল অনেক প্রশস্ত। তৈলরং, জলরঙ, ড্রইং, স্কেচ, ভাষ্কর্যসহ বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করেছেন তিনি। তাঁর ছবি এবং ভাস্কর্য দুটোকেই তিনি নিয়ে গেছেন শিল্পসৌকর্যের চুড়ায়। প্রথমদিকে ছবি আঁকার প্রতিই রামকিঙ্করের মনযোগ ছিল বেশি। পরবর্তীতে পূর্ণ্যােদ্দ্যমে শুরু করেন ভাস্কর্য। কখনোই গতানুগতিক, বাঁধাধরা নিয়মে শিল্পসৃষ্টির পক্ষপাতি ছিলেন না তিনি। নিজের তৈরি পথেই চলেছেন সবসময়। প্রতিনিয়তই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। গড়েছেন ভেঙেছেন আবার গড়েছেন; এভাবেই এগিয়ে গেছে তাঁর শিল্প সাধনার পথ। দৃশ্যশিল্পের নতুন শৈলী, টেকনিক অথবা মাধ্যমের সন্ধানে সবসময় খোলা থাকত তাঁর দৃষ্টি।
রামকিঙ্করের কাজের একটি অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য গতিশীলতা । এটা তাঁর ছবি এবং ভাস্কর্য উভয়ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তাঁর ছবি এবং ভাস্কর্যের প্রায় সকল ফিগারই গতিশীল। কেউই থেমে নেই। তাঁর বড় ভাস্কর্যের বেশির ভাগই ওপেন স্পেসে করা। এটা তাঁর ভাস্কর্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টি, আলো হাওয়া গায়ে মেখে প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে ওগুলোর অবস্থান। রামকিঙ্করের গুরুত্বপূর্ণ ভাস্কর্যগুলোর অনেকগুলোই শান্তিনিকেতনে। ইউক্যালিপটাস গাছের সারির ভেতর ‘সুজাতা’ কিংবা কলাভবনের ‘সাঁওতাল পরিবার’, ‘বাতিদান’ পারিপাশ্বিকতার মধ্যে মিলেমিশে অন্যরকম এক দ্যোতনা সৃষ্টি করেছে। তবে শান্তিনিকেতনের এই ভাস্কর্যগুলি নির্মাণের সময় কিংবা নির্মাণ পরবর্তীকালে আশ্রমের সবাই যে এগুলোকে ভালোভাবে গ্রহণ করেছিলেন তা কিন্তু নয়। অনেক সময় তাঁর কাজ নিয়ে বিতর্কও উঠেছে। তবে শেষ পর্যন্ত কাজের প্রতি তাঁর একরোখা মনোভাব এবং রবীন্দ্রনাথ নন্দলালের প্রশ্রয়, বিনোদবিহারী সহ অন্যান্য সুহৃদ বন্ধুর সহযোগিতা আর সর্বোপরি তাঁর প্রতি ছাত্রদের শ্রদ্ধা ও সমর্থনের কারণে তাঁর কাজ ঠেকিয়ে রাখা যায় নি। এ প্রসঙ্গে শান্তিনিকেতনে করা ‘ধানঝাড়া’ ভাস্কর্যটির কথা উল্লেখ করা যায়। খোলামেলা শারীরিক প্রকাশের জন্য এই ভাস্কর্যটি অনেক গোঁড়া আশ্রমিকের সমালোচনার শিকার হয়েছিল। কিন্তু আশেপাশের সাঁওতাল গ্রামবাসীদের কাছে এটা ছিল খুব প্রিয়। যাই হোক শেষ পর্যন্ত সমালোচকরাই চুপ মেরে গিয়েছিলেন।
সাধারণভাবে মাথার মধ্যে যখন কোন একটা ভাবনা আসত রামকিঙ্কর তখনই সেটাকে রূপ দিতে চাইতেন। তা ছবি কিংবা ভাস্কর্য যেটাই হোক না কেন। আর কারো কারো সমালোচনা সত্বেও এ বিষয়ে প্রায় সবসময়ই রামকিঙ্কর শান্তিনিকেতনের সহযোগিতা পেতেন। তবুও কি তাঁর ইচ্ছার সব কাজ তিনি করতে পেরেছিলেন? না! যেমন তাঁর স্বপ্ন ছিল পিয়ার্সন পল্লীর সীমান্তের তালগাছগুলোর সমান উঁচু একটা গান্ধী মূর্তি নির্মাণের। পরিকল্পনা অনুযায়ী তার খসড়া স্কেচও করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই গান্ধী মূর্তি আর নির্মাণ করা হয়নি।

