দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে সময়পেণ করে মেট্রো বাস সার্ভিসে উঠার অভ্যাস ঢাকাবাসীর দৈনন্দিন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গত বছর থেকে নতুন এক নিয়ম। তা হল দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে বই দর্শন। র্যাব ও পুলিশের তত্ত্বাবধানে মেটাল ডিক্টেটরের মধ্য দিয়ে ভদ্রসুবোধভাবে বইমেলায় প্রবেশ। এতে কেউ বিরক্তি বোধ করে, কেউ স্বস্থি বোধ করে। তবে মনে কিন্তু ভয়ের এক চিকন রেখা কম্পন কেটে যায়। প্রতি বছর বইমেলার আগে বাংলা একাডেমী কিছু মান্য নিয়মরীতি তৈরি করে। নিয়মগুলো আমাদের আশান্বিত করে। এর অন্যতম থাকে মেলা হবে সত্যিকার বই প্রকাশকদের, এক প্রকাশনীর বই অন্য প্রকাশনীর স্টলে থাকবে না, স্টল লটারির মাধ্যমে বণ্টন হবে। তা যে হয় না মেলায় প্রবেশ করলেই বুঝা যায়। অবাঞ্ছিত স্টলের দাপট দেখা যায়। এক সময় বইমেলাকে কেন্দ্র করে টিএসসি থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত বসতো আরেক মেলা। প্রকাশিত হতো প্রচুর অডিও ক্যাসেট, নানা দেশী খাবারের পশরা বসতো, সে সঙ্গে মৃৎশিল্প ও কুটির শিল্পের সরব উপস্থিতি। যেন বাঙালির সংস্কৃতির সমগ্রতা উপ্চে পড়তো। বারোয়ারি মেলা অভিধা দিয়ে বহিরাঙ্গনের এই সব স্ফুরণগুলোকে নিবৃত্ত করা হয়। অথচ এখন বইমেলার মূল উঠোনেই চলছে বইবিহীন প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতি! কাগজের দাম চড়া তবু প্রচুর বই প্রকাশিত হচ্ছে। বইয়ের বৈচিত্র্য বেড়েছে। উপন্যাস বেশি প্রকাশিত হলেও একচ্ছত্র আধিপত্য আর নাই। সাধারণ পাঠকের কাছে এখনও উপন্যাসেরই বেশি চাহিদা। গল্প কবিতার বইয়ের সংখ্যা কমছে, পাঠক স্বল্পতাই এর অন্যতম কারণ। তবে আশার কথা কবিতার ক্রেতা বাড়ছে। মননশীল ও গবেষণাধর্মী বইয়ের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু মান বাড়ছে না। তবে বাড়ছে বিভিন্নতা। সাহিত্য, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস, নারী, জেন্ডার, বিশ্বায়ন, পরিবেশ-প্রকৃতি বিষয়ক প্রচুর বই প্রকাশিত হচ্ছে। এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলোতে দেশীয় নানা সমস্যা বিশেষ করে নারীর মতায়ন, আদিবাসী সমস্যা, পরিবেশ, নারীবৈষম্য, মানবাধিকার, সুশাসন বিষয়ক গ্রন্থ প্রকাশ করেছে। বের হচ্ছে দেশের জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের আত্মজীবনী, স্মৃতিকথা। বই এখন আর শুধু শখের অনুসঙ্গ নয়, দরকারি অনুষঙ্গ। ফলে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বইয়ের ডালপালা গজাচ্ছে। অনেক বিজ্ঞান ভিত্তিক বই বের হচ্ছে। অধিকাংশ বই-ই জানার কৌতূহল মেটায়, তাত্তি্বক জগতে প্রবেশ নিষেধ হয়ে থাকে। এর থেকে বিজ্ঞানে আমাদের অর্জনের দৈন্যতা বুঝায়। এছাড়া এবারের বইমেলায় একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো বিভিন্ন বিষয়ে সংকলন, সম্পাদনা, নির্বাচিত, সমগ্র ও অমনিবাস জাতীয় গ্রন্থের আধিক্য। ষাট পৃষ্ঠার উপন্যাসের জমানায় ছয়শ পৃষ্ঠার গ্রন্থ দেখতে মন্দ লাগে না। তবে এগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বেশিরভাগ েেত্রই বানান সমস্যা, সম্পদনার দুর্বলতা, নির্বাচনের সীমাবদ্ধতা পীড়াদায়ক। বের হচ্ছে নানা অনুবাদ গ্রন্থ। গত কয়েক বছর ধরেই। এবার বইমেলায় একটু বেশি। সৃজনশীল মননশীল সব বই অনুবাদ হচ্ছে। এটা একটা সুখের খবর। তবে কেউ কেউ বলে থাকেন অনুবাদের চেয়ে মূল গ্রন্থটিই তারা বেশি হৃদয়ঙ্গম করতে পারছেন। ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। তারপরও কেন অনুবাদের প্রতি এই টান? এটা যদি অপর সাহিত্যের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা হয় তবে স্বাগতম আর যদি হয় নিজেদের সাহিত্যচর্চার নিষ্ফলা মাঠটাকে কার্পেটের মতো ঢেকে রাখা, তবে? এত দিন ধরে বইমেলা হচ্ছে কিন্তু এখন পর্যন্ত একে একটি সৌন্দর্যময় স্থাপত্যে উপনীত করা যায়নি। বরং অপরিকল্পিত গিঞ্জি বাজারে পরিণত হয়েছে। একটু খোলামেলা আলো-হাওয়ায় যে বইয়ের সঙ্গে আত্মীয় সম্পর্কটা পোক্ত করে নেওয়া, তা আর হচ্ছে না। লিটলম্যাগ চত্বরে যে তারুণ্য টগবগ করতো সেখানে তাদের জন্য কোন স্পেস রাখা হয়নি। বাংলা একাডেমী তো তরুণ সাহিত্যকদের জন্য অন্ততপ েবইমেলায় একটু সদয় ব্যবহার করে তাদের সারা বছরের অবজ্ঞার কিছুটা দায় মেটাতে পারে! এতে করে জাতির মনন নিশ্চয় সমৃদ্ধ হবে। আমরা আশা করব বইয়ের অঙ্গসৌষ্ঠবে সৌন্দর্যের যে উচ্চতায় আমরা পেঁৗছেছি, আমাদের স্টলগুলোও তেমন হবে। তবে নানা প্রতিবন্ধকতার মাঝে একুশে বইমেলা আমাদের জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। বোমাসন্ত্রাস উপো করে, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষ মেলায় যায়। বইয়ের সাথে লেখক-পাঠক-প্রকাশকের সম্পর্ক দৃঢ় হয়। অদল-বদল করে তথ্য, জ্ঞান, আবেগ। সে সঙ্গে পরামর্শ, সমালোচনার মাধ্যমে আগামী দিনের পরিকল্পনা ঝালিয়ে নেওয়া। আছে নানা অভিযোগ, অনুযোগ, সমস্যা; তারপরও বহমান রাখার প্রত্যয়। কেননা এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আমাদের স্বাধীনতার প্রাণভ্রমরা, হৃদয়ে একুশ মানে বাঙালি জাতির অমরতা।
যুগান্তর 17 ফ্রেব্রুয়ারি
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৬ দুপুর ১:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




