একটি ঘটনা দিয়ে শুরু করি...
কলেজে পড়ি তখন। আমাদের এক স্যার ম্যাথ ক্লাস নিতেন। খুবই পড়াশোনা করতেন, স্টুডেন্ডদের চাইতেও তিনি পড়াশোনা করতেন বেশী। এতটাই পড়ুয়া ছিলেন যে কলেজের অন্যান্য স্যারেরা তাকে স্টিফেন হকিং বলে ডাকতেন... পড়াতেনও যথেষ্ট ভালো।
তো একদিন তিনি ক্লাস নিচ্ছিলেন। কি যেন একটা জ্যামিতি বোঝাচ্ছিলেন। সেখানে চতুর্ভূজের একটি ব্যাপারও ছিল। উনি লেকচার দেয়ার সময় এক প্রসঙ্গে বলছিলেন "তোমরা ছোটবেলা থেকেই জানো, চারটি বাহু দ্বারা সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রকে চতুর্ভূজ বলে"। তো সেটি শুনে আমি দাঁড়িয়ে স্যারকে জিজ্ঞেস করলাম "স্যার, চারটি বাহু দ্বারা সীমাবদ্ধ হলেই হবে?" । স্যার বললেন "হ্যাঁ হবে"।
তখন আমি বললাম " স্যার, আমার একটি জিনিস নিয়ে কিছুটা কনফিউশন রয়েছে"। স্যার বললেন "কি কনফিউশন?"। তখন আমি ব্লাকবোর্ডের কাছে গেলাম। গিয়ে চক দিয়ে নতুন এক ডিজাইনের চারটি বাহু দ্বারা সীমাবদ্ধ এক ক্ষেত্রকে আঁকলাম ।আপনারা নিচের ছবিতে যেটি দেখতে পাচ্ছেন

সুন্দরমত এঁকে দিয়ে তারপর বললাম "স্যার , এটা কি চতুর্ভূজ হবে?"। স্যার আমার আঁকা ছবিটি নিয়ে ব্যাপক টেনশনে পড়ে গেলেন। "চারটি বাহু দ্বারা সীমাবদ্ধ ক্ষেত্র"র এমন ডিজাইন হতে পারে তিনি বোধহয় ভাবেন নি। অনেক্ষন ভেবে চিন্তে তিনি বললেন "না, এটা কোন চতুর্ভূজ হয়নি। চারটি বাহু দ্বারা সীমাবদ্ধ হবার পাশা পাশি তার বীপরিত কোনদ্বয়ের সমষ্টি দুই সমকোন বা ১৮০ ডিগ্রী এর সমান হতে হবে"।
আমি বললাম "স্যার, যতদূর মনে পড়ে সেটি শুধুমাত্র বৃত্তস্থ চতুর্ভূজের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ কোন চতুর্ভূজের যদি একটি পরিবৃত্ত আঁকা যায়, তবে শুধুমাত্র সে ক্ষেত্রে দুই সমকোনের এই ব্যাপারটি প্রযোজ্য। সব চতুর্ভূজের বেলায় তো নয়"। স্যার বললেন "এই থিওরী কোথায় পেয়েছো তুমি?"। আমি বললাম "সেটি নাইন টেনের গণিত বইয়ের ৪১ নম্বর উপপাদ্যে সম্ভবত পাবেন স্যার"। স্যার বললেন "যেখানেই পড়েছো, সেটি ভুল। আমি যা বলছি তা শোনো" ।
আমিও অত সহজে ছেড়ে দেবার মত ছাত্র নই। এবার আমি ব্লাকবোর্ডে একটি রম্বস আঁকলাম (নিচের ছবি লক্ষ্য করুন)। রম্বসের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এর যে দুটি বীপরিত কোনের সমষ্টি কখনোই দুই সমকোনের সমান হবেনা (কেউ চাইলে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন)।

তো আঁকা শেষে বললাম "স্যার, এটার বীপরিত কোনদ্বয়ের সমষ্টিও কিন্তু দুই সমকোনের সমান নয়। তাহলে এটাও কি চতুর্ভূজ নয়?" । স্যার আমাকে এবার একটি ধমক দিলেন "তুমি একটা সিলি ব্যাপার নিয়ে ক্লাসের সময় নষ্ট করছ। যাও গিয়ে বসো। আমি যেটা বলছি সেটা না জেনে বলছিনা।"
আমি আর কি করব? রনে ভঙ্গ দিলাম.. স্যার চতুর্ভূজ বোঝাতে গিয়ে চতুর্ভূজের সংজ্ঞাই যেখানে পালটে ফেলেছেন সেখানে আমি আর কি বলবো...
