যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য করা সংবিধানের প্রথম সংশোধনী ও আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়ের করা হয়েছে। রিটে সংবিধানের প্রথম সংশোধনী ও ট্রাইব্যুনাল আইনের কয়েকটি ধারা সংবিধান পরিপন্থী হওয়ায় বাতিলের আবেদনে করা হয়েছে। গতকাল সোমবার জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লার পক্ষে বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা ও কাজী রেজা-উল হক সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চে রিট আবেদনটি দায়ের করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার এর শুনানি হবে। রিট আবেদনে বিবাদী করা হয়েছে সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিব, আইন সচিব ও ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানকে । রিট আবেদনে সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে ৪৭ ও ৪৭(ক) এর ৩ অনুচ্ছেদ এবং আর্ন্তজাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ৩(১),৬(২),৬(৮),১৯(১),১৯(৩),২০(২) ও ২৩ ধারা বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে এসব ধারা বাতিল চাওয়া হয়েছে। রিট আবেদনে বলা হয়েছে ১৯৭৩ সালের ১৫ জুলাই আনা প্রথম সংশোধনীর ৪৭ ও ৪৭(ক)-এর ৩ অনুচ্ছেদে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য সশস্ত্র বাহিনী, সহায়ক বাহিনী বা যুদ্ধবন্দীকে দন্ড দেয়ার কোনো আইন সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্য হলেও বাতিল হবে না বলে উল্লেখ আছে। এসব অপরাধের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার প্রযোজ্য হবে না বলেও উল্লেখ রয়েছে। এটা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী। সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করা যায় না বলেও সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর রায়ে সুপ্রিমকোর্ট বলেছেন। অপরদিকে ট্রাইব্যুনালের বিষয়ে কোন আদালতে চ্যালেঞ্জ না করার বিধানের মাধ্যমে হাইকোর্টের এখতিয়ারকে খর্ব করা হয়েছে।
রিটে আরো বলা হয়, ২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন-১৯৭৩ সংশোধন করা হয়। কিন্তু এই সংশোধনীর আলোকে ১৯৭১ সালের অপরাধের বিচার করা হচ্ছে। সংবিধান অনুযায়ী বলবৎ আইনে অপরাধের বিচার করতে হবে। কোন আইনের ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দেয়া যাবে না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সংশোধনের পরও আইনের ভূতাপেক্ষতা দিয়ে আগের ঘটনার বিচার করা হচ্ছে। এই আইনের ৩(১) ধারায় প্রতিরক্ষা বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, সহযোগী বাহিনী বা যুদ্ধবন্দী এবং যে কোন ব্যক্তির বিচারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সংবিধানে যে কোন ব্যক্তির বিচারের কথা বলা হয়নি। ৬(২) ধারা অনুযায়ী সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি বা বিচারপতি হওয়ার যোগ্য ব্যক্তি ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান হবেন। ৬(৮) ধারা অনুযায়ী এই ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বা সদস্যদের নিয়োগ চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। এর মাধ্যমে হাইকোর্টের জুডিশিয়াল রিভিউর ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে। ১৯(১) ধারা অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে সাক্ষ্য আইন প্রযোজ্য হবে না। বই, ম্যাগাজিন, প্রকাশিত সংবাদ ইত্যাদি সাক্ষ্য হিসেবে আদালত গ্রহণ করতে পারবে। ১৯(৩) ধারা অনুযায়ী কোন প্রমাণ ছাড়া ট্রাইব্যুনাল প্রচলিত বা সাধারণভাবে জানা তথ্য গ্রহণ করতে পারবে। এর মাধ্যমে অভিযুক্তদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার খর্ব করা হয়েছে। ২০(২) ধারায় মৃত্যুদন্ডের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু মৃত্যুদন্ড দেয়ার জন্য অপরাধের মাত্রার বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। ফলে কোন অপরাধের জন্য মৃত্যুদন্ড দেয়া যাবে তা নিশ্চিত নয়। এছাড়া ২৩ ধারায় বলা হয়েছে, এই বিচারের ক্ষেত্রে ফৌজদারী কার্যবিধি প্রযোজ্য হবে না। অথচ ট্রাইব্যুনাল একটি ফৌজদারী আদালত।
এই বিধানগুলোকে সংবিধানের ৯৪, ৯৯ ও ১৪৭(৩) অনুচ্ছেদের পরিপন্থী দাবি করা হয় এবং বিধানগুলোকে অবৈধ ও সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণার আবেদন জানানো হয়।
সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের (১) দফায় বলা হয়েছে, যে কোন ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের (৩) দফায় বর্ণিত কোন আইন প্রযোজ্য হয়, সেই ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ, ৩৫ অনুচ্ছেদেও বর্ণিত (১) ও (৩) দফা এবং ৪৪ অনুচ্ছেদের অধীন নিশ্চয়কৃত অধিকারসমূহ প্রযোজ্য হইবে না। ৪৭ এর ৩ দফায় উল্লেখ রয়েছে, এই সংবিধানে যাহা কিছু বলা হইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও গণহত্যাজনিত অপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীন অন্যান্য অপরাধের জন্য কোন সশস্ত্র বাহিনী বা প্রতিরক্ষা বাহিনী বা সহায়ক বাহিনীর সদস্য কিংবা যুদ্ধবন্দীকে আটক, ফৌজদারীতে সোপর্দ কিংবা দন্ডদান করিবার বিধান সম্বলিত কোন আইন, আইনের বিধান এই সংবিধানের কোন বিধানের সহিত অসামঞ্জস্য বা তাহার পরিপন্থী, এই কারণে বাতিল বা বেআইনী বলিয়া গণ্য হইবে না কিংবা কখনও বাতিল বা বেআইনী হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে না।
রিট আবেদনের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেবেন সাবেক আইন মন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক।
গত ২ অগাস্ট জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও সাবেক মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লাকে পুরনো হাইকোর্ট ভবনে স্থাপিত ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
ওইদিনই ট্রাইব্যুনাল আইন লঙ্ঘন করে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ এই চার নেতাকে গ্রেফতার রাখার আদেশ দেয়।
গত ২৫ মার্চ সরকার যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা, আইনজীবী প্যানেল ও ট্রাইব্যুনাল গঠন করে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