রামকিঙ্করের জন্ম ১৯০৬ সালের ২৫ মে। পিতা চণ্ডীচরণ, মার নাম সম্পূর্ণা। তাঁদের বাড়ি ছিল বাঁকুড়ায়। পারিবারিক পদবি ছিলো পরামাণিক। রামকিঙ্করই প্রথম বেইজ পদবি চালু করেন তাঁদের পরিবারে। ক্ষৌরকর্ম তাঁদের পারিবারিক পেশা। এই পরিবারে তিনিই সর্বপ্রথম শিল্পের পথে এলেন উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া পারিবারিক প্রথা ভেঙে। তাঁদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো ছিলনা। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে লক্ষ্য করা গেছে ছবি আঁকা মূর্তি গড়ার প্রতি প্রবল আকর্ষণ। শৈশব থেকেই গতানুগতিকতার প্রতি তাঁর কোন আকর্ষণ ছিল না। বড়োষোলআনায় সুরেন পণ্ডিতের পাঠশালায় চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত এবং পরবর্তীতে বঙ্গবিদ্যালয়, যুগীপাড়ার নৈশবিদ্যালয় ও লালবাজারের জাতীয় বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত(মতান্তরে দশম শ্রেণী ) লেখাপড়া করেছেন রামকিঙ্কর। লেখাপড়া যতটুকু করেছেন তাতে সাধারণ প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিলনা। ছবি আঁকা আর মূর্তি গড়াতে ছিল তাঁর আসল মনোযোগ। বাড়িতে লেখাপড়া করতে বসলে লেখাপড়ার কথা ভুলে শুরু করে দিতেন ছবি আঁকা। বাড়ির দেওয়ালে ঝোলানো দেবদেবীর ছবিগুলো দেখে দেখে আঁকতেন প্রায়শই। আর্থিক অনটনের কারণে কিশোর রামকিঙ্করের হাতে নরুন দিয়ে বসিয়ে দেওয়া হয় দোলতলার এক গাছতলায়; যদি কিছু আয় হয়। কিন্তু ক্ষৌরকর্ম বাদ দিয়ে নরুন দিয়ে গাছের গায়ে অনুবাদ করে চলেন তাঁর মনে তৈরি ছবি। ছেলেবেলাতে রামকিঙ্কর এঁকেছেন সাইনবোর্ড, নাটকের সিনারি।
বাড়ির পাশের অনন্ত সূত্রধর তাঁর প্রথম শিল্পশিক্ষক। অনন্ত সূত্রধর প্রতিমা গড়তেন। তাঁর প্রতিমা তৈরির কাজে সহযোগিতা করতেন রামকিঙ্কর। কিশোর বয়সের এই শিল্পশিক্ষক অনন্ত সূত্রধরের কথা সারা জীবনেই মনে রেখেছেন তিনি। ছেলেবেলায় প্রচুর ছবি এঁকেছেন রামকিঙ্কর। ছবি আঁকতে গেলে রঙ লাগে। কিন্তু অভাবের সংসারে রঙ কেনার টাকা কই! শিমগাছের পাতা দিয়ে সবুজ, রান্নার হলুদ দিয়ে হলুদ, পুঁই দিয়ে বেগুনি এইভাবে ছবিতে ব্যবহারের জন্য রঙ তৈরি করতেন তিনি। এর সাথে গড়তেন মূর্তি। তাঁর গড়া পুতুল ও মূর্তি নিয়ে কোন কোন সময় মেলায় যেতেন পিতা চণ্ডীচরণ। উদ্দেশ্য ওগুলো বিক্রি করে যদি কিছু পয়সা পাওয়া যায়।
রামকিঙ্কদের বাড়ির পাশে পাঠকপাড়ায় রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি। রামকিঙ্করের পিতা চণ্ডীচরণ রামানন্দ বাবুদের বাড়ির বাঁধা ক্ষৌরকার; গ্রামাঞ্চলে এটি যজমানি নামে পরিচিত। তখনকার দিনে ক্ষৌরকাররা বাড়িতে গিয়েই তাঁদের পেশাগত কাজ সম্পন্ন করে আসতো। যজমানির কাজে একদিন চণ্ডীচরণ রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে গেলে তিনি (রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়) তাঁর (চণ্ডীচরণ) কাছে ছেলে রামকিঙ্কর সম্পর্কে জানতে চান। জবাবে চণ্ডীচরণ রামকিঙ্করের আঁকাআঁকির কথা জানান তাঁকে। এতে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় রামকিঙ্করের ব্যাপারে আগ্রহী হন। একদিন ছবি দেখতে তিনি চণ্ডীচরণের বাড়ি চলে আসেন। রামকিঙ্করের আঁকা বেশ কিছু ছবি দেখেন তিনি। এটাও বোঝা গেল ছবি দেখে তিনি খুশি । তখন তিনি বললেন যে শান্তিনিকেতনে গিয়ে তিনি রামকিঙ্করকে চিঠি দিবেন; আর চিঠি পেয়ে রামকিঙ্কর যেন শান্তিনিকেতন চলে যায়। কিছুদিন পর চিঠি আসে, আর রামকিঙ্করও রওনা দেন সাথে সাথে। পথঘাট তখনো কিছুই চেনেন না রামকিঙ্কর। অনেক জায়গা ঘুরে ঘুরে, মানুষকে জিজ্ঞেস করে অনেকটা হাতড়ে হাতড়ে শান্তিনিকেতন এসে উপস্থিত হলেন তিনি। তখন কে জানতো এই বহু কষ্টে খুঁজে পাওয়া শান্তিনিকেতন এভাবে জড়াজড়ি হয়ে যাবে তাঁর জীবনের সাথে; কে বুঝতে পেরেছিলো এই শান্তিনিকেতনই হয়ে ওঠবে তাঁর শিল্পনিকেতন! বস্তুত রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ই রামকিঙ্করকে শান্তিনিকেতনের সাথে যোগাযোগ ঘটিয়ে দেন। পরিচয় করিয়ে দেন শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুুর সাথে। শান্তিনিকেতনে যাবার সময় রামকিঙ্করকে তাঁর আঁকা কিছু ছবি নিয়ে যেতে বলেছিলেন সাথে। ছবি দেখে নন্দলাল বসুও তাঁর ভবিষ্যত কল্পনা করতে পারলেন হয়তো। ফলে শান্তিনিকেতনে তাঁর ঠিকানা নির্দ্দিষ্ট হয়ে যেতে দেরি হলো না আর।