এবার মূল কথায় আসি..
যারা কবিতা লিখেন, তাদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন আমার এই স্যারের ক্যাটাগরীর। আমার স্যার চতুর্ভূজের সংজ্ঞা পাল্টেছেন, আর উনারা সংজ্ঞা পাল্টেছেন অশ্লীলতার। তাদের দৃষ্টিতে সাহিত্য কবিতায় অশ্লীলতা বলে কিছু নেই। যে জিনিসটি আমরা সবাই অশ্লীল হিসেবে জানি, সেটিকে তারা পবিত্র ও শালীন বলে প্রতিষ্ঠিত করতে বদ্ধপরিকর।
এদের কবিতাগুলোও হয় সেরকমই, তারা যেভাবে ভেবে অভ্যস্থ আরকি। তারা কবিতা লিখেন নারীর যেকোন একটি অংগের বর্ণনা দিয়ে। কোন মেয়ের স্তন কেমন, স্তনের সাইজ কতটুকু হলে কেমন লাগে এসব নিয়ে বিচ্ছিরি সব লাইন তারা ছন্দে ছন্দে মেলান।
নারীর নিতম্বের সাথে তারা জঙ্গলের মিষ্টি কুমড়ারও নাকি সাদৃশ্য খুজে পান শুনেছি। অনেকে আবার নারীর নিতম্বকে আকাশেও উঠিয়ে ছেড়েছেন। এটা কোন জাতের শালীন কবিতা হলো তা আমার বোধগম্য নয়।
আমি একজন কবির সেরকম একটি কবিতা নিচে তুলে দিচ্ছি.. নামটা নাহয় উল্লেখ নাইবা করি..
কাঠঠোকরা
গাছের যৌনাঙ্গ থেকে ঠিকরে পড়া রোদ্দুরের মতো শাদা শাদা
অনুভূতির প্রচ্ছন্ন আভায় পৃথিবী লেপ্টে আছে।
সমস্ত অনুভূতিই তবে শুদ্ধ সঙ্গীত। আর খচ্চরের পায়ু পথ দিয়ে
যে ধ্বনি নির্গত হয় কখনও কখনও তাও কারও কারও মর্মে পশে যেতে
পারে ব’লে মনে হচ্ছে।
দ্যাখো, একটি নারী আকাশের দিকে নিতম্ব দিয়ে শিশ্ন গর্জনের মতো
ধেয়ে আসা সৌরঝড় প্রতিহত করছে।
এবং এইসব অশ্লীল ঘটনার মোকাবিলা করতে করতে পেরিয়ে যাচ্ছে
সূর্যের আয়ুষ্কাল। তবু একজন কাঠঠোকরা জীবনে কতো কিউবিক কাঠ
ঠোকরায় তা হিসেবের বাইরেই থেকে যাচ্ছে।
আরেকটি কবিতা দিচ্ছি এবার। এই কবিতার কবিকে আপনারা একনামে চেনেন। তার নামও আমি উল্লেখ করছিনা। শুধু এটুকুই বলি, তার কবিতাটা পড়ে আপনার মনে হতে পারে এটি কোন চটি বই থেকে সংগৃহীত। আমার টাইমলাইনে দেয়াটা কতটুকু ভালো হচ্ছে জানিনা.. তবুও সাহস রেখেই দিচ্ছি তার কিছু লাইন...
ঈ-শ! ঈ-শ! এ-ই, আ-হ্, এইখানে, প্রিয়!
