পাইরেসি শব্দের অর্থ জলদসু্যতা। সমুদ্র কিংবা সমুদ্রের আশপাশে অনুমোদনবিহীন লুটতরাজ চালানোকে পাইরেসি বলে। আর পাইরেসির সঙ্গে সংশিস্নষ্ট ব্যক্তিকে পাইরেট বলে, মানে জলদসু্য বলে। বিশ্বব্যাপী পাইরেসি একটি আলোচিত বিষয়। পাইরেসি মূলত সমুদ্র-উদ্ভূত, হাজার হাজার পণ্যবাহী জাহাজকে কেন্দ্র করে এর বিসত্দৃতি। যদিও আজকাল এই শব্দের ব্যবহার ব্যাপক। প্রতিটি পণ্যের অনুমোদনহীন ব্যবহার ও উৎপাদনকেও পাইরেসির আওতায় ধরা হয়। এমনকি সৃজনশীল শিল্পের ৰেত্রেও পাইরেসি আজ এক জ্বলনত্দ বিষয়। বলতে কি পাইরেসি বলতে আজকাল আমরা বইপত্র ও গান-বাজনার অনৈতিক ব্যবহারকেই বুঝি।
শুধু পণ্যবাহী জাহাজের ৰেত্রে প্রতিবছর পাইরেসির কারণে ৰতির পরিমাণ 13 থেকে 16 বিলিয়ন ডলার। এবং পাইরেসির বড়সড় ৰেত্র হলো প্রশানত্দ ও ভারত সাগর, সোমালিয়া উপকূল এবং মালাক্কা ও সিঙ্গাপুর প্রণালী। এসব এলাকায় প্রতিবছর 50 হাজার বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে। ইউরোপীয় ও আমেরিকার পাইরেটরা একধরনের পতাকা ব্যবহার করে, নাম জলি রজার। চলচ্চিত্রকার ও পুতুল প্রস্তুতকারকরা এ ধরনের পতাকা হরদম ব্যবহার করে থাকেন।
সতের শতকের দিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজে পাইরেসি হতো। সেখানে পাইরেসিতে নিয়োজিতদের বলা হতো বাক্যানিয়ার। এ শব্দটি এসেছে বুওকান থেকে। এর অর্থ মাংস রান্নার কাঠের চেলা। ফরাসি শিকারি বুওকেনিয়ার্স হতে শব্দটি উদ্ভূত। তারা ছিল আধা-আইপড। এরা স্পেনের জাহাজ আক্রমণ করত। বাক্যানিয়ারদের সঙ্গে একজন বিখ্যাত লোক জড়িত ছিলেন। তিনি হলেন হেনরি নরম্যান। ঐতিহাসিকভাবে আলোচিত কাসিক্যাল অ্যান্টিকু্যইয়টি, টাইরেনিয়ান ও থ্রেরাসিয়ানরা ছিল পাইরেট। ডাচ পাইরেটদের বলা হয় ভ্রিজবুটারস। এখানে ভ্রিজ শব্দের অর্থ স্বাধীন আর বুটার শব্দের অর্থ লুটেরা। সতের ও আঠার শতকে পাইরেটদের বলা হতে ম্যারোনার। ম্যারোন শব্দের অর্থ নির্জন দ্বীপের পরিত্যক্ত ব্যক্তি কিংবা কোথাও আবদ্ধ হয়ে পড়া। এসব ম্যারোনাররা জাহাজের অফিসার, ক্রুম্যান কিংবা বন্দী পর্যায়ের লোক ছিল। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় পাইরেটদের বলা হয় লানান। মালাক্কা প্রণালী তারা আষ্টেপৃষ্টে প্রভাবাধীন রেখেছে। সমুদ্রচারী মানুষকে বোঝানোর জন্য তৈরি লানান শব্দটি পনের শতকে পাইরেটের প্রতিশব্দ হয়ে ওঠে। প্রকৃতপৰে ইন্দোনেশীয় ভাষায় এর যুতসই শব্দ হলু বাজাক।
বলা যায়, সব দেশেই পাইরেসির চল ছিল। বিভিন্ন দেশে এর রকমসকম আলাদা, বিভিন্ন ভাষায় এর শব্দগত অবয়ব আলাদা। কোনো এক সময় পাইরেসিকে কেউ অনৈতিক বলে ভাবত না। জীবনের অংশই ছিল পাইরেসি। পৃথিবী যত আধুনিক হলো, পুঁজিবাদী সমাজের বিকাশ ঘটল, সম্পত্তির ওপর ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বত্ব প্রতিষ্ঠা হলো পাইরেসি তত অনৈতিক অভিধা পেল। বিভিন্ন মেধাস্বত্ব আইনের মাধ্যমে অবস্তুগত জ্ঞানের ওপর পাইরেসি আইনের সীমা তৈরি হলো। এসব আইন যেকোনো লোককে এক সময়কার জলদসু্যদের পর্যায়ভুক্ত করার অছিলা পেল। জলদসু্যরা এখন স্থলে-আকাশে পাইরেসি করছে।
অথচ একসময় কিন্তু অনুকরণ, অভিযোজন, ব্যবহার কিংবা নিজের মতো করে মানানসই করে নেওয়ার মধ্যে অনৈতিকতা ছিল না। আমাদের সমাজের কথাই বলা যাক। গানের দেশ বলে যা সুপরিচিত। হাজার হাজার গান গ্রামে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, অথচ এর রচয়িতা কে, কেউ জানে না। শত শত বছর ধরে মানুষ এর রস আস্বাদন করছে, কেউ হয়তো নিজের মতো করে কয়েক পঙ্ক্তি বদলেও নিচ্ছে। আমাদের পালাগান কিংবা পাঁচালিগুলোর রূপবৈচিত্র্য রয়েছে। দেখা যায়, একই সূত্র হতে এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন রূপের যাত্রা-পালা তৈরি হচ্ছে। দেশজ প্রযুক্তির কথাই বলা যাক। শত শত বছর ধরে দেশজ জ্ঞানের যে অর্জন, তার স্বত্ব তো কোনো ব্যক্তি দাবি করছে না, পুরো জাতিই যেন এর স্বত্বাধিকারী। আসলে আমাদের বহমান ঐতিহ্যে সমগ্রতার ধারণা ছিল প্রধান, ব্যক্তি তার অর্জনকে মমত্বের কাছেই ন্যসত্দ করত।
বর্তমান সমাজে পাইরেসি খুবই অনৈতিক কাজ। আইন দ্বারা একে রোধ করার ব্যবস্থা হয়েছে। তারপরও পশ্চিমা বস্তুগত পণ্য, তেমনি জ্ঞানগত পণ্য প্রচুর পরিমাণ পাইরেসি হচ্ছে, বিশেষ করে ব্যবহারের ৰেত্রে। এর মধ্যে অন্যতম হলো কম্পিউটার সফটওয়্যার। তেমনি বইপুসত্দকও পাইরেসি হচ্ছে। পাইরেসি হচ্ছে ব্র্যান্ডনেম, লোগো, সেস্নাগান ইত্যাদি। পাইরেসি এখন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ৰমতা প্রয়োগের একটি অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। পাইরেসির নামে ব্যক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যক্তির রম্নচি-অভ্যাস ও স্বভাবকে নিয়ন্ত্রণ করছে। তাই পাইরেসি নিয়ে দরকার জটিল এক তদনত্দ।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা এপ্রিল, ২০০৭ সকাল ৭:২৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