১৯২৫ সালে ছাত্র হিসাবে শান্তিনিকেতনে যোগ দেয়ার পর একই বছর লক্ষেèèৗ নিখিল ভারত শিল্পপ্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করে রৌপ্যপদক লাভ করেন রামকিঙ্কর। ঐ প্রদর্শনীতে স্বর্ণপদক পান নন্দলাল বসু। ১৯২৭ সালে ভারতের বিভিন্ন প্রসিদ্ধ স্থানে ঘুরে বেড়ান তিনি। নালন্দা, জয়পুর, চিতোর, উদয়পুরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণস্থান ভ্রমণ করেন। ফলে প্রাচীন ভারতবর্ষের নানা স্থাপত্য এবং ভাস্কর্যের সাথে তাঁর পরিচয় ঘটে।
রবীন্দ্রনাথের সাথে পরিচয়ের সূত্রে ভিয়েনার ভাস্কর লিজা ভনপট ১৯২৮ সালে ভারত আসেন। রামকিঙ্কর তাঁর কাছে ভাস্কর্যের বিভিন্ন বিষয়ে পাঠ নেন। এর অল্প পরে আসেন বিশ্বখ্যাত ভাস্কর রঁদ্যার শিষ্য বুর্দেলের ছাত্রী মাদাম মিলওয়ার্দ। মিলওয়ার্দের সাহচর্য রামকিঙ্করকে নানাভাবে উপকৃত করে। তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক উভয়দিকে তাঁর কাছে শিক্ষালাভ করেন। এরপর বিখ্যাত ইংরেজ ভাস্কর বার্গম্যানের কাছে রিলিফের কাজ শেখেন রামকিঙ্কর।
রামকিঙ্করের কচ ও দেবযানী মূর্তিটি ১৯২৯ সালে তৈরি। প্লাস্টারে করা এই ভাস্কর্যটির উচ্চতা ৩০ সেমি। এই বছরই রামকিঙ্করের শান্তিনিকেতনের পাঠ শেষ হয় এবং পরের বছর ১৯৩০ সালে কিছুদিনের জন্য কলাভবনের শিক্ষক হিসাবে কাজ করেন। সেই সময় শান্তিনিকেতনে নন্দলাল বসু ও প্রভাতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে কারুসঙ্ঘের সৃষ্টি হয়েছিল। রামকিঙ্কর এই সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা সভ্য ছিলেন। কোন ভাষ্কর্য কিংবা মূর্তি গড়ার অর্ডার এলে সেই কাজের ভার পড়ত রামকিঙ্করের ওপর। তাঁর কাজে এই সময় থেকে বিমূর্ততার দিকে ঝোঁক লক্ষ্য করা যায়। ১৯৩১ সালে করেন মিথুন সিরিজের অনেকগুলি ভাস্কর্য। এই বছর কিছুদিনের জন্য আসানসোলের ঊষাগ্রাম মিশনারী স্কুলে শিল্পশিক্ষক হিসাবে কাজ করেন। পরের বছরের শেষের দিকে দিল্লির মডার্ণ স্কুলে শিল্পশিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। মডার্ণ স্কুলের নতুন দালান তৈরি হচ্ছিল তখন। বাড়ি বানানোর চুন সুরকি দেখে রামকিঙ্করতো মহাখুশি। তিনি শুরু করে দিলেন একটা ভাস্কর্য তৈরির কাজ। ভাস্কর্যটি শেষ হলে স্কুল কর্তৃপক্ষও খুশি হয়েছিল খুব। এর জন্য রামকিঙ্করকে একশ টাকা বকশিসও দিয়েছিল। এরপর ওখানে আর বেশিদিন থাকেননি তিনি, ফিরে আসেন শান্তিনিকেতন। ১৯৩৩ সালে দিল্লিতে সরস্বতীর একটা প্যানেল ভাস্কর্য করেন। ৬ ফুট চার ইঞ্চি উচ্চতার এই প্যানেলটি চুন সুরকিতে করা।
রামকিঙ্করের পেশাগত জীবনের ভবিষ্যত স্থির হয় ১৯৩৪ সালে। তিনি কলাভবনের স্থায়ী শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ পান। ১৯৩৫ এবং ৩৬ সালে অনেকগুলো কাজ তিনি শেষ করেন। এই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে রিলিফ সাঁওতাল ও মেঝেন, সাঁওতাল দম্পতি, কৃষ্ণগোপিনী, সুজাতা। ১৯৩৭ থেকে তিনি ছাত্রদের মডেলিং শেখানোর দায়িত্ব নেন। ওই বছরের মাঝামাঝি সময়টাকে রামকিঙ্করের তেলরঙ পর্বের শুরু ধরা যায়। ১৯৩৭ থেকে ১৯৪২ সালের মধ্যে তিনি অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ তেলরঙ চিত্রের কাজ শেষ করেন। একই সময়ের মধ্যে শেষ হয় তাঁর অনেকগুলো বিখ্যাত ভাস্কর্যের কাজও। তাঁর সৃষ্টিকর্মের কাল বিচারে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় বলা যেতে পারে। এই পর্বে করা তাঁর বিখ্যাত ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে কংক্রীটে তৈরি সাঁওতাল পরিবার, প্লাস্টারে করা রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি ভাস্কর্য পোয়েটস্ হেড, সিমেন্টে হেড অফ এ উওম্যান, বাতিদান অন্যতম।

