"ঠিক আছে !", মাদার তেরেসার কন্ঠে চমক, "আমরা প্রার্থনা করবো।"
ঘটনাক্রমে আমি একটি কাজে ভারতে গিয়েছিলাম এবং সে পথে বাংলাদেশে থাকায় একদিন মাদার তেরেসাকে পাইনি।কিছুদিন পর দিল্ল্লী হতে তার কলকাতার মাদার হাউসে আমি ফোন করলাম।
আমাকে বলা হলো ,"আপনি যেখানে আছেন তিনি তো সেখানেই অবস্থান করছেন, নতুন দিল্লীতে তার আশ্রমগুলো পরিদর্শন করছেন।" কিন্তু এই রাজধানীতেই সিস্টার বেনিডিক্টা বললেন যে তিনি চন্ডীগড়ে গিয়েছেন, কিছুদিন বাদেই ফিরবেন।
তাই আমি অপেক্ষা করতে থাকলাম।
মাদার তেরেসা এক দুপুরে চন্ডীগর থেকে ফিরলেন এবং অবশেষে আমরা কিছু কথা বলার সুযোগ পেলাম।
শ্রম আর বয়সের ভারে নুয়ে পড়ার আগেও তিনি ছিলেন 4 ফুট 11 ইঞ্চি লম্বা। তার শক্ত প্রশস্থ মুখে ছিল স্পষ্ট বলিরেখা। বার্ধক্যের নাজুক দুর্বল অবয়ব তাকে গ্রাস করেছে। এতদসত্ত্বেও তিনি এখনও দাপুটে। তার নীল চোখ দুটো এখনও স্থির, কর্তৃত্বপরায়ণ কিন্তু দয়ামাখা। অসংখ্য মেঝে পরিষ্কার করে বৃদ্ধ হওয়া কর্মঠ মানুষের মত ছিল তার লম্বা, বাকা, আর বড় সন্ধিযুক্ত হাত পা গুলো ।
মাদার তেরেসা আবার ফিরে এসেছেন। কিন্তু অচিরেই তিনি বেরিয়ে পড়বেন দিল্লীতে তার আরেকটি আশ্রমের পরিদর্শনে। তিনি বললেন তিনি কাজটাকেই জানাতে চান, নিজেকে নয়। কারণ তিনি নিজে গুরুত্বপূর্ণ কেউ নন। তিনি আমার নোটবই থেকে একটা কাগজ নিয়ে লিখলেন,
"সিস্টার অনুগ্রহপূর্বক জনাব টাওয়ারকে কাজগুলো ঘুরিয়ে দেখান এবং কিছু মন্তব্য টুকে রাখুন, (মা. তে.)।"
তার এই কটি শব্দই প্রতিটা দরজা খুলে দেয়।
দুঃস্থদের সাহায্য করার তাগিদ তিনি উপলব্ধি করেছিলেন বলেই মাত্র 18 বছর বয়সে ডাবলিনের লরেটো এবেতে সিস্টারদের সানি্নধ্যে গিয়ে ইংরেজি ভাষা রপ্ত করলেন। একই বছর 1928 সালে দার্জিলিং এ গিয়ে দীক্ষা নেয়া শুরু করলেন। 1931 সালের মধ্যে তিনি কলকাতার লরেটো সন্ন্যাস আলয় উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষক এবং পরে অধ্যক্ষ পদ লাভ করেন।
লরেটোর সবুজ বাগান আর স্কুল পোশাক পরিহিত বালিকাদের ঘিরে থাকা উচু কংক্রিটের অপর পাশে 'মতিঝিল', কর্দমাক্ত গলির বস্তি আর দুর্দশাগ্রস্থ কুড়ে ঘরের দঙল। তার চোখে ধরা পড়লো নোরাং জঞ্জালে আবদ্ধ অপরিচ্ছন্ন শিশু, রোগ, শোক, ক্ষুধা, দারিদ্র আর উন্মুক্ত নর্দমার দৃশ্য। স্কুল শেষে তিনি প্রায়ই বস্তিবাসীদের কাছে ঔষধ পথ্য নিয়ে যেতেন।
1946 সালে রেলপথে দার্জিলিং যাত্রাকালে তিনি তার দ্বিতীয় ডাক পেলেন। স্পষ্ট ডাক। আমাকে সন্ন্যাসালয় ছেড়ে গরীব দুঃস্থদের মাঝে থেকে তাদের সেবা করতে হবে। এটা ছিল একটা আদেশ।
এসবকিছুর গন্ডি থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীনভাবে সন্ন্যাস জীবন পালনের অনুমতি লাভের জন্য দ্বিধাগ্রস্থ কিন্তু প্রবল মানসিক শক্তির অধিকারী সেই নানের মাত্র দুই বছর সময় লেগেছিল । পাটনায় গিয়ে তিনি প্রাথমিক চিকিৎসার উপর কোর্স করে ফিরে এলেন কলকাতার বস্তিতে।
তার প্রথম স্কুলটি ছিল শুধু একখন্ড মাটির উপর, যেখানে কাদার উপর কাঠি দিয়ে তিনি পাচ ছয়জন শিশুর জন্য বা ং লা বর্ণ লিখতেন। বিষয়টি বস্তিবাসীদের নজরে এলো, কিছু টেবিল এলো , তারপরে তার সাথে যুক্ত হলো বেঞ্চি, ব্ল্যাকবোর্ড, আরো শিশু কিশোর।
কি হচ্ছে লক্ষ্য করুন। মাদার তেরেসা মৌলিক চাহিদার বিষয়টিই দেখেন। অভাবীদের উদ্দেশ্যে তিনি সরাসরি কথা বলতেন, সেখানকার বিষয় নিয়ে। যারা সাহায্য প্রাপ্ত হচ্ছে, এবং বৃহত্তর সমপ্রদায়ের লোকজন দেখতো ভালো কাজ হচ্ছে এবং তারা সহায়তা করতো।
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


