ডাকপিয়ন অগ্রসর হয়। মনে আনন্দ আসে। ফিস ফিস গান গায়। বাতাসও শা শা তাল মেলায়। পিঠের ঝোলাটি ক্রমশঃ হালকা হয়ে আসে। যদিও সেদিকে তার মনোযোগ নেই। ঝুলন্ত ঝোলা থেকে তখন টুপ করে রক্ত গড়িয়ে পড়ে, সে-সাথে নানা রঙের ধূয়া_ লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, কালো। চিক চিক করে একটা সাদা পাখি আকাশে ওড়ে যায়। পাখির ঝাপটানি থেকে রং ছড়িয়ে পড়ছে। ডাকপিয়ন হাঁটছে, আর দূর দিগন্তে, যেখানে আকাশ নেমেছে, সে-দিকে সটান তাকিয়ে আছে। আরও প্রতি পদে পদে পেছনে ছড়িয়ে দিচ্ছে রঙের রেখা। তার পিঠ থেকে রঙধনুর গুটানো ভাঁজ খুলছে, এক দিগন্ত থেকে আরেক দিগন্ত বাঁধতে যেন তার প্রস্তুতি। রঙের ঘষার সাথে সাথে সাথে শব্দের লহরি উঠে। তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। ডাকপিয়ন তখন থমকে দাঁড়ায়, পেছনে তখন বিরাট মট মট শব্দের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি। ডাকপিয়ন আচানক এক লম্ফ দিয়ে স্থির। ঘাড় ফিরিয়ে ভালোভাবে অবলোকন করে, দেখে অশ্বত্থ বৃটি নেই। মনে ইতস্তত প্রশ্ন জাগে, গাছটি নেই নাকি সে চলে গেছে অনেক দূর। প্রশ্নের কোন মীমাংশা পায় না। চোখে পড়ে, একটি ছায়া আকাশে ওড়ে যাচ্ছে। আর অনেক পাখি ছায়া থেকে কায়া প্রাপ্ত হয়ে নীল আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে। ছায়াটি এক সময় অদৃশ্য হয়ে যায়, আর পাখিগুলি দিগন্তে মিলিয়ে যায়।
ডাকপিয়ন আবার পা চালাতেই, অনেক লোকারণ্য দেখতে পায়। মানুষেরা তাকে ঘিরে ধরে। সবাই হাত বাড়িয়ে দেয়। পাতা হাতের দিকে তাকিয়ে, সে ঝোলাটি সামনে নিয়ে আসে। তারপর সবার হাতে একটি একটি করে চিঠি তুলে দেয়। চিঠি পেয়ে কেউ হেসে ওঠে, কেউ কেঁদে ফেলে, কেউ মুক হয়, কেউ মাটিতে গড়িয়ে পড়ে...
বিবিধ মুখর শব্দাবলি পেছনে ফেলে ডাকপিয়ন আবার পথে নামে। মাইলের পর মাইল, মাঠের পর মাঠ। চলার শেষ নেই। সূর্য উঠে, সূর্য ডুবে। রাত হয়, দিন হয়। তার পথ শেষ হয় না। চুল তার ধীরে ধীরে কালো থেকে সাদা হয়। প্রতিদিনই কিছু চুল খসে পড়ে। কখনও থমকে দাঁড়িয়ে, অশ্বত্থ বৃটি খোঁজে। কখনও পায়, কখনও পায় না। ঝাপসা চোখে আকাশ দেখে, আকাশে চিঠিরা লুটোপুটি খায়। ঝম্ ঝম্ বৃষ্টি, তাকে ভিজিয়ে দেয়। সূর্যের তেজ তাকে পুড়িয়ে দেয়। হেঁটে যায় অনন্তের দিকে।
(অংশ বিশেষ)
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