রামকিঙ্কর এমন একজন শিল্পী যাকে কোন দলে ফেলে মাপা যায় না। তাঁর জীবনেতিহাস অন্যান্য শিল্পীর চেয়ে একেবারেই অন্যরকম। বাঁকুড়ার এক অখ্যাত পল্লীর দারিদ্র্যক্লিষ্ট পরিবারের সন্তান রামকিঙ্কর, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দৌঁড়ও তেমন কিছু নয়। যার পারিবারিক পেশা ছিল ক্ষৌরকর্ম। আর শৈশব কাটতো পাশের কুমোর পাড়ায় ঘুরে ঘুরে। কী অদ্ভুত এক নিবিষ্টতায়, শিল্পের প্রতি ভালোবাসায় তিনি হয়ে উঠলেন ভারতীয় উপমহাদেশ তথা বিশ্বের অগ্রগণ্য এক শিল্পী। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘যাঁরা প্রতিভাশালী তাঁদের কেউ লুকিয়ে রাখতে পারবে না’। আর শান্তিনিকেতনের সাথে তাঁর যোগাযোগটাও নিশ্চয় তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। যদি ঘটনাক্রমে তাঁর সাথে শান্তিনিকেতনের যোগাযোগ না ঘটতো তবুও হয়ত শিল্পী হিসাবে আত্মপ্রকাশের পথ তিনি খুঁজে পেতেন, খুঁজে নিতেন। কিন্তু যে রামকিঙ্করকে আজ আমরা জানি, ঠিক সেই রামকিঙ্করকে পেতাম না আমরা । শান্তিনিকেতনে আসার আগেই প্রকাশ পেয়েছিলো শিল্পের প্রতি তাঁর ভালোবাসা, স্বাধীন স্বতস্ফূর্তভাবে কাজ করতে করতে দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। তবে শান্তিনিকেতনেই তাঁর শিল্পী সত্ত্বা মুক্তির যথার্থ পথ পেয়েছে। এক্ষেত্রে সবার মাথার ওপরে রবীন্দ্রনাথতো ছিলেনই, সহায়ক হিসাবে আরও ছিলেন গুরু নন্দলাল বসু ও অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর জীবনের বিভিন্নক্ষেত্রে তাঁদের প্রভাব থাকলেও কাজের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন একেবারেই নিজের মত। নিজের স্বাধীন চিন্তা নিয়েই চলতো তাঁর ছবি আঁকা, মূর্তি গড়া। ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে প্রায়শই ব্যাকরণ, টেকনিক মানতেন না তিনি। অনেক সময়ই করতে করতেই একসময় দাঁড়িয়ে যেত তাঁর কাজ।
রামকিঙ্করের করা প্রথম ওপেন এয়ার স্কাল্পচার সুজাতা। সুজাতা মূর্তিটা আসলে জয়া আপ্পাস্বামীর। কলাভবনের সুন্দরী ছাত্রী জয়াকে মডেল হিসাবে নিয়ে এই ভাস্কর্যটি করা হয়। এই ভাস্কর্যটির মাথার উপরের পাত্রটি প্রথম অবস্থায় ছিল না, নন্দলাল বসুর পরামর্শে পরবর্তীতে এই পাত্রটি স্থাপন করা হয়। সুজাতা তৈরি করা হয় ১৯৩৫এ।
তাঁর আর একটি বিখ্যাত ভাস্কর্য যক্ষ-যক্ষীর মূর্তি। এই ভাস্কর্যটি করা হয় দিল্লীর রিজার্ভ ব্যাংকের সামনে। কাজটি বিশাল। এটা অনেকটা কলকাতা মিউজিয়ামের যক্ষমূর্তির আদলে করা। এটা তৈরির জন্য পাথর খুঁজতে খুঁজতে শেষপর্যন্ত রামকিঙ্কর পৌঁছে যান কুলু ভ্যালির কাছে বৈজনাথে। এখানেই পান তাঁর পছন্দের পাথর। কিন্তু পরিবহনের অসুবিধার জন্য তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী টুকরোগুলো ২৫ ফুট লম্বা অবস্থায় আনা যায়নি। কেটে এনে পাথরগুলো পরে জোড়া দেয়া হয়েছিল।
কলাভবনের কালো কংক্রীটের গান্ধী মূর্তিটিও রামকিঙ্করের করা। আসাম সরকারের আহবানে ১৯৬৮সালে ভাস্কর্যটির কাজ শুরু করেন রামকিঙ্কর। কাজ শুরু করার কিছুদিন পর কর্তৃপক্ষ জানান কাজটি তাঁদের ঠিক পছন্দ হচ্ছে না। তাঁরা তাঁদের পছন্দের ধরণের কথা বলেন। কিন্তু এটির বাকী অংশ রামকিঙ্কর আর শেষ করেননি। বাকি কাজ তিনি ছেড়ে দেন সহকারীদের হাতে। তাঁরাই শেষ করেন বাকি কাজ। রামকিঙ্কর এই কাজটিকে তাঁর অসমাপ্ত কাজ বলে উল্লেখ করতেন।
জীবিতাবস্থায় শান্তিনিকেতনে তাঁর আশেপাশের অনেকেই হয়ত রামকিঙ্করকে সঠিক মূল্যায়ন করেননি। তবে কেউ কেউ অবশ্যই বুঝতে পেরেছিলেন আসল রামকিঙ্করকে। বন্ধুর মতো সবসময় পাশে ছিলেন শিক্ষক নন্দলাল বসু, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়। আর ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন রামকিঙ্করের মাথার ওপর ছায়া। তখন তাঁর সুজাতা ভাস্কর্যটা শেষ হয়েছে। একদিন সকালে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ হাঁটছেন, চোখে পড়ল সুজাতা ভাস্কর্যটা। ওটি কে করেছে জানতে চাইলেন তিনি। তখন তাঁর মনোভাবও বোঝা যাচ্ছে না কিছু। কেউ একজন রামকিঙ্করের নাম বললেন। রবীন্দ্রনাথ রামকিঙ্করকে তাঁর কাছে পাঠিয়ে দিতে বললেন। একথায় অনেকেই ঘাবড়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ কি তাঁকে ডেকে নিয়ে বকবেন! রামকিঙ্কর তাঁর কাছে গেলে তিনি বললেন,‘সমস্ত আশ্রম এর চেয়েও বড় বড় মূর্তি গড়ে ভরে দিতে পারবি? সব আশ্রম ভরে দে’। এটা যে কত বড় স্বীকৃতি অন্য কেউ বুঝুক আর না বুঝুক রামকিঙ্কর কিন্তু ঠিকই বুঝেছিলেন। এর পর থেকেই রামকিঙ্কর শান্তিনিকেতনে বিভিন্ন জায়গায় সৃষ্টি করেছেন তাঁর অসংখ্য ভাস্কর্য। রবীন্দ্রনাথের গান ছিল রামকিঙ্করের সর্বক্ষণের প্রিয় একটা জিনিস। কাজ করতে করতে কিংবা অবসরে নিচু স্বরে কিংবা উঁচু গলায় রামকিঙ্কর গেয়ে চলেছেন রবীন্দ্রনাথের গান এ তখনকার শান্তিনিকেতনের এক পরিচিত দৃশ্য। নিজের ঢঙে গাইতেন রবীন্দ্র সঙ্গীত। আর গাওয়ার সময় গানে এমন দরদ মেশানো থাকতো যে ছুঁয়ে যেতো শ্রোতার অনুভবকে। শান্তিনিকেতনে মঞ্চায়িত বেশ কয়েকটি নাটকে অভিনয় করেন রামকিঙ্কর। ভালো গাইতে পারতেন বলে তাঁকে এরকম ভূমিকায় অভিনয় করতে দেয়া হতো যাকে গান গাইতে হয়। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে একাধিক ভাস্কর্য তৈরি করেছেন রামকিঙ্কর। রামকিঙ্করের অন্যান্য বিখ্যাত ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে আছে:
প্লাস্টারে করা মা ও ছেলে (১৯২৮), কচ ও দেবযানী (১৯২৯), মিথুন-১ (১৯৩১), মিথুন-২(১৯৩১), মিথুন-৩(১৯৩১), সাঁওতাল-সাঁওতাল রমণী(১৯৩৫), সাঁওতাল দম্পতি(১৯৩৫), আলাউদ্দিন খাঁ(১৯৩৫), কংক্রীটে করা সাঁওতাল পরিবার(১৯৩৮), প্লাস্টারে করা রবীন্দ্রনাথের বিমূর্ত ভাস্কর্য(১৯৩৮), সিমেন্টে করা রবীন্দ্রনাথের আরও একটি ভাস্কর্য(১৯৪১), হার্ভেস্টার(১৯৪২), ফেমিন (১৯৪৩), সাঁওতাল নাচ (১৯৪৩), অবনীন্দ্রনাথ (১৯৪৩), সিমেন্টে করা কুলি মাদার (১৯৪৩-৪৪), বিনোদিনী (১৯৪৫), বুদ্ধ (১৯৪৬-৫০ ?), সিমেন্টের দ্য মার্চ (১৯৪৮), ডাণ্ডী মার্চ (১৯৪৮), লেবার মেমরী (১৯৪৮), মা ও ছেলে (১৯৪৯), স্পীড এন্ড গ্রাভিটি (১৯৪৯), শুয়োর (১৯৫২), পিতা-পুত্র ( ১৯৫২), মিলকল (১৯৫৬), গান্ধী (১৯৫৭), শার্পেনার (১৯৫৮?), ম্যান এন্ড হর্স ( ১৯৬০), সুভাসচন্দ্র বসু (১৯৬০-৬১), হর্স হেড (১৯৬২), মহিষ-১ (১৯৬২) কাক ও কোয়েল (১৯৬২), আগুনের জন্ম (১৯৬৩), যক্ষী-১১(১৯৬৩?) মহিষ ও ফোয়ারা (১৯৬৩), মাছ (১৯৬৪), তিমি মাছ (১৯৬৫), নৃত্যরতা নারী (১৯৬৫), লালন ফকির (১৯৬৫), যক্ষ যক্ষী (১৯৬৬), প্রেগন্যান্ট লেডি (১৯৬৭-৬৯), বলিদান (১৯৭৬), রাজপথ (১৯৭৭), রেখা, কলেজ গার্ল, গণেশ, সিটেড লেডি, মা ও শিশু, কুকুর, মা, সেপারেশন, রাহুপ্রেম, প্যাশন, ত্রিভুজ, দ্য ফ্রুট অফ হেভেন, হাসি, বন্ধু ইত্যাদি।