'ঈ-শ! ঈ-শ! এ-ই, আ-হ্, এইখানে, প্রিয়! এইখানে রাখো
জিভদেব! আ-হ্! ম'রে যাচ্ছি! চোষো, একটুকু ধীরে,
আ-হ্! ডান চাঁদে ঠোঁট রেখে চিরকাল থাকো,
পান করো, খাও, গেলো, শুষে নাও, ভেঙে, ফেড়ে, ছিঁড়ে।'
'ঈ-শ! ঈ-শ! এ-ই, আ-হ্, এইখানে, প্রিয়!'
'আমার মুঠোতে দাও রাজদন্ড! দাও! ধরি! বন্য দেবতা
এতো দৃঢ়! পেশল! শক্তিমান! উচ্চশির! দাও তারে মুখগহ্বরে!
কী প্রচন্ড! আ-হ্! কন্ঠের ভেতর শুনি পৌরাণিক অপরূপ কথা,
দম বন্ধ হয়ে আসে! ভেঙে পড়ছি আশ্বিনের ঝড়ে!'
'ঈ-শ! ঈ-শ! এ-ই, আ-হ্, এইখানে, প্রিয়!'
পরের লাইনগুলো আরো ভয়াবহ। তাই দিচ্ছিনা আর..
আমি আরো ভয়াবহ কিছু কবিতা পড়েছি। এমনো কবিতা পড়েছিলাম (নামটা খেয়াল নেই) যেটার আগাগোড়া নারী যৌনাঙ্গের এনালাইসিসের ফলাফল ছাড়া আর কিছু নয়। বুঝলামনা দুনিয়ায় কি কবিতা লিখার জন্য টপিকের দুর্ভিক্ষ লাগলো নাকি যে নারী যৌনাঙ্গ নিয়ে পড়ে থাকতে হবে !? :/
স্তনের ব্যবচ্ছেদই হোক, নারী নিতম্বকে আকাশে তোলাই হোক, কিংবা নারী যৌনাঙ্গ নিয়ে গবেষনা করা সহ যাই হোকনা কেন, তাদের কবিতাকে অশ্লীল বললেই দেখবেন তারা তা মানতে নারাজ! তাদের সে ঐতিহ্যবাহী ডায়লগই তাদের কাছ থেকে শুনবেন "সাহিত্য কবিতায় অশ্লীলতা বলতে কিছু নেই"। তারা যখন এ ডায়লগ দেয় তখন বলারও কিছু থাকেনা..
কারন চতুর্ভূজের সংজ্ঞা পালটে ফেললে যেমন কিছু বলার থাকেনা, তেমনি অশ্লীলতার সংজ্ঞা পালটে ফেললেও বলার উপায় নেই...
কিন্তু কথা হচ্ছে চতুর্ভূজ চতুর্ভূজই থাকবে, অশ্লীলতা অশ্লীলতাই থাকবে। এখন আমরা মানি , কিংবা না মানি। কিন্তু ঘটনা হচ্ছে, এই যে অশ্লীলতাকে শালীন হিসেবে তারা প্রচার করছেন, বা আমাদের মাঝে সেটি প্রতিষ্ঠিত করছেন, এর প্রভাবটি ভয়াবহ। খুব সোজা ভাষায় বলতে গেলে খুব অপবিত্র এবং নষ্ট একটা বিষয়কে তারা অত্যন্ত সুকৌশলে পাঠকসমাজে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করছেন যা কোনভাবে কোন যুক্তিতেই সমর্থযোগ্য নয়।
একজন যখন বাথরুমে গোছল করবে তখন হয়তো "নগ্নতাই অশ্লীলতা নয়" বাক্যটি প্রযোজ্য।
কিন্তু বাইরে যদি নগ্ন হয়ে বের হয় তাহলে তো সমস্যা! নগ্নতাকে কবিতার আকার দিলে তো অবস্থা আরো ভয়াবহ!
যাক.. কিছু আর না বলি... শেষে যা বললাম সেটির একটি তাতপর্য রয়েছে.. খোলাশা করে বললাম না... যা কিছুই তাদের বলা হোক না কেন, সেসকল কবিদের কখনো বোধদয় হবেনা....
এটি মোটামোটি নিশ্চিত...
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই অক্টোবর, ২০১৬ দুপুর ১:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