শান্তিনিকেতনে রামকিঙ্করই তেলরং-এর প্রবর্তন করেন। ওখানে তাঁর আগে তেমন কেউ তেলরঙে কাজ করতেন না। এমন কি তেলরঙ কিভাবে ব্যবহার করতে হয়, এই রঙ দিয়ে কিভাবে ছবি আঁকতে হয় তা তিনি শিখেছিলেন দোকানদারকে জিজ্ঞেস করে করে। জলরঙেও তিনি অসংখ্য কাজ করেছেন। এই মাধ্যমে তিনি অল্প রঙ দিয়ে অনায়াসেই অনেক বোঝাতে পারতেন।
বেশ কিছু প্রতিকৃতি এঁকেছেন রামকিঙ্কর। এগুলো ফরমায়েশি প্রতিকৃতি চিত্রের মত নয়। শুধু ব্যক্তির অবয়বকে ধরে রাখার জন্য এই ছবিগুলো আঁকা হয়নি। এই ছবিগুলোর প্রত্যেকটিতেই ব্যক্তির চেহারার সাথে মিলে মিশে গেছে চরিত্র-প্রকৃতি এবং শিল্পীর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁর প্রতিকৃতি চিত্রগুলোর মধ্যে ‘স্বপ্নময়ী’, ‘ সোমা যোশী’, ‘বিনোদিনী’, ‘নীলিমা দেবী’ উল্লেখযোগ্য। চারপাশের পরিবেশ প্রকৃতি, মানুষ ও তাদের জীবনযাত্রা নিয়ে বেশকিছু ছবি আছে রামকিঙ্করের। এই ছবিগুলোতে বিষয়ের চিত্ররূপের সাথে শিল্পীর বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ছবিগুলোর কোনটিতে যুক্ত হয়েছে মিথের প্রতীক কোনটিতে বা এসেছে বিমূর্ত চারিত্র। এই ধরণের ছবির মধ্যে ‘ঘরামি’, ‘ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রাম’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
বাকুঁড়া থেকে প্রকৃতির জল কাদা মাখানো যে ছেলেটা একদিন শান্তিনিকেতনে এসেছিলো সেই রামকিঙ্কর সবার কাছে হয়ে উঠেছিলেন শ্রদ্ধেয় শিল্পী রামকিঙ্কর। কিন্তু চিরকালই রামকিঙ্করের অস্তিত্বজুড়ে জল কাদার স্নেহ মাখা গন্ধ অবিকৃত ছিল। প্রকৃতির সন্তান রামকিঙ্কর। তাঁর বেশিরভাগ সৃষ্টিকর্মের বিষয় হিসাবে এসেছে সাধারণ মানুষ, তাঁদের জীবন যাত্রা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়। প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় যাদের দেখেছেন তিনি তারাই তাঁর মডেল। শান্তিনিকেতনে রামকিঙ্করের আবাসের পাশেই পিয়ার্সন পল্লীতে সাঁওতালদের বাস। তাঁদের সাথে রামকিঙ্করের ছিল গভীর সখ্য। খুব মিশতেন তাঁদের সাথে। তাঁদের প্রতিদিনকার জীবন যাপন, সকালে কাজে যাওয়া থেকে শুরু করে আবার দিনশেষে বাড়ি ফেরা পর্যন্ত সবই ঘটত তাঁর চোখের সামনে। তাঁর ছবি এবং ভাস্কর্যের বড় অংশ জুড়ে আছে প্রকৃতির সহজিয়া সন্তান এই সাঁওতালরা।
তাঁর শিল্পে বুদ্ধি কিংবা চাতুর্যকে স্থান দিতেন না তিনি। সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা চাহিদার কথা মাথায় রেখে তিনি কাজ করতেন না। তাঁর মধ্যে স্বতস্ফূর্ত ভাবে জন্ম নেয়া আবেগ, অনুভূতি কিংবা শিল্পবোধকে অনুবাদ করে চলতেন ছবি আর ভাস্কর্যে। যে ভাবনা তাঁকে আলোড়িত করে তাঁকে রূপদান করে তিনি প্রশান্তি অনুভব করতেন; কোন একটা কাজের পূর্বাপর নিয়ে ভাবতেন না।

একটা সময় থেকে রামকিঙ্করের সাথে ঋত্বিক ঘটকের ঘনিষ্ট যোগাযোগ গড়ে ওঠে। দুজনের মধ্যে নানা বিষয়ে প্রচুর আলাপ হত। ঋত্বিক ঘটকের ভিতরকার চাপা জেদ, অভিমান ও ক্ষোভ স্পর্শ করত রামকিঙ্করকে। রামকিঙ্কর খুব মুগ্ধ ছিলেন ঋত্বিকের প্রজ্ঞায়-বিদগ্ধতায়। শিল্পের নানা বিষয়ে ঋত্বিকের অভিমত ও বিশ্লেষণ রামকিঙ্কর শুনতেন। ঋত্বিক ঘটক ক্যামেরাম্যান হরিসাধন দাশগুপ্তকে নিয়ে রামকিঙ্করের উপর একটা তথ্যচিত্রের শুটিং শুরু করেছিলেন। বেশ কিছুদিন ধরে শুটিং চলেছিল। কিন্তু ঘটনাক্রমে ছবিটি শেষ হয়নি আর। পরে ১৯৭৫ সালে ঠিক হল রামকিঙ্করকে নিয়ে ঋত্ত্বিক ঘটক আর একটি ডকুমেন্টারি নির্মাণ করবেন। ১৯৭৫ সালের ২৮ আগস্ট শুরু হলো কাজ। রামকিঙ্কর ও তাঁর ভাস্কর্যের চিত্রগ্রহণ হয়ে গেলো। ঐ বছরের মধ্যে কাজ শেষ করে বছরের শেষ নাগাদ ছবিটির রঙিন প্রিন্টের জন্য তাঁর বোম্বে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ছবিটির কাজ শেষ করতে পারেননি ঋত্ত্বিক ঘটক। ১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্র“য়ারি মারা যান তিনি।
রামকিঙ্কর ছিলেন অকৃতদার। চলতি সামাজিক জীবনের এই বাঁধা নিয়মের পথে চলেননি তিনি। তাঁর জীবনের একমাত্র ধ্যানজ্ঞান ছিল তাঁর কাজ-শিল্প। সৃষ্টির নেশায় কেটে গেছে তাঁর জীবনের বেশিরভাগ সময়। এর ভিতরেও মাঝে মধ্যে বিয়েÑসংসারের চিন্তা তাঁর মাথায় এসেছে। কিন্তু সৃষ্টির খেলায় রামকিঙ্কর সফল হলেও বিষয়বুদ্ধিতো তাঁর খুব একটা ছিলনা। টাকা পয়সার টানাটানি ছিল তাঁর নিত্যদিনকার নিয়তির মতো। এছাড়া বিয়ে করলে সৃষ্ঠির খেলায় কোন বাধা আসবে এ আশংকাও তাঁর ছিল। তাঁর কথায়, ‘ প্রেম এসেছে জীবনে। সেক্সচুয়াল রিলেশনও হয়েছে। তা কখনোই বলার নয়। কিন্তু একটা জিনিস, কখনো লেপটে থাকিনি।... শিল্পীসত্ত্বা বিঘিœত হতে পারে, এই আশংকা থেকেই হয়তো বিয়ে করা হয়নি। ঠিক তাই বা বলি কি করে। বিয়ে করতে গেলে তো অর্থ চাই। প্রচুর অর্থ। ওটাই তো আমার ছিলনা। দীর্ঘকাল শান্তিনিকেতনে চাকরী করেছি অবৈতনিক। পরে নন্দলাল বাবু পেতেন পঞ্চাশ টাকা। আমি আর বিনোদ বাবু পেতাম সাড়ে বারো টাকা করে। ঐ টাকায় তো আর বিয়ে করা যায় না। আর তখন তো ছবি আঁকছি, মূর্তি গড়ছি চুটিয়ে। এভাবেই চলছে বহু বছর। সবাই যে বয়সে বিয়ে করে, সে বয়সে তো অর্থের মুখ দেখিনি। অন্য চাকরীরও চেষ্টা করিনি। শান্তিনিকেতন ছেড়ে যাবার কথা ভাবিনি কখনো। হয়তো ঠিক এটাও কারণ নয়। বিয়ে করার কথা যতবারই ভেবেছি, মনে হয়েছে বাধ্যবাধক সংসার করলে ছবি আঁকার ক্ষতি হবে। ছবি আঁকতে পারবো না। মূর্তি গড়তে পারবো নাÑএই ভয় থেকেই বিয়ে করার কথা ভাবিনি। জানা যায় একবার পারিবারিকভাবে রামকিঙ্করের বিয়ের কথা পাকা হয়েছিল। বিয়ের দিন তারিখ সব ঠিক। কিন্তু কাউকে কিছু না জানিয়ে একদিন হঠাৎ করে বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যান রামকিঙ্কর। অনেকদিন কোন খবর নেই। মাঝে শুধু চিঠিতে লিখে পাঠিয়েছিলেন ‘আমি বিয়ে করবো না’। পরে এই পালিয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘বিয়ে করে জড়িয়ে যাবো। পা-টা বাঁধা পড়ে যাবে। আমার এই যে সাধনা, এতো বড় সাধনা, সাধনাটা নষ্ট হয়ে যাবে। বন্ধনে আমার দরকার নাই। অতএব বিয়ে করে কি হবে? বিয়ে করে করব কি?’ শান্তিনিকেতনে রামকিঙ্করের সাথে রাধারাণী দাসীর সম্পর্ক নিয়ে একসময় আশ্রমের অনেকেই সমালোচনামুখর ছিলেন। রাধারাণী দাসী রামকিঙ্করের রান্না বান্না এবং অন্যান্য কাজকর্ম করে দিতেন। রামকিঙ্করের অনেক ছবি ও ভাস্কর্যের মডেলও ছিলেন তিনি। রাধারাণীকে নিয়ে অনেক ষ্টাডি-স্কেচ করেছেন রামকিঙ্কর। নানা কাজকর্মে একসাথে দীর্ঘকাল থাকতে থাকতে রামকিঙ্করের সাথে রাধারাণীর একটা মানবিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো। কিন্তু সেটা তথাকথিত সভ্য-শিক্ষিত কারো কারো সহ্য হয়নি। এ নিয়ে রামকিঙ্করের সাথেও বচসা কিংবা ঝগড়া হয়েছিল কারো কারো। তবে এ বিষয়েও রামকিঙ্কর ছিলেন অনমনীয়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রামকিঙ্কর রাধারাণীর প্রতি দায়িত্বশীল ছিলেন। রাধারাণীকে একপ্রকার একপ্রকার আগলে রেখেছিলেন। মৃত্যুর পরও রামকিঙ্কর তাঁর ছবি বিক্রির একটা বড়ো স্বত্ব রাধারাণীকে দিয়ে গিয়েছিলেন। যদিও যতটুকু জানা যায় রাধারাণীর পাওনা এই টাকার বেশিরভাগই অন্যরা নানাভাবেই হাতিয়ে নেয়। রাধারাণীর দিক থেকেও রামকিঙ্করের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা ছিল অকুণ্ঠ।
রামকিঙ্করের সারা জীবনের কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৭০ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণ উপাধিতে সম্মানিত করেন। একই বছর গুরুতর অসুস্থতার কারণে কলকাতায় মেডিক্যাল রিসার্চ ইন্সটিটিউট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কয়েকমাস থাকতে হয়েছিল হাসপাতালে। তখন থেকেই ভেঙে পড়তে থাকে তাঁর শরীর। ১৯৭১ সালের ২৫ মে অধ্যাপনা থেকে অবসর গ্রহণ করেন তিনি। ১৯৭৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে নিয়ে ‘রামকিঙ্কর’ শিরোনামে চল্লিশ মিনিটের একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করে। তথ্যচিত্রটি পরিচালনা করেন দেবব্রত রায়। ১৯৭৭ সালে রামকিঙ্কর তাঁর ছাত্র শঙ্খ চৌধুরীর দেওয়া রতন পল্লীর মাটির বাড়িটি ছেড়ে এণ্ড্রুজপল্লীর কোয়াটার্সে উঠেন। বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ এটি তাঁকে দিয়েছিল। এসময় থেকে তাঁর শরীর খুবই খারাপ হতে থাকে। শুরু হয় নানা রকম শারীরিক সমস্যা। প্রায় সারাদিন বিছানায় থাকতে হত। হাতের কাঁপুনি শুরু হয়েছিল। দৃষ্টিশক্তি কমতে কমতে এমন হয়ে পড়েছিল কোন কিছুই আর ভালো দেখতে পেতেন না। পাগুলো প্রায় অসাড় হয়ে পড়েছিল। ঘর থেকে বেরুতে পারতেন না। মাঝে মাঝে কখনো বারান্দায় কিংবা ঘরের ভেতর সামান্য পায়চারি এই-ই ছিল তাঁর চলাচল। তাও আবার আর কারো সাহায্য নিয়ে। তখন তাঁর প্রায় সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিলেন রাধারাণী দাসী। রাধারাণীই তাঁর সবকিছু দেখাশোনা করতেন। তাঁর ছাত্র ছাত্রীরাও আসত। পরে এসেছিলেন তাঁর ভাইপো দিবাকর আর নাতি সম্পর্কিত সাধন।
জীবনের এই কষ্টকর মূহুর্তগুলিতেও মৃত্যুর কথা ভাবতেন না। বেঁচে থাকার বড় সাধ ছিল তাঁর। সুস্থ হয়ে উঠে আবার কাজ শুরু করবেন এই রকমই ছিল তাঁর স্বপ্ন।
১৯৭৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডি.লিট সম্মাননায় ভূষিত করে। রামকিঙ্করের প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ‘লোকচিত্রকলা’ পত্রিকা, ‘পেইন্টার্স ফোরাম’ এবং কয়েকজন বিখ্যাত শিল্পীর পক্ষ থেকে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কাছে আবেদন জানানো হয়।
তাঁর প্রস্টেট গ্ল্যান্ডের অসুখ ছিল। এর ফলে মলমুত্র ত্যাগে তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন। খাওয়া দাওয়ার বোধও কমে গিয়েছিল। চিকিৎসার জন্য তাঁকে কলকাতায় নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কলকাতা যাওয়ার ব্যাপারে তাঁর বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। যাহোক ১৯৮০ সালের ২৩ মার্চ রামকিঙ্করকে কলকাতার শেঠ সুখলাল কারনানি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাঁর চিকিৎসার খরচের দায়িত্ব নেয় পশ্চিমবঙ্গ সরকার। বিশ্বভারতীর পক্ষ থেকেও কিছু টাকা দেয়া হয়। সিদ্ধান্ত হয় মস্তিষ্কে জমে থাকা পানি বের করার। ধারণা করা হয় এতে তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন। ২৬ জুলাই তাঁর মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করা হবে। তার আগের দিন মাটি দিয়ে বানালেন ছোট্ট একটি ভাস্কর্য। এটিই তাঁর জীবনের সর্বশেষ শিল্পকর্ম। পরের দিন অস্ত্রোপচার হল। দু‘একদিন সুস্থ ছিলেন। তারপর শুরু হলো মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ। ১৯৮০ সালের ২ আগস্ট রাত সাড়ে বারোটায় তাঁর মৃত্যু হয়। জীবনের,সৃজনের দীর্ঘ সময় তিনি যেখানে কাটিয়েছিলেন সেই শান্তিনিকেতনেই রচিত হলো তাঁর শেষ শয্যা।
রামকিঙ্কর ভারতীয় উপমহাদেশ শুধু নয় আধুনিক বিশ্বশিল্পের জগতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী। তাঁর জন্ম কিংবা কর্মস্থল যদি ইউরোপে হত তবে তাঁর প্রচার-পরিচিতি ও খ্যাতি আরো বহুগুণ বাড়তো এটা বলাই বাহুল্য। যা হোক, তাঁকে যারা জেনেছেন, তাঁর কাজ দেখেছেন যারা তাঁদের সকলের কাছেই শিল্পী হিসাবে অনেক শ্রদ্ধেয়, আর মানুষ হিসাবে বিস্ময়ের।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই মে, ২০১১ সকাল ১১:৩৫
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অভাগী থেকে ফেলানী অতঃপর ——- পর্ব ৩

লিখেছেন ওমেরা, ০২ রা মার্চ, ২০২১ বিকাল ৪:২২



সাহেদ বলে,আচ্ছ!! তাহলে তোমার সিরিয়াস কথাটা তাড়াতাড়ি বলে ফেল, আমার খুব ঘুম লাগছে।

আর কোন ভনিতা না করেই আছবা বলে, সাহেদ, আমি ফেলানীকে নিতে চাই,... ...বাকিটুকু পড়ুন

সব চোরের এক ''রা''

লিখেছেন মোহাম্মদ মোস্তফা রিপন, ০২ রা মার্চ, ২০২১ সন্ধ্যা ৭:৪৩

গবেষনা চুরির দায়ে অভিযুক্ত সামিয়া রহমান।তার বিরুদ্ধে প্রদত্ত শাস্তির বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলনে হাজির হয়েছেন কলিমুল্লাহ এবং তুরিন আফরোজকে নিয়ে।এই দুই জনের কর্মের খতিয়ান-
তুরিন আফরোজের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের খতিয়ান তার মা... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুবাই ফেইক শহর

লিখেছেন রাজীব নুর, ০২ রা মার্চ, ২০২১ রাত ১০:১০


ছবিঃ আমার তোলা।

আমি তো সারা জীবনের বোকা।
এই পৃথিবীতে প্রায় ৮০০ কোটি মানুষের বসবাস। তবে তারা সবাই বোকা নয়। প্রায় প্রতিটি মানুষ তার পাসওয়ার্ড একটা বা দুটো ক্যারেকটার... ...বাকিটুকু পড়ুন

তুমি ধুলো মাখা চেনা সংগ্রাম !

লিখেছেন স্প্যানকড, ০৩ রা মার্চ, ২০২১ রাত ১২:৫৮

সংকিত জীবন বোধে জুই ফুলের ঘ্রাণ

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ০৩ রা মার্চ, ২০২১ সকাল ৯:৫৩



প্রেমান্ধ যুবকের প্রিয়তোষণে তুমি গলে গেলে বরফ গলা নদীর মত;তার হৃদয়ে ভাসালে বেহুলা বাংলার ভেলা। হিজল বনের ডাহুকী দুপুরের প্রতিশ্রুতি ভুলে গিয়ে; নিতে চাইলে জুঁই ফুলের ঘ্রাণ। আকাশের রং যেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×